শুনেছি ব্রিটিশরা নাকি সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ দেয়ার আগে ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউণ্ড দেখতো। ওদের ফিলোসফি ছিল, যে জমিদারের ছেলে, সে ছোটবেলা থেকেই বাপ চাচার থেকে জমিদারি শিখে বড় হয়। লোকজনকে কিভাবে শাসন করতে হয়, সেটা তাঁর রক্তেই মিশে থাকে। কারন মানুষকে শাসন করা বা সমাজে নেতৃত্ব দেয়া পৃথিবীর কঠিনতম দায়িত্বের একটি। এই যে আমেরিকা গত একশো বছর ধরে দুনিয়া শাসন করছে, এর প্রধান কারন হলো এর "ফাউন্ডিং ফাদার্সরা" দূরদর্শী এবং বিচক্ষণ নেতা ছিলেন। তাঁদের গড়া ভিত্তির উপর এই আড়াইশো বছর পরেও একটি দেশ মেরুদন্ড শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে, এবং বিশ্বময় নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমেরিকান কনস্টিটিউশন পড়েন, সাথে এদের চেক্স এন্ড ব্যালেন্স সিস্টেমটা দেখেন, মুগ্ধ হয়ে যাবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতন আবর্জনাকে রাজগদিতে বসানোর পরেও "রাষ্ট্র আমেরিকার" খুব একটা ক্ষতি হতে পারেনি। নাহলে পুরো দেশটাকে মহাসাগরে ডুবিয়ে দেয়ার সব রকমের ক্ষমতাই এই কমলা সুন্দরীর ছিল। প্রথম দিন থেকেই সে সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কখনও সুপ্রিম কোর্ট, কখনও কংগ্রেস বাঁধা দিয়েছে।
তা যা বলছিলাম, ব্রিটিশরা এইসব ব্যাপারে ঐতিহাসিকভাবেই কুটিল বুদ্ধির অধিকারী। তাই দেখা যেত, শুধু মেধা থাকলেই হতো না, বরং ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও ওরা গুরুত্বের সাথে নিত। যে কারনে, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার প্রথম আই সি এস ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমাদের বিশ্বকবি রবিন ব্রোর বড় ভাই। যার বাবা ছিলেন দেবেন ঠাকুর, মহর্ষি। যার দাদা ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রিন্স।
সভ্য সমাজ এই সিস্টেমের প্রতিবাদ করে। আমি নিজেও সাম্যে বিশ্বাসী। আমারও কথা একই, যে যোগ্য, তাঁকে অবশ্যই নেতৃত্ব দেয়া উচিৎ। যদিও আমাদের অতি আধুনিক বাঙালি সমাজ এই তত্ব মানে না। এখানে আজও নেতার ছেলে/মেয়েই নেতা হয়, নাহলে তাঁর স্ত্রী, পুত্রবধূ, পারলে ড্রাইভার। কিন্তু নেতার পরিবারেরই হতে হবে। আমাদের রক্তে ওটা মিশে আছে, কিছু বলার নাই।
কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু সরকারি কর্মকর্তার হম্বি তম্বি দেখলে এই বিশ্বাসটা নড়বড়ে হয়ে যায়। অল্প পানির মাছ বেশি পানিতে ফেলতে নেই। ক্ষমতা এমনই এক ব্যাপার, যা ভুল হাতে পড়লে এর অপপ্রয়োগটাই হয় বেশি। যেমন ইদানিং দেখা যাচ্ছে পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ। কেন ভাই? কাউকে দেখার সাথে সাথেই কেন লাঠিপেটা করতে হবে? বাংলাদেশে কি কারফিউ জারি হয়েছে? আমিতো অনেক জরুরি কাজেই বাইরে বেরুতে পারি। আমার বৌ প্রেগন্যান্ট হতে পারে যার ইমার্জেন্সি প্রয়োজনে আমাকে বাইরে বেরুতে হয়েছে। কিংবা, আমার বাবা করোনা সিম্পটম দেখাচ্ছেন, আমি দৌড়ে বেড়িয়েছি একটা সিএনজি আনতে। আমাকে দেখামাত্র লাঠিচার্জ করতে হবে কেন?
আরেকটা কার্টুনকে দেখলাম দুইজন বয়ষ্ক মানুষকে কানে ধরে উঠবোস করিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করতে। ঠিক এই কারণেই উপরে ব্রিটিশ সিস্টেমের কথাটা তুলে ধরলাম। ইন্ডিয়া যেমন একটা চাওয়ালাকে প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসিয়ে নিজেদের বারোটা বাজিয়েছে, আমরাও তেমনই যাকে তাকে বিসিএস ক্যাডার বানিয়ে পদবীটার সর্বনাশ করছি। পারিবারিক শিক্ষাকেও মানদন্ডে আনা উচিৎ।
জমিদাররা কেবলই অত্যাচার করতো না, প্রজাদের ভালও বাসতো। ছোটবেলায় যখন গ্রামের বাড়িতে যেতাম, অনেক বয়স্ক মুরুব্বিরা আমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন, খোঁজ খবর নিতেন। তাঁরা নাকি আমাদের প্রজা ছিলেন। তখনই যাদের কোটি কোটি টাকা (লন্ডনীদের কল্যানে), জমিদারি লুপ্ত হয়েছে আমার দাদার দাদার আমলে। কিছুটা ছিটেফোঁটা ছিল আমার বাবার দাদার সময়ে, কিন্তু এরপরেতো কিছু নেই। আমরা সমাজের আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবার। তারপরেও এই যে তিন জেনারেশন পরেও এই স্নেহ, এই ভালবাসা কেবল সেই পুরানো স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা থেকেই। আমার পূর্বপুরুষরা যদি তাঁদের বাপের বয়সী কাউকে এইভাবে কানে ধরে উঠবস করিয়ে দাঁত ক্যালাতেন, তাহলে এই ভালবাসা কখনই পেতেন না। লোকে তাঁদের কবরের উপর থুথু ছিটাতো।
এনিওয়েজ, যেই কার্টুন এই কাজটা করেছে, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ওদের ডাকিয়ে এনে ভাল মতন শাসাবেন কি? শাসালে সেটা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করবেন কি? জনগনের সেবার জন্যই যদি হয় সরকার, তাহলে দেশের দুই সিনিয়র সিটিজেনকে অপমান করার দায় সরকারের উপরই বর্তায়। সেই দায়বদ্ধতা থেকে এই সমস্ত কার্টুনদের বিচার হওয়াটা জরুরি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০২০ সকাল ১০:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




