একটা মূর্খ ছাগল দ্বারা ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আক্রান্ত হলেন তখন বেশ অনেকেই ইনবক্সে আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন একটি বিষয়ে পরামর্শের জন্য। তাঁদের সবার কেস একই, তাঁদের বন্ধুবান্ধব/সহকর্মীদের অনেকেই এই আক্রমণের সমর্থন করেছে, এবং তাঁরা যেহেতু ধর্ম সম্পর্কে কম জানেন, তাই ডিফেন্ড করতে পারছেন না। তাঁরা আমার কাছে কিছু যুক্তিতর্ক শুনতে চান, যাতে সেইসমস্ত অন্ধ, বেকুব, আহাম্মক, গর্ধবদের সাথে খানিকটা জবাব দিতে পারেন।
প্রথম কথা, ব্যাপারটা মোটেই ইসলামিক জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল না, পুরোটাই কমনসেন্সের ব্যাপার। আমি যদি শূন্যজ্ঞানের অধিকারীও হই, তারপরেও আমাকে বুঝতে হবে একজন মানুষকে হত্যা করা "পরমকরুনাময়" "অসীমদয়ালুর" ক্যারেক্টারের সাথে যায় না। যেখানে তিনি নিজে বলেছেন "তিনিই বিচার দিবসের মালিক," এবং তাঁর আগের আয়াতেই বলছেন তিনি "আররাহমানির রাহিম!" মানে হচ্ছে কাউকে আল্টিমেট বিচার করার অধিকার আমাকে দেয়া হয়নি। আমি কেবলই একটা নগন্য দাস, এবং তিনি মালিক। বিচারক হবার মতন ধৃষ্টতা দেখানোর অধিকার আমার নেই।
কাজেই আমাকে খুনের সমর্থন না করে পড়ালেখা করে কর্তব্য বুঝতে হবে।
হ্যা, কুরআন হাদিস অনুযায়ী কিছু ঘটনা আছে যেখানে আমরা পাই আল্লাহ এবং তাঁর নবীর বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ইসলাম কঠিন ব্যবস্থা নিয়েছিল। বদর, ওহুদ ইত্যাদি যুদ্ধ বা কাব বিন আশরাফকে মৃত্যুদন্ড - এইসব তুলে এনেই ওরা উপসংহার টেনে ফেলে। কিন্তু ঘটনাগুলোর পূর্ণ বিবরণে যাবার গুরুত্ব কেউই উপলব্ধি করেনা।
"ওর দাঁত ব্যথা করছে? উপড়ে ফেলে দাও!" এই হচ্ছে আহাম্মকদের চিকিৎসাজ্ঞান। দাঁত ফেলার আগে যে আরও অনেক কিছুই করা যায়, সেই জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তাবোধ পর্যন্ত তাদের নেই।
কাব বিন আশরাফের কথাই ধরা যাক। প্রথম কথা, এই লোকটা নবীর বিরুদ্ধে কেবল কবিতাই লিখেনি, সে আবু সুফিয়ানের সাথে বসে তাঁকে হত্যার প্ল্যানও কষেছিল। ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল এরই জন্য। এমনকি একটি সীরাত গ্রন্থ অনুযায়ী নবীকে (সঃ) যে বিষ খাইয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল এক ইহুদি মহিলা, এই প্ল্যানিংটা কাবেরই ছিল। একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ষড়যন্ত্রীকে কোলে তুলে চুমু খাওয়ার কথা না। তাই কাবকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
এখন আসছি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। এক্সট্রা এটেনশন দিন।
কাবকে হত্যার জন্য নবী (সঃ) তাঁর সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন। তাঁর সাহাবীরাই তখনকার মুসলিম রাষ্ট্রের সেনা/আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। যুদ্ধ বাঁধলে তাঁরাই যুদ্ধ করতে যান। তাহলে সিভিলিয়ান কারা? নবীর হাদিস থেকেই আসে, "যুদ্ধে কোন নারী, শিশু, বৃদ্ধ এমনকি গবাদিপশুরও কোন ক্ষতি সাধন করা যাবেনা।"
তার মানে, তাঁরাই সিভিলিয়ান। শিশু, নারী এবং বৃদ্ধ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, কোন সিভিলিয়ানকে নবী (সঃ) নির্দেশ দেননি, দিয়েছেন তাঁর সেনা/আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
বুঝার সুবিধার জন্য বাংলাদেশের উদাহরণ দেই।
এরশাদ শিকদার ছিল টপ টেরর। রাষ্ট্র চাইতো ওকে ধরে দড়িতে ঝুলিয়ে দিতে। কিন্তু কোন সিভিলিয়ান যদি ওকে গিয়ে হত্যা করতো, তাহলে রাষ্ট্রের চোখেই সেটা হতো মার্ডার, এবং উল্টো খুনের দায়েই ওর বিচার হতো। ব্যাপারটা সৌদি আরবেও সমান। কোন অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে পুলিশ দিবে, সিভিলিয়ান নয়। সিভিলিয়ান যদি আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে শরিয়া অনুযায়ীই তাঁকে শাস্তি দেয়া হয়।
এখানে নবী বা আল্লাহকে যদি কোন নাস্তিক গালাগালি করে। তাহলে অবশ্যই মুসলিম হিসেবে তাঁর রাগ উঠার কথা। কিন্তু তাই বলে কাউকে কুপিয়ে হত্যার অনুমতি ইসলাম তাঁকে দিচ্ছে? না। কারন দেশটি ইসলামিক রাষ্ট্র না, সে কোন ইসলামিক রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও না।
সে কী করতে পারে? সরকারের কাছে পিটিশন যে এই ধরণের গালাগালি আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে। সরকার ব্যবস্থা না নেয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে পারে। এর বেশি কিন্তু বাংলাদেশেঅন্তত নয়। যদি ভাল না লাগে, তাহলে দেশত্যাগ করে ভিন্নদেশে চলে যাও। ইসলামেতো হিজরতের অনুমতি আছেই।
এই ব্যাপারেই মুসলিমরা নির্লজ্জ্ব বুদ্ধিহীন মূর্খ হয়ে যায়। কেন হয় সেটারও কারন আছে।
হাদিস অনুযায়ী কেয়ামতের আলামত সমূহের দিকে তাকালে আমরা জানি যে সব ছোটছোট আলামত ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। এখন কেবল বড়গুলোর জন্য অপেক্ষা। তা কেয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে "মূর্খরা" মুসলিমদের "আলেম" হবে, এবং নিজেদের খেয়াল খুশীমতোন তাদের অধীনস্থদের পরিচালনা করবে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে ইদানিং সহজেই বুঝতে পারা যায় যে কেয়ামত আসতে বেশি দেরি নাই। বিশেষ করে ইদানিং এক মাওলানাকে দেখছি খুবই জ্বালাময়ী কণ্ঠে, ইমোশনাল ভাষায়, গলা কাঁপিয়ে ওয়াজ মাহফিলে সমানে জিহাদের ডাক দিয়ে যাচ্ছে, এবং ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, এই ব্যাটার কাছে জিহাদের সংজ্ঞা মানেই হচ্ছে কতল! কত্ত বড় সাহস, প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করছে, তাও ইসলামী লেবাসে! এবং যেহেতু সে দাড়িওয়ালা টুপি মাথার মাওলানা, কাজেই হাজারে হাজারে মানুষ কিছু ভ্যারিফাই না করেই চিৎকার দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছে!
"ইসলাম ধর্ম নাকি শান্তির ধর্ম? ক্যাডা কইছে? এই, ক্যাডা কইছে ইসলাম শান্তির ধর্ম?"
তারপর নবীর নামে অপবাদ দিয়ে বেড়াচ্ছে তিনি মানুষ "হত্যা" করেছেন, এবং সমানে প্রকাশ্যে আহ্বান করে যাচ্ছে নাস্তিক কোপানোর।
এই ব্যাটা কোন সাহসে এইসব বলার সাহস পায়? দেশের মাওলানা মুফতিরা তখন কেন কানে তুলে গুঁজে থাকেন? একজনকেওতো দেখলাম না এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করতে! এবং সরকার? সাতান্ন ধারা এখানে কোথায়? প্রকাশ্যে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা যায়, কিন্তু এখানে সরকার নীরব কেন? ও আচ্ছা, গ্রেফতার করলেতো আবার মসজিদ মাদ্রাসা থেকে প্রচারণা শুরু হবে নাস্তিক/মালাউন/কাফের/ভারতীয় দালাল সরকার দেশের আলেম উলামাদের দমিয়ে রাখার জন্যই গ্রেফতার নিপীড়ন শুরু করেছে।
আগামী নির্বাচনে জিততে হলেতো তাঁদের আবার ভোট লাগবে। নির্বাচনের আগে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাগানো যাবেনা। কিন্তু গ্যারান্টি দিচ্ছি, এই সমস্ত লোকদের অবিলম্বে থামানো না হলে আগামী তিন চার বছরের মধ্যে দেশের চেহারা পাল্টে যাবে। বাংলাভাই, জেএমবি বা এইসমস্ত জঙ্গিদের ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারলাম না, আফসোস!
একজন নাস্তিক ইসলামকে গালাগালি করলে ইসলামের কোনই ক্ষতি হয়না, ক্ষতি কারা বেশি করে জানেন? এইসব স্বল্পজ্ঞানী মূর্খ মাওলানারা, যারা দুয়েকটা কিতাব পড়ে মনে করে বিরাট আলেম হয়ে গেছে, out of context আয়াত/হাদিস পাঠ করে ওয়াজ মাহ্ফিল জমিয়ে তুলে, জিহাদি চেতনায় চেতিত হয়ে লোকজনের রক্ত গরম করে তুলে। এর ফল, ভূতের বাচ্চা সুলায়মান লেখার অভিযোগে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের মাথায় ছুরি দিয়ে আক্রমন। আমরা ভাগ্যবান তিনি বেঁচে ফিরেছেন। আগের একজনও কিন্তু ফিরেননি। ভবিষ্যতেও কেউ ফিরবে না। তখন এইসব হত্যার দায় কার? অবশ্যই সরকারের নতজানু হবার।
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন "ন্যায়ের জন্য নিজের বিরুদ্ধে হলেও যাও।"
ন্যায়ের পক্ষ নিলে দেশের একদল মূর্খ মুসলমান আমার বিরুদ্ধে যাবে? আলেম উলামারা আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করবে? আমাকে কোপানোর জন্য জঙ্গিরা তলোয়ারে ধার দিবে? করুক যার যা খুশি। আমার সাথে আল্লাহ থাকবেন। আমার ভয় কিসের? পরোয়া কিসের?
আল্লাহর ওয়াস্তে ঐ মূর্খ আহাম্মকের ভিডিও বেশি বেশি করে শেয়ার করে ব্যাটাকে আরও ফেমাস বানাবেন না। এই লোকটার কথাবার্তা আমাকে অসুস্থ করে দিচ্ছে। হার্ট বিট এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিৎ, আমার বয়স আরেকটু বেশি হলে আমার হৃদরোগে মৃত্যুর জন্য এই ব্যাটার ওয়াজই দায়ী হতো। বরং সরকারের কাছে পিটিশন করে একে গ্রেফতার বা নিষিদ্ধের ব্যবস্থা নিন। ওটাই কার্যকর পন্থা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০১৮ রাত ১০:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



