আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করা হাইকোর্ট বিভাগের বিতর্কিত বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক কোনো বেঞ্চ পাননি। নিয়ম অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষ হলে প্রধান বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ পুনর্গঠন করে এখতিযার বণ্টন করেন। অবকাশ শেষে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম শুরু হলে এখতিয়ার ভিত্তিতে শুনানি গ্রহণ করেন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। আজ বুধবার ১৯ দিনের শীতকালীন অবকাশ শেষে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তার আগেই প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ পুনর্গঠন করেছেন। তবে বিতর্কিত বিচারপতি মোঃ নিজামুল হককে কোনো বেঞ্চ দেয়া হয়নি। এর আগে গত রোববার বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন যৌথভাবে বিচারপতি মোঃ নিজামুল হককে অসদাচরণের কারণে পদত্যাগের আহবান জানায়। একইসঙ্গে আইনজীবীদের সর্বোচ্চ এই দু'টি সংস্থা অভিযোগ করে কেলেঙ্কারি এবং অসদাচরণ সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগকারী বিচারপতি নিজামুল হককে প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ দিতে পারেন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ওইদিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, মারাত্মক অসদাচরণের দায়ে বিচারপতি নিজামুল হকের বিরুদ্ধে যেখানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্তপূর্বক তাকে ইমপিচ (অভিশংসন) করা প্রয়োজন, সেখানে প্রধান বিচারপতি তাকে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের দায়িত্ব দিতে যাচ্ছেন। তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, যদি তাই করা হয় এবং আমাদের এ দাবি মানা না হলে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় ঘেরাও, আদালত বর্জনসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তাদের এই আশঙ্কার পর নিজামুল হককে দায়িত্ব দেয়া হয়নি বলে ধারণা করছেন আইনজীবীরা। গত ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি নিজামুল হক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে হাইকোর্টের ২৫ বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত বেঞ্চের মধ্যে বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি মোঃ বদরুজ্জামন সমন্বয়ে বেঞ্চ রিট মোশন, বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ দেওয়ানী মোশনের এখতিয়ার পেয়েছেন। বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ সকল প্রকার রিট মোশন, বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদারের নেতৃত্বে ডিভিশন বেঞ্চ দেওয়ানী মোশন, বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি আবু তাহের মোঃ সাইফুর রহমানকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ শ্রম ও চাকরি সংক্রান্ত মামলা, বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফৌজদারী মোশনের শুনানির এখতিয়ার পেয়েছেন।
বিচারপতিদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুযায়ী বিচারপতি মোঃ নিজামুল হকের আগে অবস্থানকারী বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ডিভিশন বেঞ্চ ফৌজদারী মোশন, তার পরের স্থানে থাকা বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ অর্থঋণ ও শ্রম আপিল সংক্রান্ত রিট মোশনের এখতিয়ার পেয়েছেন।
গত ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত থেকে সুপ্রিম কোর্টের শীতকালীন অবকাশ শুরু হয়। প্রায় ১৯ দিনের অবকাশ শেষে আজ বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট দু'বিভাগের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
প্রসঙ্গত ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর সেখানে বিচারপতি নিজামুল হককে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তাকে ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ দেয় সরকার। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রবাসী ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির (ঘাদানিক) নেতা ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপি সংলাপে কথোপকথন ফাঁস হয়ে যায়। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন তার পদত্যাগ দাবি করে। এরপর সারা দেশে সমালোচনা ঝড় শুরু হলে গত ১১ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক। পদত্যাগ করে হাইকোর্টের বিচারপতি পদে ফিরে যান তিনি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মধ্যে ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ নিজামুল হক হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হন। এর আগে তিনি পেশায় ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তার সঙ্গে আরো ৯ বিচারপতি স্থায়ী হন। তিনি অস্থায়ী তথা অতিরিক্ত বিচারপতি পদে নিয়োগ পান আগের আওয়ামী লীগ সরকারের অন্তিম মুহূর্তে ২০০১ সালের ৩ জুলাই। বিগত চার দলীয় জোট সরকার বিচারপতি নিজামুল হকসহ ১০ বিচারপতিকে স্থায়ী না করলে তারা হাইকোর্টে রিট করেন। রিট আবেদনের রায়ে তাদের নিয়োগের নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে ঠিকই তবে শপথের দিন থেকে তাদের জ্যেষ্ঠতার নির্দেশ দেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



