বর্তমান সময়ে অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাপড়ের একটি ব্র্যান্ড "আড়ং" । দেশীয় একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিদেশী অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সমানে পাল্লা দেওয়ার জন্য এরা প্রথম থেকেই বিদেশী ব্র্যান্ড এর মত ভং ধরে রেখেছে । তাই তো এই ব্র্যান্ড এর কাপড়ের মূল্যও প্রায় আকাশছোঁয়া । দামের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে আলোচিত হওয়া এই ব্র্যান্ড নতুন ভাবে আলোচনায় এসেছে ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য ও অপমানিত হওয়ার কারণে ।
ঘটনাটি প্রায় ২/৩ দিনের আগের । যারা জানে না, তাদের জন্য বিস্তারিত ঘটনা জানাচ্ছি । ইমরান হোসেন ইমন নামক এক ব্যক্তি আড়ং এ বিক্রয়কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চাকুরীর ইন্টার্ভিউ তে বেশ সন্তোষজনক পারফরমেস করে এবং সে এই করোনা পরিস্থির কারণে মুখে মাস্ক পড়ে ইন্টার্ভিউ তে অংশগ্রহণ করে । পরবর্তীতে তাকে যখন মাস্ক খুলতে বলা হয়, তখন তার মুখ ভর্তি দাড়ি থেকে তাকে বলা হয়, আড়ং এর গাইডলাইনে নাকি আছে মুখভর্তি দাড়ি থাকলে বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম নেই । সে যদি ক্লিন শেপড করে আসে তাহলেই নাকি তাকে একমাত্র চাকুরীতে নিয়োগ দেওয়া হবে অন্যথায় নয় । এরপর যুবক সেই চাকুরী প্রত্যাখ্যান করে আসে । দাড়ি কেটে চাকুরী দেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তীতে সে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিলে সেই ভিডিও হু হু করে ভাইরাল হয়ে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবারও সেই পুরনো ট্রেন্ড ফিরে আসে "বয়কট আড়ং" । এই হলো বিস্তারিত ঘটনা ।

একজন মুসলিম প্রধান দেশে ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে তারা কিভাবে দেশীয় মনোভাব আর মূল্যবোধকে রিপ্রেজেন্ট করে তা আমার বুঝে আসেনি । ঘটনার পর অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী ও মুসলিম অন্তঃপ্রাণ জনগোষ্ঠী আড়ং এর এহেন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং কয়েকটি আড়ং এর দোকানের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন । তবে কয়েকজনকে আবার দেখলাম (আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এদের মধ্যে কয়েকজন মুসলমান নর-নারীও আছেন, তবে নামে আর কর্মে মুসলিম দুটোর মধ্যে যদিও তফাৎ আছে) আড়ং এর হয়েই ওকালতি করছেন । এদের মধ্যে গতকাল একজনের পোস্ট দেখে আমি নিজেই অবাক হলাম ।
তার লেখার মূল বক্তব্য মূলত ৩টি বিষয় । (১) আড়ং ব্র্যান্ড এ কাপড়ের দাম বেশি নয় বরং যৌক্তিক । অন্যান্য কতিপয় উদ্যোক্তারা যারা আড়ং এর বদনাম করে নিজেদের ব্যবসার ব্র্যান্ডিং করেন, তারা নিজেরাই নাকি তাদের নিজস্ব বিজনেস পলিসির জন্য এই প্রপাগান্ডা ছড়ান । তাছা আড়ং নাকি একটি দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছে । (২) আড়ং কর্তৃক মুসলিম যুবককে দাড়ি কাটতে বলা নইলে চাকুরী অফার না থাকা, বিষয়টা নাকি গুজব এবং নিতান্তই মিথ্যাচার । বাঙালি নাকি গুজবে কান দিয়ে প্রমাণ ছাড়াই হুলস্থুল ঘটনা ঘটিয়ে দেয় । (৩) মাদ্রাসাগুলোতে নাকি শুধু দাড়ি টুপি ও বোরকা ব্যবহৃত জন ছাড়া সাধারণ ব্যক্তিবর্গকে শিক্ষক শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ দেয় না । কেন দেয় না, এটা নিয়ে উনি বেশ ক্ষিপ্ত ।
ঐ ব্যক্তির করা এই পোস্টটিতে দৃষ্টিকটু এবং অগ্রহণযোগ্য পয়েন্টগুলো আমি এক এক করে তুলে ধরেছিঃ
১) দেশী ব্র্যান্ড আরও অনেক আছে যেমন রঙ, অঞ্জন'স, নিপুণ, কে-ক্র্যাফট, প্রবর্তনা, বাংলার মেলা, নগরদোলা, বিবিআনা, দেশাল ইত্যাদি । আড়ং এর পণ্য এর দাম এদের সকলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি । তুলনা তো বিদেশী ব্র্যান্ড এর সাথে দেশী ব্র্যান্ডের হবে না, বরং দেশীর সাথে দেশীরই হবে । তাছাড়া দেশী ব্র্যান্ডের মার্কেটিং করলে শুধু আড়ং কেন, বাকি গুলোর কেন নয় ? (অনেকেই উপরে লেখা অনেক ব্র্যান্ডগুলোর নামও শুনেনি, আমি নিশ্চিত) ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রিপ্রেজেন্টেশন কিভাবে সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে অপমানিত করে হয় ? আমেরিকা কিংবা ইউরোপের কোন দেশের কাপড়ের ব্র্যান্ড কি তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা বা অপমানিত করে ঐ দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে ?
২) দাড়ি থাকার কারণে ইমরান হোসেন ইমন নামক একজন যুবককে চাকরী দেওয়া হয়নি । তিনি লেখায় তিনি বললেন, এর কোন প্রমাণ নেই । তিনি কি প্রমাণ চান? ঐ যুবক কিংবা আড়ং প্রেস বিজ্ঞপ্তি করে জানাবে? তাহলেই কি উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যাবে ? আড়ং তাহলে পরবর্তীতে এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলো কেন? তবু আমি বিবিসির নিউজ লিংক দিলাম আড়ং: দাড়ি থাকায় চাকরি প্রত্যাখ্যান করার অভিযোগ, সিলেটে বিক্ষোভ, আড়ংয়ের দুঃখপ্রকাশ । আশা করি, বিবিসির নিউজকে তিনি ভিত্তিহীন বলবেন না ।
৩) দাড়ি টুপি আর আর বোরখা ছাড়া মাদ্রাসার শিক্ষক হওয়া যায় না, এই কথা বলার উনার ভিত্তি কি ? অনেক দাড়ি টুপি বিহীন ব্যক্তি বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে আছেন, আমি এমন কয়েকজন কে ব্যক্তিগতভাবে চিনি । তাহলে উনি মিথ্যা বলছেন কেন? আর কোন মাদ্রাসার গাইডলাইন যদি এটা থেকেও থাকে যে দাড়িও টুপি বা বোরকা ছাড়া ঐ মাদ্রাসার শিক্ষক শিক্ষিকা হওয়া যাবে না, তবে আপনি যেখানে নমনীয় হয়ে দাড়ি টুপি কিংবা বোরকার গা ঘেঁষবেন না, তাহলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আপনার জন্য নমনীয় হবেন কেন ? বিচার মানি না, তালগাছ আমার, বললেই তো হয়ে যায় না
একজন মুসলমান নামধারী ব্যক্তির ইসলাম ধর্মের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য কে অপমান করায় গায়ে লাগলো না কিন্তু গায়ে লাগলো যারা অপমানিত করলো তাদের কিছু বলায়, বিষয়টি ভাবতেই অনেক খারাপ লাগছে । আপনি কোন ধর্ম পালন করবেন না, এটা আপনার স্বাধীনতা কিন্তু কোন ধর্মকে অপমানিত করার কোন অধিকার আপনার নেই । আর আড়ং যেটা করেছে এটা অন্যায় নয়, স্পর্ধার সীমা লঙ্ঘন । আজ আড়ং করেছে, এদের দেখাদিখি এই অন্যায় শিক্ষা যে অন্যের মাঝে সংক্রমিত হবে না, তার গ্যারান্টি কোথায় ? অবিলম্বে আড়ং কে তার গাইডলাইন বা এই অন্যায়মূলক পলিসি সংশোধন করতে হবে, অন্যথায় তাদের কপালে বড় দুঃখ আছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




