হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার (১) / সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু
মূল সাইেটর লিংক http://bit.ly/MYqgRL
১.
সাজ্জাদ ভাই আর আমি হুমায়ূন আহমেদের একাধিক সাক্ষাৎকার নিছি। আগে ওনার বাসায় আমাদের যাতায়াত ছিলো। তিনি যখন হাতিরপুলে থাকতেন তখনও, পরে ধানমণ্ডিতে গেলে সেইখানে। আরো অনেকের সাথে আমাদেরও উনি নিয়া গেছিলেন ওনার দেশের বাড়িতে। ১৯৯৬ সালের দিকে হুমায়ূন ভাই বিরক্ত হইছিলেন বোধকরি আমার উপরে। তার আগে ১৯৯৪ সালে তিনি আমারে একটা বই উৎসর্গ করছিলেন। উৎসর্গের ঘটনাটা আনন্দের। একদিন বাংলা একাডেমী মেলায় উনি স্টল থিকা বাইরে আইসা আমারে বললেন, শোনো তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে। একটু হাঁইটা উনি বললেন, আমি তোমারে একটা বই উৎসর্গ করতে চাই তোমার আপত্তি আছে কোনো? আমি বললাম, আপত্তি কেন থাকবে হুমায়ূন ভাই, আমি তো খুশি। উনি বললেন বেশি কিছু লিখি নাই উৎসর্গে। ঠিক আছে তুমি যাও। পরের দিন মেলায় আমারে স্টলের ভিতর ডাইকা নিয়া দর্শক ক্রেতাদের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিলেন: এ হচ্ছে ব্রাত্য রাইসু। ওরে আমার নতুন বইটা আমি উৎসর্গ করছি।
হুমায়ূন ভাই কবি প্রকৃতির লোক ছিলেন বইলা আমি ভাবি। মনে আছে একদিন সকালে ওনার বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। গেলে পরে উনি আমারে নিয়া বাইর হইলেন। বললেন, চলো তোমারে ইউনিভার্সিটিতে নিয়া যাই। ডিপার্টমেন্টে ওনার রুমে ঢুইকা কী কী জানি করলেন। বিশাল একটা ড্রয়ার খুইলা ভক্তদের চিঠি দেখাইলেন। অনেক চিঠি। এরপর জিজ্ঞেস করলেন আমি কোথায় যাবো? বললাম বাসায় ফিরবো, বাড্ডায়। উনি বললেন, চলো আমার টিভিতে কাজ আছে। আমি তোমার সঙ্গে যাই, রামপুরায় নেমে যাবো। রিকশায় ওনার সঙ্গে কী কী আলাপ হইছিল মনে নাই। উনি বাংলাদেশ টেলিভিশন রামপুরায় আইসা বললেন, ঠিক আছে রাইসু তুমি তাইলে যাও। আমার এইখানে কাজ আছে। এই রিকশায়ই যাও। এরপর উনি মানিব্যাগ খুইলা বললেন, তোমার কি টাকাপয়সা কিছু লাগবে। দেখলাম অনেকগুলা পাঁচশো টাকার নোট মানিব্যাগে। বললেন যত খুশি নিয়া যাও।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে দেখি উনি আর আমার লগে কথা কন না। ওনার বাসায় যাই, কিছু কন না। পরে কয়েকবার জিজ্ঞেস করছি, কী ব্যাপার? উনি কোনো উত্তরই দেন নাই আর।
১৯৯৫ টু ৯৬ দুইবার আমি হুমায়ূন ভাইয়ের নাম লইছি কাগজে। একবার মঈনুল আহসান সাবের ভাইয়ের ইন্টারভিউ নিতে গিয়া। আমি আর ডিয়ার ফ্রেন্ড রাজু আলাউদ্দিন ওই ইন্টারভিউটা নিছিলাম। ওইখানে আমি বলছিলাম, দাঁড়ান কী বলছিলাম–বইটা গোছগাছ করা আছে–ওইখান থিকা তুইলা দেই:
রাইসু: সেটা হলো যে, আমি মনে করি আমাদের যে কবিতা আছে-না? কবিতার একটা মানদণ্ড আমি আবিষ্কার করছি নিজের মতো করে। আন্ওয়ার আহমদের নাম শুনেছেন তো? সাবের: হ্যাঁ, শুনেছি। রাইসু: আমাদের বাংলায় ভালো কবিতাগুলো আন্ওয়ার আহমদের চেয়ে একটু ভালো, খারাপ কবিতা হলে আনওয়ার আহমদের চেয়ে একটু খারাপ। এই হচ্ছে আমাদের কবিতার মানদণ্ড। সাবের: ব্যক্তিগত হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? রাইসু: ব্যক্তিগত হলে অসুবিধা কী? যেমন আমাদের উপন্যাসের মানদণ্ডে যদি আমরা ধরতে চাই হুমায়ূন আহমেদ হচ্ছেন আমাদের মানদণ্ড। খুব ভালো উপন্যাসও হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে খুব খারাপ না। আমাদের এখানে উপন্যাসের ক্ষেত্রে একেবারে অন্যরকম কিছু আমরা এখনো পাই নাই। এই জন্যেই অদ্ভুত লাগে, যখন একজন হাসান আজিজুল হকের ভক্ত হুমায়ুন আজাদকে… স্যরি হুমায়ূন আহমেদকে ফেলে দেয়।সাবের: হুমায়ুন আজাদ ফেলে দেওয়ারই জিনিস। রাইসু: এটা কি রেকর্ড হবে? সাবের: হ্যাঁ, অবশ্যই। রাইসু: তো কোথায় ফেলবেন তাঁকে? সাবের: তাঁকে ভাগাড়েই ফেলা উচিৎ।…
তো এই ইন্টারভিউ বাংলাবাজার পত্রিকায় ছাপার পর থিকা হুমায়ূন ভাই আর আমার সঙ্গে কথা বলেন না। আগে আরেকটা লেখা লিখছিলাম, হিমু, মিসির আলী ও হুমায়ূন আহমেদ নিয়া। যেইখানে হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলীর বাসায় দুপুর রাতে হাজির হন চা খাবেন বইলা। এবং চা না থাকার কারণে প্রকাশকদের ফোন করতে হয় চা নিয়া আসার জন্যে। সেই লেখা উনি পছন্দ করেন নাই। অবসর প্রকাশনার আলমগীর ভাই অবশ্য লাইক করছিলেন। তো এরপর দুই তিনবারই দেখা হইছিল। এমনিতে সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক অনেক দিন ঠিকঠাক ছিল। পরে মাঝখানে একটা গণ্ডগোল হয়, শুনছি। শেষে আবার ভালো হইছিল সম্পর্ক ওনাদের। আমার সঙ্গে শেষ আলাপ ফোনে। আমি ওনার একটা ইন্টারভিউ নিতে চাইলাম। উনি ফোন কইরা কোনো এক সকালে যাইতে বললেন। কিন্তু যেহেতু নাম শোনার পরেও না চেনার ভঙ্গিতে কথা বললেন আমি আর যাই নাই ইন্টারভিউ নিতে।
আমাদের যৌথ ভাবে নেওয়া আরেকটা ইন্টারভিউ আছে হুমায়ূন আহমেদের, যা ভোরের কাগজের ছাপা হইছিল। সেইটা পরে আপ করতেছি। ওনার প্রতি আমার ভালোবাসা আপাতত অঁটুট থাকুক। যদি ঘটনাক্রমে কোনোদিন মইরা যাইতে হয় তার পরে ওনার সঙ্গে সব ঠিকঠাক কইরা নিব নে। এই ভুবনে দেরি হইয়া গেল!
(ব্রাত্য রাইসু, ২৪.৭.২০১২)
২.
”প্রতিটি লেখক এক অর্থে ধর্মপ্রচারক” – হুমায়ূন আহমেদ
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু
শিশির ভট্টাচার্য্যের আঁকা হুমায়ূন আহমেদ
সাজ্জাদ শরিফ: আপনার লেখার মধ্যে আপনি প্রায়ই কিন্তু একটা কল্পরাজ্য তৈরি করেন। কল্পরাজ্য কী রকম, ধরা যাক ময়ূরাক্ষী নদী। ঐ নামে হিমুর একটা নদী আছে। কঠিন একটা অবস্থায়, একটা কট্টর বাস্তবের সামনে এসে যখন সে দাঁড়ায়, তখন সে ওখানে যায়। এবং সে এক ধরনের প্রশান্তি নিয়ে আসে।
হুমায়ূন আহমেদ: যারা খুব যৌক্তিক তারা এটার ব্যাখ্যা ভালো দিতে পারবেন। আমার কাছে এক ধরনের ব্যাখ্যা আছে। সেটা এই যে, আমার নিজের বোধহয় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস, যদিবা থাকে, খুব কম। যেহেতু সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারছি না,সেহেতু সমস্যাটা পাশ কাটিয়ে আসার একটা প্রবণতা আমার থাকে।
সাজ্জাদ: এমন হতে পারে যে, আপনি হয়তোবা আপনার চরিত্রগুলোর এক ধরনের অভিভাবকত্ব নেন। জটিল কোনো অবস্থায় তাদেরকে ফেলে আপনি দেখাতে চান না।
হুমায়ূন: আমি নিজে যখন কোনো বিপদের মধ্যে পড়তে চাই না তখন…
সাজ্জাদ: যেমন আপনার মেয়ে চরিত্রগুলোর কথা বলি; তারা জগতের সমস্ত গ্লানি থেকে দূরে থাকে। তারা জগতের সব রকমের কর্দয, কলুষ থেকে দূরে থাকে। এ-ব্যাপারে বঙ্কিম এবং সুনীলের সঙ্গে আপনার প্যারালাল টানা হয়। এদের চরিত্রগুলো শুভ্র এবং পবিত্র। আপনার মেয়ে চরিত্রগুলোর খল বা ধূর্ত না হওয়ার পেছনে কারণ কী?
হুমায়ূন: তারা যে শুভ্র, তা না। তাদের ভেতরকার নানারকম দোষক্রটি স্বীকার করা হয়। সেগুলো এতো দ্রুত এবং কম সময়ে টেনে যাই যে জিনিসটায় আমার মন খারাপ হয়। যেমন আমি একটা উদাহরণ দিই। একটা উপন্যাসে কোথাও এরকম বলা আছে যে, একদিন ভোরবেলায় মেয়েটি রাস্তায় যায়। মেয়েটির জীবনে এরকম এক ভোরবেলায় একটা কিছু ঘটেছিলো, কিন্তু যা ঘটেছিলো তা আনন্দের নয়। কিন্তু কী ঘটেছিলো, সেটাও কোথাও কাউকে কিছু বলে না। আমি জানাতে চাই না কী ঘটেছিলো। আমি শুধু একটা ইঙ্গিত দিয়ে যাই। দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাই, যে, এমন চমৎকার সকালটা তার পছন্দ হয়নি। তার মানে চমৎকার সকালে কোনো কিছু ঘটেছিলো তার জীবনে। আমি যদি সেখানে ডিটেইল একটা বর্ণনা দিতাম সকালবেলা কী ঘটেছিলো, তাহলে বোঝা যেতো যে এই মেয়েটি, এই শুভ্র চরিত্রটি, যাকে সমস্ত কলঙ্ক থেকে মুক্ত মনে হয়, সে শুভ্র থাকতে পারে না। আর অভাবের কথা আমি বলতে ভালোবাসি না। কারণ, আমি নিজেই সে অভাবের ভেতর দিয়ে এসেছি, আমি ভালো করেই জানি অভাব কী জিনিস। এখন, লেখার সময় মনে করুন সেই অভাবের দিকটা আমি ফুটিয়ে তুলবো। তখন এতো দ্রুত কাজটা আমি সারতে চাই যে বইটা পড়ার পরে যাতে পাঠকের আর ব্যাপারটা মনে না থাকে।
সাজ্জাদ: পাঠকের ওপর আপনি কোনো চাপ তৈরি করতে চান না।
হুমায়ূন: যেমন, একটা উদাহরণ দিচ্ছি। খেতে বসেছে, সে সময়ে বাচ্চাটি বললো, মা আজকে আমি গোটা ডিম খাবো। এর মধ্যে দিয়ে আমি বোঝাতে চাচ্ছি সে কখনো গোটা ডিমটা খেতে পায় না। এই লাইন দিয়ে আমি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বোঝাতে চেষ্টা করছি। ঐ যে টাকা নাই, বাজার কী হবে, এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।
সাজ্জাদ: আপনার যেটা প্রধান বৈশিষ্ট্য সেটা সংযম। যেমন আপনার হাস্যরস থাকে, কিন্তু সেটা কখনো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যায় না।
হুমায়ূন: মাঝে মাঝে খুব সিরিয়াস কথা বলার থাকে। এই কঠিন কথাগুলি হাসির মাধ্যমে বলার চেষ্টা করছি। এই চেষ্টাটা কিন্তু আমরা সবাই করি। এটা আমাদের ক্রাইটেরিয়া। শুধু আমাদের সাহিত্যে নেই। আমাদের বাস্তব জীবনেও কিন্তু আমার কঠিন সমস্যার সময় হাসি-তামাশা-রসিকতা করে কঠিন ব্যাপারগুলো নিই। কিন্তু যখন লেখালেখি করি এগুলো খুব খারাপ একটা ব্যাপার। আমি ডিল করি হাসি-তামাশা-রসিকতা নিয়ে। উদাহরণ, একটা দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখাতে চাচ্ছি। সেখানে দেখালাম যে, বাবা চরিত্রটি বাজার থেকে সবচে সস্তায় যে মাছ পাওয়া যায় সেগুলো কিনে নিয়ে আসেন, এবং সে মাছগুলো পচা। যেহেতু মাছগুলো পচা কাজেই সেগুলো রান্না করতে হয় লেবুপাতা দিয়ে। তখন একটা চরিত্র বললো, আমাদের একটা লেবুর গাছ আছে, সেটার সব পাতা আমরা খেয়ে ফেলেছি। পুরো ব্যাপারটা কিন্তু একটা হাস্যরস তৈরি করলো। কিন্তু পেছনের যে গভীর বেদনাটি, সেটি আমি হাস্যরস দিয়ে ঢেকে দিলাম। হয়তো এটা করা উচিৎ ছিলো না।
সাজ্জাদ: আগে আপনার মেয়েরা সমস্ত কলুষ এবং কদর্যতার বাইরে ছিলো। পরে আপনি নিজেই কিন্তু কিছু জিনিস শুরু করেছেন, কিন্তু হালকাভাবে। আপনার প্রিয়তমেষু উপন্যাসে একটা মেয়ে কোনো এক সময়ে রেইপড্ হয়েছে। পুরো উপন্যাসটার ভিতরে কিন্তু আমরা জানতে পারি না আসলে সে তার দুলাভাইয়ের দ্বারা রেইপড্ হয়েছিলো। একদম শেষ এপিসোডে গিয়ে আপনি ওপেন করলেন। তখন কিন্তু পুরো উপন্যাসটাই প্রথম থেকে ঘুরে গেলো।
হুমায়ূন: এর ফলে দ্বিতীয়বার পড়তে গেলে খুব মজা লাগবে।
সাজ্জাদ: আপনি কি হঠাৎ করেই চিন্তা করেছেন যে এদিকটায় আসা উচিৎ?
হুমায়ূন: সচেতন কিছু না। আমার সবকিছুই অচেতনভাবে আসে। সচেতনভাবে কারেকশন যা করি সেগুলো সাইন্স ফিকশনে।
রাইসু: মানবিকতাটা রাখার জন্যে?
হুমায়ূন: না, সাইন্সের ব্যাপারগুলো যাতে ঠিকমতো আসে। এ নিয়ে আমি সাবধান থাকি সাইন্স ফিকশনের ব্যাপারে।
সাজ্জাদ: সাইন্স ফিকশনে কি আপনি এক ধরনের যৌক্তিক বিন্যাস রাখতে চান? মানে অনেকে তো সাইন্স ফিকশনকে নিয়ে যান ফ্যান্টাসির দিকে।
হুমায়ূন: ফ্যান্টাসি জাতীয় লেখাগুলো আবার আলাদা। ফ্যান্টাসি যে আমি লিখি না তা না।
রাইসু: সাইন্স ফিকশনে আরেকটা ব্যাপার আছে, সেটা হলো আধ্যাত্মিকতা। কোনো কোনো সাইন্স ফিকশন শেষের দিকে আধ্যাত্মিক হয়ে যায়।
হুমায়ূন: শেষপর্যন্ত তো সবকিছুই রিলিজিয়াস। এই যে সাইন্স, এ-ও তো এক ধরনের রিলিজিয়ন।
রাইসু: রিলিজিয়ন খুব ক্রুডভাবে চলে আসলে ভালো লাগে না।
সাজ্জাদ: ক্রুড রিলিজিয়ন না, সাট্ল রিলিজিয়ন। যেমন ফিহা সমীকরণ-এর কথা বলতে পারি। যেমন ইরিনার কথা বলি। যারা নাকি অমর হয়ে যাবে। এ জায়গাগুলোতে কোথায় যেন এক ধরনের ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ব্যাপার আছে। এবং তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে যে নাকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, তার যে দ্বন্দ–খুবই ইন্টারেস্টিং জিনিস এগুলো। ফিহা সমীকরণ-এর মধ্যে আমরা দেখবো ধর্মগ্রন্থের আকারে আপনি কতগুলো টেক্সট্ রচনা করেছেন। সেই টেক্সটকে ধীরে ধীরে ভাঙতে ভাঙতে আপনি একটা বৈজ্ঞানিক সূত্রের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। এই জিনিসগুলো আপনি কীভাবে ডেভেলপ করেন?
হুমায়ূন: আমাদের সভ্যতার শুরুতে আমরা তো সমুদ্র থেকে উঠে আসলাম। আমাদের প্রাণের শুরু সমুদ্র থেকে। যে-জন্যে আমাদের রক্তের ঘনত্ব আর সমুদ্রের পানির ঘনত্ব এক। আমাদের রক্তের আর. এইচ. সমুদ্রের আর. এইচ. এক। আমাদের বডির লবণাক্ততা সমুদ্রেরই মতো। সেহেতু সমুদ্র দেখলে সমুদ্রের কাছে যেতে ইচ্ছা করে আমাদের। এটা আমি নিজে ফিল করি। সমুদ্রের পাশে, বিশেষত রাত্রিবেলা দাঁড়ালে, শোনা যায় যে সমুদ্র ডাকছে। এক্কেবারে পরিষ্কার শোনা যায়। এবং আমরা উঠে এসেছি সমুদ্র থেকে। আমরা সমস্ত শরীরে সমুদ্র নিয়ে ঘোরাফেরা করছি। আমাদের হোল বডিতে আছে সমুদ্র।
সাজ্জাদ: সেন্ট মার্টিনে বাড়ি কি এজন্যেই বানাচ্ছেন নাকি?
হুমায়ূন: সমু্দ্র হচ্ছে আমাদের মা। সমুদ্র আমাদের ডাকবে না তো কে ডাকবে? আমরা হচ্ছি স্তন্যপায়ী। তো আমরা উঠে এসেছি সমুদ্র থেকে। হঠাৎ করে একটা ডিসিশান হলো আমাদের। আমরা একদল স্থির করলাম যে শুকনাতেই থাকবো। আরেক দল বললো, না, আমরা অবশ্যই সমুদ্রে থাকবো। একটা দল থেকে গেলো সমুদ্রে। তারা কারা? তারা ডলফিন। তারা তিমি মাছ। তারা জলহস্তি। তাদের সব কয়টা স্তন্যপায়ী। আমরাও স্তন্যপায়ী। আমরা অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলাম যে, না, আমরা সমুদ্রে ফিরে যাবো না। আমরা এটাকেই এক্সপ্লোর করবো। তারা বললো যে, না, সমুদ্র বিশাল। তিন ভাগের দুইভাগই আমাদের হাতে, আমরা সমুদ্রেই থেকে যাবো। দুইটা ভাগে ভাগ হলাম আমরা। একটা খুব ক্রুশিয়াল মোমেন্টে একটা ভাগ উঠে আসলাম স্থলে। স্থলেই থেকে গেলাম। আরেকটা ভাগ, তারা কিন্তু সেইখানে ডেভেলপ করলো। পরম সৌভাগ্য, আমাদের আঙুল গজালো। যে গ্রুপটার আঙুল গজালো সেই গ্রুপটা, আমরা, টেকনোজিক্যালি ডেভেলপ করলাম। আমরা চলে গেলাম টেকনোলজিতে। তাদের আঙুল গজালো না। তাদের আঙুলের প্রয়োজন ছিলো না। তাদের গজালো ব্রেইন। ওদের ব্রেইন তো আমাদের ব্রেইনের ডাবল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি প্রশ্নটা করছি, কাদেরটা ছিলো বেটার ডিসিশন? আমাদের না ওদের? আমরা বলবো আমাদের ডিসিশন বেটার। আমরা টেকনোলজি পেয়েছি। হোল ইউনিভার্স আমরা এক্সপ্লোর করছি। তারা বলবে না, আমাদের ডিসিশন বেটার, আমাদের কোনো খাদ্যসমস্যা নাই, এবং আমরা ডেভেলপ করছি আমাদের চিন্তা। হয়তো তারা তাদের চিন্তার মাধ্যমে হোল ইউনিভার্সকে এক্সপ্লোর করে ফেলেছে এর মধ্যে। আমরা টেকনোলজিতে এগিয়েছি ঠিকই, কিন্তু কোনোদিকে যেতে পারছি না। যাদেরকে আমরা মনে করছি যে কিছুই না, জাস্ট মাছ, মাছ ছাড়া কিছুই না–দেখা গেলো তারা অনেক উপরের লেভেলে আছে। কাজেই এখানে একটা সাইন্স ফিকশনের উপাদান চলে আসছে। এটা নিয়ে আমি চিন্তা করছি এখন।
সাজ্জাদ: আপনার উপন্যাসে দেখেছি, মানবেতর যে-প্রাণ, এদের প্রতি আপনার একধরনের প্রচণ্ড টান আছে। আপনি গাছ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন–অন্যভুবন। আপনার পিপলী বেগম–পিঁপড়ের জগত নিয়ে। আপনি পোকা নামে বই লিখেছেন। এখন যে ধারণার কথা বলেছেন, জলচর প্রাণদের নিয়ে, বা আপনার সাইন্স ফিকশনের মধ্যেও দেখা যাবে, আপনি মানবেতর প্রাণের মধ্যে মানবিক জগৎ এক্সপ্লোর করেন।
হুমায়ূন: আমি তো এইভাবে কখনো চিন্তা করি নাই আসলে। গাছ আমাকে সবসময়ই আকর্ষণ করে। আমার মনে হয়, গাছের একটা ব্যাপার আছে, যা আমরা কোনোদিনই বুঝতে পারবো না। একটা গাছ তিন হাজার বছর বেঁচে আছে, কতো জ্ঞান সে আহরণ করেছে। সমস্ত পৃথিবীর যতো গাছ আছে সবার সঙ্গেই সে জ্ঞানের লেনদেন করেছে। গাছটার ক্ষমতা তীব্র ক্ষমতা, বিশাল ক্ষমতা। আমরা তার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমর ধারণা, আমি খুব কনভিন্সড্ আমরা একদিন গাছের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবো। যেদিন আমরা যোগাযোগ করতে পারবো, আমরা যে-বিষয়ে গবেষণা করছি জানার জন্যে যে সৃষ্টিটা কী, তখন আমাদের তা আর চিন্তা করতে হবে না। কারণ, গাছেরা এর মধ্যেই সেটা জেনে গেছে।
রাইসু: অন্যান্য লেখকদের যেমন শুধু মানুষের ব্যাপার থাকে। আপনার এরিয়া তো আরো বড়।
হুমায়ূন: এরিয়া নিয়ে আমি চিন্তা করি না। আমার মনে হয়েছে, যে-সব জিনিস আমাকে আলোড়িত করে সেসব নিয়ে আমার লেখা উচিৎ।
রাইসু: তার মানে আপনি উপন্যাস লেখেন কোনো একটা ঘটনা বা অভিজ্ঞতা থেকে চার্জড হয়ে, তারপর লিখতে লিখতে প্লট দাঁড় করান?
হুমায়ূন: দুই রকমই হয় । মাঝে মাঝে কোনো একটা প্লট থাকে মাথার ভিতরে, তারপর লেখা শুরু করি। কোনো কোনো সময় জাস্ট লেখা শুরু করি। সাত আট পৃষ্ঠা এগুনো যায়, লিখতে লিখতেই চরিত্রগগুলো এক সময় তৈরি হয়।
রাইসু: আর চরিত্রগগুলোকে তখন থামানো যায় না?
হুমায়ূন: এক পর্যায়ে চরিত্রগুলো আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাজ্জাদ: আপনার দ্বন্দ্ব হয় না চরিত্রের সঙ্গে?
হুমায়ূন: হ্যাঁ, কোনো কোনো সময় প্রবল, যেমন, কৃষ্ণপক্ষ–আমার মধ্যে ছিলো যে খুব হ্যাপি এন্ডিং দিয়ে একটা উপন্যাস আমি শেষ করবো। উপন্যাস পড়ার একটা আনন্দ আছে তো। যে, এরা দুজন সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো। এই ভেবে আমি শুরু করেছিলাম। শুরু করার পরে দেখা গেল যে চরিত্রটা অসুস্থ হয়ে পড়লো, তাকে বাঁচিয়ে রাখা আর সম্ভব হলো না। বহু চেষ্টা করেছি তাকে বাঁচিয়ে রাখার । অনেক, অনেক চেষ্টা করেছি।
রাইসু: যেসব চরিত্রগুলো বারবার আসে সেগুলো আপনার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব শেষ হচ্ছে না বলেই বারবার আসছে?
সাজ্জাদ: যেমন হিমু।
হূমায়ূন: হিমু নিয়ে মাথার মধ্যে আরেকটা লেখা আছে। হিমু আমার খুব একটা প্রিয় চরিত্র। হিমু অনেক কিছু করে যেগুলি আমরা করতে চাই, কিন্তু করতে পারি না। আমরা চাই যে, একটা জোৎস্না রাত্রিতে সারা রাত বনের ভেতর বসে থাকবো। জোৎস্না দেখবো, এটা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে আছে। কিন্তু আমরা জানি বাস্তবে এটা সম্ভব না। পোকায় কামড়াবে, পিঁপড়ায় ধরবে। সারারাত আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে চাই। এরকম আকাঙ্ক্ষা আমাদের আছে। আমাদের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। আমরা এগুলি পারছি না, কিন্তু আরেকজন পারছে, এবং নির্দ্বিধায় করছে। কোনো কিছুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা নাই। এই লোকটি সর্ব চাপ থেকে মুক্ত, কাজেই সে আমাদের খুব প্রিয় চরিত্র। আমরা তার মতো হতে চাই না, কিন্তু আমাদের একটা অংশ আছে সে সব সময় এই লোকটির সঙ্গে থাকতে চায়।
সাজ্জাদ: আপনার প্রায় সব উপন্যাসেই হিমু চরিত্রেরই কিছু কিছু অংশ কোনো কোনো চরিত্রের মধ্যে থাকে। মানে, একটা চরিত্র থাকে, যে কোনো কিছু মানতে চায় না। যা কেউ করতে পারে না, সে সেটা করে ফেলে।
হুমায়ূন: মহান একজন উপন্যাসিক থেকে ব্যাখ্যা দিচ্ছি–তার নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমার অসম্ভব প্রিয়। এবং তার যে কী পরিমাণ ক্ষমতা! তাঁর চরিত্র সৃষ্টির যে ক্ষমতা এবং মানুষের প্রতি তার যে মমতা–এগুলি যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে, তা শেখার জন্যে বিভূতিভূষণ পড়া দরকার। তার উপন্যাস যখন পড়ি, আমি লক্ষ করি, তার প্রত্যেকটি নায়ক আসলে অপু। আমি বলতে চাচ্ছি যে, যখন একজন লেখক লিখতে শুরু করেন, নিজেকে নিয়েই তিনি লেখেন। আসলে অপুটা তিনি নিজে। যে-উপন্যাসই তিনি লিখছেন, অপুই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। তাতে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আমি খুব বড় লেখকের উদাহরণ দিলাম। এমনও হতে পারে যে আমার নিজেরই এটা আছে, পুরোপুরি জানি না, সাবকনশাসে হয়তো আছে, এটাকে হয়তো বারবার আমার চোখের সামনে তুলে নিয়ে আসছি। প্রতিটি লেখক এক অর্থে ধর্মপ্রচারক।
সাজ্জাদ: আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কী প্রচার করেন?
হুমায়ূন: আমি প্রচার করি একটা জিনিস, খুব সচেতনভাবে করি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ হয়ে এ-পৃথিবীতে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি, এর চেয়ে বড়, এর চেয়ে বেশি আনন্দের আর কিছু নেই। মানুষ যে কী পরিমাণ ক্ষমতা রাখে! সীমাহীন ক্ষমতা তার। সীমাহীন ক্ষমতা এই অর্থে–যে তার চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। এতো ক্ষমতা নিয়ে যে প্রাণীটি এসেছে তার সেই প্রচণ্ড ক্ষমতা, প্রচণ্ড মানসিক গুণ–এগুলি নিয়ে বারবার মানুষকে বলতে চাই যে, তোমরা মানুষেরা এইরকম প্রাণী।
সাজ্জাদ: অন্য বিষয়, কোনো কোনো চরিত্রের প্রতি আপনি যতোটুকু মনোযোগ দেয়ার কথা ছিলো সে মনোযোগ আপনি দেন নি।
রাইসু: এটা একটা নিষ্ঠুরতা।
হুমায়ূন: এই নিষ্ঠুরতা আগেও আমি ফিল করেছি। আমাদের বিভূতিভূষণ কি দুর্গার প্রতি একটা নিষ্ঠুর উদাহরণ নয়? তাঁর এ অপরাধটা কখনও ক্ষমা করা যায় না। এতো বড়ো একজন লেখক, তিনি কি এই মেয়েটাকে আরেকটু বড়ো করে দেখাতে পারতেন না? নিশ্চয়ই পারতেন।
সাজ্জাদ: পথের পাঁচালী লিখলে আপনি নিশ্চয়ই দুর্গাকে মারতেন না?
হুমায়ূন: মারতাম। নয়তো নিজেই স্বস্তি পেতাম না। কিন্তু তার প্রতি আরেকটু মমতা দেখাতাম। মা যে-ব্যবহারটা তার প্রতি করেছে, যে পক্ষপাতটা মা অপুর প্রতি করেছে, তা আমি করতাম না। এবং মায়ের এই পক্ষপাতিত্ব আনাটা অন্যায় হয়েছে। এ কারণে যে, মা জানেন দুই দিন পরেই মেয়েটি চলে যাবে, এই অবস্থায় একটি মা কিন্তু এ রকম করে না; তখন অনেক বেশি আদর করে মেয়েকে। আমি হলে দেখাতাম, গভীর ভালোবাসায় মা মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরেছে। যাকে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হবে তাকে একটু মায়া-মমতা দেখাবো না, এতো নিষ্ঠুরতা আমার মধ্যে নেই।
রাইসু : আপনি তো সাইকোলজিক্যালি চরিত্রগুলিকে আনেন। ছোটো ছোটো ডায়ালগের মধ্য দিয়ে লেখেন। বর্ণনা আপনাকে বেশি দিতে হয় না। এটা কি নৈর্ব্যক্তিক থাকার চেষ্টা?
হুমায়ূন: চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে আমার খারাপ লাগে না। সে অতোটুকু লম্বা, তার গায়ের রং এই, তার চুলগুলি এই, তার চোখ এরকম, চোখের এখানে একাটা কাটা দাগ আছে, তার নিচের ঠোঁটটা চিকন, ওপরের ঠোঁটটা মোটা–বেশিরভাগ লেখকের মধ্যেই এটা আছে। এতে হয় কী তিনি বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আসেন। তিনি তার চোখে আমাকে দেখান। আমি সবসময় চাই আমার পাঠক চরিত্রগুলি নিয়ে নিজেরাই চিন্তা করুক।
রাইসু: আপনি তো লেখায় সাইকোলজিক… মানে সাইকোলজিক্যাল লজিক ইউজ করেন। এখন ধরেন আপনি একটা স্বাভাবিক ছেলে, মেয়েলী ছেলে না, তার মধ্যে মেয়েদের লজিক দিলেন। আপনার উপসন্যাস কি এগুবে?
হুমায়ূন: উদ্ভটভাবে এগুবে। কারণ হচ্ছে কী, আমাদের ভেতর নানান ধরনের লজিক কাজ করে, আমরা একটা দিককে প্রাধান্য দেই। অন্যান্য দিকগুলো, যেগুলিকে গুরুত্ব দিই না, কোনো বিশেষ সময়ে সমস্যায় সেগুলো চলে আসে।
সাজ্জাদ: আচ্ছা, আপনাকে যদি এরকম প্রশ্ন করা হয়, আপনি কোন উপন্যাসটা লিখতে পারলে খুশি হবেন? আমাদের বাংলা সাহিত্যের মধ্যে যেগুলো আছে, তার মধ্যে?
হুমায়ূন: আমি খুব আনন্দিত হতে পারতাম যদি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাসটা লিখতে পারতাম।
সাজ্জাদ: ধরা যাক আপনি একজন পাঠক, এখন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মধ্যে কী কী ত্রুটি আছে বলে আপনার মনে হয়?
হুমায়ূন: খুব তাড়াহুড়ার একটা ভাব তার আছে। ইচ্ছা করলেই তিনি আরেকটু মনোযোগী হতে পারতেন। এ ছাড়া তিনি যে জাতীয় সংলাপ লিখছেন, এ জাতীয় এতো ইন্টারেস্টিং সংলাপ আমরা সচরাচর দেখি না। একথা আমার প্রায়ই মনে হয় যে তিনি জোর করে কোনোকিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেন কিনা?
#
(কোথায় ছাপা হইছে ও কবে জানা গেলে জানানো হবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১২ বিকাল ৩:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



