
একটা সুস্থ মানুষ কখনও তার বাবা মাকে খুন করে না, করতে পারেনা। শুধু বড় কোন অসুখ হলেই কেবল মানুষের পক্ষে খুন করা সম্ভব হয়। এই অসুখটা হল মনের। ঐশীর অনেক বড় একটা মনের অসুখ হয়েছিল! আমরা তার অসুখটা সারাতে চাইনি, চেষ্টাও করিনি।
আমাদের আচরণটা হল- যেহেতু অসুখটি আমরা সারিয়ে তুলতে পারবো না তাই রুগীকে মেরে ফেল। আমরা রুগীকে মেরে ফেলতে চাচ্ছি। অসুখ দূর করতে চেষ্টাও করলাম না।
গতকাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যা মামলায় তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। অপরাধের বিচার অবশ্যই চাই। ঐশীর অপরাধ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। কিন্তু সেই অপরাধের শাস্তি যদি মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় তাহলে আদালতও ঐশীর অসুখেই অসুস্থ!
ঐশী এই অসুখ নিয়ে জন্মায়নি। ঐশীর সমাজ, পরিবেশ, পরিবার, মাদক ঐশীকে অসুস্থ করে তুলেছিল। কৈশোর পেরুবার আগেই মেয়েটিকে মাদক গ্রাস করলো। যৌবনে পা দেয়ার আগেই আমরা তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছি। সব দোষ মেয়ের উপর দিয়ে দাঁয় এড়াতে চাচ্ছি।
তার বাবা পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ঐশীকে প্রতিমাসে হাতখরচ বাবদ লক্ষাধিক টাকা দিতেন। টাকা হাতে পেয়ে মেয়ে বখে গিয়েছে, খারাপ বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে আসক্ত হয়ে পড়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্যে। একদিন হয়তো মাহফুজ সাহেব অথবা তার কোন সহকর্মীই এই মাদক বিস্তারে প্রতিরোধ করেননি। ব্যাপারটা যেন প্রতিদানের মত, মাহফুজ সাহেবরা মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে গ্রহন করা টাকা সন্তানকে দিয়েছিলেন হাত খরচের জন্য। আর ঐশীরা মাদকের বিনিময়ে সে টাকা তুলে দিচ্ছে মাদক কারবারিদের হাতে।
অথবা মাদক ব্যবসা করে কামানো অঢেল অর্থের কিছু অংশও যখন কোন এক মাদক কারবারি তার সন্তানকে দেন হাত খরচের জন্য। হয়তো তার সন্তানও তারই কোন সহকারবারির কাছে সে অর্থ তুলে দেন মাদকের জন্য। অর্থাৎ আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে ধ্বংস করে দিচ্ছি।
স্কুলের বয়স রেকর্ড ও জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট থেকে আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত ঐশীর বয়স জানা গিয়েছিল ১৭ বছর। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে এসব গায়েব করে তার বিচার হল সাধারণ আদালতে।
হয়তো আরও অনেক পুলিশ অফিসারই ঐশী আতঙ্কে ভুগছেন তাই তারা তাদের বখে যাওয়া সন্তানদের কোন এক বিশেষ ম্যাসেজ দিতে চাচ্ছেন।
ঐশীর লেখা সুইসাইড নোট পড়লে তার অসুখটা হয়তো কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন। বাবা মাকে নিয়ে লিখেছে- “তারা কোন দিনও আমাকে বুঝতে পারেনি। আমার অনেক খারাপ দিক আছে- সেই খারাপ দিকগুলো চালাকি করে বুঝে ফেলা ছাড়া ভালো দিক গুলো কখনোই তারা বোঝার চেষ্টা করেছে কিনা সন্দেহ”
যে ঐশীকে আমরা তৈরি করেছি সে তার বাবা মাকে খুন না করলে হয়তো নিজেকেই খুন করতো!
আমি বলছিনা ঐশী নির্দোষ। আদালতের রায়কেও অবজ্ঞা করছিনা, শুধু বলছি-একটা বাচ্চা মেয়ের ঐশী হয়ে ওঠার পেছনের নায়কদের বিচার করুন। আমাদের বিচার করুন।
একটা মানুষ কখনও তার বাবা মাকে খুন করতে পারেনা! বাবা মাকে শুধু ভালোবাসা যায়, শ্রদ্ধা করা যায়, খুন করা যায় না। যদি করে তাহলে বুঝতে হবে কোন সমস্যা আছে! আমরা সে সমস্যা দূর করার চেষ্টা না করে, তাকে সুস্থ করার চেষ্টা না করে নিজেরাও অসুস্থের মত তাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চাচ্ছি। একজন অপরাধীকে অপরাধ প্রবণ মানসিকতা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারার চেয়ে বড় সার্থকতা আর কি হতে পারে!
আসুন, সবার আগে আমরা সুস্থ হই। একটা সুস্থ পরিবেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাই। সাধারণ একটি মেয়ের ঐশী হয়ে উঠার পেছনের নায়ক আমরাই। এ সমাজ ! এ দায় আমরা এড়াতে পারিনা কোনভাবেই। তাই আমাদের ও বিচার চাই। আমাদেরও চিকিৎসা চাই!
লেখকঃ তানভীরুল হাকিম মিরাজ
ফ্রিলান্স সাংবাদিক, ব্লগার
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


