আজব একটা দেশ বাংলাদেশ।
১. প্রথমে যখন করোনা বিশ্বময় মহামারী আকার ধারণ করছে, তখন আমাদের দেশের রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে "আলেম" "মুফতি" ইত্যাদি টাইটেল যুক্ত ধর্মব্যবসায়ীরা প্রচার করে বেড়ালেন, এইসব কোন বিষয়ই না। আমাদের দেশের মানুষের কিছুই হবে। রাষ্ট্র জানালো, বাংলাদেশ এতটাই প্রস্তুত যতটা ইউরোপ আমেরিকাও না। এটি মিডিয়ার তৈরী হাইপ। সামান্য সর্দি জ্বরের মতোই বিষয়। যারা করোনা ভাইরাসের আতংক ছড়াবে, তারা বিএনপির লোক।
ধর্মীয় নেতা জানালো, করোনা ভাইরাস ইন্টারভিউতে বলেছে, বাংলাদেশে সে কোন ক্ষতিই করবে না। যারা আক্রান্ত হবে, সবাই মুনাফেক, নাম সর্বস্ব মুসলমান। মুমিনদের ভয় নেই। কারণ ভাইরাস বলেছে, তারা কাফের ধ্বংস করতেই পৃথিবীতে এসেছে।
কেউ স্বপ্নে প্রাপ্ত ওষুধের ফর্মুলা দিয়ে বেড়ালেন। কেউ কেবল দোয়া পড়ে গায়ে ফু লাগিয়ে ঘুরতে বললেন।
তালিকায় কিছু ডাক্তার সাহেবও যুক্ত হয়ে গেলেন। WHO, CDC ইত্যাদি বিশ্ব সংস্থাদের গবেষণা, জার্নাল, তথ্য উপাত্য ইত্যাদি পাত্তা না দিয়ে নিজেরাই নিজেদের খেয়াল খুশি মতন হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়ে প্রচারণায় নেমে গেলেন যে গরমে করোনা ভাইরাস ছড়ায় না। তাই বাংলাদেশের কোনই ভয় নেই। বাংলাদেশে আসলেও গরমে মরে যাবে।
ফলাফল হয়েছে ভয়াবহ।
এই যে শুরু থেকেই আমরা হাজারো বাঙ্গাল বিদেশে নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে চিল্লাফাল্লা করছিলাম, সবাইকে সাবধান করছিলাম, আমাদের রীতিমতন হ্যারাস করেছে লোকে। কেউ সরকারি দলের কথা বিশ্বাস করেছে। তারা বলেছে, আমরা জনমনে আতংক ছড়ানোর চেষ্টা করছি। এটি সর্দি, জ্বরের মতোই সামান্য ব্যাপার। মৃত্যু হার দুই পার্সেন্টও না। তাও বয়স্কদের। ইয়ং পোলাপানের কিছুই হবেনা। শুধু শুধু প্যানিক সৃষ্টি করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির ষড়যন্ত্র করছি ইত্যাদি।
ধর্মীয় নেতার বাণীর আলোকে যারা হ্যারাস করলো, তারা আগে থেকেই নিশ্চিন্ত ছিল আমরা কাফের, মুনাফেক, এখন প্রমান হয়ে গেল আমরা দাজ্জালের অনুচর। নাহলে মসজিদ বন্ধ করার মতন কথা মুখে আনি কোন সাহসে! টুপি মাথার দাড়িওয়ালা মুফতি বলেছেন, কেউ দোয়া পড়ার পরে করোনা আক্রান্ত হলে কুরআন মিথ্যা হয়ে যাবে। এরপরে আমরা কিসের দোহাই দেই? মহামারীতে নিহত সাহাবীদের নাম সহ উদাহরণ দেয়ার পরেও লোকে এইসব মুফতি মাওলানার কথা বেশি বিশ্বাস করে।
ডাক্তারের কথা মেনে চলা লোকজনতো একটাই প্রশ্ন করে। "আপনি ডাক্তার?" "না।" "তাহলে এত প্যান প্যান করছেন কেন? বেশি জানেন? শুধু শুধু প্যানিক ছড়াবেন না। আমাদেরকে আমাদের মতন থাকতে দিন।"
ফলে আমরা অবাধে রাস্তাঘাট মাতিয়ে বেড়িয়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে, আমাকে যেন ক্যামেরায় দেখা যায়, সেজন্য আমরা গাদাগাদি করে মন্ত্রীর পেছনে দাঁড়িয়েছি। ওয়াজ মাহফিলে যোগ দিয়েছি। হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে গায়ের সাথে গা ঘষা ঘষি করে মোনাজাতে অংশ নিয়েছি। সনাতনধর্মীরা পুণ্যলাভের আশায় পুণ্যস্নানে গিয়েছি। করোনা বিস্তার চলছে, তারপরেও কনসার্ট বাতিল করিনাই। মক্কা মদিনা সহ বিশ্বের মোটামুটি সব মুসলিমপ্রধান দেশে মসজিদ বন্ধ হয়ে গেলেও, আমরা ঠিকই জুম্মার সালাত আদায় করেছি। নামাজ শেষে হ্যান্ড শেক করেছি, কোলাকুলি করেছি। ডাক্তার সাহেব বলেছেন, "এই ভাইরাস ড্রপলেট থেকে ছড়ায়। মানে কেউ কাশলে, বা হাঁচি দিলে জীবাণু সারফেসে পরে, এবং সেই সারফেস কেউ হাতাপিতা করে নিজের মুখ, চোখ নাক ধরলে তখন গিয়ে কেউ আক্রান্ত হবে।" - এই ফূর্তিতে কেউ একটুও চিন্তা করলাম না টম হ্যাংকসের মুখের উপর কে হাঁচি দিল, ট্রুডোরের বৌ কার মুখ নিঃসৃত কফ দলাই মালাই করলো, ইদ্রিস এলবা বা অন্যান্য সেলিব্রেটিরা, যারা মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন, তাঁদের শরীরে কিভাবে "ড্রপলেটের" মাধ্যমে রোগটি ছড়ালো? কমন সেন্স, যা সবার মাঝে আনকমন একটি ব্যাপার, সেটি থাকলে আমরা বুঝতাম, না, এই রোগ কেবলই ড্রপলেট থেকে ছড়ায় না। এখন রেজাল্ট বলছে, আক্রান্ত রোগীর ছয়ফিট radius এর মধ্যে থাকলেই খবর আছে। সে কাশুক, অথবা না কাশুক।
এখন হায় হায় করে লাভ আছে? সেই ডাক্তার সাহেবরা নিজেদের ভুল শুধরে কোন নতুন হাইপোথিসিস নিয়ে হাজির হয়েছেন? সেই নেতারা? সেই আলেম উলামারা? এই যে মানুষ মারা যাচ্ছেন, রোগে কষ্ট পাচ্ছেন এসবের দায়িত্ব কাদের? যারা উন্নত বিশ্বের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার পরেও দুই পার্সেন্ট মৃত্যুহার দেখিয়ে স্ট্যাটিস্টিক্স শেখাচ্ছিলেন, লাখে লাখে মানুষ যখন বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে পড়ে থাকবেন, সমাজচ্যূতির ভয়ে কাউকে বলবেনও, এসবের দায় কারা নিবে? একটি ভুল তথ্য, সেটা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা, কতটা মারাত্মক ক্ষতির কারন হতে পারে আজকে আমরা হাতেনাতে দেখতে চলেছি।
আল্লাহ মাফ করুক!
২. যখন পৃথিবীর সব দেশে বিমান চলাচলের উপর কঠিন নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলো, আমাদের দেশে তখনও অবাধে চীন এবং ইউরোপ থেকে লোকজন যাতায়াত করতে লাগলেন। টনক নড়লো তখন যখন ইটালির একদম রেড জোন এলাকা থেকে এক প্লেন ভর্তি মানুষ দেশে এলেন। এমন বেয়াক্কেলদের সবাই চরম গালাগালি করলেন। বাইরে থেকে এইভাবে রোগ বয়ে আনলো কোন বুদ্ধিতে? রেমিটেন্সের দোহাই দিচ্ছিল কেউ কেউ। আরে ছাগল, আমি নিজে প্রবাসী। দুই চারপয়সা রেমিটেন্সের অংশীদার আমিও। কিন্তু তাই বলে আমার অধিকার নাই কোটি কোটি মানুষকে বিপদে ফেলার।
এর ফলে একটা লাভ অবশ্য হলো। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হলো আমাদের প্রস্তুতি কতটা ফাঁকা ছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে বললেন, আড়াইটা মাস সময় পাবার পরেও তাঁরা "হোম কোয়ারেন্টাইনের" চেয়ে বেশি আর কোন ব্যবস্থা নেন নি। তিনি বললেন, এটাই আমাদের সামর্থ্য। এর বেশি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।
তা হোম কোয়ারেন্টাইন কি, সেটা সম্পর্কেও কাউকে কোন রকম গাইড লাইন দেয়া হলো না। কোন নজরদারিরও ব্যবস্থা করা হলো না। তাই লোকজন বাড়িতে ফিরেই বাজারে বেরিয়ে গেলেন আড্ডা দিতে। কোলাকুলি, জড়াজড়ি, হাতাহাতি সব চলল। ছোট বাচ্চাদের চুম্মাচাটি দেয়া হলো, বড়দের বুকে জড়িয়ে ধরা হলো। কেউ বিয়ে খেতে গেলেন, কেউ নিজের বাড়িতে পার্টির ব্যবস্থা করলেন। কেউ ভ্যাকেশনে সাজেকে গেলেন, আড্ডা দিলেন চবি ক্যাম্পাসে। খুবই আনন্দে সময় কাটলো।
সরকার এরপর জোর পূর্বক গৃহবন্দীর ব্যবস্থা করলে, লোকজন "কোয়ারেন্টাইন" কি জিনিস,সেটা জানতেই সেই ভদ্রলোকের জানালায় ভিড় করলেন। পুলিশ ডেকে খ্যাদাতে হয়েছে। কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক রোগীর মধ্যে করোনা ভাইরাসের সব উপসর্গ দেখা দিলে "রোগী দেখতে" আত্মীয় স্বজন ভিড় করলেন বাড়িতে। রোগীর বিছানায় বসে রোগীর হাল হকিকত জেনে জীবনটা ধন্য করলেন।
ঢাকার মেয়র গন সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবাইকে হাত ধুতে বললেন। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে বেসিনের ব্যবস্থা করলেন। সেই বেসিন উদ্বোধন এবং মানুষকে কিভাবে হাত ধুতে হবে, সেটা শেখাতে বিরাট জমায়েতের ব্যবস্থা করলেন। স্বাস্থমন্ত্রী শিশু হাসপাতালের ডায়েবেটিস বিভাগ উদ্বোধন করতে দলবল নিয়ে গেলেন। নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ বদলালেন না, এবং প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সেখানে ভোট দিতে গেলেন।
যাই হোক, সরকার এরপরও স্কুল কলেজ চালু রাখছিলেন। কারন ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী। কোটি কোটি টাকা বাজেটের প্রোগ্রাম প্ল্যান করা আছে। এমন অনুষ্ঠান করা হবে যে বাঙালির চোখ কপালে উঠে যাবে। এর আগে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে লেজার শোর নামে লাল গালিচার উপর ছ্যাচড়াতে থাকা বঙ্গবন্ধুর ভিডিও জাতি সহ্য করতে পারেনাই। জাতির জনকের এমন অপমানে প্রচন্ড গালাগালি করা হয়েছে এই শোয়ের পরিচালনা কমিটিকে যারা কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে সস্তা একটা শো নামিয়ে দিয়েছে। তাই এইবার সেটার জবাব দেয়া হবে। কিন্তু এর মাঝেই লোকজনের চাপে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সব স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এরপরের দিনই আমরা ছুটে গেলাম কক্সবাজার, পতেঙ্গা, সিলেট, বান্দরবান, রাঙামাটি ইত্যাদিতে। আমাদের ট্যুরিজম খাত লালে লাল হয়ে গেল। হঠাৎ পাওয়া এই ছুটিতে আমাদের তখন আনন্দের শেষ নেই!
স্কুল কলেজতো বন্ধ হলো, কিন্তু অফিস আদালত কল কারখানা? শ্রম মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিল, অবশ্যই কল কারখানা চালু রাখা হবে। পরেরদিনই সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেন, যাতে লোকজন বাড়িতে অবস্থান করেন। কিন্তু আরেক দফা ভ্যাকেশন পেয়ে আমাদের মাথা নষ্ট হয়ে গেল। আবারও ট্রেনের, লঞ্চের, বাসের টিকিট কেটে, শুয়ে, বসে, ছাদে উঠে, দাঁড়িয়ে, ভিড় করে আমরা ছুটলাম যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমাদের মনে ঈদের আনন্দ! এরাই কিছু দিন আগে ইতালিয়ানদের গালাগালি করেছিল, কেন তারা বিদেশ থেকে ভাইরাস নিয়ে দেশে এলো! এরাই এখন শহর থেকে ভাইরাস বয়ে নিয়ে গ্রামে গেল।
নজরুল ব্রো সেই বহু যুগ আগেই এই জাতি সম্পর্কে বলে গেছেন,
“ আমরা সবাই পাপী;
আপন পাপের বাটখারা দিয়ে;
অন্যের পাপ মাপি !! ”
৩. দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এমনিতেই জঘন্য ছিল। স্বাস্থ্যখাতে আমাদের বাজেট শুনলে বাইরের লোকে হাসে। এই সময়ে সেটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক মহামারী পরীক্ষার ক্ষমতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে, তাও যাদের অফিস ঢাকায়। ঢাকার বাইরের কেউ চিকিৎসা পাবেন না। তাও যাদের কীট সঙ্কটে ভুগতে হচ্ছে। ঢাকার লোকেরাও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অন্যান্য সব হাসপাতাল উপসর্গ শোনামাত্র রোগী খেদিয়ে বিদায় করছে। রোগীর আত্মীয়স্বজনরাও তাই রোগের লক্ষণ লুকিয়ে কোনরকমে হাসপাতালে ভর্তি করে দিচ্ছেন। এর ফলে ডাক্তাররা সংক্রমিত হচ্ছেন। কারন ডাক্তারদের কোন সুরক্ষা পোশাক নেই। আমেরিকা ইউরোপের চেয়ে ভাল ব্যবস্থা নেয়া সরকারের পক্ষ থেকে একটি গ্লাভস, একটি মাস্ক পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়নাই। ফলে, ডাক্তাররা পলিথিন প্যাঁচিয়ে চিকিৎসা চালাচ্ছেন। এদিকে ব্যাংকের অফিসাররা পিপিই পরে অফিস করছেন। আচ্ছা, ডাক্তাররা নিজেদের টাকায় এই ড্রেস কেনার ব্যবস্থা করতে পারেন না? এমনতো না যে আমাদের দেশের ডাক্তাররা না খেয়ে মরছেন। সরকারের দিকে কেন তাকিয়ে আছেন? এত ভরসা আমাদের সরকারের লোকজনের উপর? নিজেদের বাচ্চাদের দিকে তাকান, নিজেদের প্রাণ বাঁচান। যেখান থেকে পারেন, এই পোশাক কেনার ব্যবস্থা করুন। নার্স, ওয়ার্ড বয়, বা অন্যান্যরা, যাদের টাকা পয়সা নেই, তাঁদের জন্য ডোনেশন তুলুন, তাঁদের আপাতত পলিথিন প্যাচিয়ে কাজ করান। যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের পোশাক যেন আসে, সেটা নিশ্চিত করুন। আমি জানিনা, আমার কোনই ধারণা নেই এইসব বিষয়ে। কিন্তু বুঝতে পারছি, আমাদের সিস্টেমে ৯৯% গন্ডগোল চলছে। এবং এই কঠিন সময়ে নিজেরটা নিজেকেই সামলাতে হবে। আমাদের কোটি কোটি টাকা বাজেট থাকে আতশবাজি পোড়ানোর, ডাক্তার নার্সদের পিপিই দেয়ার সময়ে আমরা ফকির!
ও আচ্ছা, তাঁদের করোনা পরীক্ষার পদ্ধতির কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ন থেকে যাবে।
রোগীর মধ্যে যদি কোন উপসর্গ ধরা পড়ে, লোকজন হাসপাতালে ছুটে। হাসপাতাল জানায় হট লাইনে ফোন দিতে। হটলাইনে ফোন দিলে এঙ্গেজ আসে, ব্যস্ত আসে, বন্ধ আসে, সব আসে, কেবল কাউকে পাওয়া যায় না। যখন পাওয়া যায় তখন একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়। রোগী কোন প্রবাসীর সংস্পর্শে এসেছিলেন কিনা। যদি না এসে থাকেন, তাহলে সেখানেই বাতিল। ওটা করোনা না। আর যদি আসে, তখন খুব সম্ভব সেই প্রবাসীরও খোঁজ খবর নেয়া হয় তাঁর করোনা হয়েছে কিনা। নাহলে এও বাতিল। মোট কথা, একশোর মধ্যে দুইজনেরও পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় কিনা আমার সন্দেহ। যেকারনে আমাদের দেশে তিনের ঘরের নামতানুযায়ী রোগী বাড়ছে। গতকালকে তিনজন রোগী সনাক্ত হয়েছিল, আজকে তিনজন যোগ হয়েছে, কালকে আরও তিনজন হবে। ইদানিং সেটা বেড়ে ছয়ের ঘরের নামতা চলছে। ইতালিতে মরছেই দিনে সাতশো তিরানব্বই জন, আর আমাদের দেশে শনাক্ত হচ্ছেন দিনে তিন থেকে ছয়জন। আসলেইতো মন্ত্রী সাহেব ঠিক বলেছিলেন, আমাদের মতন প্রস্তুতি ইউরোপ আমেরিকাও নেয়নি।
তা মানুষের মৃত্যু কি থেমে আছে? না। ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া টাইপ রোগে মানুষের মৃত্যু ঠিকই হচ্ছে। সুস্থ সবল মানুষ, ধুম করে মারা যাচ্ছেন। কোন পরীক্ষা হচ্ছে না। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যাও তাই তিন-চার-পাঁচ। একটা সময়ে হয়তো এই মহামারী কেটে যাবে, আমাদের সরকারি হিসেবে দেখা যাবে একশো জনও মারা যাননি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা পরিবারের হয়তো একজন করে হলেও সদস্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিবেন ততক্ষনে। আমাদের মা বাবা, আমাদের শ্বশুর শ্বাশুড়ি, আমাদের দাদা দাদীরা এখন চরম বিপর্যয়ের মাঝে আছেন।
করোনার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে আমাদের অর্থনীতিতে। একের পর এক কোম্পানি ধসে যাচ্ছে, প্রতি ঘন্টায় মানুষের চাকরি যাচ্ছে, প্রতি মিনিটে শেয়ারের দর পতন ঘটছে। বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলো সামান্য একটি জীবাণুর কাছে অসহায়। আমাদের এখানে বন্দুক পিস্তলের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। লোকজন বেকার হয়ে গেলে সমাজে অপরাধের পরিমান বেড়ে যায়। তখন নিজের ও বাড়ির সুরক্ষা নিজের কাছেই। গৃহবন্দী থাকতে থাকতে সবাই খুব দ্রুত ডিপ্রেশনে চলে যাবে। এখনই অনেকে চলে গেছেন। মদ বিক্রি হচ্ছে পানির চেয়ে বেশি।
করোনার একটিই ভাল দিক লক্ষ্যণীয়। সেটি হচ্ছে, গত এক মাস ধরে কোন বিমান কোন জনপদে বোমা ফেলেনি। কোন ট্যাংক থেকে ছুটে আসা গোলা গুড়িয়ে দেয়নি কোন আবাসিক দালান। কোন বাবার তাঁর মেয়েকে বোমার শব্দকে খেলার অংশ বুঝিয়ে ভুলিয়ে হাসির ভিডিও বানাতে হয়নি। কোন শিশুকে শরণার্থী হয়ে পালাতে গিয়ে সাগরে হারিয়ে গিয়ে তীরে মৃত ভেসে উঠতে হয়নি। কোন শিশুকে মৃত্যুর আগে কাঁদতে কাঁদতে বলতে হয়নি, "আমি আল্লাহকে সব বলে দিব।"
আল্লাহ সব জানেন, সব শুনেন। তাঁকে কখনও তন্দ্রা স্পর্শ করেনা। তিনি যখন কাউকে ধরেন, তখন আসমান জমিনে কারোর সাধ্য নেই তাঁকে উদ্ধার করার।
আমরা সবাই এতদিন তাঁদের কান্না দেখে না দেখার ভান করেছি। আমরা এতদিন ওদের মরতে দেখেও চুপ করে ছিলাম। না খেতে পেরে মানুষ মরেছে, আমাদের বিবেক জেগে উঠেনি। আমরা আমাদের দায় কিভাবে এড়াবো? আজকে সামান্য এক জীবাণু আমাদের নতজানু করে ছেড়েছে। মসজিদে গিয়ে কান্নাকাটি করবেন? সে পথ তো বন্ধ হয়ে গেছে। একজন মুসলিমের জন্য এরচেয়ে বড় আর কি আজাব হতে পারে?মসজিদে হারামের জামাত হচ্ছে বন্ধ দরজার ভিতরে। আমার নবীর মসজিদের দরজা বন্ধ, ঈমাম নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন।
আবার একই সাথে দেখতে চাইলে, যে দুর্যোগ আমাদের আল্লাহর কাছে নিয়ে আসে, সেটি দুর্যোগ নয়, বরং আল্লাহর উপহার।
এই সময়েই আমরা আমাদের বিগত জীবনের যাবতীয় ভুলের ক্ষতিপূরণ করতে পারবো। যার একটি হচ্ছে, আমাদের দিন আনি দিন খাই মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ানো। আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা ইচ্ছা করলেই একটি পরিবার বাছাই করতে পারি, যাদের এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা আমরা করবো। কয়েক মুঠো চাল, সামান্য ডাল, দুয়েকটা পেঁয়াজ, কিছু ডিম, আলু, যেকোন একটি সবজি ইত্যাদি কিনতে খুব বেশি টাকা যায় না। আমি ইচ্ছা করলেই সাত দিন, দশ দিন ইত্যাদি হিসাব করে একটা প্যাকেট তৈরী করে সেই পরিবারকে বলে দিতে পারি এসে নিয়ে যেতে। অবশ্যই সোশ্যাল ডিস্টেন্স রেখে। ও আসার সময়ে আমি দরজার বাইরে রেখে দিব, সে এসে নিয়ে যাবে। কারোর কোন স্পর্শের সুযোগ নেই।
এই চরম দুর্যোগে বাড়তি খাবার কিনে মজুত করে খাদ্য সংকটের দিকে দেশকে ঠেলে দেয়া বন্ধ করতে পারি। এক প্যাকেট পাউরুটি খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ টিকে। এরপরেই কিন্তু এক্সপায়ার করে। আমি আট দশ প্যাকেট পাউরুটি কিনে বাড়ি ভরিয়ে ফেললাম। সপ্তাহ শেষে দেখি মাত্র দুই প্যাকেট খেতে পেরেছি, বাকিটা সব এক্সপায়ার্ড হয়ে গেছে। ফেলে দিতে হবে। অথচ, হাজার খানেক মানুষ দোকানে এসে পাউরুটি না পেয়ে খালি হাতে ফেরত গেছেন। শুধু পাউরুটি না, চাল, ডাল, সবজি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে। ফ্রিজে সবজি পচিয়ে কি লাভটা হচ্ছে? সেদিন তারেক জানালো, তাঁর সামনে একজন পঞ্চাশটা মুরগি কিনে নিয়ে গেল। আস্ত দোকানে আর মুরগি বাকি রাখলো না। ইচ্ছা করছিল বলতে, "তুই কি পঞ্চাশটা মুরগি তোর পিছে দিয়ে ঢুকাবি?"
আরেকজন costco থেকে জিনিসপত্র কিনে নিজের বাড়িকে দোকান বানিয়ে ফেলেছেন। সব এক্সপায়ার্ড মাল কি করবেন? জিজ্ঞেস করলে হারামজাদা দাঁত ক্যালিয়ে বলছেন, "Costoর রিটার্ন পলিসি কাজে লাগাবো!"
মানে বাতিল হওয়া মাল সে ফেরত দিয়ে নিজের টাকা ফেরত আনবে। কিন্তু প্রচুর মানুষ এই বদমাইশটার জন্য খালি হাতে দোকান থেকে ফেরত যাবে।
দয়া করে, এই কাজগুলো করবেন না। আমরা সবাই মিলে এই মহা বিপদে পড়েছি, সবাই মিলে কাজ করলে একসাথেই বের হতে পারবো ইন শা আল্লাহ। সবাইকে এক হতে হবে। আলাদা আলাদা ভাবে ইতরামি কর্মকান্ড চালিয়ে গেলে অতি শীঘ্রই করোনা ভাইরাসের পাশাপাশি আরও হাজারো সংকটে আমরা ডুবে যাব।
পৃথিবীর সিস্টেম রিবুট হচ্ছে। এখন বাঘে মোষে এক ঘাটে জল খাওয়ার সময়।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মার্চ, ২০২০ রাত ২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




