somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি ইসলামের সেলসম্যান না

২০ শে অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের মসজিদ এবং অ্যামেরিকান মসজিদগুলোর বেসিক পার্থক্যটা বলি।
বাংলাদেশের মসজিদে শবে বরাত, শবে কদর, ঈদে মিলাদুন্নবী ইত্যাদি উপলক্ষ্যে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হয়। বেশিরভাগ ওয়াজ মাহফিলে ইসলামী শিক্ষা প্রচার করা হয়। নবীর জীবনী, সাহাবার জীবনী, জান্নাত জাহান্নাম ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। কোন সামাজিক কর্মকান্ডে মসজিদ অংশগ্রহন করেনা। মসজিদ কখনও বলেনা এলাকায় ফকির মিসকিনদের জন্য আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো। ক্ষুধার্তকে খাদ্য যোগাবে মসজিদ কমিটি। বাংলাদেশের কোন মসজিদ কখনও বলেনা প্রফেশনাল কাউন্সিলর দিয়ে আমরা ম্যারেজ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করবো। দাম্পত্য জীবন কেমন হওয়া উচিৎ, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আচরণ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার, সন্তানদের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব ইত্যাদি নিয়ে নিরপেক্ষ সত্য আলোচনা হয়না। যা হয় বেশিরভাগই একপেশে। আমাদের পুরুষেরা জানেনই না স্ত্রী বা সন্তানরা নারাজ থাকলে মৃত্যুর পরেও তাঁর মুক্তি নেই। অথচ এই কথা সবারই মুখস্ত যে স্বামী নারাজ থাকলে স্ত্রীর খবর আছে।
বাংলাদেশের কোন মসজিদ কোন সামাজিক কাজে এগিয়ে আসেনা। যেমন বন্যার্তদের সাহায্যে কখনই দেখিনা মসজিদগুলো কোন ভূমিকা রাখতে। কিংবা ডাক্তার ডেকে এনে বিনা পয়সায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। সারাজীবনে মাদ্রাসার ছাত্রদের কেবল দানবাক্স হাতে নিয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছি। আফসোস!
অথচ আমাদের দেশের ৯০% এর বেশি মুসলিম। হাজার হাজার ডাক্তার মুসলিম। অনেকেই সুপার ধার্মিক। মসজিদ কমিটি তাঁদের সাথে আলোচনা করলে অবশ্যই তাঁরা নিজেদের বহুমূল্যবান সময় থেকে ২-৩ ঘন্টা এইসব গরিব মানুষের জন্য, তথা আল্লাহর জন্য দিতেন। আমাদের দেশের মসজিদগুলো যা টাকা তুলে সব নিজেদের জন্যই। মসজিদে ফ্যান লাগবে, টাকা তোলো। টাকা বেশি উঠে গেলে এসি লাগাও। টাইলস লাগাও। টাইলস বদলে মার্বেল লাগাও। মসজিদের যে ঈমাম, যে মুয়াজ্জিন, তাঁদের বেতন বৃদ্ধির দিকেও এদের মনোযোগ নেই। "ওরাতো আল্লাহর বান্দা, ওদের এত টাকা বেতন লাগবে কেন?" হোয়াট আ লজিক!
অথচ এরা ভুলে যায় আমাদের নবী(সঃ) তাঁর নিজের মসজিদে বৃষ্টির সময়েও নামাজ পড়তেন, এবং সিজদা দিলে তাঁর কপালে কাদা লেগে যেত, তারপরেও তিনি বলতেন, "সুবহানা রাব্বিয়াল আলা।"
জীবনের শেষ দিনটিতে, নিজের বাড়ি থেকে তিনি যখন চটের পর্দা সরিয়ে তাঁর সাহাবীদের দেখেন ফজরের নামাজ পড়ছে, আনন্দে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল। কারন তিনি জানেন, তিনি লেগেসি ছেড়ে যাচ্ছেন। সমস্ত জীবন তাঁর ইনভেস্টমেন্ট ছিল উম্মাহর পেছনে, এরাই তাঁর নীতিকে সামনে এগিয়ে নেবেন। তখনও কিন্তু তাঁর মসজিদের ছাদে শ্যান্ডেলিয়ার ছিল না। মার্বেল পাথরের ফ্লোর ছিল না। তাঁর কাছে সেটা ম্যাটার করতো না।
আজ মুসলিমদের হাতে টাকা এসেছে। আমরা নবীর সেই মসজিদকে সোনায় মুড়িয়ে রেখেছি। কিন্তু আমাদের সেই ঈমানটা হারিয়ে গেছে।
এখন আসি অ্যামেরিকান মসজিদগুলোর কথায়। হ্যা, এইটা সত্যি যে আমাদের মসজিদগুলো দেশি মসজিদের তুলনায় অনেক বেশিই জাকজমকপূর্ণ। তবে, এইটাও সত্যি, আমাদের টাকা পয়সা কেবলমাত্র মসজিদ সংস্কারে ব্যয় হয়না। অ্যামেরিকার প্রতিটা মসজিদে বলতে গেলে লাইব্রেরি থাকে। আপনি ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতে চান? বই, ইন্টারনেট, কম্পিউটার সব পাবেন।
মসজিদগুলো সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সদা লিপ্ত থাকে। আমাদের সাউথ ডালাস মসজিদ বছরের প্রতিদিন গৃহহীন উদ্বাস্তুদের জন্য ফ্রী লাঞ্চের ব্যবস্থা করে। ওরা হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, খ্রিষ্টান হোক, ইহুদি হোক - ক্ষুধার্তকে খাদ্যপ্রদান আমাদের রাসূলের (সঃ) নির্দেশ। তাঁরা সেটাই পালন করেন।
ক্যারলটনের মদিনা মসজিদ রমযান মাসের প্রতিটা দিন সর্বসাধারণের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করে। এছাড়া আমাদের সব মসজিদে রমজানের প্রতিটা উইকেন্ডে ইফতারের ব্যবস্থা থাকে। এই ইফতার কিন্তু ফার্স্টক্লাস ইফতার। এমন না যে ফকির মিসকিনের জন্য লো কোয়ালিটির খাবার।
ডালাস ফোর্টওয়ার্থের প্রতিটা মসজিদে (৫০ এর বেশি সংখ্যা) ডাক্তাররা এসে ভলান্টিয়ারি রোগী দেখে যান। ট্যাক্স সিজনে সিপিএরা আসেন ফ্রী ট্যাক্স ফাইল করে দিতে। আরও অনেক সামাজিক কর্মকান্ডে মসজিদগুলো জড়িত। কেন জানেন? আমাদের নবী (সঃ) ঠিক এই নির্দেশটাই দিয়ে গেছেন। তিনি নিজেও করতেন। তাঁর যৌবনে "হিলফুল ফুদুল" ছিল এমন একটি সামাজিক কর্মকান্ড, যার জন্য রাসূলুল্লাহ হবার পরেও তিনি গর্ব করে বলতেন, তাঁকে মিলিয়ন ডলার দিলেও তিনি হিলফুল ফুদুল থেকে সরে আসতেন না।
এখানে "মিলিয়ন ডলার" তিনি বলেন নি, তিনি বলেছিলেন "১০০ লাল উট" - যা বর্তমান যুগে মিলিয়ন ডলারেরই ভার্বাল এক্সপ্রেশন। এইটা বুঝা কমন সেন্সের ব্যাপার। তারপরেও এই ফিগার অফ স্পিচ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হচ্ছি, কারন অতি আফসোসের সাথে লক্ষ্য করলাম আমাদের দেশে একটি বিপুল সংক্ষ্যক লোক, অতি সরলভাষায় লেখা বাংলা বুঝে না। যা বলা হয়নি সেটা নিয়েই ত্যানা প্যাচানো শুরু করে। এবং কোন কথা না বুঝেই একে অপরকে মোনাফেক, ফিৎনা সৃষ্টিকারী ইত্যাদি ট্যাগ দেয়া শুরু করে।
তা আমাদের অ্যামেরিকান মসজিদগুলোর অতি মহৎ গুণাবলীর একটি হচ্ছে এখানে সাপ্তাহিক "হালাকা" অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ইসলাম কী, কিভাবে আমাদের জীবনের সাথে জড়িত, কিভাবে আমরা এর নিয়মকানুন মেনে চলবো ইত্যাদি আলোচনা এইসব অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে। বিশ্ববিখ্যাত সব স্কলারগণ এইসব হালাকায় আসেন। তর্ক বিতর্ক চলে তাঁদের মধ্যে। তাঁরা যদি না আসেন, তবে মসজিদের রেসিডেন্ট স্কলার দিয়েই কাজ চালানো হয়। শুধুমাত্র এইসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার ফলেই যা জ্ঞান অর্জন সম্ভব, আমাদের মুমিন মুসলমানরা হাজার বছর ফেসবুক ঘাটাঘাটি করেও এর বিন্দুমাত্র শিখতে পারবেনা। এদের দৌড় সাকিব আল হাসানের বৌকে পর্দা করতে বলা পর্যন্তই। কিছু বলতে যান, বলবে, "পর্দা করা ফরজ, আপনি পর্দার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন? পর্দাকে ছোট করার চেষ্টা করেছেন? হালকাভাবে নিচ্ছেন? আপনি মুনাফেক! ভন্ড! কাফির! মুরতাদ!"
তো আমার গত লেখায় আমি স্পষ্ট বাংলায় লিখেছিলাম, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে আল্লাহর নাম ছাড়া জবাই করা বা অন্যভাবে হত্যা করা পশুর মাংস খাওয়া হারাম। কিন্তু কেউ যদি পূজার খাদ্য খেয়ে থাকে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে না। কারন হচ্ছে, বিভিন্ন স্কলারের ফতোয়ায় এই বিষয়টা হালাল।
এই বিষয়ে তর্ক শুরুর আগে যেকোন স্মার্ট, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান প্রাণী আগে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করতো। সবার আগে নিজের বাড়িতে যে কুরআন আছে, তা খুলে বসতো। খুঁজে বের করতো এর ভিত্তি। যেই ইন্টারনেট ডাটা সে ফেসবুক করে নষ্ট করে, সেটা ব্যবহার করে বের করতো, কোথায় কোন স্কলার কেন এটিকে "হালাল" বলছেন। তাঁদের যুক্তি কি। এই বাহানায়ও ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতো, শিখতো।
কিন্তু এইসবের কিছুই না করে শুরু করে দিল নোংরামি। এদের হচ্ছে আপনি ওদের প্লেটে সাজিয়ে শুধু খাবার পরিবেশনই করবেন না, ওদের চামচে করে খাইয়ে দিতে হবে। পারলে চিবিয়েও দিতে হবে। পারলে হজম করে ওদের হয়ে পায়খানার কাজটাও আপনাকেই করতে হবে।
এর সাথে এও লিখেছিলাম, কোন বিধর্মীর বাড়িতে নিমন্ত্রণ হলে কেউ যেতে চাইলে যাওয়া যাবে, যতক্ষণ না সেখানে দেবদেবীর "পূজা" অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কারন পূজায় অংশ নেয়া আমাদের ধর্মে শিরক, এবং পূজায় যাওয়াটা আমাদের আল্লাহকে ইনসাল্ট করারই শামিল।
আমি স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছিলাম, এইসব বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেন সৃষ্টি না হয়, কারন আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকাটা জরুরি।
যেসব স্কলারদের দেখি এইসব বিষয়ে বিতর্ক করতে, তাঁদেরই দেখি বিতর্ক শেষে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে নামাজে যোগ দিতে। একজন ইকামত দেন, তো অপরজন করেন ইমামতি।
কিন্তু আমাদের মুমিন ভাইয়েরা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সবাই গালাগালি করতে শুরু করলো, কিন্তু কেউই রেফারেন্স দিতে পারলো না। একজন বললেন এলাকার ঈমামের সাথে কথা বলে আমি যেন শিখি। তাহলে যেসব স্কলারদের থেকে শিখেছি, তাঁরা কী ঈমাম নন?

একটাই রেফারেন্স এখানে কেউ কেউ দিলেন, যা হচ্ছে, সূরা নাহলের একটি বিখ্যাত আয়াত, "إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالْدَّمَ وَلَحْمَ الْخَنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيْرِ اللّهِ بِهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلاَ عَادٍ فَإِنَّ اللّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ"
যা বাংলায় দাঁড়ায়, "অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা জবাই কালে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে। অতঃপর কেউ সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে নিরুপায় হয়ে পড়লে তবে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
যা ইংলিশে করলে হবে,
"He has only forbidden you dead meat, and blood, and the flesh of swine, and any (food) over which the name of other than Allah has been invoked. But if one is forced by necessity, without wilful disobedience, nor transgressing due limits,- then Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful."
প্রথম অংশে ভেজিটেবল, মিষ্টি ইত্যাদির উল্লেখ নাই। দ্বিতীয় অংশে বলছেন, কেউ নিরুপায় হয়ে খেলে, আল্লাহ ক্ষমাশীল। দ্বিতীয় অংশটি আগে বলি, ধরা যাক কেউ ক্ষধার্ত। পয়সা নেই খাবার কেনার। মুমিন ভাইয়েরা তাঁকে খাদ্য দেননি। এদিকে মন্দিরে প্রসাদ বিলি হচ্ছে। তিনি সেই খাবার খেলেন। এতে মুমিনরা বলতে পারেন তিনি হারাম খেয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, সে যদি কেবল ক্ষুধা নিবারনের নিয়তে বাধ্য হয়ে খাদ্য গ্রহণ করে থাকেন, তবে পরম দয়ালু আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে ক্ষমা করবেন। কুরআনে যতবার হারাম মাংসের উল্লেখ এসেছে, আল্লাহ ততবার বলেছেন যদি কেউ অজ্ঞতাবশত বা নিরুপায় হয়ে খেয়ে ফেলেন, তবে তিনি আছেন উপরে বসে যিনি তাঁদের ক্ষমা করবেন।
আফসোস, আমরা বাংলাদেশী মুমিনরা আল্লাহকে যত ইনসাল্ট করি, অন্য কেউ এর বিন্দুমাত্র করেনা।
এখন আসা যাক আয়াতের প্রথম ভাগে। অনেক স্কলারদের মধ্যে এখানেই মতভেদ যে যেহেতু মাংস ছাড়া অন্য কিছুর উল্লেখ নেই। সাথে কোন সুস্পষ্ট হাদিসও নেই এই ব্যাপারে। এক গ্রূপ স্কলার বলেন, যেহেতু পূজা ব্যাপারটা আমাদের ধর্মের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক, কাজেই সেই রিলেটেড কোন খাদ্য গ্রহণই উচিৎ না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও পূজার প্রসাদ খাইনা। কেন খাইনা? সেটাও ব্যাখ্যা করেছিলাম আগের এক লেখায়। আবারও করি। কারন হচ্ছে, নিজের পিতাকে সম্মান করতেই ১৫ই আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিনের কেক যেমন শেখ হাসিনার খাওয়া উচিৎ না, তেমনি আমার আল্লাহকে সম্মান দেখিয়েই সেই প্রসাদ আমার খাওয়া উচিৎ না। যদিও এব্যাপারে আল্লাহ বা রাসূল কোন ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ইন্সট্রাকশন/নিষেধাজ্ঞা দেননি। কেউ স্পষ্ট রেফারেন্স দেখাতে পারবেন না।
দ্বিতীয় গ্রূপটি বলছে, খাবার (নিরামিষ) হচ্ছে খাবার। যতক্ষণ না আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ আছে নিষিদ্ধের ব্যাপারে - ততক্ষন যেকোন খাবারই হালাল। কেউ প্রসাদ খেয়ে ফেললেই হিন্দু হয়ে যাবেনা, যতক্ষন না তাঁর মনে এই উপলব্ধি আসছে যে এই প্রসাদ তাঁর কল্যান সাধন করবে। যদি সে মনে করে সরস্বতী পূজার প্রসাদ খেলেই তাঁর জ্ঞানবৃদ্ধি হবে, তবে সেটা হারাম। কিন্তু সাধারণ নাস্তা হিসেবে যদি খায়, তবে সেটা হালাল।
একই রুল এপ্লাই করে কোন মুসলিম যদি ভক্তিভরে মিলাদুন্নবীর মিষ্টিও খায়, সেটাও হারাম। আর নাস্তা হিসেবে খায়, হালাল।
আমি নিজেই আরেকটি উদাহরণ দেই। সূরা বাকারায় ১৭৩ নম্বর আয়াত, "إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللّهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلاَ عَادٍ فَلا إِثْمَ عَلَيْهِ إِنَّ اللّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ"
বাংলা: "তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মৃত জীব, রক্ত, শুকর মাংস এবং সেসব জীব-জন্তু যা আল্লাহ ব্যাতীত অপর কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোন পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।"
এখানেও পশুর কথা বলা হয়েছে।
এবং আরেকটি উদাহরণ দেই, কুরআন শরীফের আরেকটি অতি বিখ্যাত আয়াত, সূরা মায়েদাহর তৃতীয় আয়াত, যেখানে আল্লাহ আমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ন করার কথা বলেছেন। সেখানেও আল্লাহ "পশুর" উল্লেখ করেছেন।
"তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চ স্থান থেকে পতনের ফলে মারা যা, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বন্টন করা হয়। এসব গোনাহর কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যাক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।"

এই হচ্ছে বিতর্কের বিষয়। যেসব স্কলারগণ এই বিতর্কে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের পায়ের নখেরও যোগ্য হবার জ্ঞান রাখিনা আমরা কেউ। অথচ আমাদের ফেসবুকের লোকজন এককথায় সবাইকে ফিৎনা সৃষ্টিকারী, মুনাফেক, কাফির, নাস্তিক, হিন্দুবান্ধব ইত্যাদি বানিয়ে দেই।
মুনাফেকের ব্যাপারে একটি ঘটনা বলি। আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) মুনাফেকদের নামের তালিকা দেন, তখন তিনি কেবলমাত্র হুযাইফা ইব্ন আল-ইয়েমেনের কাছে সেই তালিকা বলেন। এবং বলেন তিনিও যেন সেই নামগুলো গোপন রাখেন। এদিকে খলিফা উমার (রাঃ) টেনশনে শেষ, তালিকায় তাঁর নাম নেইতো? তিনি বারবার হুযাইফাকে বলেন তালিকাটা বলতে, হুযাইফা প্রতিবার রাসূলের বিশ্বাসের মান রাখতে তাঁকে ফিরিয়ে দেন।
এক্ষেত্রে দুইটি পয়েন্ট উল্লেখযোগ্য। এক. কাউকে প্রকাশ্যে "মুনাফেক" ঘোষণা করাটা আল্লাহ বা নবীরও সুন্নত নয়, সেখানে আমার বাংলার মুমিন ভাইয়েরা যাকে তাকে মুনাফেক উপাধি দান করে।
পয়েন্ট নম্বর দুই: হযরত উমারের (রাঃ) মতন লোকও কাউকে মুনাফেক ট্যাগ দেয়াতো দূর কি বাত, নিজের কর্মকান্ড নিয়েই টেনশনে শেষ। সেখানেও আমাদের মুমিন ভাইয়েরা নিজেদের কর্মকান্ড বাদ দিয়ে দিব্যি অন্যকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কী কনফিডেন্স! আহা!

যাই হোক, আমার সেই লেখায় কোথাওই পূজায় মন্দিরে গিয়ে আনন্দ উদযাপন করতে বলা হয়নি। আহাম্মকেরা তারপরেও অসভ্য মূর্খের মতন এই দাবি করছে আমি নাকি বলেছি সবাইকে মন্দিরে গিয়ে নাচানাচি করতে।
ভাল করে পড়লে বেকুবগুলো বুঝতো, সেই লেখায় বলা হয়েছে কেউ আড্ডা দিলে বা বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলে যাওয়া যায়।
ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছে পূজার দিন আপনারা বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ করে কান্নাকাটি করেন, বা করতে বলছেন। সাধারণ আড্ডা বা সৌজন্যতা রক্ষার আনন্দ এবং ধর্মীয় উৎসবে গিয়ে ফুর্তি ফার্তা করে আনন্দ উদযাপনে পার্থক্য আছে সংকীর্ণমনারা বুঝতে পারেনা। এবং সেটা করতে এই লেখায় বলা হয়নি। ভাল করে পড়লে বুঝতে পারতো।
অ্যামেরিকায় আসায় এই একটা সভ্যতা শিখেছি। আমার জানার বাইরে অনেককিছুই আছে যা আমি জানিনা। এবং জ্ঞানার্জনের সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে, ধরেই নিতে হবে আমি কিছুই জানিনা, এবং আমাকে সবকিছু শিখতে হবে।
এইযে অতি জরুরি এই বিষয়টি নিয়ে নিজের জানা মতের বাইরের স্কলার লেভেলে তর্ক শুনেছি, আমি নিজে গিয়ে কুরআন ঘাটাঘাটি করে বাকি দুটো আয়াত খুঁজে বের করেছি। সূরা আন আমের ১৪৫ নম্বর আয়াতটিও দেখতে পারেন। মুমিন ভাইয়েরা এই কাজ করেন কী?
আমাদের দেশের এইসব মুমিনরা জানেই না ঈদে মিলাদুন্নবী বেদাত, হারাম। এরা জানেই না শবে বরাত এবং মেরাজের কোন শরিয়াভিত্তিক দলিল নেই। এদের বুঝাতে যান, এরা আপনাকে কুপিয়ে শেষ করে দিবে। আমাকে এক ভাই জানিয়েছিলেন তাঁর গ্রামে নামাজে সূরা ফাতিহা শেষে "আমিন" জোরে বলা এবং আস্তে বলা নিয়ে দুই দল তর্কা তর্কি করে মারামারি হাতাহাতি শেষে এখন দুইটি আলাদা মসজিদ বানিয়ে ফেলেছে।
এই হচ্ছে আমার দেশের অবস্থা। সাম্প্রদায়িকতা এবং অন্যের মতের ব্যাপারে অসহিষ্ণুতা এমনই তিক্ত আকার ধারণ করেছে তাদের হৃদয়ে যে এরা নিজেদের নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বিভাজন তৈরী করে। নিজের ধর্মের বাইরের লোকেদের জন্য সহমর্মিতা, সম্মানবোধ লালন করবেই বা কিভাবে?
আমি এইসব গায়ে মাখিনা। আমাদের মুসলিমদেরই একটি শাখা আবু বকর, উমারকে (রাঃ) কাফির ডাকে। উসমান (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) শহীদ হলেন যাদের হাতে, তারাও নিজেদের এইরকম বিরাট আলেম মুসলিম মনে করতো, এবং তাঁদের কাফির। :)
বিশ্বখ্যাত স্কলার নোমান আলী খানকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "তুমি নিজের দেশ পাকিস্তানে কেন লেকচার দিতে যাও না?"
আমরা ভাল করেই জানি, পাকিস্তানে গেলে তাঁকে জবাই করে ফেললেও কেউ কিছু বলবে না।
তবে যেহেতু তাঁর সেন্স অফ হিউমার ভাল, তিনি বললেন, "আম্মু যেতে দেন না।"
সেই হিসেবে আমিতো আসলেই কিছু জানিনা। আল্লাহ আসলেই আমাকে হেদায়েত দিন। এবং আমার হেদায়েতের জন্য যারা দোয়া করেছেন, কিন্তু নিজেদের জন্য চাননি, তাঁদেরও দিন।
শেষ করার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলি।
আমি এপোলোজেটিক মুসলিম না। ইসলামকে সুগারকোটিং করে কিছু অংশ এড়িয়ে কিছু অংশ লুকিয়ে নিজের মতন সাজিয়ে উপস্থাপন করায় আমি বিশ্বাসী না। যা সত্যি সেটাই প্রচার করায় আমি বিশ্বাসী। এইটাই আমার আল্লাহর নির্দেশ। এবং এর বাইরে কিছু করার আমার অনুমতি নেই।
আমি ইসলামের সেলসম্যানও না। লোকে যা চায়, তাই শোনাবো, যা শুনতে চায়না, তা জানার পরেও এড়িয়ে যাব, এমন দায়িত্ব নিয়ে আমি দুনিয়ায় আসিনি। আমি একজন সাধারণ ছাত্র, আমি যা নতুন শিখি, সেটাই আমি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেই। কেউ শিখলে শিখবে, আলহামদুলিল্লাহ। কেউ যদি নিজেকে পন্ডিত মনে করে থাকে, তাহলে ফি আমানিল্লাহ।
আল্লাহ সবার হেদায়েত দান করুন। আমিন।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১২:০২
২০টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহা! নক্ষত্রের পতন! এই ধরাদামের সর্বশ্রেষ্ট খেলোয়াড়ের আজই যেনো ইতি!

লিখেছেন অব্যক্ত কাব্য, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৩৬






আর্জেন্টিনার আরেকটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো আজ। দুই সোনালী যুগের(প্রথমটি ম্যারাডোনার সময়কাল আর দ্বিতীয়টি মেসির সময়কাল) শিরোপা জয়ে সময়ের ব্যবধান ছিলো ৩৬ বছর। দুই সোনালী যুগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

খুশু: নামাজের প্রাণ

লিখেছেন নতুন নকিব, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১৮

খুশু: নামাজের প্রাণ

ভূমিকা

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় রুকন এবং মুমিনের জীবনে আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলিমকে বারবার আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়, তাকে দুনিয়ার ব্যস্ততা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বকাপ ২০২৬ঃ গোল্ডেন বল মেসিকে না দেওয়া অন্যায়, অযাচিত ও ভুল সিদ্ধান্ত

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



ইদানিং, বিশ্ব ফুটবলের ক্যালকুলেশনগুলো কিছুই বুঝতেছি না। উয়েফারও না, ফিফারও।

২০২৪ ইউরোতে টুর্নামেন্টের সেরা পারফরমার ছিল লামিন ইয়ামাল। সবাই ভেবেছিল, সেই ওই টুর্নামেন্টে 'সেরা খেলোয়াড়'-এর পুরষ্কার জিতবে। কিন্তু অবাক করার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল তৌহিদী জনতা।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪


ফিফা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চে সারা বিশ্ব যখন মেতে ওঠে, তখন আমাদের দেশের একদল মানুষের অতি-উৎসাহ এবং অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ড সমাজের একটা বড় অংশকে বিভ্রান্ত ও বিরক্ত করেছে। ফাইনাল ম্যাচের রাতেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×