somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিল্প ও সাহিত্যের নবজাগরণ: যুগপৎ আন্দোলন এবং মৌলিকতার স্বরূপ।

২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সভ্যতার বিকাশ, সমাজের রূপান্তর এবং মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে শিল্প ও সাহিত্য এক অবিনাশী চালিকাশক্তি। একটি জাতির মননশীলতা কেমন হবে, তার নৈতিক ভিত্তি কতটা দৃঢ় তা নির্ভর করে সেই জাতির সাহিত্যচর্চা ও সংস্কৃতির সুস্থতার ওপর। বর্তমান সময়ে আমাদের সংস্কৃতিচর্চা, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র এবং সামগ্রিক প্রকাশনা অঙ্গনে একধরনের স্থবিরতা ও অসামাজিক, রুচিহীন সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই অবক্ষয় রোধ এবং শিল্প-সাহিত্যে এক যুগপৎ নবজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী প্রস্তাবনা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
নিচে এই ছয়টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার আলোকে শিল্প ও সাহিত্যের সার্বিক উন্নয়নের ওপর একটি বিশদ আলোকপাত করা হলো:
১. টিভিতে নাটকের স্ক্রিপ্ট বইমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থনির্ভর করা
টেলিভিশন নাটক আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অথচ আজকাল মানসম্মত চিত্রনাট্যের অভাবে নাটকের মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী হচ্ছে। নাটক যদি বইমেলায় প্রকাশিত মানসম্মত উপন্যাস বা গল্পগ্রন্থ থেকে রূপান্তরিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তা একদিকে যেমন নাটকের সাহিত্যমূল্য বাড়াবে, অন্যদিকে লেখকদের বই প্রকাশে উৎসাহিত করবে। এর ফলে টিভি নাটক সস্তা বিনোদনের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও সংস্কৃতির দর্পণ হয়ে উঠবে।
২. চলচ্চিত্রে সাহিত্যনির্ভর কাহিনীর আবশ্যিক ব্যবহার
সিনেমার শক্তি তার শক্তিশালী গল্প ও চিত্রনাট্যে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর অধিকাংশই সাহিত্যকর্মের সফল সেলুলয়েড রূপায়ন। আমাদের চলচ্চিত্রে গল্পের মৌলিক সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশের প্রথিতযশা ও উদীয়মান লেখকদের প্রকাশিত উপন্যাস বা গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ গল্প থেকে চিত্রনাট্য গ্রহণের নিয়ম চালু করা উচিত। এতে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাহিত্যিকদের মাঝে একটি মেলবন্ধন তৈরি হবে, যা রূপালী পর্দায় সুস্থ বিনোদনের ধারা ফিরিয়ে আনবে।

৩. গণমাধ্যমে কবিতা আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করা
কবিতা হলো মানুষের অন্তরের গভীরতম অনুভূতির শিল্পিত প্রকাশ। অথচ আধুনিকতার জিগির তুলে গণমাধ্যম থেকে কবিতার চর্চা দিন দিন সংকুচিত করা হচ্ছে। রেডিও ও টেলিভিশনের মূলধারার অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কবিতা আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করা হলে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কাব্যানুরাগ ও ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত হবে। এটি তরুণ প্রজন্মকে শুদ্ধ উচ্চারণ, মার্জিত রুচি এবং সৃষ্টিশীলতার দিকে ধাবিত করবে।
৪. ছন্দ-মাত্রার সঠিক চর্চা ও মুক্তছন্দের আধিক্য রোধ
সাহিত্য মানেই শৃঙ্খলা ও সুষমার মেলবন্ধন। অতি-আধুনিকতার নামে ছন্দহীন, এলোমেলো গদ্যকে কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আজ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্তের মতো সুনির্দিষ্ট ছন্দ, মাত্রা ও মিলের ওপর জোর দিয়ে লেখালিখি করা জরুরি। মুক্তছন্দের নামে অগোছালো লেখার আধিক্য থেকে অন্তত পঁচানব্বই শতাংশ বেরিয়ে এসে ছান্দসিক ও পঙক্তিমালা নির্ভর পরিশীলিত সাহিত্য চর্চায় ফিরে যাওয়া উচিত।

৫. মৌলিক লেখার গ্রহণযোগ্যতা ও সৃজনশীলতার সৃষ্টি
অনুকরণ বা পরমুখাপেক্ষিতা কোনো জাতির সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারে না। বিদেশি সাহিত্য বা অন্ধ অনুকরণ বাদ দিয়ে আমাদের নিজস্ব মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে মৌলিক লেখার চর্চা বাড়াতে হবে। মৌলিক লেখার প্রকৃত মূল্যায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা সমাজ ও রাষ্ট্রে নিশ্চিত করা গেলেই কেবল প্রকৃত সাহিত্যিক ও মানসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব।

৬. সরকারি উদ্যোগে নতুন লেখক সৃষ্টি ও প্রতিবছর ১০০ বই প্রকাশ
নতুন ও উদীয়মান লেখকদের মেধা বিকাশের পথ সুগম করতে রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সারা দেশ থেকে ১০০ জন নতুন লেখকের ১০০টি মৌলিক বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ তরুণ প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক ও কবিদের আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত করবে এবং মেধাবী লেখকদের জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেবে।

উপসংহার
শিল্প ও সাহিত্যের এই যুগপৎ আন্দোলন সফল করতে হলে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা এবং লেখক-শিল্পীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। একটি জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড মজবুত না হলে সামগ্রিক উন্নয়ন হোঁচট খায়। তাই সুস্থ ধারার সাহিত্য এবং প্রতিভাবান লেখকদের মূল্যায়ন করার মাধ্যমে একটি আলোকিত সমাজ বিনির্মাণ আজ সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
স্লোগানঃ ভালো লেখা বা লেখকের জন্য অপেক্ষায় জাতি।
মোঃ মুসা গাঙচিল। শশীভূষণ চরফ্যাশন ভোলা।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৪৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবশেষে শেষ হলো! কিন্তু তিনি ফিরবেন কবে?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৫

আমি সর্ব প্রথম আগ্রহ নিয়ে ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ দেখেছিলাম ১৯৯৮ তে। তখন আমি ক্লাস ৮এর ছাত্র।



আমার বড় ভাইয়ের তখন ফ্রান্সে যাবার কথা আমার আম্মার এক আত্মীয়ার বরের ব্যবসা ছিলো ফ্রান্সে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অহনার কীর্তিকলাপ, কিংবা পাগলামি, কিংবা ভালোবাসা

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১

অহনা খুব জ্বালাতন করতো, অর্থাৎ খুব জ্বালাত,
বা বিরক্ত করতো আমাকে, যেমন, হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে
মোবাইলে কল করে বলতো, ‘তুই যে ঘুমিয়েছিস, ঘুমানোর
আগে কি আমার কথা ভেবেছিস? বল, কতবার ভেবেছিস?
তাহলে একবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলা নিয়ে আমার সামান্য কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৮

গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে আমার মন ভালো নেই

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×