২০১৬ সাল থেকে মোটরবাইক চালাই। স্পষ্ট মনে আছে, তখনকার দিনে প্রতি লিটার অকটেনের দাম ছিল ৮৯ টাকা। সেই থেকে আজ পর্যন্ত খুব কাছে থেকে দেখছি—কীভাবে ধাপে ধাপে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। আর প্রতিবার তেলের মিটারে দামের অংকটা যখন বাড়ে, তখন কেবল বাইকের ট্যাঙ্ক নয়, কেঁপে ওঠে সাধারণ মধ্যবিত্তের মাসের বাজেটও।
সম্প্রতি লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবরটি শোনার পরই রংপুরের মেসার্স সুরমা ফিলিং স্টেশন কিংবা যশোরের তোফাজ্জল হোসাইন পেট্রলপাম্পের দৃশ্যগুলো যেন আমাদের পুরো দেশেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে সামনে এলো। রাত ১২টায় নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে পুরোনো দামে কয়েক লিটার তেল পাওয়ার জন্য কিলোমিটারজুড়ে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি, হর্ন আর ক্ষুব্ধ মানুষের ভিড়।
‘দুই-চার টাকা বাড়াইলেও হইতো, তাই বলে লিটারে ২০ টাকা!’—রংপুরের পাম্পে দাঁড়িয়ে এক চালকের এই আকুল ক্ষোভ কিংবা ‘মানুষের কি সবকিছু সয়ে গেল নাকি!’—আরেক বাইকারের এমন প্রশ্ন আসলে আজ কোটি সাধারণ মানুষের মনের কথা। রাত ১২টা বাজার সাথে সাথে পাম্পের মিটারে যখন বর্ধিত মূল্য ফুটে উঠল, তখন পাম্পগুলো মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার মেঘ জমল, তা এত সহজে মিলিয়ে যাওয়ার নয়। পাম্পে থাকা পুরোনো স্টক রাতের আঁধারেই বেশি দামে বিক্রি হয়ে যাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নিয়ে নাগরিক প্রশ্নগুলোও থেকে গেল অলিখিত।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কিন্তু কেবল পেট্রল বা অকটেনের লিটারে সীমাবদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুদূরপ্রসারী ‘ডমিনো ইফেক্ট’ তৈরি করে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সাথে সরাসরি জড়িয়ে আছে গণপরিবহনের ভাড়া, কৃষকের সেচ খরচ, কারখানার উৎপাদন এবং বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম। তেল আমদানির চেইন থেকে শুরু করে আপনার সকালের কাঁচাবাজারের থলে পর্যন্ত—সবকিছুর ওপরই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে। তেলের দাম বাড়লে প্রসেসিং ও পরিবহন খরচ বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচের চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হয় শেষ ভোক্তা হিসেবে আমাদেরকেই। চাল-ডাল-সবজির দাম তো বাড়বেই, পাশাপাশি এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়লে বিদ্যুতের দামও নতুন করে ধাক্কা দেবে নাগরিক জীবনে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয় বা বৃদ্ধির ঘোষণার সাথে সাথে বাজারে একদফা মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। আর তার ওপর যখন লিটারে ২০ টাকার এমন একতরফা আঘাত আসে, তখন সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ এবং বেসরকারি চাকরিজীবীরা। নির্দিষ্ট আয়ে সংসার চালানো যাদের জন্য এমনিতেই প্রতিদিনের লড়াই, তাদের জন্য বাড়তি প্রতিটি খরচ যেন নতুন এক দেউলিয়াত্বের সংকেত। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, কিন্তু বেঁচে থাকার ন্যূনতম পণ্যের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।
প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি আজ সরাসরি আঘাত করছে নাগরিকের পকেটে, তাদের মানসিক শান্তিতে। কোনো আগাম বার্তা বা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া একলাফে এত বিশাল অংকের দাম বাড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। দিনশেষে সাধারণ মানুষের জীবনধারণ করা আজ সত্যিই বড্ড কঠিন ও চ্যালেন্জিং হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সাধারণ মানুষের চাপা দীর্ঘশ্বাসগুলোর উত্তর শেষপর্যন্ত দেবে কে?
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





