somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এম ডি মুসা
জ্ঞানী লোকের কাছে প্রতিনিয়ত শিখছি। অজ্ঞের থেকে শেখার কিছু নেই। সম্মান যতটুকু দিবেন ততটুকু ফেরত পাবেন।

প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিকতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট।

০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিকতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট
ভূমিকাঃ

শিক্ষা হলো মানবজীবনের আলো, যা মানুষের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় এবং তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষার প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য কিছুটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সার্টিফিকেট সর্বস্ব পড়াশোনা এবং বাহ্যিক প্রদর্শনী বা লোকদেখানো অর্জনের পেছনে ছোটার প্রবণতা আজ প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ শিক্ষার আসল ভিত্তি নিহিত রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক দক্ষতার ওপর। রিডিং পড়ার ক্ষমতা, বানান শুদ্ধতা, অনুধাবন শক্তি এবং নৈতিকতা অর্জনের মাধ্যমেই শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হয়।

শিক্ষার প্রাথমিক অর্জন ও রিডিং দক্ষতাঃ

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুর প্রধান অর্জন হলো রিডিং পড়ার ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন করা। শিক্ষার প্রথম জ্ঞান শুরু হয় বর্ণমালার সঠিক জ্ঞান ও এর লিখিত রূপ অনুধাবনের মধ্য দিয়ে। এর পরপরই আসে শুদ্ধভাবে রিডিং পড়ার এবং নির্ভুল বানান লেখার ক্ষমতা। এই দক্ষতাগুলো না থাকলে শিক্ষার উচ্চ স্তরে গিয়েও হোঁচট খেতে হয়। কারণ, রিডিং পড়ার মূল উদ্দেশ্য কেবল অক্ষরের উচ্চারণ নয়, বরং পঠিত বিষয় থেকে জ্ঞান অনুধাবন করা এবং তা থেকে বাস্তব জীবনের শিক্ষা গ্রহণ করা। এছাড়া পড়া মনে রাখার কৌশল আয়ত্ত করা এবং চারিত্রিক নৈতিকতার জ্ঞান অর্জন করা শিক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত। এই মৌলিক বিষয়গুলোর ঘাটতি থাকলে সেই শিক্ষাকে কোনোভাবেই পরিপূর্ণ বলা চলে না, বরং তা এক প্রকার ব্যর্থতাই বটে।

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁকিবাজিঃ

আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক ধরনের নীরব ফাঁকিবাজি চলে আসছে। এর করুণ পরিণতিতে দেখা যায়, ক্লাসের হাতে গোনা কিছু শিক্ষার্থী, যাদের বাসায় পড়াশোনা করার পরিবেশ রয়েছে বা যাদের অভিভাবক কিছুটা শিক্ষিত, কেবল তারাই এগিয়ে থাকে এবং রোল এক থেকে দশের মধ্যে স্থান পায়। অথচ বাকি বিশাল একটি অংশ বাংলা রিডিং পর্যন্ত ঠিকমতো পড়তে পারে না। তারা কোনো রকমে নামেমাত্র ক্লাসে ওপরের শ্রেণিতে ওঠে এবং কোনোভাবে পাস করে বের হয়ে যায়। কিন্তু একসময় জীবনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তারা চরম হতাশায় ভোগে এবং শিক্ষা থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ে।
শিক্ষাঙ্গনে ফাঁকিবাজি মানেই জাতির সাথে দায়িত্ব পালন করছেন না।

প্রতারণাঃ

শ্রেণিকক্ষে বা শিক্ষাঙ্গনে ফাঁকি দেওয়া মানে কেবল দায়িত্ব অবহেলা করা নয়, এটি সরাসরি গোটা জাতির সাথে বেইমানি করা এবং সমস্ত শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। দেশের প্রতিটি শিক্ষকের বেতনের টাকা আসে জনগণের কষ্টের আয়ে পরিশোধিত রাজস্ব থেকে। প্রশ্ন জাগে, সরকার শিক্ষকদের এই বেতন কেন দেয়? শিক্ষকদের দায়িত্ব কি শুধু নামেমাত্র উপস্থিতি রক্ষা করা, নাকি কোমলমতি শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা? তারা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন, অথচ জনগণের কাছে নিজেদের কাজের কতটুকু দায় তারা পালন করছেন?

বইয়ের নৈতিক শিক্ষা বনাম বাস্তবের নির্মম বৈপরীত্যঃ
শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট লুকিয়ে আছে আমাদের পাঠ্যপুস্তক আর বাস্তব জীবনের বিশাল দূরত্বের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ে একজন শিশুকে শেখানো হয় নীতিশিক্ষা। যেমন বলা হয় সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি, আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে। আরও পড়ানো হয় আমাদের ছোট গাঁয় ছোট ছোট ঘর, থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেউ পর। কিন্তু বাস্তব জীবনে কি আমরা এর ছিটেফোটাও দেখতে পাই? আমাদের চারপাশের সমাজ, এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত জনগণও আজ বিশৃঙ্খল, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত। ছোটবেলায় যা শেখানো হয়, বাস্তব জীবনে বড় হয়ে তার কি কোনো প্রতিফলন ঘটে?

প্রকৃত শিক্ষা ও সার্টিফিকেট সর্বস্ব মূর্খতাঃ

প্রশ্ন হলো, বইয়ে এত নৈতিক শিক্ষা শেখার পরও মানুষ যখন বড় হয়ে চাকরি পায়, তখন সে কেন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর হয়ে ওঠে এবং অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়? সে কেন কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেয়? পাঠ্যবই তো কখনো কাউকে দুর্নীতি বা খারাপ কাজ শেখায়নি! তাহলে সে কী শিক্ষা লাভ করল?
যদি কারো অর্জিত শিক্ষা তার বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তবে সে আসলে কিছুই শেখে না। তার ভেতর তো আসল শিক্ষাই নেই। তাকে স্পষ্ট ভাষায় মূর্খ বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যে শিক্ষা মানুষের আচার-ব্যবহারে, সততায় এবং কর্মে ফুটে ওঠে না, সেই শিক্ষা মূল্যহীন।
আপনি যতই সার্টিফিকেট অর্জন করুন না কেন, যদি আপনার ভেতরে প্রকৃত শিক্ষা না থাকে, তবে সেই সার্টিফিকেট কেবল মুখস্থনির্ভর বা পরোক্ষভাবে নকলযুক্ত কাগজ ছাড়া আর কিছু নয়। আপনার আচার-ব্যবহার যদি বই থেকে শেখা প্রতিশ্রুতির সাথে না মেলে, তবে মনে রাখবেন আপনার ভেতরের শিক্ষা মিথ্যা। সে ক্ষেত্রে আপনার সার্টিফিকেট বাতিল এবং মূল্যহীন। আপনার চাকরি বাতিল হিসাবে গণ্য। আপনার অর্জিত সাফল্যের কোনো সার্থকতা নাই। কারণ, আপনি যা শিখেছেন তার প্রতিফলনই হলো প্রকৃত শিক্ষা।


প্রাইভেট পড়ানোর বাণিজ্য বনাম শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্বঃ

আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। স্কুলে নামেমাত্র ক্লাস করিয়ে শিক্ষকদের অনেকেই প্রাইভেট পড়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়েন। যেসব শিক্ষার্থী প্রাইভেট পড়তে পারে বা সামর্থ্য রাখে, কেবল তারাই শিক্ষকের কৃপায় ভালো ফল করে; আর বাকি গরিব বা সাধারণ শিক্ষার্থীরা পেছনে পড়ে থাকে। জনগণের টাকায় বেতন পাওয়ার পরও কেন একজন শিক্ষককে প্রাইভেট পড়িয়ে ভালো ফল করাতে হবে? সরকার কি শিক্ষকদের বেতন দেয় না? যদি সরকারি বেতনই তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়, তবে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে প্রাইভেট বাণিজ্য চালানোর এই প্রবণতা কেন থাকবে? শিক্ষাকার্যক্রমের এই বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ক্লাসেই সমানভাবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব শিক্ষকদের নিতে হবে।

অভিনয় বনাম বাস্তব জীবন বা বাহ্যিক প্রদর্শন বনাম প্রকৃত জ্ঞানঃ

বর্তমান সামাজিক মাধ্যমে বা চারপাশের পরিবেশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেকেই নিজেকে খুব জ্ঞানী বা আদর্শবান হিসেবে জাহির করতে পছন্দ করেন। ঠিক যেমন ক্যামেরার সামনে যারা খুব ভালো অভিনেতা, বাস্তবে তাদের চরিত্র অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও মুখোশধারী হতে পারে। বাহ্যিক চটকদারিতা বা লোক দেখানোর চেষ্টা

মোঃ মুসা গাঙচিল। ঠিকানা শশীভূষণ চরফ্যাশন ভোলা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৯
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লিটারে ২০ টাকার আঘাত, পাম্পের দীর্ঘ সারি এবং মধ্যবিত্তের না-বলা দীর্ঘশ্বাস

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫

২০১৬ সাল থেকে মোটরবাইক চালাই। স্পষ্ট মনে আছে, তখনকার দিনে প্রতি লিটার অকটেনের দাম ছিল ৮৯ টাকা। সেই থেকে আজ পর্যন্ত খুব কাছে থেকে দেখছি—কীভাবে ধাপে ধাপে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

⌛️ সক্রেটিসের আত্মানুসন্ধান

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫



প্রাচীন গ্রিক দর্শনের মহান পুরুষ সক্রেটিসের আত্মানুসন্ধান বা "নিজেকে জানো" তত্ত্বটি মানুষের ভেতরের ঘৃণা, গোঁড়ামি এবং অজ্ঞানতা দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সক্রেটিসের মতে, মানুষের সমস্ত নৈতিক স্খলন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা অঞ্চলে টমটম, অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন চলাচল করে। বেশ মানুষজন পরিবহন সহ মালামালের বস্তাও টানাটানি করতে দেখা যায়। কিন্তু এইগুলোর দেশ হচ্ছে গ্রাম গঞ্জের বাজার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

শিশুর অধিকার রক্ষা অবশ্যই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই কঠিন হয়ে ওঠে, যখন ১৭ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সী কেউ ধর্ষণ বা হত্যার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×