somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজহারির কোটি টাকার গাড়ি

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি আরব ছেলে, যে আমেরিকায় পড়াশোনা করছে, সে তাঁর বাবাকে চিঠি লিখেছে, "আমার বন্ধু বান্ধবেরা সবাই ট্রেনে চেপে আসে, আর আমি গোল্ড প্লেটেড ল্যাম্বরগিনিতে। ব্যাপারটা নিজের বিবেকের জন্যই ক্ষতিকর। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আর ল্যাম্বরগিনি চড়ে আসবো না। তাঁদের মতন ট্রেনে চেপেই ক্যাম্পাসে আসবো।"
চিঠি পড়ে আরব বাবা মা ইমোশনাল হয়ে গেলেন। তাঁরা পুত্রকে জবাবে লিখলেন, "প্রিয় পুত্র! তোমার ব্যাংক একাউন্টে এই মুহূর্তে দুইশো মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করে দিয়েছি। তোমাকে বিব্রত করার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। এই টাকায় নিজের জন্য একটা ভাল ট্রেন কিনে ফেলো, যাতে তুমিও তোমার বন্ধু বান্ধবের মতন ট্রেনে চেপে ক্যাম্পাসে যেতে পারো। ইয়াল্লা, হাবিবি! জাযাকাল্লাহ খায়ের!।"

জোকস ছিল। তবে এতে কিঞ্চিৎ সত্য লুক্কায়িত। সেটি হচ্ছে, আরবরা এতটাই ধনী। যারা আরবদের চেনেন, তাঁরা নিশ্চই কথাটা মানেন।

আমাদের শহরের আরবিদের এলাকায় গেলে চোখ কপালে উঠে যায়। আলিশান আলিশান সব প্রাসাদ তৈরী করে রেখেছে একেকজন। বিএমডব্লিউ মার্সিডিজ বেঞ্জের নিচে কোন গাড়ি আছে, সেটা যেন ওরা জানেই না। আমাদের দেশের পাংকু আবুলরা আশির দশকের টয়োটা গাড়ির পেছনে স্পয়লার আর স্পিকার লাগায়ে বুম বুম আওয়াজ করতে করতে শো অফ করে। আরবি ছেলেদের শো-অফের বিষয় কী জানেন? বাড়িতে পোষা সিংহ, পোষা বাঘ, পোষা চিতা নিয়ে খেলাধুলা করা। কারন ল্যাম্বরগিনি, ফেরারি, বুগাটি দিয়ে শো অফের কিছু নাই। ওদের ঘরে ঘরে এইসব মাল পড়ে আছে।

স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই তাই প্রশ্ন তুলেন, মুসলিমদের এত ধন সম্পত্তি থাকা উচিৎ কিনা। সম্পত্তিতো ফিৎনা, আল্লাহ বলেছেন অপচয় না করতে।
আমাদের সমাজে একটি বিষয় মানুষের মনের মধ্যে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করা আছে, এবং তা হলো, যারা ধর্মকর্ম করে, তাঁদের টাকাপয়সা থাকতে পারবে না। আরবরা যেহেতু মুসলিম, মক্কা ও মদিনা তাঁদের অঞ্চলেই অবস্থিত, আমাদের ধর্মের মূল এসেছে তাঁদের অঞ্চল থেকেই, তাই ওদের এমন সম্পত্তি থাকা কতটা জায়েজ? বিশেষ করে যেখানে হাজারে হাজারে, লাখে লাখে মুসলিম না খেয়ে মরছে।
অন্য ধর্মে কি বলা আছে জানিনা, তবে যেহেতু আমি মুসলিম, তাই ইসলাম নিয়েই বলি।
আমাদের দেশে একটা মসজিদের ঈমামের যদি টয়োটা করোলা গাড়িও থাকে, তাহলেও লোকজন বাঁকা চোখে তাকায়। মার্সিডিজ থাকলেতো লোকে মরেই যাবে। কথা হচ্ছে, ইসলাম কী টাকা পয়সা উপার্জন নিষেধ করে দিয়েছে?
তার আগে আমাকে বলেন, আমাদের নবী সুলাইমান(আঃ) ও তাঁর বাবা দাউদ (আঃ) কী ছিলেন? উত্তর হচ্ছে, "সম্রাট।"
কোন সম্রাট কখনও দরিদ্র হয়ে থাকে? না।
উল্টা সুলাইমান নবী আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন তাঁকে যেন এমন সাম্রাজ্য ও ক্ষমতা দেয়া হয় যা আগে কখনই কাউকেই দেয়া হয়নি, ভবিষ্যতেও কাউকে দেয়া হবেনা। তিনি তা জনকল্যাণে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
এইটাই পয়েন্ট। আল্লাহর কাছে অর্থ সম্পদ চাইবেন, কেন চাইবেন না? তবে সেটি অবশ্যই তার একাংশ জনকল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
আমাদের একটি বহুল পরিচিত দোয়া আছে, "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।"
"হে আল্লাহ, আমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন, এবং আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন!"
দোয়াটা কারোর মাথা থেকে আসেনি, এসেছে সরাসরি কুরআন থেকে। সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত দেখে নিন।
তাহলে দেখতে পারছি, আল্লাহ নিজেও বলছেন, তাঁর কাছেই দুনিয়ার অর্থ সম্পদ ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করতে হবে।
এবং অর্থ সম্পদ উপার্জন করলে অবশ্যই আল্লাহর হক আদায় করতে হবে, সেটি হচ্ছে জাকাত ও হজ্জ্ব। সদকা দিলে এক্সট্রা সোয়াব। এরপরে আপনি আপনার সম্পদ দিয়ে আপনার হালাল কি কি শখ পূরণ করলেন, তাতে কোনই বাঁধা নেই। আপনি দামি গাড়ি কিনুন, বিদেশে ছুটি কাটাতে যান, দামি রেস্টুরেন্টে খান, কোনই সমস্যা নাই।
হ্যা, এইটা ঠিক যে পৃথিবী ব্যাপী প্রচুর অনাহারী মানুষ আছেন। আপনাকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তাঁদের জন্য কিছু করতে। আপনি করবেনও। কিন্তু এইটাও সত্য, সবার দুঃখ কষ্ট দূর করার একক দায়িত্বও আপনার নয়। আপনি আপনার সাধ্য অনুযায়ী করবেন। আপনি আপনার পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য যা ব্যয় করবেন, সেটাও কিন্তু সদকা। এই যে আমরা স্ত্রী সন্তানদের জন্য পেঁয়াজ টমেটো মাংস কিনি, সবই সদকা হিসেবে কবুল হয়। জানেন? কারন আল্লাহ আপনাকে পরিবার দিয়েছেন, আপনি সেই উপহারের (পরিবারের) যত্ন নিচ্ছেন।

অনেকে এখন বলবেন, "কিন্তু ইসলামে যে বলা হয়েছে কুরআন শিক্ষার বিনিময়ে টাকা নেয়া যাবে না?"
তাহলে আপনারাই বলেন, কুরআন শিখানো "হুজুর" তাহলে সকালে নাস্তায় কী খাবেন? দুপুরের খাবারে? কোন সূরা পাঠ করলে তাঁর ক্ষুধা নিবারণ হবে? "কুরআন বিক্রি করা যাবেনা" বলতে এটি বোঝানো হয়েছে যে আমি আমার মন মতন ফতোয়া কুরআনের বাণীর নামে পয়সার বিনিময়ে প্রচার করতে পারবো না। যা কুরআনে নেই, হাদিসে নেই, কেউ পয়সা দিল, আর আমি বলতে শুরু করলাম "আছে।" এইটা করতে পারবো না।
এবং আরেকটি শর্ত হলো, ধরুন কেউ আমাকে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইলো। আমি জানি, কিন্তু তাঁকে বললাম, "আমাকে এক হাজার ডলার না দিলে আমি তোমাকে বলবো না।" - এই ফাজলামি আমি করতে পারবো না। আমি অবশ্যই আমাদের জ্ঞানের সর্বোচ্চ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবো। বিনিময়ে সে কিছু দিলে আলহামদুলিল্লাহ। না দিলে ডবল আলহামদুলিল্লাহ। কারন সেটার বিনিময় তখন সরাসরি আল্লাহ দিবেন।
বুঝতে পেরেছেন?

এখন আসি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে।
"ওয়াজ" সম্পর্কে আমার কী মতামত।
আমার লেখালেখির সাথে যারা পরিচিত, তাঁরা ১০০% নিশ্চিত, আমি এইসব ওয়াজ-মাহফিলের ঘোর বিরোধী। অনেক কারনই আছে। প্রধানতম কারণটি হচ্ছে, আমার নবী (সঃ) কখনই বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়মে ওয়াজ করেননি। তাঁর সাহাবীগণও না। এবং যেহেতু আমি আলগা মাতবরিতে বিশ্বাস করিনা সেহেতু ওয়াজের পক্ষে না।
তাঁরা মসজিদে খুৎবা দিতেন। সেটাই ইসলামী পথ, এবং কার্যকরী পথ।
দ্বিতীয় কারন হলো ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা।
ইসলামের খিলাফতের প্রথম শতকে (দুই তিন জেনারেশন পরেই) ইসলামিক রাষ্ট্র জুড়ে একটি ট্রেন্ড চালু হয় যেখানে তথাকথিত "আলেমগণ" বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় গিয়ে ধর্মীয় কেচ্ছা কাহিনী প্রচার করে বেড়াতেন। লোকজনের জন্য সেটাই ছিল বিনোদন। পাবলিককে যে যত খুশি করতে পারতো, তাকে তত বেশি হাদিয়া দান করা হতো। সে হতো ততবার সেলিব্রেটি, তত বড় আলেম।
সমস্যা ছিল এই যে, এইসব মনপ্রসূত ধর্মীয় কেচ্ছাকাহিনীকে হাদিসের নামে চালানো হতো। যেমন, মেরাজের ঘটনায় অথেন্টিক হাদিস সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু সেখানে মশলা যুক্ত করতে তারা আরও ডিটেইল যোগ করতেন। কিংবা কেয়ামত সম্পর্কিত হাদিসেও অনেক ভুয়া ঘটনাকে হাদিসের নামে চালানো হয়েছে। এতে পাবলিক শুনে শিহরিত হতো। ফলে কেচ্ছাকাহিনী কথকদের প্রচুর আয় হতো। একটা সময়ে দেখা গেল প্রচুর জাল হাদিস সমাজব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। তখন আসল আলেম এবং খলিফাগণ এইসব কেচ্ছাকাহিনীর আসর পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। ফিল্টার করে করে তখন সহীহ আর জাল হাদিস আলাদা করা হয়। কিন্তু আজ তেরো-চৌদ্দ শতক পরেও সেই সব জাল হাদিস থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। "জ্ঞানার্জনের জন্য চীনে যাও" "দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ" ইত্যাদি তারই নমুনা।
এখন এই ঘটনার সাথে কী ওয়াজের মিল খুঁজে পাচ্ছেন? ওয়াজতো ধর্মীয় দাওয়াতের জন্য আয়োজন করা হয় না। সেখানে উপস্থিত জনতার ৯৯.৯৯% মানুষই মুসলিম। তাহলে কিসের জন্য আয়োজন করা হয়?
আমাদের দেশে শীতকালে চাষের টাকা আসার ফলে গ্রামের মানুষের অবস্থা তখন একটু ভালোর দিকে থাকে। তখন এরা ধর্মীয় চেতনা থেকে ফাঁকা মাঠে ওয়াজের আয়োজন করেন। বক্তারা বক্তব্য দেন। অশিক্ষিত লোকজন বেহেস্তে যাবার আশায় তা শোনেন। ইসলামী বয়ান শুনতে তাঁদের ভাল লাগে। হালাল বিনোদন, সোয়াবও কামানো হয়। ঈমানও চাঙ্গা হয়। সর্বোপরি, প্রচুর জ্ঞান লাভ হয়।
কথা হচ্ছে, বক্তারা যা বলেন, তা কী ১০০% অথেন্টিক? অবশ্যই না। আমি নিজে কিছু ভিডিও ক্লিপ শুনেছি যেখানে একজন বক্তা বলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নাকি কোন এক হাদিসে আছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন সে মুসলিমদের খুব অত্যাচার করবে।
আরেকজন বলে বেড়ান মাটির তলে পিতিবি আছে, সেখানে চাঁদ, সূর্য, আলাদা আলাদা মহাদেশ লুক্কায়িত। এইসব ইনফরমেশন কুরআন থেকে তিনি পেয়েছেন।
একটা ভন্ডকে পেয়েছিলাম যে আজগুবি আরবি উচ্চারণ করে কুরআনের আয়াতের নামে চালিয়ে দিচ্ছিল। তারপরে সেটার তর্জমা। পাশে বা সামনে বসা একজন মুসলিমও লোকটির কলার চেপে ধরেনি। আস্ত মাহফিলে একজনও হাফেজ ছিলেন না? অদ্ভুত!
এছাড়া বিধর্মীদের বিরুদ্ধে লোকজনকে উস্কে দেয়ার ঘটনাতো নতুন কিছু না।
শব্দদূষণের কথা আপাতত বাদই যাক। প্রয়োজন নাই, তারপরেও ঝাঁকে ঝাঁকে মাইক লাগানো হবে। হার্টের রোগী, বাচ্চা শিশু, যাদের পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন, পরীক্ষার্থী, যাদের নিরবিচ্ছিন্ন পরিবেশ প্রয়োজন, তাঁদের পরোয়া না করে এইধরনের অসভ্য আচরণ ইসলামে কোন লজিকে জায়েজ হবে?
রাতভর ওয়াজ শুনে ফজরের নামাজের সময়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে লোকজন বেহেস্তে যাবার স্বপ্ন দেখে?
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ওয়াজে ভালোই "সমস্যা" আছে। এর মাধ্যমে লোকজনকে ভুলভাল শেখানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও হিংসার পথে উষ্কে দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে "নাস্তিকদের জবাব একটাই, কোপ!"

এই সমস্যা দূরীকরণ সম্ভব কিভাবে? স্ট্রিক্ট মনিটরিং। প্রথমেই বলে দেয়া হবে খোলা ময়দানে ওয়াজ হবেনা, হয় মসজিদে, নাহয় ইনডোর ফ্যাসিলিটিতে হতে হবে। আর যদি মাঠে ময়দানে হয়, তবে মাইকের শব্দ যেন নির্দিষ্ট ডেসিবেলের বেশি না উঠতে পারে সেটা নিশ্চিত করবে প্রশাসন।
ওয়াজে কেউ উল্টাপাল্টা কিছু বললে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইসলামের নামে ভুলভাল কথাবার্তা থেকে শুরু করে পুলিশ, আর্মি সরকার সম্পর্কিত ভিত্তিহীন কথাবার্তা ইত্যাদি সবই ভ্যারিফাইড সোর্স ছাড়া বললে মোটা অর্থ দন্ড থেকে শুরু করে কারাদন্ড পর্যন্ত সবকিছুই এর আওয়াতায় আনতে হবে।
এছাড়া প্রকৃত আলেম সমাজের একটি সংগঠন থাকতে হবে। যারা লাইসেন্স দিবে কে কে ওয়াজ করতে পারবে, কে কে না। যে উল্টাপাল্টা ওয়াজ করবে, তার লাইসেন্স কেড়ে নেয়া হবে। খুব কঠিন বা জটিল বিষয় না। একটু সদিচ্ছা থাকলেই চলে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডাক্তারি লাইসেন্স ইত্যাদি যেমন শরীরের জন্য জরুরি, তেমনি ধর্মীয় লাইসেন্সও আত্মার জন্য জরুরি। এর ফলে ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে ফাজলামি বন্ধ হবে, এবং আসল আলেমরা সামনে আসার সুযোগ পাবেন।

যাই হোক, আমি বলছিলাম ধর্মের কাজে অর্থ উপার্জন নিয়ে। আপাতত সেটাতেই ফোকাসড থাকি।
আমাদের দেশের মসজিদের ঈমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন কত বলতে পারেন? আমাদের অনেকেরই বাচ্চাদের পকেটমানির টাকায় এদের পুরো মাসের সংসার চালাতে হয়। আমাদের মসজিদগুলোতে এসি লাগানোর জন্য, মোজাইক পাল্টে টাইলস এবং টাইলস পাল্টে মার্বেল বসানোর জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়। তাঁদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলে হারেরেরে বলে মসজিদ কমিটির লোকজন তেড়ে আসেন। আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমাদের এলাকার মসজিদের ঈমাম এবং মুয়াজ্জিন দুইজনই এসে আমাকে বলেছিলেন, "আমরা আজ আমাদের অভিভাবক হারালাম। একমাত্র তোমার বাবার কারণেই প্রতি বছর আমাদের বেতন বাড়তো। এখন কেউ আমাদের হয়ে কথা বলবে না।"
কথা সত্য। যতবার তাঁদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব তোলা হতো, ৯০% মসজিদ কমিটির সদস্য বলে উঠতেন, "তাঁরা হুজুর মানুষ। তাঁদের এত খাই খাই কেন?" আর বাকি ১০% চুপ থাকতেন।
হুজুরদের বাড়তি আয় বলতে এই মিলাদ, কুরআন খতম আর ওয়াজ মাহফিলই ভরসা। সাথে শিশুদের কুরআন শিক্ষা দিয়ে যদি কিছু আয় হয়! সেখানেও লোকেরা এখন বলে বেড়াচ্ছে, "ইসলাম শিক্ষার বিনিময়ে তাঁরা কেন টাকা নিবেন?"
আমাদের দেশের মসজিদের নিয়ম কী হওয়া উচিৎ জানেন? এসি, টাইলস ইত্যাদিতে ফোকাস না করে ঈমাম, মুয়াজ্জিনরা যাতে গবেষণাধর্মী পড়াশোনা করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। মসজিদে লাইব্রেরি থাকা। কম্পিউটার, ইন্টারনেট থাকা। আশি নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্ব উলামারা যে ফতোয়া দিয়ে এসেছেন, এই ২০২০ সালে এসেও আমাদের দেশের মসজিদের ঈমামরা জানেন না, এইটা বিস্ময়কর। জানবেন কিভাবে? তাঁদের সোর্স অফ নলেজ হয়ে গেছে ফাজায়েলে আমাল, নেয়ামুল কুরআন, নূরানী অজিফা জাতীয় ভুয়া আজগুবি তথ্যে ভরপুর বইগুলো।

আপনি বলতে পারেন, আমাদের নবীজি (সঃ) খেজুর পাতায় ঘুমাতেন, তাহলে তাঁরা কেন হেলিকপ্টার চড়েন।
আমি বলবো, আমাদের নবীজি (সঃ) কিন্তু আমাদের কাউকে নিষেধ করেননি হেলিকপ্টার চড়ার ব্যাপারে। তাঁর নিজেরই সাহাবীগণ তাঁর মৃত্যুর পরে বিলিওনিয়ার হয়েছিলেন। উমারের (রাঃ) খেলাফতে মুসলিম সাম্রাজ্য এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল (ইজিপ্ট থেকে পাকিস্তান) যে চারদিক থেকে বৃষ্টির জলের মতন টাকা আসতে শুরু করে। উমারের (রাঃ) নিয়ম ছিল মুসলিমদের ranking অনুযায়ী ভাতা প্রদান। এক নম্বর ক্যাটাগরি আহলে বাইত, বা রাসূলুল্লাহর (সঃ) স্ত্রীগণ ও পরিবার। সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন তাঁরা। তারপরে মক্কার চরম নির্যাতনের ঘটনায়ও যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা। বিলাল, খাব্বাব, আম্মার প্রমুখ এই ক্যাটাগরিতে পড়েন। তিনি নিজেও নন। এইভাবে নামতে নামতে মক্কা বিজয়ের পরে যারা মুসলিম হয়, তাঁদের মধ্য দিয়েই এই ranking শেষ হয়। তাঁর লজিক ছিল, অন্তরে তাকওয়া যাই থাকুক, বিলালের সাথে কিভাবে আবু সুফিয়ান, সোহেলদের তুলনা হবে যারা আরাম আয়েশের সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন? যাই হোক, এই সময়টায় হজরত আয়েশা (রাঃ) এত বিপুল অর্থ ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য দেখে কেঁদে উঠে বলতেন, "আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) কখনই ভরপেট আহার করতে দেখিনি।" তিনি এই সম্পদ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। নিজে এক পয়সাও রাখতেন না।
তিনি কিন্তু বলেননি, প্রতিটি মুসলিমেরও তাই করা উচিৎ।

আমার পয়েন্ট হচ্ছে এই যে, অর্থ সম্পদ আল্লাহর দান, রহমত ও নেয়ামত। তিনি যদি আপনাকে দিয়ে থাকেন, সেটি অবশ্যই গ্রহণ করবেন। শর্ত একটাই, অবশ্যই অহংকার করবেন না। অবশ্যই স্বীকার করবেন এটি আল্লাহর দান, তিনি আপনাকে দিয়েছেন বলেই পেয়েছেন, এবং তিনি যখন খুশি নিয়ে নিতে পারেন। তাই যতক্ষণ এটি আপনার কাছে আছে, ততক্ষন এর হক আদায় করুন। জাকাত দিন, গরীবের হক আদায় করুন, হজ্জ্ব পালন করুন। পারলে উমরাহ আদায় করুন। এরপরে আপনার "হালাল" শখ পূরণ করতে চাইলে করুন। কোনই সমস্যা নাই।
ইসলামে অর্থ উপার্জন মোটেও হারাম না। উসমানের (রাঃ) অর্থ সম্পদ ছিল বলেই তিনি মসজিদে নববীর জন্য জায়গা কিনতে পেরেছিলেন। আজকে আমাদের নবী (সঃ) সেই জমির উপরই শুয়ে আছেন। যাকে জান্নাতের টুকরা বলা হয়ে থাকে।
তিনি কুয়া কিনতে পেরেছিলেন, যার পানি পান করে মুসলিমরা তখন প্রাণে বেঁচেছিলেন।
দুর্ভিক্ষের সময়ে তিনি এক বিশাল ক্যারাভান ভর্তি সম্পদ দান করতে পেরেছিলেন। সবই সম্ভব হয়েছিল, কারন তাঁর টাকা পয়সা ছিল।
দুনিয়ায় কেবল দুই ধরনের মানুষ আছে। একজন দেন, আরেকজন গ্রহণ করেন। আপনাকে আল্লাহ যদি দাতা হিসেবে নির্বাচন করেন, তাহলে সমস্যা কোথায়? আলহামদুলিল্লাহ বলে দান করতে থাকুন।

সমস্যা হয় তখন যখন ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা।’
সে যাই করবে, আমরা সেখানে খুঁত খুঁজে পাব। সে হাসলে আমরা বলবো তার চেহারা শুয়োরের মতন। সে কারোর মাথায় হাত দিলে বলবো ব্যাটা ভন্ড। সে কারোর জন্য যদি মরেও যায়, বলবো বাটে পড়ে মরেছে। পেছনে অন্য ঘটনা আছে।
সে যদি দামি গাড়ি কিনে ছবি দেয় - আমি তখন অন্তর জ্বালায় জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাব। "আমি শালা এখনও রিকশা কিনতে পারলাম না, এই ব্যাটা এত দামি গাড়ি কিনলো কিভাবে?"
আমি সামনের পিঁপড়া নিয়ে হৈহুল্লোড় করছি, এদিকে আমার পেছন দিয়ে হাতি চলে যাচ্ছে, আমার কোন খবর নেই।
আমার প্রিয় দলের রাজনৈতিক নেতারা হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে ফেলছে, আমি জিভ বের করে বলছি জ্বি হুজুর।
আমার প্রিয় নেতা নেত্রীরা প্রকাশ্যে আদর্শ বিরোধী কাজ করছে, আমি চুখ বুজে প্রশান্তির হাসি হেসে বলছি, সহমত ভাই!
আমার প্রিয় নেতা নেত্রীর ছানা পোনার কোটি টাকার সম্পদ দেখে বলছি, "ও দেশের জন্য এইটা করেছে, ঐটা করেছে, একটু আধটুতো ডিজার্ভ করেই।"
হিপোক্রেসিটা ধরতে পারছেন?

কেউ ওয়াজ-মাহফিল ইত্যাদি করে টাকা কামিয়েছে, হালাল হারামের ইস্যুতে এখন যাচ্ছি না। তবে এই টাকা অনেক অনেক ভাল সেই টাকা থেকে যারা সরকারি কোষাগার লুটে খাচ্ছে। "দেশে দুর্নীতি নাই, শেখ হাসিনার আমলে দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে" টাইপ আজগুবি কথাবার্তা আমাকে শোনাতে আসলে গালি খেয়ে বসতে পারেন। গতবার দেশে গিয়ে নিজের জমি নাম জারি করতে গিয়েই ঘুষ দিয়ে আসতে হয়েছে। আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি নিজেদের বাড়ি নিজেদের মেয়েদের নামে নাম জারি করতে গিয়ে এক লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। নাহলে ফাইল এই টেবিল থেকে ঐ টেবিলে নড়ে না। আমাদের ন্যায্য দুইটি চা বাগানের ফাইল আজকে প্রায় এক দশক ধরে সচিবালয়ে আটকে আছে কারন অমুক স্যার তমুক স্যার হাদিয়া চেয়ে বসেছেন।
কিংবা, করোনা ভাইরাসের মতন সিরিয়াস পরিস্থিতিতে প্রটেকশন "মাস্কের" দাম কয়েকগুন বাড়িয়ে হঠাৎ ধনী হতে চাওয়া অমানুষ ব্যবসায়ীদের আয়ের তুলনায় ওয়াজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন কিছুই না।

বলতে পারেন যেসব ওয়াজে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক কথাবার্তা চলে, তাদের ব্যাপারে কী?
ভাই, ওদেরকে আপনার সরকারই পৃষ্ঠপোষকতা করছে। সহজ রাজনীতি যদি এখনও না বুঝেন, তাহলে কিছু বলার নাই। সবই মুদ্রার এপিট ওপিঠ।

একটি উপদেশ দিয়ে শেষ করি।
কারোর যদি উন্নতি দেখেন, তাহলে হিংসার পরিবর্তে দোয়া করবেন। "হে আল্লাহ, ওকে একটা কেন, একশোটা বেন্টলি (দুই লক্ষ ডলারের গাড়ি) কেনার সামর্থ্য দান করো। সেই সুযোগে দুয়েকটা যেন আমিও কিনতে পারি, এই সুযোগ দাও।"
জেনুইন মন থেকে এই দোয়া করুন, দেখবেন আপনার হয়ে ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন যেন আপনাকেও দুয়েকটা বেন্টলি কেনার সামর্থ্য আল্লাহ দেন। আল্লাহ যদি আপনাকে তারপরেও না দেন, তাহলেও ক্ষতি নাই। অন্তত নিজের মনটা যে পরিষ্কার করলেন, সেইটার মূল্যও কয়েক কোটি টাকা।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:০৬
২৯টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"বানের পানির মতো আসছে রেমিট্যান্স, রিজার্ভেও রেকর্ড"।

লিখেছেন পলাতক মুর্গ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৩৮


গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, এই অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই তার চেয়ে ১৪৭ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বেশি এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

= সব শেষ হয়ে যায় একদিন=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:১৮



©কাজী ফাতেমা ছবি
=একদিন সব শেষ হয়ে যায়=
একদিন আনন্দের ঢেউ ছিলো মন নদীতে,প্রাথমিকে যখন
হইহুল্লোড়ে কেটে যায় পাঁচটি বছর- মন বেখবর,
ক্লাস পার্টি ছিলো না, ছিলো না সেদিন আনন্দের লহর
বন্ধুদের ছেড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরকমও হয়!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৮:০৯



একবার অস্ট্রেলিয়ার এক বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে একজন বাংলাদেশী জয়েন করলো বিক্রয়কর্মী হিসাবে। প্রথমদিনে পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করলো সে।

সারাদিনের কাজ শেষে সন্ধ্যা ৬টার সময়ে তার বস তাকে ডাকলো।

বস:... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাতা আবিষ্কার

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৫১


কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জুতা আবিষ্কার' কবিতার ছায়া অবলম্বনে একটি রম্য কবিতা

রাজামশাই কহিলেন শোন কান খুলিয়া,
মন্ত্রী উজির বুদ্ধি বাহির কর সকলে মিলিয়া।
বর্ষার বারি আর প্রখর রোদ লাগিবে কেন গায়,
বৃষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

"কালের পরিক্রমা"

লিখেছেন উম্মে সায়মা, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৯:১৫




চোখ বুজলেই বুঝি ঘুম?
পা বাড়ালেই বুঝি চলা?
চোখ মুদেও জেগে থাকা
এক পা দু' পা হেঁটেও থেমে থাকা
কখনো এইতো রীতি

জীবন বহতা নদী
ঘড়ির কাঁটা জানান দেয়
টিকটক টিকটক
একসময় গ্রাস করে জরা
শীতের সকালের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×