একটি মমর্ান্তিক সত্যি ঘটনা...
আমার ছোট চাচার সাথে বন্ধুর মত সম্পর্ক আমার। তিনি আমাকে এই ঘটনাটি বলেন।
আজিমপুরের সাধারন এক ছেলের কথা, আমি তার নাম ভুলে গিয়েছি। বাবা আগেই মারা গিয়েছেন। ব্ৃদ্ধা মা সহ পৈত্রিক দ্বিতল বাড়িতে বসবাস। খুব কম বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। একটি ছোট ফাস্ট ফুডের দোকান দিয়ে চলছিল পরিবারটি। মা বাসায় একা থাকেন, তাই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে ঘরে বউ আনেন। ছেলেটি খুব শান্ত এবং কর্মঠ, বাবা মারা যাবার পর সংসারের হাল ভালভাবেই ধরেছিল। রুটীন করা জীবন ছিল তার। প্রতিদিন সকালে চলে যেত দোকানে, যাবার আগে মায়ের সাথে দেখা করে যেত আর রাত ৯টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরত। সপ্তাহে ৬দিন এইভাবেই শ্রম দিত আর বন্ধের দিন স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও বের হোত অথবা টুকটাক কাজ করত। বিয়ের ২ বছরের মাথায় ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয় তাদের। এইভাবে কেটে যায় কয়েকটি বছর। মেয়েকে নাসর্ারীতে ভতর্ি করায়।
প্রতিদিন সকালে তার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে স্কুলে চলে যায় আর সে নাস্তা শেষ করে দোকানে চলে যায়। মা, স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে খুব সুন্দরভাবেই চলছিল সবকিছু। ছেলেটি সংসারের হাল ধরে ৭/৮ বছরের মাঝে গুছিয়ে ফেলেছে নিরলস পরিশ্রম করে। এর মধ্যে কোনদিন দোকান বন্ধ থাকা দূরে থাক, দেরীতেই কখনো যায়নি। এমনকি কখনো দোকান থেকে আগেও বাসায় চলে আসেনি। যত কষ্টই হোক নিজের পরিবারের জন্য নিরন্তর খেটেছে, একটা দিনের জন্যেও এর ব্যতিক্রম করেনি। এমন শান্ত স্বভাবের জন্য এলাকায় তার সুনাম ছিল খুব।
একদিন দুপুরে হঠাৎ তার শরীর খারাপ লাগছিল। বেশী খারাপ লাগাতে ভাবল আজ বরং বাসায় গিয়ে একটি বিশ্রাম নিই। ৩টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় বলে আসে। দোতলা বাসা তাদের। সিড়ি দিয়ে উঠে প্রথমে মায়ের রুমে দেখে মা ঘুমিয়ে আছে, পাশে তার ছোট মেয়েও ঘুমাচ্ছে। মায়ের ঘুম যাতে না ভাঙে তাই ধীরে আওয়াজ না করে নিজের রুমের দিকে যায়, মনে মনে ভাবে বউকে অবাক করে দিবে, কারন বিয়ের পর এতদিনে কখনোই দুপুরে এভাবে দোকান থেকে চলে আসেনি। চুপেচুপে যখন রুমে ঢুকতে যাবে, তখন শুনতে পেল ভেতর থেকে পুরুষ কন্ঠ। জানালার পর্দা একটু সরিয়ে দেখতে পেল তার স্ত্রী এক লোকের সাথে তাদের বিছানায়। বিশ্বাস করতে পারেনি সে, আবারো তাকালো, যা দেখতে পেল তা এখানে বলার মত না। কিছু বলে নি সে, কোন আওয়াজ ও করলো না, দোকানে চলে গেল। রাতে একই সময়ে ফিরে আসলো বাসায়। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে স্ত্রীকে বললো, 'আজ দুপুরে শরীরটা একটু খারাপ লেগেছিল'। 'কেন, কি হয়েছে? একটা ফোন দিয়ে বাসায় চলে আসতে, ডাক্তার দেখিয়েছ?' 'হ্যা, এখন ঠিক হয়ে গেছে, টেনশন কোর না। তুমি কি করলে সারা দিন?' স্ত্রী বললো, 'আমি? এইতো, বাবুকে নিয়ে স্কুল থেকে এসে রান্না শেষ করলাম, তারপর খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম, তুমি আসার একটু আগে উঠেছি'। 'ও..' আর কিছু বললোনা সে তার স্ত্রীকে, কিছু জিজ্ঞেসও করল না। প্রতিদিনের মত মেয়েকে আদর করে, রাতে ঘুমোতে গেল। তারপর সে একই রুটীন - প্রতিদিন দোকানে যায়, বাসায় ফেরে, স্ত্রী, মা মেয়েকে সময় দেয় একই ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে সবকিছু, স্ত্রীকেও কিছুই বলেনি।
কয়েক দিন পরের কথা, সকালে দোকানে যাবার আগে মায়ের সাথে দেখা করতে যায়। মাকে হঠাৎ করে বলে, 'মা, তোমরা ভাল থেকো'। মায়ের মনটা কেমন জানি করে উঠে। 'কেনরে বাবা, আমরাতো আল্লার রহমতে ভালোই আছি, কি হয়েছে তোর?' 'কিছু না মা, দোকানে যাচ্ছি' একথা বলে চলে যায়। রাতে বাসায় ফেরার পর মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে কিছুক্ষন। তারপর কিছু কাগজপত্র গুছিয়ে রেখে শুয়ে পরে। সকালে প্রতিদিনের মত স্ত্রী আগে ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করতে। পাশে যখন তাকায় দেখে তার স্বামীর নিথর দেহ ফ্যানের সাথে ঝুলছে। টেবিলে একটা চিঠি লিখা। চিঠিটির কথা যতটুকু মনে আছে তা হচ্ছে...
"অামার সাথে তুমি সুখী ছিলে না, তা আমি দেরীতে বুঝেছি। বাসায় ঐদিন দুপুরে এসে অন্য কাউকে তোমার সাথে যে অবস্থায় দেখেছি, কিছু বলার ভাষা নেই, হয়তো তুমি সেভাবেই থাকতে চাও। তাই আমি সরে গেলাম। ড্রয়ারে বিষয়-সম্পত্তির কাগজ তোমার নামে আর মায়ের নামে সমান ভাবে গুছিয়ে রেখেছি, যাতে তুমি না ঠকো আর আমাদের মেয়েকে যাতে ঠিকভাবে মানুষ করতে পারো। ভাল থেকো।
ইতি
---- তোমার হতভাগা স্বামী..."
কোন শ্রদ্ধা একে অপরের প্রতি ভালবাসা তখনি পূর্ণতা লাভ করে যখন তারা একে অপরকে অন্ধের মত ভালবাসতে পারে, যে যেখানেই থাকুক না কেন শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে থাকবে যে তার আমানত পবিত্র আছে। এর চেয়ে প্রশান্তি পৃথিবীতে আর নেই।
নিজের স্বামী বা স্ত্রীকে এইভাবে বিশ্বাস করা মানে হচ্ছে তার প্রতি এক গভীর ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ, তাকে শ্রদ্ধার সবর্োচ্চ স্থান দিয়ে দেয়া। কিন্তু লুকিয়ে, জীবনসঙ্গি/সঙ্গিনীর অগোচরে অন্য কারো সাথে দিনের পর দিন নিজের চরিত্রকে বিসর্জন দিলেন, ভাবলেন সে যেহেতু জানছে না আপনি জিতে গেলেন, না! আপনি জিতে যান নি, আপনি শেষ করে দিলেন আপনার সন্মানের সর্বোচ্চ জায়গাটাকে।
যখন আপনার এই ক্ষনস্থায়ী যৌবন শেষ হয়ে যাবে, পুরনো হয়ে যাবে চেহারা, গতানুগতিক হয়ে যাবেন সবার কাছে (যা কখনোই আপনার নিজের জীবনসঙ্গি/সঙ্গিনীর কাছে লাগতো না), সেদিন পাশে কাউকে পাবেন না, এমনকি যাকে সাথে নিয়ে ধঁোকাবাজি করলেন সেই মানুষটিও আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে, আর একদিন শুনতে পাবেন 'তুই তো ভরসার যোগ্য না।'
প্রত্যেকটা মানুষের কিছু দূর্বলতা আছে আপনারও আছে যা আপনার স্বামী বা স্ত্রী জানে, কিন্তু সে কখনোই তার জন্য আপনাকে ছোট করে দেখবে না, বরং আপনার সকল দূর্বলতাকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা দিয়ে ঢেকে দিবে, আপনি ভূলে যাবেন সেই দূর্বলতার লজ্জার কথা। নিজের আত্বসন্মানবোধ বেড়ে যাবে। এই শক্তি আর কেউ দিতে পারবে না, বাকিরা ক্ষনস্থায়ী প্রশংসাই করতে পারবে আপনাকে পটানোর জন্যে।
এমন বিশ্বাস ভাঙার কষ্ট আল্লাহ কাউকে যেন না দেয়। আত্বহত্যা কখনোই সমাধান নয়, উল্টো পরকালে নিজের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারিত করে ফেলা হয়। আমি তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।
আজ যদি আপনিও এই স্ত্রীর মত হয়ে থাকেন, দয়া করে সরে আসুন, নিজকে সন্মান দিতে শিখুন, নিজের জীবনকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা দিতে জানুন, এমন মূল্যবান সম্পদকে হারাবেন না, এখনো সময় আছে, নষ্ট করে দিবেন না এতগুলা জীবন। যেটা হারাবেন সেটা একবারই পায় মানুষ, আর অসন্মান করবেন না আপনার স্বামী বা স্ত্রীর শ্রদ্ধাবোধকে। এটা মানুষ হত্যা করার চেয়ে কম নয়।
ফিরে আসুন, আপনি পারবেন সবকিছু ঠিক করতে, নিজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি আল্লাহ সবাইকে দিয়েছেন। কারো বিশ্বাসকে খুন করে একজন খুনী হয়ে বেঁচে থাকবেন না, তার আগেই নিজকে সরিয়ে আনুন... আপনি চাইলে পারবেন, আল্লাহ ও আপনাকে সাহায্য করবেন।
যারা ঘটনাটি পড়লেন, ধন্যবাদ। শুধু ঘটনা হিসেবেই এটিকে রেখে দিবেন না দয়া করে।
- ফখরুল আমান ফয়সাল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



