আমার ক্রেডিট রিপোর্ট ভাল না। কোন দিক দিয়েই নয়। কাজ করতে গেলে পাঁতিল কালো হয়না। আমি নাকি কাম চোর। কিছুদিন পর পরই কাজ চলে যায়। আবার নিতে হয়। অবশ্য কাজ আমি ছাড়িনা, কাজই আমাকে ছাড়ে। তারপর ও কাজ একটা করতে হয়। কাজ না করলে চলে না। যাকে বলে ডিউটি। এই ডিউটি করতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়। তারই কিছু ঘটনা বলব। অবশ্য পাঠকের ধৈর্য্যশক্তির আওতার বাইরে গেলে বন্ধ করে দেবার ক্ষমতা পাঠকের আছে।
সেদিন আমার ডিউটি পড়েছিল ধনে পাতা সরবরাহ করা। সকালের দিকে আমার বস বললেন, কাল ধনে পাতা আনতে ভুলে গেছি। নিয়ে এস। (কানে কানে বলি, ধনে পাতা আনার ডিউটি কিন্তু বসের, আমার নয়। ওসব সহজ ডিউটি আমাকে দেয়া হয়না। বসের এরকম ভুল হলে দায়িত্ব পরে আমার উপর)।
এই সহজ কাজটা পেয়ে বেশ খুশি হলাম। বেশিদূর যেতে হবে না। ড্যানফোর্থে বাংগালি গ্রোসারীতে পায়ে হেটে গেলে মিনিট দশেক। তাহলেই আজকের ডিউটি শেষ। তখন বাজে সকাল দশটা। হাটতে ইচ্ছে করছিল না। তাই গাড়ী নিয়েই গেলাম। ইচ্ছে করেই ভুল করে সেল ফোনটা ঘরে ফেলে গেলাম। গ্রোসারির কাছাকাছি গাড়ী পার্ক করে বের হতেই দুজন জাঁদরেল আইনজ্ঞের সামনে পড়ে গেলাম। একজন বাংলাদেশে এডভোকেট ছিলেন, এখানে করেন না এমন কিছু নেই। আর একজন কানাডার ব্যারিষ্টার। চুটিয়ে পয়সা বানাচ্ছে। একটা সই করলেই ডলার। কথা বললেও ডলার দিতে হয়। বছর দুয়েক আগে এই টরন্টোতে এক বাংগালি উকিলকে ফোন করেছিলাম একটা বিষয়ে কথা জিজ্ঞেস করার জন্য। তিনি ফোন ধরেই বললেন, পাঁচশ ডলার কনসালটেশন ফি লাগবে। বললাম - ভাই, আগে বলুন এসব কাজ আপনারা করেন কি না। তিনি না শুনেই বললেন, আগে ফি জমা দিন, তারপর কথা বলুন। এমনভাবে তিনি আমার সাথে কথা বললেন যেন আমি একজন দাগী আসামী। সেই থেকে উকিল নামক ব্যক্তি থেকে দূরে থাকি। কিন্তু এ দুজন উকিল অন্য দলের। বরং তাদের পয়সা দিয়েই আমি যখন তখন কফি খাই।
আমাকে দেখেই ব্যারিষ্টার বললেন, কি হল? এই কয়দিন কোথায় ছিলেন। চলুন এক কাপ কফি হয়ে যাক।
বললাম আমি ধনে পাতার অর্ডার নিয়ে এসেছি। চাকরিটা ঠিক রাখতে হবে।
আরে দূর! রাখেন আপনার চাকরি। এমন কত চাকরি আসে যায়। চলুন!
আমি যন্ত্রচালিতের মত তাদের সাথে রোয়ানা দিলাম। ড্যানফোর্থের কান্ট্রি স্টাইলে গিয়ে বসলাম। এর মধ্যে এডভোকেট সাহেব ফোনে কার সাথে কথা বললেন। আমরা কফির অর্ডার দিলাম। তার মাঝেই আরো দুজন বাংগালি, (একই দলভুক্ত) এসে পৌছলেন। কফি নিয়ে আড্ডা চলল। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তপ্ত আলোচনা। শেষ হয়না। দুকাপ কফি শেষ হতে (এই কফি সপে আমরা প্রথম কাপের পর যা অর্ডার দেই তাতে আর এক কাপ বলতে হয়না, বলি ‘রিফিল’। দোকানের কর্মচারিরা বুঝে নেয়।) ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। একটা বাজে। আরে! আমার ধনে পাতা! এর কি হবে! সামনে বিপদ। চাকরি থাকবে না। এখন উপায়! হঠাৎ আমার ওস্তাদের কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়লে উকিলের সাহায্য নিবে। তারা ছয়কে নয়, নয়কে ছয় বানিয়ে, আইনের ফাক ফোকর বের করে ঘটনা জগাখিচুরি পাকিয়ে আসল অপরাধিকে নির্দোষ প্রমানিত করে তাদের পকেট ভারী করে। তাহলে আমার চিন্তা কি! আমার সামনে তো দুজন জাঁদরেল উকিল। তাদের পরামর্শ নিলেই হল। একবারে বিনে পয়সায়। ব্যারিস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার ধনেপাতার কি হবে? দশ মিনিটের জায়গায় তিন ঘন্টা হয়ে গেল। কি বলে কিভাবে কভার দিব?
তিনি বললেন, গ্রোসারি বন্ধ ছিল, ব্রডভিউতে যেতে হয়েছে। তাই দেরী হয়েছে। এ বললেই চলবে।
এডভোকেট বললেন, না তা গ্রহনযোগ্য হবে না। ব্রডভিউতে আসতে যেতে এক ঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়। তাছাড়া মিথ্যা বলার জন্য আর একটা অপরাধ হবে। তখন চাকরি তো যাবেই আবার জরিমানাও হতে পারে।
তাহলে উপায়!
আগত একজন বলে উঠল, আরে দুর সাহেব! এত সব কি ভাবছেন? এসব ব্যাপারে চাকরি যায় না বরং আরো প্রমোশন হয়। এই নিন আমার ফোন নাম্বার। বাসায় গিয়ে বলবেন আমি রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। বাসায় যান, বাতাসটা দেখে আমাকে একটা মিস কল দিলেই হবে। বাকিটা আমি বলব। দেখবেন আপনি তখন কত ভাল মানুষ। আপনি না থাকলে একটা মানুষের জীবন বিপন্ন হত। এই বলে ভদ্রলোক আর একবার রিফিলের অর্ডার দিল।
বুঝা গেল এসব পরিস্থিতিতে ভদ্রলোক পি এইচ ডি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরিপক্ক। অনেক অভিজ্ঞ। নিশ্চিন্তে আড্ডা চলল।
বেলা চারটার দিকে ব্যারিষ্টার উঠে গেল। তার মক্কেল এসে অপেক্ষা করছে। আড্ডা ভেংগে গেল। বের হয়েই বাংগালি গ্রোসারিতে গেলাম। এক ডলারের ধনেপাতা নিয়ে গাড়ীতে এলাম। আরে! গাড়ির উইন্ডশিলে হলুদ কাগজ কেন? এ্যা! কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম। ট্রাফিক মামা দয়া করে চল্লিশের ঘরে দাগ দিয়েছে। টিকেট দিল কেন? এখানে তো সাইন আছে তীর চিহ্ন দেয়া, এই চিহ্নের ভেতরে পার্ক করা যাবে। আমি তো এই তীরের ভেতরেই পার্ক করেছি। ব্যাপারটা কি? আর একটু এগিয়ে গেলাম। আর একটা সাইন আছে। লেখা আছে মে মাসের পনের তারিখ থেকে জুলাই মাসের পনের তারিখ, নভেম্বরের তিরিশ তারিখ থেকে জানুয়ারির.. ইত্যাদি লেখা। সেখানে এপ্রিল মাসের কথা লেখা নেই। তার মানে এপ্রিলে এখানে পার্ক করা যাবে না। দোষ আমারই। ভেতরটা শুধু জ্বলছে। চল্লিশ ডলারের জ্বলুনি। আসার পথে হিসাব করলাম। ধনেপাতার দাম কত পড়ল। দশটা থেকে চারটা ছয় ঘন্টা, এর দাম না হয় মাগনাই ধরলাম, গ্রোসারিতে দিলাম এক ডলার, আসা যাওয়ার ফুয়েল খরচ, সবশেষে চল্লিশ ডলার যোগ করলে কত দাড়ায়? এই সময়টা, এই টাকা এবং পার্কিং টিকেট সব আমার কারনে হল। এই আড্ডার কোন প্রয়োজনই ছিলনা। আমি উকিলের পেচে পরে না গেলেই পারতাম। আজকের দিনটাই মাটি হয়ে গেল, লোকসানের শেষ নেই! চাকরিটা আছে কি নেই তারো কোন ঠিক নেই।
মনকে প্রবোধ দেবার জন্য হিসাব মিলাতে চেষ্টা করলাম। পরশ পাথরের ক্ষ্যাপার কথা মনে হল। সারাটা জীবন অলীক পদার্থের পেছনে ছুটে জীবনটা শেষ করে দিল। অর্ধেক জীবন গেল পরশ পাথর খুজে, আর বাকী অর্ধেক জীবন গেল পেয়েও হারানো পাথরটা খুজে। জীবনের ছোটখাটো আনন্দগুলোকে সে তুচ্ছ মনে করে স্বাদ গ্রহন করেনি, বড় কিছুর আশায় আর সব আনন্দ সুখ পদদলিত করেছে। সে যদি জীবনের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দগুলোকে একত্রিত করতে পারত তাহলে দেখা যেত বড় আনন্দের চেয়ে কম নয়। আমি যে আজকে এই ছয় ঘন্টা আড্ডায় কাটিয়ে আসলাম তা কি শুধুই লোকশান? কিছুই কি পাইনি? এই ছয় ঘন্টা আমি অন্য জগতে ছিলাম। সেখানে কোন দায়ীত্ব ছিলনা, ধনে পাতা সরবরাহের কথা মনে ছিলনা, ছক বাধা জীবনের অংক মিলাবার কোন চিন্তা ছিলনা। এই আড্ডার মাঝেও আনন্দ আছে। গদবাধা জীবনে এর ও প্রয়োজন আছে। ধনে পাতার লোকশান এবং আনন্দ উপভোগের লাভ যোগ বিয়োগ করে যা দাড়ায় তাতে দেখা যায় লোকশান খুব বেশি একটা হয়নি।
ধনে পাতা হাতে নিয়ে নি:শব্দে ঘরে ঢুকলাম। উঁকি দিয়ে দেখলাম বস কোথায়। নেই। রান্নাঘরে নেই, লিভিং রুমে নেই। রান্নাবান্না শেষ। ধনে পাতার আর প্রয়োজন নেই। কোথায়ো কেউ নেই, কোন শব্দ নেই। বেড রুমে উঁকি দেখলাম। বস অঘোরে ঘুমাচ্ছে। যাক, বাচা গেল। চাকরিটা বোধ হয় আছে। উকিল আর বুদ্বিজীবির বুদ্বি কাজে লাগানোর প্রয়োজন আছে কিনা আবহাওয়ার অবস্থা না দেখে এখন ও বুঝা যাচ্ছে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


