somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ক্ষত ঝেড়ে ফেলে আবার জেগে উঠেছে রামু।

১৫ ই আগস্ট, ২০১৩ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল সমুদ্রতীরবর্তী জেলা কক্সবাজারের রামু ও উখিয়া উপজেলার বৌদ্ধ বসতি। বসত ঘরের পাশাপাশি পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের প্রার্থনাস্থল।

সরকারি উদ্যোগে আবার দাঁড়িয়েছে ওই সব বৌদ্ধ পল্লী। বসত ঘর নির্মাণের পাশাপাশি ধ্বংস হওয়া ১৯টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরও তৈরি হয়েছে আবার।

একই সঙ্গে আস্থার সঙ্কটে ভুগতে থাকা ওই এলাকার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝেও ফিরে আসছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশ্বাস।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা এবং মন্দির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।

“এককথায় নতুন করে জাগছে রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলো।”

নতুন করে নির্মাণ ও সংস্কার করা বিহারগুলো আগামী ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন।

লুঠ হয়ে যাওয়া প্রাচীন ও দুর্লভ বৌদ্ধ মূর্তি না পেলেও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এসেছে দেবতার নতুন প্রতিকৃতি।

টিন ও কাঠের তৈরি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্যশৈলীর বিহারগুলো ধ্বংস হলেও সেখানে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ইট-পাথরের নতুন শৈলীর শক্তিশালী কাঠামোর মন্দির।

দুর্বৃত্তদের আগুনে তিনশ’ বছরেরও বেশি পুরনো রামুর মেরংলোয়া পাড়া কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের দোতলা টিন ও কাঠের মন্দিরটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পুড়ে যায় বুদ্ধের বড় পিতলের মূর্তি, লুট হয় স্বর্ণ, শ্বেত ও মার্বেল পাথরের আড়াই থেকে তিনশ’ দুর্লভ মূর্তি।

পুড়ে যাওয়া মূল মন্দিরের স্থানেই সরকারে দেয়া অর্থে গড়ে উঠেছে নতুন তিনতলা বৌদ্ধ বিহার। সেখানেই নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে বুদ্ধ মূর্তি, তাতেই হচ্ছে পুজো।

পাশে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য ভবনটিও সংস্কার করে নতুন রূপ দেয়া হয়েছে। সেখানে বসানো হয়েছে থাইল্যান্ড থেকে উপহার হিসেবে আসা দুই টন ওজনের শ্বেত পাথরের নতুন বৌদ্ধ মূর্তি।
রামুর উত্তর মিঠাছড়িতে ‘বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে’র শোয়ানো অবস্থায় একশ ফুট দৈর্ঘ্যের বৌদ্ধ মূর্তি সংস্কার, নতুন করে একটি মন্দির ঘর ও তোরণ সংস্কার করে দেয়া হয়েছে।

শ্রীকূল এলাকায় অবস্থিত চারটি বিহারও সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের পর নতুন সাজ নিয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে কারুশৈলীর আলোকে নতুন করে ইট-পাথরে বিহারগুলো তৈরি করা হয়েছে।

নির্মাণ ও তদারককারী সংস্থা সেনবাহিনী এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের শৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বজিত বড়ুয়া নামে একজন স্থপতি পুনর্নির্মিত বিহারগুলোর নকশা করেছেন।

সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের (এসডব্লিউও) সদস্যরা নকশার আলোকে মন্দিরগুলো সংস্কার ও নির্মাণ কাজ করেছেন। এখন চলছে নবনির্মিত মন্দিরগুলো উদ্বোধনের প্রস্তুতি।

এ বিষয়ে এসডব্লিউও, চট্টগ্রামের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামস খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রামু ও উখিয়ায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মোট ১৯টি মন্দির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে।

তিনি জানান, সেপ্টেম্বরের হামলার পরপরই সেনাবাহিনী নিরাপত্তা এবং অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের কাজে নিয়োজিত হয়। পরবর্তীতে গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে এসব কাজ শেষ করা হয়।

তিনি বলেন, বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি মেনেই তাদের নিজস্ব স্থাপত্য শৈলীর আলোকে নতুনভাবে বিহারগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু সংস্কারই নয়, যে মন্দিরে যা প্রয়োজন হয়েছে তা নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে।

সেনা সদস্যরা রামু উপজেলার ১২টি এবং উখিয়ার সাতটি বিহার পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজ শেষ করেছেন। এছাড়া মেরংলোয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ২৬টি বসতঘর নির্মাণ করে দেয় বিজিবি সদস্যরা।
রামুর পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা করা বিহারগুলো হল- মেরংলোয়াপাড়ার রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার, শ্রীকূল এলাকার লালচিং বিহার, জাদিপাড়া আর্যবংশ বৌদ্ধবিহার, উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র, শ্রীকূল অপর্ণচরণ বৌদ্ধবিহার, শ্রীকূল মৈত্রী বৌদ্ধবিহার, একই এলাকার সাদাচিং বিহার, তেরাংঘাটার উচাইসেন বিহার, উখিয়ারঘোনার জেতবন বৌদ্ধবিহার, উত্তর মিঠাইচড়ি বনবিহার, চাকমারকূল এলাকার অজান্তা বৌদ্ধ বিহার ও ফতেখাঁর কূল বিবেকারাম বৌদ্ধ বিহার।

আর উখিয়ায় পশ্চিম মরিচ্যা দীপাংকুর বৌদ্ধ বিহার, পশ্চিম রত্না সুদর্শন বৌদ্ধ বিহার, রেজারকূল সদ্ধর্মবিকাশ বৌদ্ধবিহার, রাজাপালং জাদি বৌদ্ধবিহার, রাজাপালং খয়রাতি বৌদ্ধ বিহার ও জালিয়াপালং এর পাইন্যাশিয়া বৌদ্ধ বিহার নুতন রূপ পেয়েছে।

এছাড়া কক্সবাজার সদর উপজেলার খরুলিয়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ধর্মজ্যোতি বৌদ্ধবিহারও সংস্কার করা হয়েছে।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সীমা বিহারে একটি নতুন ভবন নির্মাণ, পুরাতন ভবনের সংস্কার ও পুরো এলাকার সৌন্দর্য্য বর্ধন করা হয়েছে। এর বাইরে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে নতুন বুদ্ধ মূর্তিও বিভিন্ন বিহারের জন্য পাঠানো হয়েছে।

সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, “সাম্প্রদায়িক হামলায় আমাদের অনেক কিছু গেলেও নতুন করে মন্দির গড়ে উঠেছে- এটাই অনেক প্রাপ্তি। গত বছর সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর প্রশাসন-সেনাবাহিনী সকলেই অনেক করেছে।”

এক বৌদ্ধ যুবকের ফেইসবুক পাতায় কোরআন অবমাননার প্রচার চালিয়ে গত বছর রাতের বেলায় হামলা হয় বৌদ্ধ বসতিতে।
প্রজ্ঞানন্দ বলেন, “আশপাশের মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের যে জায়গাটা ভেঙে গিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটছে।”

রামু এলাকার প্রবীণ ধর্মগুরু এবং শ্রীকূল বিহারের অধ্যক্ষ উ ছেকাচারা মহাস্থবিরের বলেন, নতুন বিহার ভালো লাগছে। তা না হলে তো জীবন পুনর্গঠন করা যাবে না।

‘সকলেই সংস্কার ধর্মের অধীন’ এ বাণী মনে করিয়ে দিয়ে এ ধর্মগুরু বলেন, “সুখ দুঃখ জীবনে থাকবে। তা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।”
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ আগুন আপনাদেরও একদিন গ্রাস করবে।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৩


আজ যারা ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদির ভিত্তিতে ও তাঁর কথিত “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা”, “মুসলিম বিদ্বেষী” সহ নানা মিথ্যা অভিযোগ আর অজুহাতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্বেষের ব্যাপারে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি ও ইতরামি দেখিয়ে বেড়াচ্ছে তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×