somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভঙ্গুর ভবিষ্যৎ এর ভয় কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?

০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি—
“ডিপ্রেশন ছিল”, “প্রেশার নিতে পারেনি”, “পারিবারিক সমস্যা ছিল”…


তারপর গল্পটা শেষ।

কিন্তু সত্যি কি এতটাই সহজ?

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭৭ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, ৯২ জন কলেজ শিক্ষার্থী, ১৯০ জন স্কুলশিক্ষার্থী, আর ৪৪ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ছিল। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩১০। অর্থাৎ এক বছরে বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো: এটা কি শুধু “ডিপ্রেশন”?
নাকি এর পেছনে আরও বড় সামাজিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, আর ঐতিহাসিক চাপ আছে—যেটা আমরা দেখতে চাই না?

আমার মনে হয়, আসল প্রশ্নটি এখানে: আমাদের শিক্ষার্থীরা কি ভবিষ্যতের উপর আস্থা রাখতে পারছেন?
যে ভবিষ্যতের জন্য তারা এত পড়ছে, এত সহ্য করছে, এত তুলনা মেনে নিচ্ছে—সেই ভবিষ্যৎ কি তাদের কাছে এখনও বিশ্বাসযোগ্য আছে?

শুধু “একাডেমিক প্রেশার” বললে সমস্যাটা ছোট হয়ে যায়। কারণ এই চাপ শুধু পড়াশোনার চাপ না। এর মানে হলো—
বাবা-মার সব আশা তোমার ওপর,
ভালো ফল মানে পরিবারের সম্মান,
খারাপ ফল মানে লজ্জা,
দেরি মানে পিছিয়ে পড়া,
আর ব্যর্থতা মানে যেন মানুষ হিসেবেও ছোট হয়ে যাওয়া।

এখানে পড়াশোনা আর পড়াশোনা থাকে না। এটা হয়ে যায় নৈতিক মূল্য, সামাজিক সম্মান, পরিবারের বিনিয়োগের জবাব। এই জায়গায় এসে শিক্ষার্থীর ফলাফল শুধু মার্কশিটের বিষয় থাকে না; সেটা তার আত্মসম্মান, পরিবারের মুখ, আর ভবিষ্যতের দরজার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

পরিবারকে আমরা সাধারণত নিরাপদ জায়গা ভাবি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সত্যিই সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবার অনেক সময় সবচেয়ে বড় চাপের জায়গাও হয়ে ওঠে।
“তুই তো আমাদের আশা”
“আমরা তোকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি”
“এই রেজাল্ট করলে কী হবে?”
এই কথাগুলো আলাদা করে খারাপ না। কিন্তু যখন একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন এগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়, তখন এগুলো ভয়, অপরাধবোধ, আর নিজের প্রতি ক্ষোভে পরিণত হতে পারে। তখন সে শুধু নিজের জন্য ব্যর্থ হয় না; তার মনে হয় সে পুরো পরিবারকেই হতাশ করছে।

এই জায়গাটা সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের কথাকে মনে করিয়ে দেয়। তিনি অনেক আগে বলেছিলেন, আত্মহত্যা শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার না; এটা সামাজিক অবস্থার সঙ্গেও জড়িত। অর্থাৎ মানুষ একা একা ভাঙে না, সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক, চাপ, বিচ্ছিন্নতা, প্রত্যাশা—এসবও বড় ভূমিকা রাখে। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালে এই কথাটা নতুনভাবে সত্যি মনে হয়।

সোশ্যাল মিডিয়া এই চাপকে আরও তীব্র করে। ফেসবুক খুললেই দেখি—
কেউ স্কলারশিপ পেয়েছে,
কেউ বিদেশে গেছে,
কেউ স্টার্টআপ করছে,
কেউ “পারফেক্ট লাইফ” দেখাচ্ছে।
তখন নিজের দিকে তাকালে অনেকের মনে হয়:
“আমি পিছিয়ে পড়ছি।”
“আমি কিছুই করতে পারিনি।”
“সবাই এগোচ্ছে, শুধু আমি না।”

এখানে সমস্যা শুধু তুলনা না। সমস্যা হলো, তুলনাটা থামে না।
স্ক্রল শেষ হয় না,
অন্যের সাফল্যের দৃশ্য শেষ হয় না,
নিজের অপ্রতুলতার অনুভূতিও শেষ হয় না।
ফলে ভবিষ্যৎ আর নিজের ভেতর থেকে তৈরি হয় না; সেটা ক্রমশ অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে মাপা হয়।

কোভিড-পরবর্তী বাস্তবতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড শুধু কিছু মাস বা বছর নষ্ট করেনি; এটা অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের ছন্দ নষ্ট করেছে। পড়াশোনার রিদম ভেঙে গেছে, আত্মবিশ্বাস কমেছে, সময়ের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে, অনেকে পিছিয়ে গেছে। অথচ সমাজের প্রত্যাশা কমেনি। আগে যেমন ফল চাইত, এখনো তেমনই চায়। আগে যেমন “সময়মতো সফলতা” চাইত, এখনো তেমনই চায়।
বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বলেছে যে কোভিড-লকডাউন তাদের মানসিক সুস্থতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; বিশেষ করে সময়মতো গ্র্যাজুয়েশন ও চাকরি পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল খুব বেশি।

অর্থাৎ, এখানে মানসিক কষ্ট শুধু দুঃখ বা টেনশন না। এখানে একটা বড় বিষয় হলো—
জীবনের টাইমলাইন ভেঙে যাওয়া।
যে ছন্দে একজন শিক্ষার্থী ভাবত: পড়বো → পাশ করবো → বের হবো → কাজ পাবো → পরিবারকে সাহায্য করবো—
সেই ধারাবাহিকতায় ফাটল ধরেছে।
যখন এই সময়ের ওপর ভরসা নষ্ট হয়, তখন ভবিষ্যতের ওপরও ভরসা নষ্ট হয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ স্তর যোগ করেছে। ওই সময় বহু তরুণ-তরুণী অনুভব করেছে—
আমরা একসঙ্গে কিছু বদলাতে পারি,
আমাদের কণ্ঠস্বরের শক্তি আছে,
আমরা ইতিহাসের অংশ।
একটি ২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় আত্মহত্যার কিছু সূচকে সাময়িক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। এর মানে এই না যে কষ্ট উধাও হয়ে গিয়েছিল; বরং অনেকের ব্যক্তিগত কষ্ট সাময়িকভাবে সমষ্টিগত শক্তি, অংশগ্রহণ আর অর্থবোধের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।

কিন্তু আন্দোলনের পর?
আবার ফিরে এসেছে—
ক্লাস,
রেজাল্ট,
অ্যাসাইনমেন্ট,
পারিবারিক চাপ,
চাকরির অনিশ্চয়তা।
অর্থাৎ, একবার বড় স্বপ্ন দেখে আবার ছোট, ভঙ্গুর, চাপপূর্ণ বাস্তবতায় ফিরে আসা—এটাও এক ধরনের ধাক্কা।
একবার যদি মনে হয় “আমরা ইতিহাস বদলাতে পারি”, তারপর যদি বাস্তবতা আবার বলে “এখন CGPA, deadline, চাকরি, টিকে থাকা”—তাহলে সেই মানসিক ফারাকও গভীর হতে পারে।

সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা সম্ভবত এখানেই:
শিক্ষার্থীরা একা না, তবুও একা।
চারপাশে পরিবার আছে, সহপাঠী আছে, শিক্ষক আছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার মানুষ আছে—
কিন্তু কেউ সত্যিকার অর্থে “শোনে” না।
আমরা জিজ্ঞেস করি, “কেমন আছো?”
কিন্তু উত্তর শোনার জন্য থামি না।
আমরা ফল জানতে চাই, অনুভূতি না।
আমরা সাফল্য দেখতে চাই, সংকেত না।
আমরা সমস্যা বোঝার আগে ব্যাখ্যা দিয়ে দিই।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর করা একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে, perceived social support বা অনুভূত সামাজিক সমর্থন যত বেশি, আত্মহত্যামূলক চিন্তার ঝুঁকি তত কম। আর distress, stress, anxiety, depression যত বেশি, ঝুঁকিও তত বেশি। অর্থাৎ, এখানে একটা বড় শিক্ষা আছে: সমস্যাটা শুধু “মনের অসুখ” না; সমস্যাটা সমর্থনের অভাব, একাকিত্ব, অশ্রুত কষ্টও।

এই জায়গায় আমি একটি ধারণা ব্যবহার করতে চাই: ভাঙা ভবিষ্যৎ-আস্থা।
আর একটু তাত্ত্বিক ভাষায় বললে, এটা fractured futurehood—
অর্থাৎ এমন এক অবস্থা, যেখানে ভবিষ্যৎ আর ভরসার জায়গা থাকে না; বরং চাপ, ভয়, দায়, তুলনা আর অনিশ্চয়তার জায়গা হয়ে যায়।

আমাদের শিক্ষার্থীরা আজ শুধু পড়াশোনা করছেন না। তারা একসঙ্গে লড়ছেন—
পরিবারকে খুশি রাখতে,
নিজের সম্মান বাঁচাতে,
অন্যদের সঙ্গে তাল মিলাতে,
ভবিষ্যৎকে “সার্থক” প্রমাণ করতে,
এবং সবসময় মানসিকভাবে “ঠিক আছি” এমন একটা মুখোশ ধরে রাখতে।
কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি পরিষ্কার না হয়,
চাকরি যদি অনিশ্চিত হয়,
সময় যদি ভেঙে যায়,
সমাজ যদি শুধু মূল্যায়ন করে কিন্তু ধরে না,
তাহলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে সেই ভবিষ্যতের ওপর আস্থা রাখবে?

সুতরাং, সমস্যাটা শুধু “ডিপ্রেশন” না।
সমস্যা হলো—
আমরা এমন এক সমাজ বানিয়েছি, যেখানে ভবিষ্যৎটাই অনেকের কাছে ভয়ংকর, ভারী, আর অবিশ্বাস্য হয়ে উঠছে।

কী করা যেতে পারে?

প্রথমত, “সমস্যা ছিল” বলে গল্প শেষ করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, রেজাল্টের আগে মানুষটাকে দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, তুলনা কমাতে হবে—“ও পারে, তুই পারিস না” এই কথাগুলো অনেক সময় ছুরির মতো কাজ করে।
চতুর্থত, কাউন্সেলিং আর সাহায্য চাওয়াকে লজ্জার কিছু ভাবা যাবে না।
পঞ্চমত, পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়, আর সমাজ—সবাইকে শিখতে হবে:
সব চাপই চোখে দেখা যায় না,
সব ভাঙনই প্রকাশ পায় না,
সব বিপদই শেষ মুহূর্তে আসে না।

শেষ কথা একটাই:

সমস্যা এটা না যে আমাদের শিক্ষার্থীরা দুর্বল হয়ে গেছে।
সমস্যা হলো—
আমরা তাদের এমন এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি,
যেটার ওপর তারা নিজেরাই ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ যদি আর ভরসার জায়গা না থাকে,
তাহলে বেঁচে থাকাটাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো:
আমাদের শিক্ষার্থীরা কি ভবিষ্যতের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন?
যদি উত্তর “না” হয়,
তাহলে সমস্যাটা শুধু ব্যক্তির না—সমগ্র সমাজের।

শরৎ চৌধুরী, ৫ই এপ্রিল, ২০২৬।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১২
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরবে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৫৮


দিন দিন সরকারপ্রধানের ফ্যান হয়ে যাচ্ছি। তাঁর চলাফেরা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা দেখে মানুষ বলতে শুরু করেছে, এ যেন আরেক জিয়া। আর “I have a plan” কথাটার অর্থ এত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব রাজনীতি, ক্ষমতা ও অর্থনীতির কেন্দ্রে এখন ভারত

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১২


ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Dr S. Jaishankar কথা বলছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অন্য বিশাল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের মন্ত্রীরা একাগ্রচিত্তে শুনছেন।

হ্যাঁ, অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমানে বিশ্বে ভারতের অবস্থান এমনই। সামরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×