somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাকা এবং আশ্চর্য সোনার মেডেল

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শরীরটা জ্বলে যায়, পুড়ে যায়! বড় আমগাছটার বুনট ছায়ায় বসিয়ে টিউবয়েলের ঠাণ্ডা জলে ঘন ঘন গামছা ভিজিয়ে গা মুছিয়ে দিলেও জ্বালা কমে না; ভেজা গামছা গায়ে জড়িয়ে রাখলেও স্বস্তি মেলে না। চামড়ার নিচে রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে, আর কাতরাতে থাকে বাদল। রোদ যতো চড়ে রক্তের টগবগানি ততো যেন বাড়ে!

রুদ্র গ্রীষ্ম উত্তপ্ত জিভ দিয়ে গাছপালা চাটে, নদী-পকুর চাটে, মানুষ-প্রাণিকুল চাটে; চেটে চেটে রস নিংড়ে-শুষে নেয়। কষ্ট হলেও সবাই সইতে পারে, বাদল পারে না। শেষ পর্যন্ত মনোজদের ধান সিদ্ধ করা মানুষ সমান লম্বা তাফালটা এনে তাতে জল দিয়ে টাকিমাছ জিয়োনোর মতো জিইয়ে রাখা হয়েছে, মানে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে বাদলকে। সেই জলও কিছুক্ষণ পরই তপ্ত হয়ে যায় গায়ের গরমে, বাদলের বউ চায়না ঘন ঘন জল বদলে দেয়। সংসারের কাজ সামলাতে জল বদলাতে একটু দেরি হলেই চায়নার ওপর চোখ রাঙায় সে, দীর্ঘদিনের স্বভাববশত শীর্ণ হাত দিয়ে চড়-চিমটিও মারে! বাদলের পেশিবহুল ঘাম চকচকে লাঙলের কড়া পড়া হাতের মার খেয়েও চায়না কোনোদিন টু শব্দ করেনি, বড়জোর কিছুক্ষণ মুখ ভার করে থেকেছে। স্বামী থাকলে ঠ্যাঙাবেই, গরু ঠ্যাঙানো নড়ি দিয়ে ঠ্যাঙাবে, খেতে বসে পাছার নিচের পিঁড়ি দিয়ে ঠ্যাঙাবে, কড়া পড়া হাত দিয়ে ঠ্যাঙাবে, হাতের কাছে ঘটি-বাটি যা পাবে তাই দিয়েই ঠ্যাঙাবে! ঠ্যাঙাবে আবার সোহাগও করবে! এমনটাই জেনেছে চায়না, জেনেছে তার মা-জেঠিমাকে দেখে। চায়নার বাবা-জ্যাঠার হাতে ঠ্যাঙানি খেয়ে মা-জেঠিমা মুখ ভার করে থাকলে তার ঠাকুমা বলতো, ‘বিটামানষির ঠ্যাঙানি খায়ে মুখ ভার করে থাকলি কি চলে! বিটামানুষ ঠ্যাঙাবি, ভাত-কাপড় দিবি, আবার সোহাগও সে-ই করবি!’ এরপরই ঠাকুমা তার ঠাকুমার মুখে শোনা পুরুষের স্বভাব সম্পর্কিত প্রবাদ বচন বলতো, ‘যহন আদর জোটে ফুটকলাই দিয়ে ফোটে, যহন আদর টুটে ঢেঁহি দিয়ে কোটে!’

অথচ সেই চায়না এখন প্রায় গরু ঠ্যাঙানো নড়ির মতো বাদলের শীর্ণ হাতের হালকা চড়-চিমটিতেও কেঁদে চোখের জল ঝরায়; শরীরের ব্যথায় নয়, অন্তরের ব্যথায়। আর তার চোখের নোনা জল চেটে খায় শাড়ির আঁচল!

প্রায় সারাদিনই জলে জিইয়ে থাকে বাদল। জলের মধ্যে শুয়ে শুয়ে আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছোপ ছোপ আকাশ দ্যাখে; গাছের ডালে বসা চড়ুই দম্পতির খুনসুটি, ভালবাসা, আদরের বিনিময় দ্যাখে। দেখে বুঝিবা তার অন্তরেও ভালবাসা জেগে ওঠে, তখন চায়নাকে ডেকে কাছে বসায়। কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করলে কথা বলে না, তাকিয়ে থাকে চায়নার মুখের দিকে। চায়নার গালে হাত বুলিয়ে বলে, ‘আমি খুব খারাপ না! তোমারে কতো মারিচি। এ আমার পাপের শাস্তি!’
চায়না তখন শব্দ করে কেঁদে ওঠে! ছেলে-মেয়েরা কান্নার শব্দ শুনে এগিয়ে এসে মায়ের গালে বাবার সোহাগের হাত দেখে থমকে দাঁড়ায়।

এখন আর শক্ত কিছু গিলতে পারে না বাদল। ভাত ফুটিয়ে পাতলা জাউ বানিয়ে চামচে খাইয়ে দেয় কখনও চায়না কখনওবা মেয়ে। চামচে পাতলা জাউ খেতে খেতে পুরনো স্মৃৃতি ফিরে আসে বাদলের মনের পর্দায়। লাঙল ঠেলে এসে শুধু কাঁচা কিংবা পোড়া শুকনো মরিচ, ঘানিতে ভাঙানো সরিষার তেল আর এক চিমটি লবন দিয়ে মাখিয়ে এক গামলা ভাত সাবার করে দিতে পারতো সে। আর এখন কয়েক চামচ জাউ-ও গলা দিয়ে নামতে চায় না! চোখের জল গড়িয়ে নামে তার কানের পাশ দিয়ে।

ছেলেটা ক্লাস টেনে পড়ে, কাছে এসে দাঁড়ালে বুকটা হুহু করে বাদলের। ওর আর পড়াশোনা হবে না, ওকেও হয়তো তারই মতো বর্গা জমি চষে খেতে হবে। একটা হালের বলদ আর গাড়ি আছে, বিনোদ নয়তো অন্য কারো বলদ নিয়ে ভাগে টানতে হবে ধান কিংবা অন্য ফসল, এমনকি লাঙলও। একদিন হয়তো ওকেও মরতে হবে তারই....না, না, ও বাঁচুক, তার মতো দশা যেন ওর না হয়।

তার মতো দশা যাতে না হয় সে জন্য কষ্ট হলেও ছেলেটাকে স্কুলে দিয়েছিল সে, স্কুল কামাই করলে গরুর নড়ি দিয়ে পিটিয়েছে ছেলেকে। পড়ায় খুব একটা ভাল না হলেও পাস করে যায়। কিন্তু সে না থাকলে তো ওকেই ধরতে হবে সংসারের হাল, গাড়িতে টানতে হবে অন্যের ফসল, ঠেলতে হবে লাঙল, বইতে হবে ঋণের বোঝা, বিবাহিত বড়বোনের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে গেলেও খেতে-পরতে দিতে হবে মা আর ছোট বোনকে, বিয়েও দিতে হবে ছোট বোনটাকে। ওর কৈশোরের অপক্ক কাঁধটা ঋজু হয়ে যাবে, আর সোজা হবে না কোনোদিনই। গুছিয়ে ভাবতে না পারলেও এমনটাই ভাবে বাদল, বড় এলোমেলো আর দিশেহারা সে ভাবনা।

তাফালের জলের মধ্যে শুয়ে থাকতে থাকতে কখনও কখনও ঘুমিয়ে পড়ে বাদল। সে ঘুমাতেই চায়, ঘুমালে শরীরের জ্বালা টের পাওয়া যায় না। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ ঘুমের মাঝেও শান্তি পাচ্ছে না, ঘুমালেই বীভৎস একটা স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে যায়। বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না ঘুম। এমনকি আধো ঘুম আধো জাগরণেও স্বপ্নটা তাড়া করে তাকে। বড় ভয়ানক স্বপ্ন!

বয়রার মাঠ দিয়ে তিন মানুষ সমান বৃহৎ দুটো চাকা আসে গড়াতে গড়াতে! চাকা দুটো কাঠের, লোহার না রাবারের তা ঠিক বুঝতে পারে না সে। চাকা দুটো ক্রমশ এগিয়ে আসে ধানক্ষেত ছেড়ে হালটের দিকে। চাকার নিচে পড়ে পিষ্ট হয় তার পূর্ব-পুরুষ, ঠাকুরদার বাবার বাবা, ঠাকুরদার বাবা, ঠাকুরদা। মুহূর্তেই হালট মাটির রাস্তা হয়ে যায়, চাকার নিচে পিষ্ট হয় তার বাবা-কাকা। এবার মাটির রাস্তা রূপান্তরিত হয় পাকা রাস্তায়, ভয়ানক দৈত্যাকৃতির চাকা দুটো এগিয়ে আসে তার দিকে। বিনা প্রতিরোধে তার শরীরের নিচের অংশ চাপা পড়ে চাকার নিচে। পিছনে দাঁড়ানো তার পনের বছরের ছেলে, তাকে পিষেই চাকা এগিয়ে যাবে ছেলের দিকে, তখনই চিৎকার করে ওঠে সে। ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু মগজ আচ্ছন্ন করে রাখে দুটো চাকা!

দলে দলে মানুষ আসে বাদলকে দেখতে, শেষ দেখা। শেষ জবাব দিয়ে দিয়েছে ডাক্তার। যারা তাকে দেখতে আসে, তাদের মুখে ছড়িয়ে থাকে বিষাদ। তারা দরদ মাখা কথা বলে, ভগবানকে ডাকতে বলে। দাদুর মৃত্যুর কথা মনে পড়ে তার। দাদু অবশ্য বুড়োকালেই মরেছিল, রোগে ভুগে। দলে দলে মানুষ দাদুকে দেখতে আসতো। তারপর একদিন বিকেলে সবার চোখের সামনে দাদু মরে গেল। কোনোদিন সুখ পায়নি দাদু, অভাবের সাথে যুঝতে যুঝতেই তার জীবন শেষ হয়েছিল, তবু তার দাদনের টাকা শোধ হয়নি।

সুখ তার বাবাও পায়নি, মহাজনের সুদের জাল থেকে মুক্তি মেলেনি বাবার। মহাজন ঋণের টাকা শোধ না হতেই আবার ঋণ নেবার হুকুম জারি করতো, নয়তো ঋণের টাকা একবারে ফেরত চাইতো। ফেরত দেবার সাধ্য ছিল না বাবার, তাই আবার ঋণ নিতো।

সাবানের ফেনার মতো বাড়তো ঋণের সুদ, তাতে ডুবে থাকতো বাবা। সব মনে আছে বাদলের। তারপর একদিন সুদ সমেত একবোঝা টাকার ঋণ রেখে বাবা ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মরলো দয়ারামপুর হাটে গরু বেচে ফেরার সময়। একটা দুধেল গাই আর দুটো এঁড়ে বেচা টাকায় ঋণের বোঝা কিছুটা কমাতে চেয়েছিল বাবা। কিন্তু অপঘাতে বাবার জীবন গেল, সেই সাথে উধাও হলো গরু বেচা টাকা। ঋণের ভার যেমনি ছিল তেমনি রইলো, তার ওপর চাপতে লাগলো সুদের বোঝা। সব ভার এসে পড়েছিল তার অপোক্ত কাঁধে। কিছুদিন পরেই তার উপলব্ধি হয়েছিল, বাবা তো মরলোই, তাকেও মেরে গেল!

এদেশের অধিকাংশ নিন্মবিত্ত মানুষ কেবল নিজে মরে না, স্ত্রী-সন্তানদেরকেও মেরে যায়। বাদল যেন এই কথাটাই পুনরায় প্রমাণ করতে চলেছে। সেও তার বাবার মতো ছেলের মাথায় একবোঝা ঋণ রেখে মরতে চলেছে। কিন্তু সে কখনও চায়নি তার ছেলের মাথায় ঋণের বোঝা চাপিয়ে মরতে। ঋণের বোঝার ওজন কতো তা সেই প্রথম যৌবনেই সে বুঝেছিল। আসলে কি থেকে যে কি হয়ে গেল তা ঠিক মতো বুঝেও উঠতে পারেনি সে। ঐ যে শহর থেকে চকচকে পোশাক পরে ভদ্দরলোক ঋণবাবুরা এলো, সুন্দর করে কথা বললো; উন্নয়নের কথা, তাদের দারিদ্র্যতার কথা, দারিদ্র্যতা থেকে মুক্তির কথা, সচ্ছল সুন্দর হাসি-খুশি জীবনের কথা; কার না ভাল লাগে এসব কথা শুনতে! তারও লেগেছিল, লেগেছিল বলেই বউয়ের নামে একখানা বই করলো, ঋণও নিলো। ঋণ নিয়ে ছন ফেলে টিনের চালার ঘর তুললো। তারপর ফুরোলে আবার ঋণ। এরই মধ্যে অন্য পাড়াতে অন্য সংস্থার ঋণবাবু এলো, গায়ে ভুরভুর করা সুগন্ধ, পায়ে যতো না চকচকে জুতো তার চেয়ে বেশি চকচকে তাদের মুখের কথা! বউয়ের নামে খুললো আরও একখানা বই।

ঋণ নেয়, ঋণ শোধ হতেই আবার ঋণ নেবার জন্য পীড়াপীড়ি করে ঋণবাবুরা; নইলে ডিপিএস বই বাতিল করার হুমকি দেয়। কিন্তু ডিপিএস ভাঙলে চলবে কেন, ছোট মেয়ের বিয়ের সময় লাগবে না! ছেলে-মেয়ের নিরাপদ আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েই ডিপিএস খুলিয়েছিল ঋণবাবুরা, ডিপিএস যে শিকল দিয়ে বাঁধার কৌশল তা সে বুঝেছে অনেক পরে। ঋণের টাকা তুলে আনে চায়না, কম টাকা তুলতে চাইলেও জোর করে বেশি টাকা তুলতে বাধ্য করে ঋণবাবু আর তার ওপরের ম্যানেজার। একটার টাকা দিয়ে অন্যটার কিস্তি শোধ করতে থাকে। তাতেও শোধ হয় না, বর্গা খাটা জমির ফসল বেচে ঋণের টাকা শোধ করতে হয়, এবাড়ি-ওবাড়ি জন খাটতে হয়। তাতেও শোধ হতে চায় না। একটা কিস্তি দিতে না পারলেই হুমকি দেয় ঋণবাবুরা, কারো কারো ঘরের জিনিসপত্র, দুধেল গাই নিয়ে যায়। স্বচ্ছল-সুন্দর হাসি খুশি জীবন অধরাই থেকে যায় বাদলের। বাদলের মতো আরও অনেকের।

সপ্তাহের কিস্তির টাকা শোধ করতে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো বাদলকে। আধপেটা খেয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে করতেই গ্যাস্ট্রিক বাধায় সে। বাজারের নীরোদ ডাক্তারের ওষুধ খেতো, তবু বুক-পেট জ্বলা কমতো না। নীরোদ ডাক্তরের ওষুধে কাজ না হলে যায় উপজেলার সরকারী হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার শরীরের কয়েক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ফল দেখে জানায় তার আলসার হয়েছে। ডাক্তারের কথা মতো দু-তিন মাস ওষুধ খায়, কিন্তু তাতেও কাজ হয় না। বুক-পেটের জ্বালা কমে না, কেবল শরীরের জোর কমতে থাকে। মাঠে খাটতে কষ্ট হয়, অথচ মাঠে খাটতে না পারলে পেটের ভাত জুটবে না, কিস্তির টাকা জুটবে না। এদিকে কিস্তি শোধ হতেই আবার ঋণ নেবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে ঋণবাবু, নইলে ডিপিএস বাতিল হয়ে যাবে। শেষবার দশ হাজার টাকা তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু ঋণবাবু সে কথা কানেই তোলেনি; জোর করে বিশ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছে। তার থেকে কিছু টাকা নিয়েই গিয়েছিল জেলা সদরে আরও বড় ডাক্তারের কাছে। এবারও ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেয়, পেট কেটে নমুনা পাঠায় ঢাকায়। দিন কয়েক বাদে রিপোর্ট এলে জানা যায় পৃথিবীতে তার ভাগের বায়ু প্রায় শেষ, ক্যান্সার!

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ার সাধ্য তার নেই, আর যায়নি ডাক্তারের কাছে। তারপর কেটে গেছে কয়েক মাস। কর্মক্ষমতা পুরোপুরি হায়িয়েছে, শরীর শুকিয়ে গেছে, গায়ের রঙ হয়ে গেছে কয়লার মতো! কিস্তির টাকা দিতে পারেনি বলে জোর করে একটা গরু নিয়ে গেছে ঋণবাবু। আরেকটা সমিতির ঋণবাবু বউকে হুমকি দিয়েছে ডিপিএস ভেঙে টাকা নেবার। তার দিন প্রায় শেষ, সেও তার বাবার মতো ঋণের ভার চাপিয়ে যাচ্ছে কচি ছেলের অপোক্ত কাঁধে!

বাদল অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব বোঝে না, বোঝে না হিসাব বিজ্ঞান কিংবা সমাজ বিজ্ঞানের ভাষাও; তবে ঋণের জোয়াল টানতে টানতে নিজের নিষ্পেষিত জীবনের অভিজ্ঞতায় এইটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, ঋণবাবুরা যতো চটকদার কথাই বলুক আর মাটিতে দাঁড়িয়ে যতোই আকাশের রঙিন স্বপ্নঘুড়ি দেখাক, তার কিংবা তাদের মতো কৃষকের জন্য এই ঋণ গলার ফাঁস! যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে তারা ঋণের টাকার সুফল পেলেও পেতে পারে, কিন্তু যারা তার মতো স্বল্প জমির মালিক কিংবা বর্গাচাষী, শরীরের ঘাম নিংড়ে মাটির সাথে যুদ্ধ করে যাদের ফসল ফলাতে হয়, ঋণের টাকা তাদের কাছে এক লোভনীয় আলোকরশ্মির আড়ালে গলার ফাঁস ব্যতিত কিছু নয়। কিন্তু এই উপলব্ধি যতোক্ষণে হয়েছে বাদলের, ততোক্ষণে ফাঁস তার গলায় আটকে গেছে, মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পায়নি সে।
দুপুরের পর পর তাফাল থেকে তুলে কয়েক চামচ জাউ খাইয়ে বারান্দায় শোয়ানোর কিছুক্ষণ পর থেকেই কথা বন্ধ হয়ে গেছে বাদলের। হাত-পা অসার। কেবল চোখ দুটো নড়ছে, দৃষ্টি ঘুরে ফিরছে প্রিয়জনদের মুখে। কি যেন বলতে চাইছে অথচ বলতে না পারার অক্ষমতা দৃষ্টিতে। দুু’চোখের কোনা বেয়ে জল গড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে নেমে হারিয়ে যাচ্ছে তৈলাক্ত-আঠালো চুলের মধ্যে।

বাদলের চোখে ভাসছে সেই চাকা দুটি! গড়াতে গড়াতে ক্রমশ কাছে আসছে। যতো কাছে আসছে, ততো অস্থির হচ্ছে তার চোখের মণি! চাকা দুটি একই গতিতে এগিয়ে আসছে। হালট ছেড়ে মাটির রাস্তায়, মাটির রাস্তা ছেড়ে পাকা রাস্তায়; শরীরের নিচের অংশ পিষে চাকা ক্রমশ উঠে আসছে বুকের ওপর, দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। কী আশ্চর্য! চাকা দুটোর মাঝ বরাবর শূন্যে ভাসছে একটি সোনার মেডেল! আশ্চর্য সোনার মেডেল থেকে আলো ঠিকরে বেরিয়ে ধাঁধিয়ে দিচ্ছে তার চোখ!

তার হাঁ করা মুখে আঁজলায় করে ফোঁটা ফোঁটা জল দিচ্ছে আপনজনেরা, কানের কাছে মুখ নিয়ে জপ করছে হরিনাম। ক্রমশ যেন হরিনামের চিৎকার দূরে চলে যাচ্ছে, সোনার মেডেলের আলোর ধাঁধায় স্থির হচ্ছে তার চোখের মণি; ম্রিয়মাণ চোখের দৃষ্টিতে তবু যেন চাকা রুখে দেবার অকৃত্রিম দৃঢ়তা আর আলোকোজ্জ্বল আশ্চর্য সোনার মেডেলের প্রতি তীব্র ঘৃণা!


মিরপুর-৬, ঢাকা।
সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০১৭ রাত ১০:১৫
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছে! আগেই কি ভালো ছিলাম?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে! আগে এমনটা দেখা গেলেও গত কয়েক বছর এটা অতি বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। কেন??

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×