
আপনি কি জানেন, একজন লেখক একটি লেখার স্বপ্ন নিয়ে দিনের পর দিন পেটে কিল মেরে শুয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, লেখকের বউরা এসব ছ্যাবলামি দুচোখে দেখতে পারে না।
লেখকদের ধান্দাল মনে করে মানুষ (বিশেষ করে প্রকাশক ও পত্রিকার জন্যে ফরমায়েশি লেখা প্রত্যাশীরা, কারণ আজ দেবো-কাল দেবো করে করে লেখক তাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে)। অথচ তারা জানে না, একজন লেখকের সঙ্গে তার লেখা কী পরিমাণে ধান্দালি করে। কারণ, ভাষার ব্যাকরণ, কাহিনীর কলকব্জা, উপস্থাপনার কলাকৌশল- এইসব শেখা যায়, চর্চা করা যায়। কিন্তু লেখাটা শিখলে কিছুই হয় না। এটা আসতে হয়। সে আবার সব সময় আসে না। লেখাটা যদি না আসে, ভেতরে প্রেরণা তৈরি না হয়, তবে আপনি যতই কান্নাকাটি করেন, মারধোর বা বকাবকি করেন- কী লাভ! ইচ্ছাটা চাগিয়ে না উঠলে একটা জানা গল্পের দুটা লাইন, কবিতার একটা মাত্র ছত্র, অনুবাদের দুটি শব্দ, এমনকি নেট ঘেঁটে কপি-পেস্ট করার ধৈর্যও আপনার হবে না।
নির্দিষ্ট একটা লেখা কখনো মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়, ধরা দেয় না। হয়তো এর ফাঁকে আরো অনেক লেখা তৈরি হয়ে যায়, কিন্তু ওই লেখাটা আর হয় না- ধরতে গেলেই ঘাসফরিঙের মতো উড়াল দেয়।
লিখনি কাজটা বড় কষ্টের। সাধারণ মানুষকে টেনশন পোহাতে হয় একমাত্র উপার্জন নিয়ে । কিন্তু এই টেনশনটাই লেখকের লেখার জন্যে সবচে’ বড় বাধা। কারণ লেখককে সংগ্রাম করতে হয় তার লেখা নিয়ে। একজন ন’মাসের প্রেগন্যান্ট নারীকে দুই কিলো দূরে নিয়মিত অফিস করতে হলে, তার কেমন যাতনা হবে ? একজন লেখককে লেখা প্রসবের জন্যে তেমন অসহনীয় যাতনা নিয়ে দিন কাটাতে হয়, আবার আঁতুরঘরে শুয়ে শুয়ে রোজগারের চিন্তা করতে হয়।
না, লেখক অর্থের কাঙাল না, ভালোবাসাও খয়রাত চায় না; তার শুধু দরকার নিরুপদ্রব জীবন। লেখক কাঙাল হতে পারে কেবল একটু স্বীকৃতির জন্যে। এ সময়েই লেখকসত্তাটা খানিক আপসকামী হয়ে ওঠে এবং তার ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে দ্বৈরথে জড়িয়ে পড়ে।
পরিবার ও প্রতিবেশ ম্যানেজ করতে গিয়েই একজন লেখকের ওপর হতাশা নেমে আসে গাঢ় অন্ধকারের মতো। এখনকার সব লেখাতেই তাই হতাশার ছায়া থাকে। এবং এ কারণেই নোবেল পাওয়ার মতো লেখক তৈরি হয় না এ সমাজে। এখানেই রবি আর কাজীর ফারাক। এ যুগে ধনী হওয়া ছাড়া লেখকের টিকে থাকা মুশকিল। গরিব লেখক মরে যায় অকালে। মধ্যবিত্ত লেখক আধখানা সম্মাননা বগলে চেপে ধুঁকতে থাকে আজীবন।
কবি জসীমুদ্দীনকে নৌকায় চড়িয়ে নদীর বুক বরাবর নিয়ে বলা হলো, এখনই দুটি কবিতা লিখে দিন, নইলে নদীতে ফেলে দিয়ে নৌকা নিয়ে চলে যাবো। পেরেছিলেন কি না জানা নেই। তবে লেখকের থেকে লেখা পেতে চাইলে তাকে হৃদ্যতাপূর্ণ চাপ ও আন্তরিকতায় ভরপুর প্রেরণা দিন- এটা বেশ কাজে লাগে। নয়তো লেখকের মন খারাপ হলে দু-চার লাইন কবিতা বেরুলেও বেরুতে পারে, কিন্তু আপনার লেখাটা আর হবে না।
সত্যি বলতে কি, লিখতে কিন্তু তত ভালো লাগে না। লেখাটা একটা বোঝার মতো চেপে থাকে। সেটাকে ঝেড়ে নামাতে পারলে ফ্রেশ লাগে মাথাটা। লেখকের যদি ভালো লাগার মতো কিছু থেকে থাকে, সেটা পড়া। পড়া’তেই লেখক সবচে’ বেশি সুখ খুঁজে পান। আর নিজের প্রকাশিত লেখাটা পড়তে গিয়ে নিষিদ্ধ প্রণয়ের আনন্দ হয় তার।
সহানুভূতি ও সহমর্মিতা পেতে লেখকমাত্রই ঘৃণা করেন। একজন লেখকের মন সবচে’ স্বাধীনচেতা মন। আর যে যা-ই বলুক, লেখাটাই হলো তার বিশ্বাসের অক্ষরীয় আকার। লেখক আর কিছু চায় না, শুধু বাঁচতে চায়; মরতে ভয় পায়- যদিও অসহনীয় কষ্টে প্রায়ই সে মরণ কামনার কথা বলে থাকে।
তাই লেখককে বাঁচতে দিন, বেঁচে থাকার প্রেরণা দিন। জানেন তো, লেখক মরে যাওয়া মানেই পৃথিবীটা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া। সেদিনই প্রলয় নেমে আসে ধরায়। এ কারণেই মহাময় প্রভু কেয়ামতের আগে হরফ উঠিয়ে নেবেন, শূন্য হয়ে যাবে কোরআন। তারপর যবনিকা হয়ে যাবে বিশ্বের...
এসব আমি একটু আধটু বুঝি। মাঝেমধ্যে তাদের কষ্ট আমার মধ্যেও সংক্রামিত হয়। তাই কোনো লেখকের সঙ্গে দেখা হলেই, আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসতে চায়- আহা, লেখক বেচারা !

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৫:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



