আমার পরিচিত লোকজন সবাই জানেন আমি মহা আস্তিক একজন মানুষ, একজন সাধারণ মুসলমান। স্বাভাবিকভাবেই কেউ যদি আমার আল্লাহ, আমার নবীকে নিয়ে মিথ্যা বানোয়াট কথা বলে তখন আমার প্রচন্ড রাগ হয়। এই তালিকায় যে শুধু নাস্তিকরাই থাকেন তা না, "অতি আস্তিক" দাবিকারী অনেক মুসলমানও থাকে। এই যেমন সেদিন ইউটিউবে দেখলাম এক ছাগল আজানের ভিডিও আপলোড করেছে যেখানে কাট পেস্ট করে আমেরিকা'স গট ট্যালেন্টের বিচারকদের ক্লিপ ঢুকিয়ে দিয়েছে, এবং ক্যাপশনে লিখেছে আজান শুনে ওরাও মুগ্ধ হয়ে গেছেন।
বা এর আগেও একবার দেখেছিলাম একজন কুরআন তিলাওয়াতের ভিডিও এডিট করে এইরকমই একটা পোস্ট করেছে যা দেখে অনেক বেকুব আহাম্মক মনে করেছে আমেরিকাস গট ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতায় একজন কুরআন তিলাওয়াত করে দর্শক বিচারক সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে।
কারোর ইউটিউব কন্টেন্টে সাধারণত কমেন্ট করিনা, কিন্তু এদের কন্টেন্টে করলাম। এদের চেয়ে বড় ইসলামের দুশমন দ্বিতীয় কেউ হতে পারেনা, সেটাই লিখলাম। ইউটিউবে রিপোটও করলাম। বাকি কর্তৃপক্ষের ব্যাপার।
তা যাই হোক, আমার রাগারাগি, তর্কাতর্কি, ঝগড়াঝাড়ি, গালাগালি সবই অনলাইনভিত্তিক পোস্টে। অফলাইনে সামনা সামনি কারোর সাথেই আমি কখনও ঝগড়ায় জড়াই না। কারন এতে গলা চড়ে যায়, এবং সম্পর্ক খারাপ হয়। সামনা সামনি এমন তর্ক কেউ তুলতে চাইলে আমি তর্কের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলি। কারন আমি জানি, এইসব তর্ক খুব সহজেই হাতাহাতির দিকে মোড় নিতে পারে।
আমাদের দেশে নাস্তিক ব্লগারদের কারোর সাথেই "ধর্ম বিষয়ে" আমার মতের মিল হয়না। অতি স্বাভাবিক ঘটনা। যদি হতো, তাহলেই বরং সমস্যা হতো।
কিন্তু একই সাথে ওদের অনেক মতের সাথেই কিন্তু আমার মতের মিল হয়ে যায়। যেমন, দেখা ওদের অনেকেই চায় দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, অনেকেই চায় দুর্নীতি দূর হোক। অনেকেই চায় ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে ভণ্ডামি বন্ধ হোক। সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়ে কাজ করেন অনেক বড় বড় নাস্তিক। বিদেশে একজন সংখ্যালঘু মুসলিম হিসেবেই বলছি, যখন অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়, একই সাথে আমার নিজেটাও কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়। সমকামীদের বিয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মানে কিন্তু মুসলিমদের মসজিদে গিয়ে নিরাপদে নামাজ আদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এই যে জুম্মার নামাজ জামাতে গিয়ে আদায় করছি, এই যে ঈদের দিনে ছুটি নিচ্ছি এবং নির্ভয়ে গর্বিত চিত্তে নামাজে যাচ্ছি, এটাই আমার অধিকার যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সহজ ব্যাপারটি বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয়না। আফসোস, অনেক মানুষেরই সেই বুদ্ধি থাকেনা।
তা বাংলাদেশে যখন নাস্তিকদের মারা হয়, তখন আমি প্রতিবাদ করি। যদিও ওদের মতের সাথে আমার মতের মিল নেই, যদিও যে কারনে সে মার খেয়েছে বা খুন হয়েছে সেই কারনে আমি নিজেও তাঁর উপর খ্যাপা, তারপরেও বলবো, অন্যায়ভাবে তাঁকে যখন হত্যা করা হয়, বা আঘাত করা হয়, আমি সেই ঘটনার প্রতিবাদ করি। কেন? কারন আজকে আমি যদি একটা অন্যায় কাজে খুশি হয়ে বগল বাজাই, কালকে আমার সাথেও সেই অন্যায়টা হবেই।
উদাহরণ দিতে গেলে খুব বেশিদূর যেতে হবেনা। এই যে আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত আলেম ইউসুফ রাজ্জাক সাহেব, তাঁর উপর কিছুদিন আগে একটা হামলার ভিডিও দেখলাম। সিলেটে হয়তো তিনি কোন কাজে গিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর উপর হামলা করা হয়েছে। তাঁর সমর্থকরা আহত হয়েছেন, তাঁর গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে, ভিডিওর শেষ পর্যায়ে দেখলাম গাড়ি ছুটিয়ে সেই জায়গা থেকে মোটামুটি পালিয়ে প্রাণ বাঁচানো হয়েছে।
এই নিন্দনীয় হামলা কারা করেছে জানেন? মুসলমানরা। যাদের বিশ্বাস, আমি নিশ্চিত ওরা যে পীরের মুরিদ, সেই পীরের ঘোষণা অনুযায়ী ইউসুফ রাজ্জাক সাহেব একজন ভন্ড, কাফেরদের এজেন্ট, মুনাফেক বা এইরকম কিছু। মানুষকে ধর্মের নামে ম্যানিপুলেট করা অতি সহজ ব্যাপার। আজকে যারা আপনাকে মাথায় তুলে নাচবে, কালকেই আপনার কোন কর্মকান্ড ওদের মতের বিরুদ্ধে গেলে তলোয়ার হাতে তাড়া করবে। আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা উসমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) কাদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন? নবীজির নয়নের মনি হজরত ফাতিমার কনিষ্ঠপুত্র হজরত হোসেনের গলায় ছুরি চালিয়েছে কারা? কোন কাফির, নাস্তিক?
ঠিক এই কারণেই আমি কোন অবস্থাতেই অন্যায়কে সাপোর্ট করতে রাজি নই। আমার মতের বিরুদ্ধে গেলেও।
বাংলাদেশের নতুন যন্ত্রনা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তেমনই একটি অন্যায় নিপীড়নমূলক আইন। এর মাধ্যমে সরকার যাকে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে মেরে ফেললেও কেউ কিছু বলতে পারবে না। বললেই ওকেও ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশি ডলার ব্যবস্থা করা হবে। বিশ্বের কোন গণতান্ত্রিক দেশেই এমন আইন থাকতে পারে না। স্বৈর শাসকরা এমন আইন পাশ করিয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখেন। আওয়ামীলীগ যদি সত্যিই মন থেকে দাবি করে থাকে দেশে গণতন্ত্র আছে, এবং তাঁরা সেটা বিশ্বাস করে থাকেন, তাহলে এমন আইন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়।
যে কারনে বলছি এমন কালো আইন অতি ভয়াবহ তা হচ্ছে, একজন লেখককে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যার প্রতিবাদ করা আমার নিজের পোস্টেই একজন সরকারি অফিসার এসে এই অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গাইলেন। জাস্টিফাই করার চেষ্টা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে বললে সরকার উচিৎ শিক্ষে দিবেই, এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রশাসনে কাজ করা একজন লোকের যদি এমন মেন্টালিটি হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর সেটা বুঝতে আইনস্টাইন পর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা লাগেনা। আপনি "সহমত ভাই" বলে কতদিন চালাবেন? আজকে যার বিরুদ্ধে অন্যায় হচ্ছে, একদিন এই আইন আপনার বিরুদ্ধেই প্রয়োগ হবে।
আমার নিজের অতি কাছের এক প্রিয়জন জিন্দেগীভর আওয়ামীলীগের রাজনীতি করে গেলেন। ক্ষমতায় যখন ছিল তখনও, ক্ষমতায় যখন ছিল না, তখনও তিনি দলের নিবেদিতপ্রাণ সেবক।
একটি নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন চাইলেন, তাঁকে সরাসরিই বলা হলো এত টাকা দিতে পারলে মনোনয়ন দেয়া হবে।
তিনি এত টাকা দিতে পারেননি, টিকেটও পাননি।
দাঁড়ালেন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেন চিরচেনা দৃশ্য। গায়েবি তরিকায় লোকজন বাড়িতে বসেই আসমানী ওহীর মাধ্যমে নিজের ভোট আওয়ামীলীগকে দিয়ে দিচ্ছে, কবর থেকেও কয়েকজন ওয়াই ফাই আর ব্লু টুথের মাধ্যমে ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি প্রতিবাদ করলেন ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে। অথচ কয়েক বছর আগেও যখন আমরা বলতাম আমাদের নির্বাচনে ভোট চুরি হয়, তখন তিনিই ছিলেন আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। "না! এইসব বিএনপির লোকেদের প্রোপাগান্ডা! নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, আর নিরপেক্ষ হয়েছে। লোকজন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছে।"
যাই হোক, কথা বেশি টেনে লাভ নেই।
জানি আমার কথায় কিছুই যাবে আসবে না, তারপরেও মনে হয় আওয়াজ তোলা উচিৎ, এইসব ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ফাইন ইত্যাদি অবিলম্বে বাতিল হোক।
সাথে দেশের আরেকটি হাস্যকর আইন বাতিল নিয়েও জনগনের আর্জি করা উচিৎ। সেটি হচ্ছে, দন্ডিত খুনের আসামিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার অধিকার আইন। একটা লোক খুন করেছে, আদালতে প্রমান হয়েছে, আদালত তাকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে, নিহতের পরিবার অপেক্ষায় আছেন কবে লোকটাকে দড়িতে ঝুলানো হবে, এর মাঝে মহামান্য রাষ্ট্রপতি খুনিকে ক্ষমা করার কে? তাহলে দেশে আইন আদালত ইত্যাদির প্রয়োজন কি? নিহতের পরিবারকে কি ক্ষতিপূরণ দেয় রাষ্ট্র? যার বাবা মা মারা গেছে, ছেলে মারা গেছে, কিংবা মেয়ে, রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করার সময়ে কি তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারবেন? তাহলে কি এটি বিচারের নামে প্রহসন নয়?
যেহেতু মুসলিম, তাই শেষ করি এই ব্যাপারে ইসলামের নিয়ম নিয়েই। খুনের মামলায় আল্লাহ নিজেও নিজের ক্ষমা করার অধিকার সরিয়ে নিয়েছেন। শুধু খুন না, কোন বান্দার প্রতি করা যেকোন অন্যায়, সেটি খুন থেকে শুরু করে ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই হয়ে কটূক্তি পর্যন্ত, যেকোন ধরনের জুলুমের ব্যাপারে ইসলাম ঘোষণা করে, যতক্ষন পর্যন্ত না জুলুমের শিকার হওয়া ব্যক্তি ক্ষমা করছেন, ততক্ষন পর্যন্ত জুলুমকারী পায়ে হেঁটে হজ্ব করা থেকে শুরু করে দিন রাত নামাজ পড়তে পড়তে কপাল ফাটিয়ে ফেললেও কিচ্ছু লাভ হবেনা।
সেখানে আদালতে প্রমাণিত একটা খুনিকে ক্ষমা করার অধিকার রাষ্ট্রপতি পান কিভাবে?
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ৮:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


