somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তোকেও বলি মা- জীবনে অনেক বড় অমানুষ হ

২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





আমাদের মা-টা ভারতের দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে- বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে- ফ্যাশন ডিজাইনে, আর বিশ্বভারতীতে- ইংলিশে। ওর বাবার ইচ্ছে ছিল- ওকে মেডিকেলে পড়ানোর, কোচিং-ও করেছে। আমি আগেই বলেছিলাম, ‘মেডিকেলের কোচিং করানোর দরকার নেই, ও মেডিকেলের জন্য নয়।’ ওর বাবা-মা আমাকে কথা শুনিয়েছে। ওরা ওকে জন্ম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানসিক গড়ন তো আমার হাতে। তাই আমার চেয়ে ওকে আর বেশি কে চেনে!
ওর বাবার ধারণা আমি জীবনে কিছু করতে পারিনি। মানে মানুষ হইনি, অমানুষ হয়েছি। ভাগ্নিটাকেও অমানুষ বানিয়েছি। আমার বাবার ধারণাও তাই ছিল যে আমি সেই অর্থে মানুষ হতে পারিনি, সমাজ যাকে মানুষ হওয়া বলে! কিন্তু আমার মা বলতেন, ‘আমার মেজদার চার ছেলে যা না করবে, আমার মিশু একাই তা করবে। ও মানুষ হবেই।’

নিজের দাদার কাছ থেকে মানসিক আঘাত পেয়ে মা এই কথা বলেছিলেন, যা আজও আমার কানে বাজে। আমাকে তাড়িত করে সামনে ছুটতে।

আমার ইচ্ছে ছিল চারুকলায় পড়ার, বাবা পড়তে দেননি পাশের বাড়ির এক কাকার পরামর্শে। তারপর বললাম ফিল্মে পড়ি, সেটাও দিলেন না। এসব পড়লে নাকি ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তখন এত টেলিভিশন ছিল না, ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না, জানাশোনা ছিল সীমিত, অল্প বয়স নিজেও সাহস করতে পারিনি। ফলে আমাকে বিবিএ করতে হলো- ফিন্যান্সে। সে-এক বিষাদগ্রস্ত শিক্ষাজীবন!

কিন্তু সাহিত্যচর্চা, আবৃত্তি, থিয়েটার এসব চালিয়ে গেছি। ক্লাস ফাইভে দেবদাস পড়েছিলাম, তখনই বোধহয় নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল আমার ভাগ্য যে- আমি সারাজীবন লেখাপড়া নিয়েই থাকব।

ভাগ্নিটাকেও ছোট থেকেই পড়ার অভ্যাস তৈরি করেছি। স্কুলে থাকতেই ক্লাসিক সাহিত্য হাতে ধরিয়ে দিয়েছি একটার পর একটা। বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে সাহিত্য পড়ত। ধরা পড়লে ওর মায়ের হাতে মার খেত, আমি বাঁচাতে গেলে আমার কপালেও জুটত মার। মামা-ভাগ্নি কতদিন যে এমন মার খেয়েছি, তার ঠিক নেই! এইতো পনের মাস আগে দিদি অসুস্থ হবার আগেও আমরা মার খেয়েছি! আমার দোষ একটাই- আমি অমানুষ হয়েছি, ভাগ্নিকেও অমানুষ বানাচ্ছি। বই পড়ে, ছবি আঁকে অমানুষেরা!

সারাজীবন এই কলঙ্ক আমাকে বইতে হবে যে আমার জন্য অহনা মেডিকেলে চান্স পায়নি, আমি ওকে ভালো শিক্ষা দেইনি।

অহনাও চারুকলায় পড়তে চেয়েছিল, ওর বাবাকে বোঝায় সাধ্য কার! তিনি শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা দু-চোক্ষে দেখতে পারেন না। আমার জীবনে অর্থ-বিত্ত হয়নি সে-জন্যই হয়ত। আমি শুরু থেকেই বলে আসছিলাম ওকে দেশে পড়ানো যাবে না। যখন মেডিকেলে চান্স পেল না, তখন শুরু হলো নতুন লড়াই, কোথায় পড়বে, কোন বিষয়ে পড়বে তা নিয়ে। ভারতের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা হয়। পড়ার বিষয় নিয়ে আমি কথা বলতে গেলেই ওর বাবার সাথে ঝগড়া লেগে যেত, ফলে তাকে বোঝানোর দায়িত্ব দিলাম নিষাদকে। নিষাদ কেবল ছোট ভাই বা বন্ধু নয়, নিজগুণে ও আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছে। অহনার মানসিক গড়নে নিষাদেরও ভূমিকা আছে। নিষাদ দিনের পর দিন আমার ভগ্নীপতিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যাতে অহনা ওর পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারে। আরেকটি বোন প্রীতিলতা, ভারতে থাকে, সে-ও চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছুতেই রাজি করানো যায়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিই যাতে মানসিকভাবে ভালো থাকে। ড্যাফোডিলে থিয়েটার ক্লাবে জয়েন করে এরই মধ্যে তিন-চারটি প্রোডাকশনে কাজ করেছে, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় গেছে। শিক্ষক-সহপাঠীদের প্রশংসা পেয়েছে। আর দেরি করে বাসায় ফেরায় রোজ বকা খেয়েছে!

মাসখানেক আগে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার মেইল এসেছে। কিন্তু কিছুতেই ওর বাবা ফ্যাশন ডিজাইনে পড়াতে রাজি নয়। নানাভাবে বুঝিয়েও নিষাদ ব্যর্থ। শেষে আমরা এক কৌশল অবলম্বন করলাম। তাকে বোঝানো হলো যে ভর্তি হোক- ওখানে গিয়ে পরে সাবজেক্ট বদলানো যাবে। তাতে রাজি হলো। ভর্তি হলো বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ভিসার আবেদন না করে আমরা অপেক্ষা করছিলাম বিশ্বভারতীর জন্য। সপ্তাহখানেক আগে বিশ্বভারতীর ইন্টারভিউ হলো। কী প্রশ্ন ছিল সেই ইন্টারভিউতে? সারাজীবন ও যে কারণে মার খেয়েছে, তা নিয়েই ইন্টারভিউ! ও কী কী বই পড়েছে, সেইসব বইয়ের কাহিনী এবং চরিত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করেছে। আজ সন্ধেয় বিশ্বভারতীর মেইল এসেছে, ও চান্স পেয়েছে বিশ্বভারতীতে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী, স্বপ্নের বিশ্বভারতী! জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করি না, করলে পরজন্মে ওখানেই পড়তে চাইতাম!

আমি দীর্ঘদিন ধরেই একটা বিষয় ভাবি যে- আমি তো মাদকাসক্ত, মাস্তান, চাঁদাবাজও হতে পারতাম! তা না হয়ে লেখক হয়েছি, সাংবাদিক হয়েছি। তাতেও আমি আমার বাবাকে খুশি করতে পারিনি। অথচ অনেক বাবা-মা-ই হয়ত আমার মতো ছেলে কামনা করেছে, কিন্তু তারা পেয়েছে হয়ত- মাদকাসক্ত কিংবা বখাটে। পৃথিবীর কী নিষ্ঠুর পরিহাস!

এই উপমহাদেশের অনেক বাবা-মায়ের হয়ত গর্বে বুক ভরে যেত- তাদের মেয়ে বিনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর বিশ্বভারতীতে পড়ার সুযোগ পেলে। কিন্তু আমার ভগ্নীপতি সারাজীবন কষ্ট বয়ে বেড়াবে মেয়ে ডাক্তার হয়নি বলে! আর মনে মনে আমার ওপর ক্ষোভ ঝাড়বে- তাদের মেয়েকে অমানুষ বানানোর দায়ে।
কদিন আগে তিনি আমাকে বললেন, ‘মেয়েকে কী শিক্ষা দিয়েছ তুমি!’

আমি বললাম, ‘মেয়েকে এমন শিক্ষা দিয়েছি যে- এই মেয়ে কোনোদিন আপনাকে লাথি-ঝাঁটা মারবে না, বুড়োকালে আদরে-যত্নে রাখবে।’

আমি মানুষ হতে পারিনি, বেঁচে থাকলে আরও বড় অমানুষ হবো, তোকেও বলি মা- জীবনে অনেক বড় অমানুষ হ।

লেখাটা লিখলাম সেইসব বাবা-মায়েদের জন্য, যারা সন্তানকে কেবল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চান, কিন্তু সন্তানের প্রাণের কথা শোনেন না। আপনি একদিন পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেবেন, দু-দিনের দুনিয়ায় শুধু শুধু সন্তানকে কেন একটি বিষাদগ্রস্ত জীবন দিয়ে যাবেন?

ঢাকা
২১ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×