- স্যার, আরেকটা কম্বল নেওয়া যাবে ?
- আরেকটা কম্বল মানে ?
- না, মানে, আমার দাদীর জন্য আরেকটা কম্বল কি দেওয়া যায় ?
- মানুষ একটা পায় না, আর এই হালা আইছে দুইটা কম্বল নিতে!!! যা ফুট এখান থেকে ।
কলিম শেখের অর্ডারে আশেপাশে থাকা দুই সাঙ্গ শরীফকে ধাক্কা দিয়ে লাইন থেকে বের করে দিলো । শরীফ ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছে । তার হাঁটুটাও কেটে গেছে । ভালোই ছুঁলে গেছে, রক্ত পড়ছে সেখান থেকে । ধাক্কাটা খেয়ে নয়, রক্ত দেখে চোখে পানি চলে এলো ওর । কি দোষ ছিল ওর ? একটা কম্বলই তো বেশি চেয়েছে, তাই না !!
বাবা নেই শরীফের । দুই বছর আগে, বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে আসি বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর ফিরে আসেনি কোনদিন । দাদাও ছেলের শোক সহ্য করতে না পেরে চলে গেছেন নিষ্ঠুর এই দুনিয়া ছেড়ে । বাবার মৃত্যু শরীফের মা ঠিকভাবে নিতে পারেননি । সেদিন থেকে মা-ও শয্যাশায়ী । ডাক্তার দেখানো হয়েছে অনেক । প্যারালাইজড হয়ে গেছেন তিনি । এখন সংসারের পুরো হালটুকু তারেকের ঘাড়েই । তারেক শরীফের বড় ভাই । এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পেরেছে তারেক, বাবার মৃত্যু পর্বতসমান দায়িত্ব এনে দিয়েছে তার ঘাড়ে । অতটুকুন ছেলেটা দিন-রাত এক করেই মাঠে কাজ করে । শরীফ ক্লাশ থ্রি তে পড়ে । সেও অবশ্য বসে থাকে না । এলাকার ছেলেগুলোর সাথে ব্যাপারী পাড়ায় গিয়ে বোতল কুড়ায় । সেই বোতল বিক্রি করে প্রতিদিন ২০-৩০ টাকার মত আয় সেও করে ।
কলিম শেখ শহরেই থাকে । এই অজপাড়া গাঁয়ে তার পা ঠিক নির্বাচনের আগ মুহূর্তেই পড়ে । যেই লোকটার মুখ দেখাই যায় না, সেই লোকটাই কিনা নির্বাচনের আগে জনদরদী হয়ে উঠেন হঠাৎ করেই । সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া, কম্বল-শীতকাপড় দান, এমনকি টাকা-পয়সা দিয়েও সাহায্য করে থাকেন এলাকার মানুষদের । তবে সবক্ষেত্রেই যেন প্রচার ঠিক হয়, সেটাও খেয়াল রাখেন ।
চারিদিকে ম্যালা মানুষ । কম্বল নেওয়ার লাইন দুইটা পড়ছে । পুরুষ মানুষগুলা এক লাইনে দাড়াইছে আর মহিলা মানুষগুলা এক লাইনে । শরীফ এই কম্বল দানের খবর আগের দিনই পাইছিল । তাই তো সে সকাল সকাল এসেই লাইনে দাঁড়াইয়ে পড়ছিল । মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাই শরীফ খেয়াল করলো, চারিদিকে ম্যালা মানুষ ক্যামেরা নিয়ে দৌড়াইতেছে । অনেক নাকি টিভির লোক আইছে এখানে । এমনকি পেপারের লোকও । শরীফকে ধাক্কা দেওয়ার ব্যাপারটা যেন কোন টিভি-পেপার কভারেজ না পায়, সে ব্যাপারটা খেয়াল রেখেই তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে ।
শরীফ উঠে দাড়ায় । বাড়ি যাবে এখন সে । আচ্ছা, এখন তাইলে এই একটা কম্বল কাকে দেবে সে ? আম্মাকে নাকি দাদীকে ? ভাবতে ভাবতেই বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সে । গরীবের ঘরে এটা একটা সমস্যা !! এখানে সহসা নতুন কোন জিনিস আসে না আর আসলে সেটা নিয়ে ভাগাভাগি অনেক অশান্তি সৃষ্টি করে । যাই হোক, পায়ে অনেক ব্যাথা করছে শরীফের । সে একরকম খোঁড়াতে খোঁড়াতেই ফিরতি পথে হাঁটা ধরলো । খালি ফেরার সময় একবার পিছনে ফিরেছিল সে, কলিম শেখ বারবার হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দিচ্ছে ।
আজকাল এরকম দানের ব্যাপার তো আসলেই অনেকটা দেখানোর ব্যাপার !! যে যতটা দেখাতে পারে, তারই তো বাজিমাত হয়, তাই না ?
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



