somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সরকারি বৃত্তি নিয়ে কিছু কথা - অপ্রিয় শোনাতে পারে।

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের সময়ে ক্লাস ফাইভ এবং এইটে বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। পিএসসি জেএসসির যুগে জানিনা এখনও সেটা আছে কিনা। যদি না থাকে, তাহলে লেখাটিকে আজাইরা বকবক ভেবে ইগনোর করতে পারেন। তবে যেহেতু জীবনে আরও মাইলফলকে বৃত্তির ব্যবস্থা আছে, কাজেই নিজ অভিজ্ঞতার কিছু কথা বলা যাক। কাজে লাগবে অবশ্যই।
তা ক্লাস ফাইভে উঠার আগে থেকেই জানতাম একটা পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলে টাকা কামানো যায়। ফার্স্ট সেকেন্ড হলে চার পাঁচ হাজার টাকা বোধয়। ফার্স্ট সেকেন্ড না হলেও যা টাকা আসে সেটাও কম না। আর প্রাইভেট বৃত্তি পরীক্ষাগুলোর কথা নাহয় বাদই দিলাম। সিলেটের বিখ্যাত চাঁনমিয়া বৃত্তির (প্রাইভেট) চানমিয়ার নাতি তখন আমাদের বন্ধু! যতদূর মনে আছে সে বাসা থেকে নিজের দাদার নামে বৃত্তির পরীক্ষায় বসার অনুমতি পায়নি। আংকেলের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
তো যা বলছিলাম, আমরা তখন প্রাইমারি ক্লাসের ছাত্র, পকেটে চার আনা পয়সাও আসেনা। এদিকে স্বপ্ন দেখি কোটিপতির। আইসক্রিম খাবার সময়ে ইচ্ছে হয় বৃত্তির টাকা পেলে আস্ত এক গাড়ি আইসক্রিম কিনে খেয়ে শেষ করবো। ভিডিও গেম্স্ খেলার সময়ে চিন্তা করি বৃত্তির টাকা পেলে অবশ্যই অবশ্যই একটা গেম কনসোল কিনবো। এদিকে যখন কমিক বা গল্পের বই পড়ি, তখন সিদ্ধান্ত নেই লাইব্রেরির যত বই আছে তা না কিনে থামবো না।
আমাদের বাবা মারা তাঁদের সাধ্যের মধ্যে যা সম্ভব পুরোটুকু ঢেলে দিয়ে আমাদের তৈরী করেন বৃত্তি পরীক্ষার জন্য। বৃত্তি পেলে যে অর্থপ্রাপ্তি হবে, তারচেয়ে অনেক বেশি খরচ করে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত বৃত্তিপরীক্ষা বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের বাড়িতে কোচিং, স্কুলের কোচিং, বাড়িতে গৃহশিক্ষক.....কোনই ফাঁক বাকি নেই। তাঁদের বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অনেকের বাচ্চাই পরীক্ষা দিবে, এবং অনেকেই গর্বিতমুখে বলবেন, "আমার বাচ্চা বৃত্তি পেয়েছে।" তাঁরাও নিজেদের সেই গর্বিত অভিভাবকদের মধ্যে দেখতে আগ্রহী। নানান মোটিভেশনাল কথাবার্তা, "যদি তুমি বৃত্তি পাও, চাকরির সময়েও তুমি বলতে পারবে তুমি ফাইভে/এইটে বৃত্তি পেয়েছিলে। তাহলে চট করে তোমার চাকরি হয়ে যাবে। সবাই কত সম্মান করবে তোমাকে!..........."
আমার এইসব দূর ভবিষ্যতের চাকরি নিয়ে চিন্তা নেই (মিলিটারিতে যাবার ইচ্ছা ছিল) তখন বৃত্তির জন্য শুধু একটাই মোটিভেশন, পয়সা। এইটা ঐটা সেইটা কিনতে পারার লোভ।
বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুলো। ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড তিনটাই আমাদের স্কুলের ছেলে মেয়ে। (ফোর্থ পজিশন পাইলট স্কুলের ফার্স্ট বয়ের এবং তারপর আবারও তিন চারটা সিরিয়াল আমাদের স্কুলের।) দুইজন ডাক্তারের সন্তান এবং অপরজনও কোন অভাবী পরিবারের সন্তান নয়। স্কুল বিবেচনায় আমাদের স্কুল থেকে সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী বৃত্তি পেয়েছে (আগের দশ বছর বা তারও অনেক আগে থেকেই এই ধারা চালু আছে, আমরা শুধু ধরে রেখেছি), প্রিন্সিপাল টিচার এবং অন্যান্য টিচাররাও এতে খুশি। ক্লাস সিক্সে অন্যান্য স্কুল থেকেও আরও কিছু ছাত্রছাত্রী এসে আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়ে দলকে আরও শক্তিশালী করেছে। এদের কেউ কেউ আবার গ্রাম থেকে পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি পেয়েছে। কারন সেখান থেকে বৃত্তি পাওয়া নাকি সহজ। খুব সম্ভব কোটা সিস্টেম আছে তাতে। এবং বলাই বাহুল্য, সবগুলিই পয়সাওয়ালা পরিবারের সদস্য।
এখন সরকারি বৃত্তির যে মূল উদ্দেশ্য, গরিব মেধাবী ছাত্রদের মেধানুযায়ী বৃত্তি প্রদান, যাতে তাঁরা তাঁদের পড়ালেখা এগিয়ে নিতে পারে, সেটা কতটুকু সফল হলো? আমাদের বাবা মারাতো সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী, তাঁদের বন্ধুবান্ধব, যাদের সন্তানেরা সবাই বৃত্তি পেয়েছেন, তাঁরা মোটামুটি সবাই বিসিএস ক্যাডার বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, কিংবা নামি ব্যবসায়ী, দামি চাকুরে, তাঁরা কেউই বিষয়টা আমলে নিলেন না। বরং এটিকে প্রেস্টিজ ইস্যু বানিয়ে ফেললেন। আমাদের দেশের সরকার এতটাও ধনী নয় যে বড়লোকের সন্তানের জন্যও বৃত্তি দিবে, এবং তাঁদের দরকারও নেই - এক্ষেত্রে সরাসরিই বলতে হবে, আমাদের সবার অভিভাবকগণ গরিবের পেটে লাথি দিয়েছেন। তাঁদের দোষ ছিল না, তাঁরা উপলব্ধিই করেননি কত মহাপাপ তাঁরা করছেন। পরমকরুনাময় তাঁদের ক্ষমা করুন।
আমাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছেলে পড়তো। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এমনিতেও এক্সপেন্সিভ, ব্র্যাক এবং এনএসইউ এই এক্সপেনসিভের মধ্যেও এক্সপেন্সিভ। তবে ব্র্যাকের সুবিধা হচ্ছে এরা নানান স্কলারশিপ প্রদান করে থাকে। নিড বেস স্কলারশিপ তাদের একটি। আমাদের ব্র্যাকের এক ছেলে ছিল, যে নিজেই ব্যবসা করতো, এবং যার মাসিক যায় তখনকার মার্কেটে ছিল মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা। সে কী করলো জানেন? একটা টিনের ঘর ভাড়া করে কাগজে পত্রে দেখালো সেটা তাঁর বাসস্থান যেখানে সে গরিব বাবা মা নিয়ে থাকে। তারপর নিড বেস স্কলারশিপ এপ্লাই করে বসলো। ব্র্যাক লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখে আসলেই ছেলের স্কলারশিপের প্রয়োজন আছে। ব্যস, পেয়ে গেল!
ব্র্যাকেই আমাদের সিএসই ডিপার্টমেন্টের ডিন ছিলেন প্রফেসর সাঈদ সালাম স্যার। তিনি গর্ব করে বলতেন তিনি সমাজের অত্যন্ত নিচু শ্রেণী থেকে উঠে এসেছেন, এবং তাঁর পিতাকে কখনই তাঁর জন্য কোন টাকা ব্যয় করতে হয়নি। তিনি চলেছেন স্কলারশিপের উপর। বৃত্তি পেয়ে পেয়ে তিনি বিদেশী ডিগ্রিও অর্জন করে দেশে ফিরে এসেছেন। একবার ক্লাসে ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করায় (পাশের বন্ধুর সাথে কথা বলেছিলাম) তিনি তাঁর রুমে গিয়ে আমাদের বলেছিলেন, "একটা সেমিস্টারে তোমাদের বাবা একটি সাবজেক্টের পেছনে যত টাকা খরচ করেন, তত টাকা বুয়েটের একটি ফুল স্কেল প্রফেসরেরও বেতন না। তোমরা কত লাকি তোমরা জানোনা। তোমাদের শিক্ষার পেছনে তোমাদের বাপের টাকার কদর করতে শেখো।"
হ্যা, মেধাভিত্তিক স্কলারশিপ, যেটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অফার করে, সেটা নিয়ে কোনই অভিযোগ নেই। আমার সাথে সাঈদ সালাম স্যারের বকা খাওয়া অপর ছেলেটি ১০০% ফ্রী স্কলারশিপে পড়তো, কারন ভর্তি পরীক্ষায় সে প্রথম হয়েছিল ও নির্দিষ্ট সিজিপিএ ধরে রেখেছিল।
কথা হচ্ছে, এই যে সরকারি বৃত্তি পেয়ে পেয়ে গরিব ঘরের কয়েকটা মাত্র সন্তান এতদূর এগিয়ে আসছেন, সেখানে অপ্রয়োজনে ভাগ বসিয়ে আমরা আরও কতজনের ভাগ্যের গলা টিপে হত্যা করছি? গরিব ঘরের কতজন ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা টাকার অভাবে আটকে যাচ্ছে, যেখানে হয়তো সরকারি সাহায্য পেলে আসলেই তাঁদের পড়ালেখা সুন্দর এগিয়ে যেতে পারতো। আমাদের সন্তানদের নিয়ে গর্ব করতে হয় অন্য হাজারো বিষয় নিয়েইতো গর্ব করা যায়। ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে/সব সাবজেক্টে A পেয়েছে -
এইতো যথেষ্ট, বৃত্তিও পেতে হবে কেন?
প্রায় ৯০% মানুষের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কথাগুলো লিখলাম। আপনারা হয়তো বলবেন, "যে যোগ্য, সেই বৃত্তি পাবে। এখানে ধনী-গরিব আসছে কোত্থেকে?" তাহলে আপনারাই নিজেদের জিজ্ঞেস করুন, ধনি বা মধ্যবিত্তের সন্তানের পড়াশোনার জন্য বৃত্তি প্রাপ্তিরই বা প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? টাকার অভাবেতো তাঁদের পড়াশোনা এটকে যাবেনা। "ভাল ছাত্র" প্রমান চাইলে স্কুলের বা বোর্ডের পরীক্ষাইতো যথেষ্ট।
ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন এই ব্যাপারে কিছু করবেন কিনা। আপনি হতে পারেন ট্রেন্ড সেটার। বন্ধুবান্ধব যখন বাচ্চাদের বৃত্তি নিয়ে কথা তুলবে, বলবেন, "আমারটাকে আর বৃত্তি পরীক্ষায় বসতে দিবো না। ওরতো টাকা পয়সার দরকার নেই, শুধু শুধু গরিবের বাচ্চার পেটে কেন লাথি দেয়া?"
লোকের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে আপনার সামান্য কথাটিই যথেষ্ট।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ১:৪৬
১০টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বরাজনীতি চলে স্বার্থের হিসেবে, আমরা চলি অন্ধ আবেগে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২২


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস হলো বিশ্লেষণ। চাল, ডাল কিংবা তেলের দাম নিয়ে যতই হাহাকার থাকুক, ভূরাজনীতি নিয়ে জ্ঞানের কোনো অভাব নেই। চায়ের দোকানে বসে যিনি নিজের বাসার গ্যাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছুই ভাল্লাগে না আজ তবু সময় বয়ে যায়

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০৮


কিছুই ভাল্লাগে না আজ
মানুষের মুখে মানুষেরই রক্তের গন্ধ লেগে আছে
শিশুর কান্না আকাশ ছুঁয়েও
কোনো ক্ষমতার প্রাসাদের জানালা কাঁপে না।

বাংলাদেশ জেগে থাকে
গ্যাসের অপ্রতুলতা, দ্রব্যমূল্যের দীর্ঘশ্বাস,
বেকার যুবকের অনিদ্রা,
আর প্রতিদিনের অগণিত অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির পাশে।
সংবাদপত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

"জাগো বাহে কোনঠে সবাই"....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৩৬



ফেসবুক মেমোরিঃ
৩২ জুলাই এই পোস্ট লিখেছিলাম.....

"জাগো বাহে কোনঠে সবাই"....

ভালো থাকার চেষ্টা সবসময় করি, বেঁচে থাকার উপাদান খুঁজে নিতে চেষ্টা করি- পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর কিছু করতে না পারার আফসোস... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা সীমানা পেরিয়ে - বালির দাগে রাজনীতি

লিখেছেন রাজসোহান, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:০২



১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ভোলা সাইক্লোন। দশ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস উঠে আসে ব-দ্বীপের নিচু চরে। মৃতের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ ভ্রমনঃ মেহেন্দীগঞ্জ উলানিয়া_জমিদার বাড়ি

লিখেছেন মৌন পাঠক, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭

আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে কোনো এক বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় চলে যান সদরঘাটে। সেখান থেকে উলানিয়াগামী কোনো একটি লঞ্চে উঠে পড়ুন। লঞ্চের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে এক পাশের একটি কেবিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×