somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্নহত্যা এবং অতঃপর

২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


একটি কর্দমাক্ত লাশ পাওয়া গেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল কবি আত্নহত্যা করেছেন।
সফেদ চুল, ছিমছাম দেহ আর মধ্যবয়স পার হওয়া লোক মিঃ জালাল। গোয়েন্দা হিসেবে উনাকেই তদন্তের ভার দেয়া হয়েছে।দ্রুততার সাথে কুমিল্লা থেকে মিঃ জালালকে ঢাকায় আনা হয়েছে।
দেখতে অনেকটা তীক্ষ্ণ মেজাজের
মিঃ জালাল সিগারেট মুখে ছোয়ান না। কিন্তু নিয়ম করে প্রতিদিন দু'প্যাগ হুইস্কি দরকার হয়, তিনি বলেন ওষুধ। মরা মানুষ, খারাপ মানুষ দেখতে দেখতে জালালের সব মুখস্ত হয়ে গেছে।গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কিছুদিন আন্ডারকাভারেও ছিলেন মিঃ জালাল। ছেলে মেয়ে পরিবার থাকলেও প্রতিমাসে সপ্তাহখানেক তিনি বাসার বাইরে থাকেন, একা না থাকলে কোন তদন্তের ব্যাপারে তার মাথা খোলে না। কবি হত্যার বিষয়টি বেশ চাঞ্চল্যকর। কেউ বলছে হত্যা, কেউ বলছে আত্নহত্যা।

এদিন তুমুল কান্ড হয়ে যাচ্ছে,
ফিল্মমেকার সাংবাদিকরা বললেন ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগার কারনে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা কবিকে মেরে ফেলেছে। অবশ্য একটা বলার যথেষ্ট যুক্তিও আছে। এর আগেও এরকমের আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। লেখক সাহিত্যিকদের হত্যা ঘটনা নতুন নয়। এখানে অনন্ত লাতিন আমেরিকার মতো কোন ঘটনা ঘটে না, যা করার বিচ্ছিন্নবাদীরাই করে থাকে।

মিঃ জালাল স্পটে আসলেন, অন ডিউটি অফিসারের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। অফিসার বললেন স্যার লাশকে মর্গে পাঠানো হয়েছে, দু'দিনের ভেতরেই রিপোর্ট পাওয়া যাবে। স্পট থেকে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি, শুধুমাত্র একটি ছুড়ি পাওয়া গেছে। আত্নহত্যা করবে ভালো কথা, কিন্তু এখানে এসে কেন?

মিঃ জালাল স্পটটিকে খুব ভালো করে দেখতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করলেন,এখান থেকে পুলিশ ফাঁড়ি কত দূরে?
স্যার হেঁটে গেলে চার মিনিট।
সামনে লেক ভিউ, শুনশান রাস্তা; শহর হলেও কেমন যেন থমথমে একটা গ্রামের মতো পরিবেশ। এখানটায় মানুষজন কম আসে।

মিঃ জালাল বুঝে গেছেন এখানে আত্নহত্যা সম্ভব না, দূর থেকে দেখার সম্ভাবনাও রয়েছে; হত্যাই হবে।
কিন্তু দু'দিন তদন্ত শেষে হত্যার কোন আলামত পাওয়া গেল না। তাহলে হল কী?

পোষ্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, মৃত্যুর আগে কবি নেশাগ্রস্ত ছিলেন। প্রচুর মদ খেয়েছেন, ফেরার পথে হাতের রগ কেটে নিয়েছেন।

এরকম পরিস্থিতিতে তদন্ত বন্ধ হয়ে যাবারই কথা, বুঝা যাচ্ছে নিশ্চিত আত্নহত্যা। মিঃ জালালের মনে তবু খটকা লেগে আছে, প্রচুর রক্তপাতের চিহ্ন তো পাওয়া যায়নি। অবশ্য এমন এক দিনে লাশ পাওয়া গেল, যেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ছড়াছড়ি।

কবির বাসায় তল্লাশি চালানো হল, কোন শেষ নোট যদি পাওয়া যায়। নাহ তেমন কিছুও নেই। তাহলে কি এভাবেই সব শেষ?

মিঃ জালাল এখনই তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারেন। কিন্তু তিনি কি দিবেন?

অন্তত এর আগের হত্যাগুলো মিঃ জালালকে ভাবিয়ে তুলল। মিঃ জালার কবির কবিতা পড়তে শুরু করলেন, যদি আত্নহত্যার কিছু আভাস পাওয়া যায়। নাহ কোথাও কিছু নেই। খটকা বেড়ে চলছে, বেড়েই চলছে। পত্রিকাগুলোর তাজা খবর- দেশের মান বেঁচেছে, অন্তত হত্যা নয়, আত্নহত্যা।

আন্ডারকাভারে থাকার সময় মিঃ জালাল অনেককিছুই জেনেছেন, ক্রিমিনালদের সাথে কাজ করেছেন, আবার নিজের কাজ আদায় করে সরেও গিয়েছেন।

এখন আর কেন যেন তার ভেতরে দেশভক্তি, ন্যায় অন্যায়ের অনুভূতি আর তেমন একটা কাজ করে না।
তার কাছে তার কাজটা অনেকটা নেশার মতো হয়ে গেছে, স্রেফ নেশা। প্রতিদিনকার কাজ, ফলাফল যাই আসুক কাজ করতেই হবে।

রাতে পানে বসেছেন মিঃ জালাল, অনেক চিন্তা আসছে মাথার মধ্যে-
দেশের চিন্তা, দেশদ্রোহীতার চিন্তা। আন্ডারকাভারে থাকাকালীন তাকে মেরে ফেলা হলে সে একটা মামুলি সন্ত্রাসী বলেই পরিচিতি পেত। কী আশ্চর্য বিষয়। ভাবছেন আর মদ গিলছেন...
মিঃ জালাল ভেবেই চলেছেন।
মিঃ জালালের মনে হলো কবি শুভ্র সুপ্রদীপের কয়েকজন বন্ধুর থেকে তার লিখাগুলোর উপর ধারণা নিবেন, যদি কোন ক্লু পাওয়া যায়।

পরদিন সকাল এগারোটায় কবি সুপ্রদীপের বন্ধু কলেজের সাহিত্য শিক্ষক শঙ্খ নারায়ণের কাছে গেলেন। চায়ের কথা বল্ব হয়েছে, মিঃ জালাল না করেছেন। কলেজ গেস্টরুমে শান্ত স্থবিরতা কাজ করছে। মিনিট দু'য়েক আগে যাই-
মিঃ জালাল বলছিলেন, আচ্ছা কবি যদি তার কোন কবিতায় আত্নহত্যার পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন। আপনি তো তার বন্ধু আবার তার উপর বাংলা সাহত্যের শিক্ষক। আপনার এব্যপারে কী মনে হয়। শঙ্খ নারায়ণ কেন যেন অনেকটা উত্তেজিত হয়ে গেলেন।
আত্নহত্যা! আমার বন্ধু কবি শুভ্র সুপ্রতীম আত্নহত্যা করতে পারেনা।

লাতিন আমেরিকান কবি লোরকাকে চিনেন? যিনি হত্যা হবার আগে তার কবিতার তার নিজের হত্যার বর্ণনা সম্পর্কে লিখে গিয়েছিলেন। কী ভাবছেন, এ নিয়ে চারজনের আত্নহত্যা হল, বিশববিদ্যায়ের দর্শনের শিক্ষক, দু'জন রাজনৈতিক কর্মী আর আমার বন্ধু শুভ্র সুপ্রতীম।
আমি অনেক বলেছি, একটু সাবধাবে থাকিস। ও কি উত্তর দিয়েছিল জানেন?

সাবধানে কীভাবে থাকতে হয় বলতে পারিস?

দর্শনের শিক্ষকের আত্নহত্যার পর ও কী বলেছিল জানেন?
বলেছিল, কোনদিন আমার আত্নহত্যার খবর পেলে ভাববি আমি আত্নহত্যা করিনি, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কবিরা তো এত সহজে হেরে যেতে পারে না।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে তিলে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া চাই।
শঙ্খ নারায়ণ মেটামরফোসিস সম্পর্কিত একটা বই নিয়ে বেড়িয়ে পরলেন।

সন্ধ্যায় মর্গে গেলেন মিঃ জালাল। সবগুলো মর্গের পরিবেশ যেন একই, একটা গুমট অন্ধকার কাজ করে। মানুষগুলো কেমন নিথর পড়ে থাকে, অথচ মানুষগুলো কোথায় চলে যায়।
কবি শুভ্র সুপ্রতীমের লাশ দাফন হবে না, তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার মেডিকেল কলেজকে হস্তান্তর করা হবে অতি শীঘ্রই।

মিঃ জালাল লাশটির দিকে তাকিয়ে আছেন, একটা ছুড়ি আঘাতে রক্তাভ চিবুক, একটি অনিয়ত মুখ ফ্যাল ফ্যাল করে যেন তাকিয়ে আছে।
নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে মিঃ জালালের। মিঃ জালাল খুব ভালো করেই জানেন কখন কী করা হয়।
খুব ভালো করেই জানেন মৃত্যু কতোটা সহজ, ন্যায় অন্যায়ের বুলি কতোটা সহজ। এই তদন্তগুলোকে ঘাটাতে গেলে কতোটা সংশয়।
মিঃ বিড়বিড় করে বললেন, পারলে ক্ষমা করে দিবেন শুভ সুপ্রতীম, পারলে ক্ষমা করে দিবেন।
তদন্তের রিপোর্ট জমা দিবেন মিঃ জালাল।
রিপোর্ট জমা শেষে গাড়ীতে উঠলেল না মিঃ জালাল, হেঁটে ফিরছেন আর ভাবছেন।

ঢাকায় তার কাজ শেষ, কিছুদিন বেড়েয়ি আসবেন তার গ্রামে থেকে। পৃথিবী যেন তাকে ঋণী করে ফেলছে, সময় যেন তাকে বেঁধে ফেলছে প্রতিনিয়ত।




সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×