
জনৈক প্রকাশকের দেয়া একটি বইয়ের কিছু অংশ অনুবাদ করার চেষ্টা করছি । নারী সম্পর্কিত বই । সমস্যা হলো, যতোটুকু অনুবাদ করতে হবে, প্রকাশক মহোদয় বইটির ঠিক ততোটুকুই ফটোকপি করে মেইল করেছেন । বইয়ের নামটি টপ-ফুটার কোথাও লেখা নেই । আমার তাতে বয়েই গেছে । আমার প্রাপ্ত অংশে কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে একটা অধ্যায় আছে । নানান যুক্তি প্রমাণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নারীদের চাকরি করার প্রয়োজন নেই । চাকরির থেকে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে নারীকে । তিনি লিখেছেন—
“উপার্জনের জন্যে নারীদের কর্মতৎপরতা জায়েয প্রমাণ করার অনেকে বলে থাকেন— এ যুগে জীবন-জীবিকার প্রয়োজন এতোটা বেড়ে গেছে যে, পুরুষ একা উপার্জন করে কুলিয়ে উঠতে পারে না । তাই নারীকেও উপার্জনের লড়াইয়ে পুরুষের সহযোগী হতে হয় । প্রয়োজনটা এখন এতো বেশি যে, নারী-পুরুষের সম্মিলিত চেষ্টা-মেহনত ছাড়া কোনো পরিবারের জীবিকার প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হয় না ।”
কর্মজীবী নারীদের পক্ষে ‘অনেকে’র এই যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে লেখক বইতে মোটের ওপর ৫ টি যুক্তি তুলে ধরেছেন । এবং একটি জরিপও সামনে এনেছেন । সেই জারিপের কোনো রেফারেন্স তিনি দেন নি । আমরা লেখকের যুক্তিগুলো লক্ষ্য করি—
“এক. বর্তমান সময়ে প্রত্যেক ব্যক্তির সামনে পশ্চিমা জীবনের মানদণ্ড হাজির আছে । জীবনকে সেই মানে উত্তীর্ণ করার জন্যে মানুষ অস্থির ও ব্যাকুল । তাই তারা মনে করে, নারীর কাছে অবশ্যই কোনো জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম থাকা উচিত । কিন্তু তাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, পাশ্চাত্যে কাজ করার উপযুক্ত সব নারীই কিন্তু উপার্জনের অভীপ্সায় ছুটছে না। বেশির থেকে বেশি ৩০ বা ৪০ শতাংশ নারীর কাছে জীবিকা উপার্জনের কোনো মাধ্যম রয়েছে । নারীদের অধিকাংশই পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে নগণ্য ও নিম্নমানের টাইপের কাজ করতে বাধ্য হয় এবং যে বিনিময় পায়, তা দিয়ে সে পরিবারের ভরণ পোষণে খুব একটা সহায়তা করতে পারে না । প্রশ্ন হলো, পাশ্চাত্যে কি কেবল সেই সকল পরিবারের প্রয়োজনই পূরণ হয়, যাদের নারীরা বেশি পরিমাণে উপার্জন করে থাকে? আর বাকি যে-সব পরিবারের নারীরা উপার্জনের জন্যে কোনো পন্থা খুঁজে পায় নি, তাদের পরিবার কি কঠিন সংকটে নিপতিত হয়? বাস্তব কথা হলো, এই যুগেও এটা কোনো স্বত:সিদ্ধ নিয়মে পরিণত হয় নি যে, নারী উপার্জনের ময়দানে নেমে এলেই কোনো পরিবারের প্রয়োজন আর বাকি থাকবে না, তার মাধ্যমেই কেবল পরিবারের প্রয়োজন মিটতে পারে।

দুই. এ যুগে প্রয়োজনের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই । কেননা, তালিকা করতে গেলে তা এতো দীর্ঘ হয়ে যাবে যে, তাতে বেদরকারী অনেক আসবাবপত্র এবং বিলাসসামগ্রীও ঢুকে পড়বে। হতে পারে তারপরও এই তালিকা তৈরি শেষ হবে না এবং প্রতিদিন তাতে নিত্যনতুন বিষয়াবলি যোগ হতেই থাকবে । মানুষ ক্রমবর্ধমান একটি কাল্পনিক তালিকার আসবাব-সামগ্রী জোগাড় করতে রাতদিন বেহুঁশের মতো ছুটতে থাকে । এরপরও বহু প্রয়োজন পড়ে থাকে, যা পূরণ করা সম্ভব হয় না । যদি কোনোমতে পূরণ হয়েও যায়, তবু দিনকে দিন বদলে যাওয়া ফ্যাশন ও নিত্যনতুন পণ্যের আবিষ্কার তাকে শান্ত ও স্থির হয়ে বসার ফুরসত দেয় না ।
তিন. বর্তমান যুগ উপার্জনের প্রতিযোগিতাকে এতোটা তীব্রতর করে তুলেছে যে, মানুষের কাছে লাখো-কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স থাকুক, কিংবা কারুনের সম্পদ ভাণ্ডার তার হাতে এসে যাক, তবু তার জীবিকার ক্ষুধা কমবে না; বরং সে ‘আরও চাই, আরও চাই’ স্লোগান তুলতে থাকবে । এই ক্ষুধা মানে অতৃপ্তি এবং একটা রোগ; যার নিরাময় কিছুতেই এ হতে পারে না যে, নারীও উপার্জনের লড়াইয়ে মনপ্রাণ উজাড় করে ঝাঁপিয়ে পড়বে । বরং নিরাময় হতে পারে এভাবে যে, এই পৃথিবী ও এখানকার আসবাব-সামগ্রী সম্পর্কে মানুষ তার চিন্তা বদলে ফেলবে এবং সে প্রতিনিয়ত লোভ ও লিপ্সার নরক থেকে বের হতে চেষ্টা করবে । যতদিন এই চিন্তাধারার পরিবর্তন না হবে, ততদিন পুরুষের সঙ্গে কেবল পরিবারের নারী-স্ত্রী নয় বরং তাদের শিশু-সন্তানরাও যদি শামিল হয়, তবু সে-ক্ষুধা কমবে না। রোগের নিরাময় হবে না ।
চার. জীবিকার জন্যে নারীর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের আয়-উন্নতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি ঘটে বটে, কিন্তু ঘরের প্রতি মনোযোগ দেয়ার স্বাভাবিক ফুরসত তখন আর সে পায় না । তা ছাড়া এটা একটা বাস্তব সত্য যে, নারী ঘরে থাকলে ঘরের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং নারী যদি পরিবারের খরচের প্রতি নজর না দেয় তাহলে ঘরের খরচসহ অন্যান্য বিষয়াবলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলশ্রুতিতে তার আয়ের দ্বারা যে লাভ হওয়ার কথা ছিলো, তা খুব কমই ধোপে টেকে।

পাঁচ. নারী উপার্জনের তৎপরতায় শামিল হওয়ার কারণে ঘরের শান্তি হারাম হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মতানৈক্য প্রকাশ্যে চলে আসে এবং সঠিক প্রতিপালনে বিঘ্ন ঘটে। কেননা, সন্তানের যত্ন নেয়ার অভাব কিছুতেই নারী ছাড়া ঘুঁচতে পারে না । পশ্চিমা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এটাই বলে যে, শুধু নারী পরিবারের বাইরে থাকার কারণে সমগ্র পারিবারিক রীতিনীতি সব তছনছ হয়ে যায় এবং ঘরের অবস্থা হয়ে যায় একটা সরাইখানার মতো । যেখানে কেবল রেস্টুরেন্টের মতো খাওয়া ও হোটেলের মতো ঘুমানোর প্রয়োজন সম্পন্ন হয় । প্রশ্ন হলো, নারীর আয়-উপার্জন কি এতোটাই মূল্যবান যে, এ জন্যে সে এবং পুরো পরিবারকে এত বড় ক্ষতি বরদাশত করে নিতে হবে ?”
লেখক সবশেষে যে জরিপ ও ফলাফল তুলে ধরেছেন, তা যদিও তিনি রেফারেন্সসহ উল্লেখ করেন নি, তবে আমার মনে হয়, এ জাতীয় যে-কোনো জরিপরে ফলাফল এর ব্যতিক্রম হবে না । তিনি লিখেছেন—
“ম্যানহাটন চয়েজ ব্যাংক একটি সাধারণ হিসাব করে দেখেছে যে, একটি ঘরে নারীরা যে পরিমাণ কাজ করে, তা আঞ্জাম দেয়ার জন্যে সপ্তাহে ১৬০ ডলার কিংবা বার্ষিক ৮৩২০ ডলার মাইনে দিয়ে কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে। এর বিপরীতে নারী যদি ঘর ছেড়ে বাইরে কাজ করে, তাহলে সে তার কর্মস্থল থেকে এই অর্থের সর্বোচ্চ ৩২ ভাগেরও কম উপার্জন করতে পারে । তদুপরি এর ফলে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা কিছুতেই ডলার দিয়ে উসুল করা সম্ভব নয় ।”
লেখকের এমন দুর্বার যুক্তি পড়ার পড়ে প্রথমে তাকে বিশাল বড়মাপের যুক্তিবিদ মনে হওয়াই স্বাভাবিক । তারপর আবার পড়া গেলো এবং অনুবাদ করতে করতে যে-সব প্রশ্ন সামনে এসেছে তা-ও লিখে ফেলা সমীচীন মনে হলো ।

প্রথমত : লেখক মূলত প্রথমোক্ত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এতোগুলো যুক্তি পেশ করেছেন । কথা হলো, নারীকে কি কেবল পরিবারের উপার্জনের তাগিদেই কর্মজীবী হতে হয়? যদি হয়ও সেটা তবে পশ্চিমা সমাজের প্রয়োজন এবং আমাদের সমাজের প্রয়োজন কি সমান? আমাদের সমাজের পুরুষদের তো কেবল ঘরের অভাব ঘোচানোর জন্যে ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিতে হয় এবং দেশে থেকে তার উপোসী স্ত্রীকে স্বামীর দায়-দেনা পরিশোধ করতে হয় । এই প্রয়োজন কি কমকিছু? পশ্চিমা দেশের অবস্থা অবশ্যই এর ব্যতিক্রম ।
দ্বিতীয়ত : আমাদের দেশের কর্মজীবী নারীদের বিশাল অংশ যুগের ক্ষুধা নয়, বরং পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্যেই চাকরি করতে হয় । তাদের হাতেও হয়তো একটা কাল্পনিক তালিকা আছে, কিন্তু সে-তালিকায় বাথটাব, এসি, গাড়ির চাকা, মুভিনপিক আইসক্রিম, স্ট্রবেরি জাতীয় সামগ্রী দূর-অস্ত কি বাত, বরং মুদির দোকানির সাথে তাদের খিটিমিটি বাঁধে, কেনো তিনি পাঁচ টাকার লবন, আধাকেজি চাল, দুইটাকার কাঁচামরিচ, ছয় টাকার রসুন দিতে রাজি হন না । তারা গরুর গোশতের দোকানে গিয়ে ‘ঝাঁটি’ কিনে রসনা পুরায় । তাদের ফ্যাশনের অলঙ্কার রোগ-ব্যামোতে বন্ধক রাখা হয় মহাজন কর্মকারের সুদের বিনিময়ে । তাদের শিশু-সন্তানরা এই জন্যে অপুষ্টিতে ভোগে যে, কেনো এখন ইটভাঙার মেশিন তৈরি হলো । আমাদের এই নারীরা মনে করে, তারা ঘরের বাইরে থাকলেই বরং পরিবারের অর্থ সাশ্রয় হবে । কেননা, যদি মালিকের ঘরের পান্তা বেঁচে যায়, তবে আজ দুপুরে ছেলেটাকে আর অনাহারী থাকতে হবে না ।
তৃতীয়ত : ঘরের শান্তি বিষয়টা আসলে আমাদের গরিব কর্মজীবী নারীর কাছে ঈশপের গল্পের মতো মধুর এবং বাংলা সিনেমার মতো রোমান্টিক স্বপ্ন । আমাদের এই দেশে, কিংবা আমাদের এই শহরে কত নারীকে যে শুধু স্বামীর লাথি থেকে পালাতে গিয়ে বারবণিতা হতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা আছে? যে দেশে ২০ লাখের অধিক পরিবারের জন্যে মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই, রেলস্টেশন যাদের কাছে আলীশান মহলের মতো, তাদের কাছে ‘সরাইখানা’ শব্দটা যে কত আজনবি রূপকথা, সে-কথা কী করে বোঝাবো জনাব । বর্তমান সময়ে একটা ‘নারী বিষয়ক’ জরিপের হিসাব-নিকাশ করতে যে অর্থ খরচ হয়, তাতে শ’খানে গরিব পরিবারের একমাস দুবেলা অন্যের ব্যবস্থা হয়ে যায় ।

চতুর্থত : ধরে নিলাম, আদতেই পৃথিবীর কোনো পরিবারই নারীকে উপার্জনের তাগিদে ছুটতে হবে—তেমন অভাবী নয় । তাহলেও কি নারীর কর্মস্থলে যাওয়ার গত্যন্তর আছে? যদি পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ হয় নারী, তাহলে পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখার জন্যেই, কিংবা নারীর নিরাপত্তার জন্যেই তো পৃথিবীর সবধরনের কর্মস্থলের অর্ধেক সদস্য নারী হওয়া উচিত । যদি ‘কর্মস্থলের অর্ধেক সদস্য নারী’ শুনতে বেশি মনে হয়, তবে তারও অর্ধেক ধরে নিন, কিংবা তারও অর্ধেক—আদৌ না থেকে উপায় নেই— চাই তা উপার্জনের তাগিদে হোক, কিংবা তাগিদ ছাড়াই তার উপার্জন হয়ে যাক । নারী যেহেতু মানুষ, সুতরাং সে অপরাধী হবে এবং নারীকে গ্রেপ্তারে, বন্দিখানায় রাখতে, ওকালতিতে নারীর প্রয়োজন হবে । নারীর প্রয়োজনীয় পোশাক-আশাক কিনতে নারীবান্ধব মার্কেটের প্রয়োজন হবে । নারীকে শেখাতে নারী শিক্ষকের প্রয়োজন এড়ানো যাবে না । নারীর চিকিৎসায় নারীকে রাখতে হবে । এভাবে সবক্ষেত্রেই হিসাব কষে নেয়া সহজে । যদি এই প্রয়োজনকে অস্বীকার করা হয়, তাহলে কি সমাজ সুন্দর হবে?
সন্দেহ নেই, নারীবাদের ধামাকা দেখিয়ে তথাকথিত ‘সভ্য’ পুরুষেরা নারীকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে এবং কর্মের ধোঁয়ার আড়ালে অকর্মের ফায়দা হাসিল করে নিচ্ছে । এগুলো নারীরা সবসময় বোঝে না, আবার লোভ-মোহ-খ্যাতি-তৃষ্ণা নারীকে সবসময় বুঝতেও দেয় না । তাই বলে কর্মজীবী নারীর প্রয়োজন উড়িয়ে দিয়ে নারীমুক্ত পরিচ্ছন্ন আঙিনা কামনা করা বোকামি হবে । ঘরের প্রয়োজনে নারী বাইরে যাওয়া আর বাইরের প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া নিশ্চয়ই এক নয় । ফরাসি চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ (Auguste comte ১৭৯৮-১৮৫৭) এ সম্পর্কে একটি চমৎকার আইডিয়া দিয়েছেন । তিনি বলেছেন— “নারীকে বাড়িতে রাখার জন্যে তার খোরপোশসহ যাবতীয় ব্যবস্থা সমাজের লোকদের করা উচিত ।”
সবিশেষ— বইটির নাম জানার জন্যে প্রকাশক মহোদয়কে ফোন করেছিলাম । তিনি দুটি বইয়ের কথা বলেছেন । একটির নাম তার জানা আছে, আরেকটি ভুলে গেছেন । লেখকের নাম নিশ্চয় এখন স্মরণ করতে পারবেন না । পরে জানতে পারলে এডিট করে নোটের শেষে যুক্ত করে দেয়ার আশা আছে ।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




