দেশের দুইটা ঘটনায় মন খুব বিক্ষিপ্ত।
প্রথমটি একটি মেয়ে শিশুর পরিবার সহ ওমরাহ করতে গিয়ে একা ফিরে আসার ঘটনায়। পরিবারের বাকি সদস্যরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। ছোট্ট মেয়েটা এই আশায় আছে যে ওর পরিবার ঈদের আগেই দেশে ফিরে আসবে, এক সাথে ঈদ পালন করবে। আহারে বাচ্চাটা! আহারে!!
আর দ্বিতীয় ঘটনাটা চিটাগংয়ের হালি শহরের। গ্যাস বিস্ফোরণে শিশু সহ ৯ জন নিহত!
হালিশহর আমার শৈশবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি এলাকা। আমার মামার বাসা ছিল সেখানে। শৈশবে ওদের রাস্তাঘাটে প্রচুর হেঁটে বেড়িয়েছি। চোখের সামনে একদম শূন্য জমি থেকে বহু বাড়িঘর নির্মাণ হতে দেখেছি। এই যে মানুষগুলো মারা গেল, প্রথমেই চিন্তা এলো, এরা আমার পরিচিত কেউ ননতো?
আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন বিটিভিতে গ্যাস দুর্ঘটনা নিয়ে প্রচুর খবর আসতো। এবং সরকারও নাগরিকদের সচেতন করতে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে নানান প্রচারণা চালাতো। আমাদের শৈশবে দেশে গ্যাসের কোন অভাব ছিল না। প্রাচুর্য এতটাই ছিল যে লোকজন গ্যাসের চুলার উপর ভেজা কাপড় শুকাতো। সামান্য একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য সারাদিন চুলা জ্বালিয়ে রাখতো।
এর ফলে মাঝে মাঝে বাতাসে আগুন নিভে যেত, চাবি চালু থাকায় বাসা বাড়িতে গ্যাস জমে যেত। তারপরে বিস্ফোরণ! প্রাণক্ষয়।
যেটা প্রচার করা হতো, তা হচ্ছে, অবশ্যই যেন গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়ী হই। গ্যাস অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। রান্নার প্রয়োজন ফুরালে যেন কেউ অহেতুক গ্যাস না পোড়ান। এবং চাবি বন্ধ হয়েছে কিনা, বা চাবি বন্ধের পরেও পাইপ থেকে গ্যাস লিক হচ্ছে কিনা সেটা অবশ্যই পরীক্ষা করেন।
চুলার পাশেই যেন জানালা থাকে। জানালা খোলা থাকলে বাড়িতে গ্যাস জমবে না। সেটি বাইরে বেরিয়ে যাবে।
যদিও আমাদের দেশের লোকজন সেই জানালা খুলতে ভয় পেতেন। কারন রাতের বেলা চোর সেই জানালা দিয়েই বাড়িতে ঢুকে পড়তো।
ছোটবেলায় এইসব দেখতে দেখতে বড় হয়েছি বলে গ্যাসের চুলার প্রতি আতংক আমার ডিএনএতে গেঁথে গেছে। এতটাই যে আমেরিকায় আসার পরেও প্রথম নয়-দশ বছর আমি ইলেক্ট্রিক চুলাওয়ালা বাড়িতেই থেকেছি। তারপরে ধীরে ধীরে গ্যাসের চুলাওয়ালা বাড়ি কিনে থাকতে শুরু করি।
তা আমার বর্তমান বাড়িতেই একবার ছুটির দিনে ব্যাকইয়ার্ড থেকে ঘরে ঢুকতেই নাকে প্রোপেন গ্যাসের গন্ধ এসে ঠেকলো। দৌড়ে দেখি চুলার চাবি খোলা। সেটা দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আস্ত বাড়ি গ্যাসবেলুন হয়ে গেছে।
বাড়ি ভর্তি পরিবারের লোকজন। আমার বৌ, দুই বাচ্চা ছাড়াও আমার মা, শ্বশুর শ্বাশুড়ি সবাই আছেন। কারোর নাকেই গন্ধ গেল না। আমি যদি বাইরে না বেরোতাম, তাহলে আমিও টের পেতাম না।
সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করলাম। ওরা এসেই আমাদের সবাইকে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ছাড়তে বলল। গ্যাসের পরিমান এতটাই বেশি ছিল।
তারপরে কয়েকদিন পরে আবারও একই ঘটনা।
এইবার একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমি আমার দুই ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত। বাকিরা ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজা খুলতেই প্রোপেনের গন্ধ নাকে ঠেকলো। দৌড়ে গেলাম চুলায়, দেখি নব খোলা। গ্যাস বেরুচ্ছে। ওটা বন্ধ করে পিছনের দরজা আর বাসার প্রতিটা জানালা খুলে দিলাম। যেসব রুমে ফ্যান আছে, ফ্যান চালু করে দিলাম। Exhaust ফ্যান চালু করলাম যাতে বাসার ভিতরের বাতাস বাইরে বেরিয়ে যায়। সকাল হতে হতে সব নরমাল।
সাথে সাথে এমাজন থেকে প্রোপেন গ্যাস ডিটেক্টর কিনে আনলাম। আমাদের বাসা বাড়িতে স্মোক, কার্বন মনোক্সাইড ডিটেক্টর থাকেই। ওগুলোর মতোই জরুরি হচ্ছে এই প্রোপেন গ্যাস ডিটেক্টর, বিশেষ করে ওদের বাড়িতে যাদের গ্যাসের চুলা থাকে।
তারপর থেকে নিশ্চিন্তে থাকি।
যখনই চুলায় গ্যাস লিক হয়, ডিটেক্টর আওয়াজ করতে শুরু করে, কেউ না কেউ তৎক্ষণাৎ গ্যাস বন্ধ করে দেয়।
আমাদের দেশের তো মনে হয় ৯৫% এর বেশি মানুষের বাড়িতেই গ্যাসের চুলা। তাঁদের কয়জন এই গ্যাস ডিটেক্টর বাড়িতে রাখেন?
মৃত্যুর সময়ে মৃত্যু আসবেই। মৃত্যুকে আমরা কেউই এড়াতে পারবো না। কিন্তু দুর্ঘটনারোধে সাবধানতো হতেই পারি।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




