somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্রলিং, বাঙালি জাতি ও খাদ্যে ভেজাল।

১৯ শে জুন, ২০১৯ রাত ১০:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ট্রলিং বিষয়টা আমার অসহ্য লাগে। এমন না যে আমার সেন্স অফ হিউমার নেই, বা খারাপ। কিন্তু বাঙালি ট্রলিংয়ের সীমা পরিসীমা সম্পর্কে কোনই ধারণা রাখে না। ফাজলামি করতে করতে আমরা এমন পর্যায়ে চলে যাই যখন সেটা রীতিমতন দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবার যোগ্যতা রাখে।
ক্রিকেটারদের নিয়েই ট্রলিংয়ের কথা ধরা যাক।
বিদেশী দল বা ক্রিকেটারদের কথা বাদই দিলাম, আমরা আমাদের নিজেদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরই ছাড়ি না। এই যে সাকিব আল হাসান, একবার সে বলেছিল "আমাদের ছেলেরা ভাল পারফর্ম করবে কিভাবে? বিদেশী খেলোয়াড়রা ছোটবেলা থেকেই অরেঞ্জ জ্যুস খায়, আমরাতো সেটা পাই না।"
শুরু হয়ে গেল অরেঞ্জ জ্যুস খাওয়া নিয়ে "ট্রলিং।"
কেউ কী বিন্দুমাত্র চিন্তা ভাবনা করিনা যে ছেলেটা ভুল বলেনি? সাকিবের ব্যাকগ্রাউন্ড কী? গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি ছেলে। আমাদের দেশের গ্রামের ছেলেরা কতটা পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খায়? পেটে ভাত গেলেই হলো। তাঁদের মা বাবার কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ইত্যাদির হিসাব রাখেন? ভিটামিন, মিনারেল, ফলিক এসিড ইত্যাদি টার্ম জানেন? তাঁরাতো কেউই ডায়েটিশিয়ান নন। বিদেশী শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এথলেটিক ট্রেনিং নিয়ে বড় হয়। রিকি পন্টিংয়ের বয়স যখন তিন, তখন থেকে তিনি একাডেমি ক্রিকেট খেলতেন। বার্সেলোনা, রিয়্যাল মাদ্রিদ সহ ইত্যাদি যাবতীয় বড় বড় ক্লাবগুলো শৈশব থেকেই এথলেট খুঁজে বের করে। তাঁদের ভাল মতন খাইয়ে দাইয়ে খেলোয়াড় হিসেবেই বড় করেন। আমাদের দেশে সেটা হয়? আমাদের ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলাকে পার্টটাইম একটিভিটি হিসেবে ধরা হয়। আমাদের বাবা মায়ের কাছে লেখা পড়া হচ্ছে প্রথম প্রায়োরিটি। তারপরে এইসব খেলাধুলা গানবাজনা ইত্যাদি আসে। যখনই রেজাল্ট খারাপ হয় (কারোর কাছে ১০০ জন ছাত্রছাত্রীর ক্লাসে সেরা তিনজনের মধ্যে আসতে না পারাটাও ব্যর্থতা) তখনই সবার আগে কোপ পড়ে খেলার সরঞ্জামের উপর। ছেলের শখের ক্রিকেট ব্যাট বা ফুটবল পুড়িয়ে দেয়া হয়। হয় না?
অথচ কেউ কী এই খোঁজ নেন যে শিশুটির জন্মের পরে তাঁর খাদ্যতালিকায় ব্রেন ডেভেলপিং খাবার থাকতো কিনা? "ওমেগা থ্রি" নাম শুনেছেন কয়জন? শিশুদের খাইয়েছেন কয়জন?
প্রতিটা বাবা মাই চেষ্টা করেন তাঁরা নিজেরা যা খেতে পারেননা, সেটাও সন্তানকে খাওয়াতে। দুধ, ডিম, মাংস ইত্যাদি। সমস্যা হচ্ছে, বাংলার মাটিতে যে দুধ শিশুদের খাওয়ানো হচ্ছে, সেটাতে গোয়ালা কর্তৃক পানি মেশানো হচ্ছে সেই নব্যপ্রস্তর যুগ থেকেই। গত কয়েক দশক ধরেতো সেখানে ফরমালিনও মেশানো হয়। আবার এক দশক আগে এক ভিডিও দেখেছিলাম যেখানে ইন্ডিয়াতে দিওয়ালি মৌসুমে শ্যাম্পু ও অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার করে কিভাবে দুধ প্রস্তুত করা হয় সেটা দেখানো হয়েছিল। যা ইন্ডিয়াতে ঘটে, অবশ্যই বাংলাদেশে সেটা ঘটতে বেশি সময় লাগার কথা না। এখন বলেন, এই দুধ খেয়ে শিশুরা যে বেঁচে আছে, এইতো আমাদের ভাগ্য!
আমাদের খাদ্যে যে ভেজাল মিশ্রিত হয়, সেটা আজকের কালকের ঘটনা না। আমাদের দাদা দাদীরা লম্বা হায়াৎ পেয়ে বেঁচে ছিলেন। দুইজনই নব্বই পেরিয়েছেন। আমার নানা চেইন স্মোকার ছিলেন। তাঁরও বয়স সত্তুরের কোটা পেরিয়েছিল। আমার নানীর জন্ম থেকেই হার্টে ছিদ্র ছিল। সারা জীবন গিয়েছে তাঁর শারীরিক কষ্টে। অথচ তিনিও মাশাল্লাহ সত্তুর পেরিয়েছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার আম্মুর নানীকে পর্যন্ত দেখার। তিনি আমার বোনের বিয়ে দেখেছেন, তাঁর সন্তানও দেখে যেতে পেরেছেন। অথচ আমাদের বাবা মায়ের জেনারেশনের লোকজন চল্লিশ পঞ্চাশ হতেই হার্ট অ্যাটাক বা ক্যান্সারে মারা যাচ্ছেন। স্কুল জীবনে আমার নিজের ক্লাসমেট, কিছুদিন আগে মারা গেল হার্ট অ্যাটাক করে। ক্যান্সারে এর আগেও ক্লাসমেট বা জুনিয়র পোলাপান মারা গেছে।
একদিকে নানান জটিল রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার হচ্ছে সত্য, কিন্তু রোগের পরিমানও বেড়ে গেছে আশংকাজনকভাবে। কেন হঠাৎ এমন হলো ভেবে দেখেছি কখনও? কারন কী হতে পারে বলে আপনাদের ধারণা?
খাদ্যাভ্যাস!
আমরা যা খাই, তা আমাদের শরীরেই যায়। এবং সেটা বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উল্টাপাল্টা কেমিক্যাল শরীর যন্ত্রের কলকব্জার হিসাব নিকাশ পাল্টে দেয়। যার ফল আমরা অচিরেই ভোগ করি।
রমজান মাস আসলেই কেবল ভ্রাম্যমান আদালতগুলোর অভিযান দেখা যায়। কেন? আর বাকি ১১ মাসে কী খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয় না? একটি ভিডিও দেখেছিলাম মোবাইল কোর্টের আগমনের খবর শুনে বসুন্ধরা সিটির ফুড কোর্টের প্রতিটা দোকানের শাটার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আহা! চুরির এরচেয়ে বড় প্রমান আর কী হতে পারে? ওরা যদি সৎভাবেই ব্যবসা করতো, তাহলেতো ওদের ভয়ের কোন কারন ছিল না।
যত বড় দোকান, তত বড় বাটপারি। গুলশানের রেস্টুরেন্টে ব্যবহার করছে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, পশুর পঁচা মাংস, এবং তাদের রান্নাঘরগুলো আমাদের টয়লেটের চেয়েও নোংরা। তাহলে এত টাকা খরচ করে আমি কেন খেতে যাব?
ঢাকার বিখ্যাত ফুচকা, যা না খেলে আমাদের ঢাকা সফর বৃথা বলে গণ্য নয়, সেই ফুচকা তৈরী হয় এমন সব কারখানায় যেখানে অহরহ ইঁদুরের পায়খানা আবিষ্কৃত হয়। ইঁদুরের পেশাব যে মারাত্মক বিষ এইটা জানেন? এই বিষ খেয়ে বিদেশে প্রচুর মানুষ মারা যায়। আমরা এই বিষ হজম করে ফেলি।
মরিচের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া মেশানো থাকে, আচারে ব্যবহার করা হয় পঁচা ফল ও কেমিক্যাল, কেক পেস্ট্রিতে রং হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাপড়ের রঙ.....আর কী কী বলবো? ওরা কী মানুষ?

আমাদের দেশে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণকে attempt to murder হিসেবে কবে থেকে গণ্য করা হবে? সেই অনুযায়ী শাস্তি কবে দেয়া হবে? Slow poison দিয়েইতো মানুষকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমরা আমরা বলেই "slow poison" বললাম, কারন আমরা লোহা হজম করে ফেলতে পারি। বাস্তবে ওসব মারাত্মক বিষ। Actual poison. মানুষ মারার ক্ষমতা রাখে।
বাস্তব উদাহরণ দেই।
আমার আপন চাচাতো ভাই, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা অ্যামেরিকায়, সে বেচারা গিয়েছিল বাংলাদেশ ভ্রমনে। ট্রেনে করে চিটাগং যাচ্ছি। লাঞ্চে ট্রেনের "ফ্রেশ" বার্গার কেনা হলো। আমি এবং আমার ফুপাতো ভাই তারেক গপাগপ খেয়ে ফেললাম। সে এক কামড় দিয়েই মুখ থেকে সেটা ফেলে দিল। তাঁর কাছে স্বাদটা "কেমন যেন" মনে হলো। সেই "কেমন যেন" বার্গারের কারনে বেচারার ফুড পয়জনিং হয়ে গেল। তিনদিন হস্পিটালে ছিল। যমে মানুষে টানাটানি চলেছে। বেচারা তাঁর বাপ চাচার শৈশবের শহরটি দেখতে পারেনি। তারপর যতদিন বাংলাদেশে ছিল, একবারের জন্যও বাইরের খাবার মুখে তোলার সাহস করেনি। যেকোন প্রবাসীর দেশে গিয়ে বাইরের খাবার খেলেই প্রথম কিছুদিনের মধ্যেই পেট খারাপ হয় কেন? আমরা আমরা বলেই বেঁচে যাই। বিদেশী আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা ভেজালমুক্ত খাঁটি খাবার খাওয়া পাবলিক হলে কবেই মরে শেষ হয়ে যেত।
সাকিব আল হাসান তাহলে খুব কী ভুল বলেছিল? এ নিয়ে ট্রল করায় নিজের আহাম্মকীপনাই প্রকাশ হলো না?

প্রিয় পাঠক, আপনার যদি খাবারের ব্যবসা থাকে, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে প্লিজ, নিজের পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য হলেও, টেস্ট বাড়াতে বা বেশিদিন সংরক্ষণ করতে বা অন্য যেকোন কারণেই হোক এমন কিছু মেশাবেন না যাতে মানুষের ক্ষতি হয়। এতে আপনার দুই চার পয়সা লস হবে হয়তো, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছেতো পরিষ্কার থাকবেন। সেই "শান্তি" মানুষ কোটি টাকা দিয়েও কিনতে পারেনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০১৯ রাত ১০:১৬
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মা শুদ্ধ কর....

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৪০


আত্মা করো শুদ্ধ
হারাম খেলে আরাম মিলে, কে বলেছে শুনি
শান্তিতে কী ঘুমায় বাপু, হাজার লোকের খুনি?
ঘুষের টাকায় পকেট ভরা, আছে মনে শান্তি?
ওদের চলার পথটি যে ভাই, ভ্রান্তি শুধু ভ্রান্তি!

বে-নামাজীর আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সু-চি'র বক্তব্য নিয়ে সাধারন মানুষ যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৪৮



১। নেদারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সরবরাহ করা স্ক্রিপ্ট পড়ে বিশ্ববাসীর সামনে মিথ্যাচার করলেন সু-চি! এই মানুষরুপী শয়তান মহিলা কিভাবে নোবেল পেয়েছেন তা আমার মাথায় ঢুকছেনা!

২। কত বড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম ও বিজ্ঞান আসলেই কি সাংঘর্ষিক

লিখেছেন শের শায়রী, ১১ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:২০



ধর্ম নিয়ে আমি পারতপক্ষে কোন আলাপ করি না। কারো সাথে না। করা পছন্দও করিনা। আমি কার সাথে ধর্ম নিয়ে আলাপ করব? সেই ধার্মিকের সাথে যে কিনা ভারতে মসজিদ ভাঙ্গছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আধ্যাত্মিক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১২:৩৩



আধ্যাত্মিক শব্দের বাংলা অর্থ সম্পর্কে জানবো। আধ্যাত্মিক শব্দের বাংলা অর্থ কি?
উত্তর: - আত্মা হইতে আগত; ধর্ম বিষয়ক, ব্রহ্ম বিষয়ক।

সহজ হিসাব। আধ্যাত্মিক নিয়ে বড় সর গল্প মালা বিজ্ঞানের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহ! নিভে যাচ্ছি মোমবাতির মতন!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১:১৮



কীসব যেন নেই, আবার যেন কী কী দেখেছি-
পেয়েছি, হয়ত পেতে চলছি!
কিংবা হারিয়েছি সে ঘোর কাটেনি।

পৃথিবীর মধ্যে এসে আমি পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছি,
এই জনপদে!
নিজেকে জানি -
এসব ভাব, অভাব: সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×