গত ১৬ই মার্চ রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে আমরা ৯জন কলিগ। এটা ছিল একটা অফিসিয়াল ট্যুর। ১৭ তারিখ সকালে চট্টগ্রাম পৌছে ওখান থেকে একটা মাইক্রোবাস কয়েকদিনের জন্য ভাড়া করে সেটা যোগে সকাল ১১টার সময় বান্দরবান শহরে পৌছি। তারপর হোটেলে উঠি। হোটেল গ্রীণ ল্যান্ড। সেখানে কিছুক্ষণ রেষ্ট নেবার পর গেলাম স্বর্ণমন্দির। অদ্ভুত সুন্দর কারুকাজ। অনেকগুলো সিড়ি কেটে তারপর পাহাড়ের চুড়ায় মন্দিরটি। এটি একটি বৌদ্ধ মন্দির। দেখে মনে হচ্ছে পুরোটাই সোনা দিয়ে মোড়ানো।
তারপর গেলাম মেঘলা। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা আর মাঝখানে গভীর লেক। লেকের উপর দিয়ে এপার থেকে ওপারের পাহাড়ে যাওয়ার জন্য দুটো ঝুলন্ত ব্রিজ আছে। বেশ রোমাঞ্চকর সে পথ পার হওয়া। কাঠের পাটাতন। ও পাড়ের পাহাড়গুলো যেন আরো উঁচুতে। দুপুরের খাবার খেলাম পর্যটন মোটেলে। মেঘলাতে প্রায় দুঘন্টার মত কাটিয়ে গেলাম আরেকটি স্পটে “নীলাচল”। ওহ! দেখার মত একটা জায়গা। সমূদ্র লেভেল থেকে প্রায় ১০০০ ফুট উঁচুতে। ওখান থেকে বান্দরবানের পুরো শহর দেখা যায়। ছোট ছোট সব দালান-কোঠা। ওখানে গাড়ী নিয়েই ওঠা যায়। তবে এসব পাহাড়ী রাস্তায় চলার জন্য অন্য ধরনের গাড়ী আছে। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে “চান্দের গাড়ী”। আসলে চান্দের গাড়ী আরেকটু অন্য রকম। সেগুলো আরো পুরোনো ইঞ্জিনের কিছু জিপ জাতীয় গাড়ী। তো যাই হোক নীলাচলে সে এ দেখার মত দৃশ্য। ভেবেছিলাম এটাই সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। প্রচুর বাতাস। সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়। একেবারে পাহাড়ের চুড়ায় ইট বিছিয়ে রাখা হয়েছে অনেকখানি জায়গায়। আর তার একেবারে মাঝখানে একটি দোতলা ওয়াচ টাওয়র। নীচে কিছু দোকান আছে। যেখানে হালকা নাস্তা সারা যায়। মূলত: ওখানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকা উচিত। তবেই আসল মজাটা। ছিলাম আমরা সূর্যাস্ত পর্যন্তই। সন্ধ্যার সময় ফিরে এলাম আবার হোটেলে।
একটা সমস্যা বান্দরবানে ফেস করেছি, সেটা হলো খাবারের হোটেলের সমস্যা। আমার মতে ভালো মানের খাবারের হোটেল নেই। যেমনটা আছে কক্সবাজারে। তবে কোনমত চালিয়ে নেয়া যায় আরকি!
পরের দিন খুব সকালে ৬টায় রওনা দিলাম চান্দের গাড়ীতে “নীলগিরি” এর দিকে। ওটা বান্দরবান শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দুরে। যাবার পথে যে দৃশ্য দেখেছি তা ভোলার মত না। আগের দিনে নীলাচল দেখে ভেবেছিলাম ওটাই বোধহয় সব সেরা। কিন্তু না, সে ধারণা ভুলে প্রমাণিত হলো। গাড়ী পাহাড়ের রাস্তা বেয়ে উঠছে তো উঠছেই। আবার যখন নামছে তো নামছেই। সে এক অন্যরকম শিহরণ। উত্তেজনায় কেউ গাড়ীর সিটে বসতেই পারছিলাম না। আমরা সব কলিগেরা দাড়িয়ে গিয়েছি প্রায় পুরোটা রাস্তা। এই দৃশ্যর চেয়ে ওটা ভালো। ওটার চেয়ে ওটা আরো সুন্দর। একসময় দেখলাম আমাদের অনেক নীচে মেঘের আনাগোনা। আর ওখানকার গাড়ীর সব ড্রাইভাররা প্রচন্ড দক্ষ। ঐ চিকন পাহাড়ী রাস্তায় তাদের দক্ষ হাতে গাড়ী নিয়ন্ত্রণ করতে দেখলাম।
এভাবে একসময় পৌছালাম আরেক উঁচু (২২০০ ফুট, তবে সেনাবাহিনীদের মতে ২৮০০ফুট)পাহাড় নীলগিরি’তে। ওটার সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করার মত না। তবে এই পাহাড়টির অর্থাৎ এই স্পটটি বাংলাদেশে সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে ছোট পরিসরে প্রায় তিন রকমের রেষ্টহাউজ আছে। কোনটা পাকা, কোনটা আধাপাকা আবার কোনটা বাশেঁর তৈরী, এছাড়া সেখানে তাবুরও ব্যাবস্থা আছে। পাহাড়ের উপরের পুরো অংশটা রেলিং দেয়া। ওখানকার আর্মি সদস্যরা খুবই হেল্পফুল। ওখান থেকে ৬২ কিলোমিটার দুরের কেওকারাডং পাহাড় দেখলাম, যেটা বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়ের চুড়া। [বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পাহাড়ের চুড়া হলো তাজিংডং (৩৩০৯.৯ ফুট উচু সমূদ্রপৃ্ঠ থেকে। তবে এসব উচ্চতা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কারণ বিভিন্ন জিপিএস ডিভাইজে বিভিন্ন রকম রেজাল্ট শো করে। আবার পর্বত আরোহনকারীদের দেয়া তথ্য আর সরকরের তথ্যের মধ্যে আছে ফারাক। আর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ স্থান হলো সাকা হাফং পাহাড় (নতুন আবিস্কৃত, তবে সেটা সর্বোচ্চ পাহাড় বলা যাবে না, কারণ পাহাড়টি বার্মা’র, বাংলাদেশে কিছু অংশ রয়েছে, এটা একেবারে বাংলাদেশের সীমান্ত ছুঁয়ে)] [বি:দ্র: পাহাড়ের উচ্চতা নিয়ে কোন তর্কে যাচ্ছি না, কারণ এগুলো তথ্য সবই ইন্টারনেটে পাওয়া, আর এগুলো সম্মন্ধে আমরা ধারনাও খুব একটা পরিষ্কার না, এই ব্লগেই অনেক অভিজ্ঞ পর্যটক আছেন তারা অনেক ভালো বলতে পারবেন]
নীলগিরির পাশেই রয়েছে একটি হেলিপ্যাড। পাশের পাহাড়ের মাথা ছেটে ওটা তৈরী করা হয়েছে। যদিও আমার কাছে পাহাড়ের মাথা ছাঁটাটা পছন্দ হয়নি, অবশ্য এটা ছাড়া অন্য উপায়ও ছিল না হয়ত। ”নীলগিরি এবং নীলাচল“ এমন নাম দেয়ার সঙ্গত কারণ আছে। আসলে পাহাড় তার রূপ ছড়ায় বর্ষাকালে। এই বর্ষাকালে মেঘ, বৃষ্টি, রোদ এবং রংধনু একটা সমাহার দেখা যায় এই পাহাড়গুলোতে। এবং দুর থেকে তখন ঐ অঞ্চলটাকে পুরো নীল মনে হয়।
নীলগিরিতে ছিলাম প্রায় তিনঘন্টার মত। এখানে খাবার ভালো ব্যাবস্থা নাই, অন্তত: সাধারণ পর্যটকদের জন্য। তবে খেতে চাইলে ওখানে একটা ছোট দোকান আছে যেখানে আগেই জানাতে হয়। এছাড়া টয়েলেটের সমস্যা আছে এখানে। তারপর গাড়ী নিয়ে ব্যাক করলাম। পথে নামলাম চিম্বুক পাহাড়ে। চিম্বুকের উচ্চতা সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৩০০ ফুট উঁচতে। ওটার উপরে একটা ক্যাম্প আছে সীমান্তরক্ষীদের এবং রেষ্টহাউজ আছে। আবার গাড়ীতে চেপে বসলাম।
এবার নামলাম শৈলপ্রপাতে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। ঝরণা। পাহাড়ের গা বেয়ে পড়ছে পানি। তীব্র ঠান্ডা সে পানি। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন পানি কম ছিল। কোথা থেকে এ পানি গুলো আসছে সেটা আমার কাছে একটা রহস্য। ভেবে কুলকিনারা পাইনি। এটা বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার দুরে। তারপর হোটেলে এসে ফ্রেশ হলাম। কলিগদের কেউ কেউ গেলো সাঙ্গু নদীতে সাঁতার কাটতে। তারপর লাঞ্চ করে একটা ঘুম। উঠতে উঠতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমাদের পরিকল্পনায় আবারো নীলাচল যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সময়ের অভাবে যাওয়া হল না। গেলাম বার্মিজ মার্কেটে। সেখানকার প্রায় প্রতিটা দোকান পরিচালনা করে ওখানকার উপজাতী চাকমা মেয়েরা। সব পুতুলের মত সাজগোজ করে বসে আছে ওরা। দেখতে খুবই সুন্দর। রাতে ডিনার করে তবে আবারো হোটেলে ফিরলাম। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা শেষে ঘুমতে গেলাম। পরের দিন সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঐ দিনটা চট্টগ্রাম কাটিয়ে রাতের বাস গ্রীণলাইনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
এভাবে শেষ হলো আমাদের বান্দরবান সফর। আসলে আল্লাহ যে কি সৌন্দর্য্য বিলিয়ে রেখেছেন এই পাহাড়ের মাঝে তা চোখে না দেখলে কখনই বোঝা যাবে না। এই সমতল আর পাহাড়ের কত যে পার্থক্য!!! সে এক জটিল রহস্য। আসলেই পুরোটাই রহস্যে ঘেরা এ সৌন্দর্য্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



