
কবি জীবনে প্রেম ও কবিতা
======মোঃ খুরশীদ আলম
কবি জীবনে প্রেম ! আচ্ছা, মানুষ প্রেমে পড়ে কবি হন না কবিরা প্রেমে পড়েন? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা অতটা সহজ নয় হয়তো। তবে একথা একবাক্যে স্বিকার করতে দ্বিধা নেই যে, কবিরা ভালবাসেন মানুষ ও প্রকৃতিকে। কবির ভালবাসায় উঁচু-নিচু, জাত-ভেদ, ফর্সা-কালো, সময়-অসময় বলে কিছুর অস্তিত্ব নাই। একটি সুন্দর গোলাপ, সরোবরে সদ্য ফোটা নীল পদ্ম, আকাশে ভেসে বেড়ানো কালো মেঘ কিংবা দীঘির জলে জলকেলিতে মেতে থাকা রাজহংসীর জুটি, বেপরোয়া গ্রাম্য ছেলেদের দুপুরে মাতাল ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য, বর্ষায় জলভেজা কর্দমাক্ত মাঠে গাঁয়ের দুষ্টু ছেলের লুটোপুটি খাওয়ার চিত্র কবির দৃষ্টি এড়ায় না। এখান হতে আহরিত রং-রুপ, রস-রসদ আর মনের সবটুকু আবেগমিশ্রিত ভালবাসার ফ্রেমে কলম কাগজের সফল মিলন ঘটান। তিনি কবি, তার ভালবাসা জগতের সবকিছুকে নিয়ে। প্রভাতের সূয্য ওঠা, সন্ধ্যাকাশে সূয্যর রক্তিম অবয়ব এমনকি তার ব্যবহৃত কি-বোর্ডকে ঘিরেও তার ভালবাসার বিস্তৃতি। তার কবিতায় হাজার বছরের দুঃখ-কষ্টের বিবরণ সহজে উঠে আসে, হাজার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের সমস্ত জিজ্ঞাসা তার কবিতার কয়েকটি লাইনে বর্ণিত হয়। তিনি লিখেন হৃদয়ের অনুভূতি হতে, আবেগ হতে। ঘটনার পূর্বাপর অনুসঙ্গ যা হৃদয়ে দাগ কেটে যায় তা নিংড়িয়ে তিনি এক একটি কথামালা আবিস্কার করেন । যিনি লিখেন তিনি স্বাভাবিক বর্ণনা দেন ঘটে যাওয়া প্রসঙ্গের, কাব্যিক বর্ণে, কাব্যিক ছন্দে। তাই হয় কবিতা আর যিনি পড়েন তিনি কবিতা পড়েন। পাঠক কবিতা পাঠ করে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন কবির কবিতায়।
কবি জীবনে প্রেম আসে, প্রেমিকার ভাললাগা-ভালবাসায় কবির হৃদয় হাসে। কবি নতুন করে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পান এবং দুঃসাহসী হয়ে উঠেন। লিখেন প্রেমিকার রুপ নিয়ে, সৌন্দয্য নিয়ে। তার চোখে তার প্রেমিকাই যেন পৃথিবীর সব। তাকে নিয়েই হামেশা কবির ভাবনায় ডুবে থাকা।
আসুন, এই পর্যায়ে দু’একজন কবির প্রেম ও কবিতা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।
কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাম্যের কবি, মুসলমানের কবি, বিদ্রোহী কবি, জাগরণের কবি বলেই অধিক চিনি। ইনি কিন্তু প্রেমের কবি, বিরহেরও কবি। এই মানুষটি জীবনভর মানুষকে ভালবেসেছেন কিন্তু ভালবাসা পাননি। কবি যদি প্রেমে না পড়তেন তাহলে কবির এতো সুন্দর সুন্দর প্রেমের ও বিরহের গান আমরা কোথায় পেতাম ? কবির জীবনে প্রেম এসেছে বারবার, তিনি উপেক্ষিতও হয়েছেন বারবার। প্রথম দিকে সৈয়দা খানমকে ভালবেসে ইরানী ফুলের নামানুসারে নাম দেন নার্গিস । এই নার্গিসকে উপলক্ষ করে কবি লিখেছেন-
“ নয়ন ভরা জলগো তোমার
আঁচল ভরা ফুল,
ফুল নেবো না অশ্রু নেবো
ভেবে হই আকুল।”
এতো ভালবাসতেন যে নার্গিসকে, তাকে নিয়ে কবির সংসার হয়নি দু’একদিনও (যদিও কারো কারো অভিমত নার্গিসের সাথে কবির বাসরও হয়েছিল)। অথচ ভালবাসার কমতি ছিলনা নার্গিসের জন্য। নার্গিসের বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যুবক নজরুলের সাথে পরিচয় হয়। কারো কারো মতে বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে নজরুলের সাথে নার্গিসের পরিচয়ের সূত্রপাত ঘটে। সে যাই হোক, ষোড়শী সৈয়দা খানম তথা নার্গিস-নজরুলের প্রেম পূর্ণতার পথে হাঁটছিল উভয়ের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ছোট্ট ভুল বুঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে তথা কবিনের শর্ত নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় (কাবিনে শর্ত ছিল নজরুলকে ঘর জামাই থাকতে হবে) রগচটা কবি রাগ করে চলে যান, আর দৌলতপুরে ফিরে আসেননি। প্রায় ষোল বছর পর উভয়ের মধ্যে কাগজে-কলমে লিখিতভাবে বিচ্ছেদ ঘটে। এই ষোলটি বছর কবির ভালবাসার নার্গিস অপেক্ষায় ছিলেন কবির জন্য। এরই মধ্যে কবি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন প্রমীলা সেনগুপ্তা দেবীর সাথে। কিন্তু কবি তার প্রথম প্রেমকে ভুলেননি, ভুলতে পারেননি। নার্গিসের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতেই তার প্রমাণ মেলে। কবি লিখেন –
“ তুমি আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না- আমি ‘ধুমকেতুর ’ বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।”
অপেক্ষমান নার্গিসকে শান্তনা দিতে গেয়ে অভিমানি কবি বলেন-
“ যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে,
ভুলে যাও তারে
ভুলে যাও একেবারে।”
নজরুল গবেষকদের সকলেই একমত যে, নার্গিসই একমাত্র নারী যার কারণে পৃথিবীর বুকে নজরুলের মতো একজন বিখ্যাত কবির সৃষ্টি হয়েছিল। কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলপুরে বসেই আমাদের প্রিয় কবি একশত ষাটটি গান, একশত বিশটি কবিতা রচনা করেছেন বলে জানা যায়।
বিয়ের আসর হতে ফিরে আসা শারীরিকভাবে অসুস্থ্য ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া কবির সুস্থতায় বিশেষ অবদান রাখেন সেনবাড়ীর সকলে বিশেষ করে কুমারী প্রমীলা দেবী। যার ফলে হয়তোবা প্রথম প্রেমের স্মৃতি হতে মুক্তি পেতে কবি ভালবেসে ফেলেন প্রমীলা দেবীকে। প্রমীলা দেবীর বাড়ীতে আসা যাওয়া তৎকালে হীন্দু সমাজের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। ফলে কবি শারীরিকভাবেও নির্যাতিত হন। ঊনিশশত চব্বিশ সালের পঁচিশ এপ্রিল কলকাতায় নজরুল ও প্রমীলা দেবী স্ব-স্ব ধর্ম বজায় রেখে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘকাল পক্ষাঘাতগ্রস্থ থাকার পরে ঊনিশশত বাষট্টি সালের ত্রিশ জুন প্রমীলাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পরে কবি ভেঙ্গে পড়েন। কবি তার সহধর্মীনির উদ্দেশ্যে লেখেন -
“ হে মোর রাণী ! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে। ”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙ্গালী মুসলমান ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতে স্নাতক প্রথম মুসলিম মহিলা ছিলেন ফজিলতুন্নেসা। ইনি ছিলেন ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ। কবি নজরুল ওনার প্রেমে মজেছিলেন। যদিও এই প্রেম ছিল একদিক থেকে। শ্রদ্ধেয় কবি নিজেই ভালবেসে গেছেন কিন্তু ভালবাসা পাননি। পরিচয়ের প্রথম দেখাতেই কবি তার প্রেমে পড়েন। অনাকাঙ্খিত একটি ঘটনার মাধ্যমে কবি প্রত্যাখাত হন। কবি লিখেন –
“ তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।”
জীবনভর ভালবাসার আকুতি ছিলো কবির। তৃষ্ণার্ত কবির ভালবাসার তীব্রতা অনুভব করা যায় তার “ অভিশাপ” কবিতায়। কবি লিখেন-
“যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মরু কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি আর বড় করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কিন্ত ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে কোন ভাবেই কলম ধরতে পারছি না। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সেজন্য। সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে দু’একটি শব্দের বানান ভুল হয়েছে- কোনভাবেই ঠিক করতে পারি নি। ক্ষমা চাই সেজন্যও।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



