
হরর সিনেমাটার সিনগুলো দেখতে দেখতে শিহাবের হাফ হাতা টিশার্টের নিচের নগ্ন বাহুতে নখ বসিয়ে দিল অহনা। শিহাব একটু ব্যথা পেলেও কিছু বলল না। অনেক বলে কয়ে অহনাকে সিনেমা দেখতে যেতে রাজি করিয়েছে, মুহূর্তটাকে নষ্ট করতে চায় না। যদিও অহনা এত থাকতে হরর মুভি দেখতেই কেন রাজি হল সেটা শিহাব বুঝতে পারেনি। কে জানে? একেক জনের হয়তো একেক জেনারের সিনেমা পছন্দ!
এই মুভিটার নাম Mist, কুয়াশা। কোন এক দেশ হঠাৎ করে ঘন কুয়াশায় ছেয়ে যায়। অদ্ভুত কিছু প্রাণী এসে মানুষের উপর হামলা চালায় কুয়াশার মধ্যে। ভয়াবহ রকমের আতঙ্কজনক গল্প। সিনেমা যতই ভয়ংকরত্বের দিকে যাচ্ছে, শিহাবের বাহুতে হাতের নখ ততোই চেপে বসছে। একসময় একটা অর্ধেক কাটা লাশ দেখে খুব বেশি ভয় পেয়ে মুখ দিয়ে গোঙানির মত শব্দ করে উঠল অহনা। নখ দিয়ে প্রচন্ড চাপ বসাল শিহাবের হাতে। তার লম্বা নখ মাংস ভেদ করে ঢুকে যেতেই শিহাব আর্তনাদ করে উঠল।
"অহনা, কি করছ তুমি?"
চমকে উঠে হাত সরি নিল অহনা।
"সরি সরি, আমি বুঝতে পারিনি....একি, তোমার তো দেখি চামরা কেটে গেছে। সরি শিহাব, এক্সট্রিমলি সরি! চলো, এই ভয়ের মুভি আর দেখব না,বাইরে গিয়ে তোমার বাহুতে এন্টিসেপটিক লাগিয়ে দেই!"
*** *** ***
শিহাব বাসায় এসেছে আধঘণ্টা হয়ে গেছে। কিন্তু তার বাহু থেকে এখনো রক্ত পড়ছে চুয়ে চুয়ে। বেশ অবাক হল সে। শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার কথা, কিন্তু যাচ্ছে না।
শিহাবের বড়ভাই প্লাবন ডাক্তার, বাসায় আসতেই ভাইকে দেখাল সে ক্ষতটা। প্লাবন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে অবাক হয়ে বলল,
"নখের আঁচরের দাগ হলে এমন করে চুয়ে চুয়ে রক্ত পড়ছে কেন? তোকে তো আর জোঁকে কামড়ায়নি। জোকের শরীরে হেরুডিন নামক এক ধরণের রাসায়নিক বস্তু থাকে, যেটা রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। কিন্তু সেটা তোর বন্ধুর নখে আসবে কেমন করে?"
শিহাব আমতা আমতা করে বলল, "কি জানি ভাইয়া, ইনফেকশন টিনফেকশন....!"
শিহাবকে থামিয়ে দিয়ে প্লাবন আবারও বলল,
"আরে আরে, নখের দাগগুলো এমন কেন?"
"কেমন ভাইয়া?"
"মানুষের নখ তো হয় সামান্য বাঁকা, কিন্তু এই দাগগুলো দেখ! মনে হচ্ছে নখ নয়, ছুরি দিয়ে আঁচর দেয়া হয়েছে। একদম সোজা সোজা দাগ!"
শিহাব দেখল, আসলেই তাই। নখের দাগ বলে মনে হচ্ছে না! অহনার নখগুলো কেমন তা অবশ্য ভাল করে দেখা হয়নি কখনো।
ঘটনাটা অদ্ভুত মনে হলেও কিছুক্ষণ পর রক্ত পড়া বন্ধ হতে বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাল না আর সে।
*** *** ***
কয়েকদিন পরের কথা। রিকশায় ঘুরছিল শিহাব আর অহনা। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝুম বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। বিকেলের আকাশ মেঘে ঢেকে যাওয়ায় সন্ধ্যা মনে হচ্ছে। শো শো বাতাস বইছে, বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে বৃষ্টিবলয় একেক সময় হেলে পড়ছে একেক দিকে।
শরীর কিছুটা ভিজে গেছে অহনার। ঠান্ডা বৃষ্টির দাপটে সে কাঁপছে একটু একটু করে। শিহাবের গায়ের সঙ্গে সেঁটে এলো সে কিছুটা। অহনার কাঁপুনি টের পেয়ে শিহাব তার চোখের দিকে তাকাল। এই কাঁপুনি কি শুধুই ঠান্ডার দাপট? না প্রেমের প্রকোপ?
শিহাব নিজের ঠোঁট দিয়ে অহনার ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। কাঁপুনিটা আরও বেড়ে গেল অহনার। শিহাবের ঠোঁট নিজের নরম ঠোঁটের ভেতর টেনে নিল সে। গভীর চুম্বনে দু’জন কিছুক্ষণের জন্য স্থান-কাল ভুলে বসল।
হঠাৎ শিহাব খেয়াল করল, জিভে নোনতা-উষ্ণ কিছু ঠেকছে। অহনাকে দেয়া এটা শিহাবের প্রথম চুমু নয়, স্বাদের তীব্র পার্থক্য টের পেয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল শিহাব। টের পেল জিভ গড়িয়ে রক্ত পড়ছে।
অহনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-“কি হয়েছে শিহাব?”
শিহাব জিভে আঙুল ঠেকিয়ে চোখের সামনে সে আঙুলটা নিয়ে আসল আবার। রক্ত লেগে লাল হয়ে গেছে। অস্ফুট স্বরে অহনা বিস্ময় প্রকাশ করল। “মাই গড, এটা কি করে হলো শিহাব?”
“বুঝতে পারছি না। ব্যথা করছে না জিভে, কিন্তু রক্ত পড়ছে অনবরত!”
“কেমন করে হলো এটা? আমি কি...”
“নাহ, যা ভাবছ তা নয়। অন্য কোন ব্যাপার আছে।”
“কি ব্যাপার?”
“বুঝতে পারছি না।”
সেদিন ঘরে ফেরার পরও অনেকক্ষণ ধরে রক্ত পড়ল শিহাবের।
*** *** ***
শিহাবের বন্ধু রবিন। পেশায় কেমিস্ট সে। পরের দিন সন্ধ্যায় শিহাব তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলো। রবিন শিহাবকে দেখে সহাস্যে বলল-
“বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ তুই। বিয়ে টিয়ে করছিস নাকি শীগগির?”
শিহাব একটু গম্ভীর। সরাসরি কাজের কথায় চলে গেল সে। কয়েক ফোঁটা রক্তে সাঁটা একটা প্লাস্টিকে মোড়া টেস্ট টিউব ছোট প্যাকেটে পুরে বাড়িয়ে দিল সে রবিনের দিকে।
“এখানে আমার কিছু রক্ত আছে, তুই কি টেস্ট করে দেখবি যে এখানে হেরুডিন নামক কোন রাসায়নিক বস্তু আছে কি না?”
“বাপরে বাপ! কি হয়েছিস বল তো? ডিটেক্টিভ নাকি পাগলা সায়েন্টিস্ট?”
“ঠাট্টা নয় রবিন। আমি সিরিয়াস!”
“কি হয়েছে বলতো?”
“কিছু মনে করিস না। আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না এ ব্যাপারে। অন্তত এখনই নয়!”
রবিন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শিহাবের দিকে।
*** *** ***
পরদিন পত্রিকার একটা খবর আকৃষ্ট করল শিহাবকে। যেখানে বলা হচ্ছে, চট্টগ্রাম এর “আগ্রাবাদ জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর” থেকে সাওয়া দেবীর মূর্তি চুরি গেছে। ছোট একটা মূর্তি। কোন একজন ভিজিটর চুরি করে নিয়ে গেছে হয়তো। কতদিন আগে চুরি গেছে বলা মুশকিল, তবে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ দু’দিন আগে আবিষ্কার করেছে বিষয়টা।
পত্রিকায় আরও লিখেছে যে, সাওয়া দেবীর মূর্তিটি তিনশো বছরের পুরনো। চাকমা উপজাতি তিনশো বছর আগে, মোঘল শাসনামলে যখন মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তখন তারা সঙ্গে করে দেবীর মূর্তি নিয়ে এসেছিল। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এই মূর্তিটি সরকারী তত্ত্বাবধায়নে আছে। চাকমারাও এই মূর্তি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এনথ্রপলজির প্রফেসর শুধু এই নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে মিউজিয়ামের কিউরেটর এবং অন্যান্য কর্মচারীদের দোষারোপ করে সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখেছে। তার মতে, সারা পৃথিবীতে সাওয়া দেবীর এটিই একমাত্র অবশিষ্ট মূর্তি। বহু বছর আগে মায়ানমারের কোন এক অতি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাওয়া দেবীর উপাসনা করত।
শিহাবের এই সংবাদটা চোখে পড়েছে, কারণ শিহাব জানে এই মূর্তিটি কে চুরি করেছে। কিছুদিন আগে ঠিক একই রকম একটা মূর্তি সে অহনার বাসায় দেখেছে।
গত বছর চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়েছিল সে অহনাকে নিয়ে। আগ্রাবাদের জাতি-তাত্ত্বিক জাদুঘরেও গিয়েছিল দু’জনে। শিহাবের অগোচরে নিশ্চয়ই মূর্তিটি তখন চুরি করেছিল অহনা।
অহনাকে এভাবে অকপটে চোর ভাবার পেছনে শিহাবের একটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে। শিহাবের অনেক দিনের ধারণা যে, ক্লেপটোম্যানিয়া রয়েছে অহনার। ক্লেপ্টোম্যানিয়া হলো একটি মানসিক রোগ, যাদের এই রোগ হয় তারা নিজেদের অজ্ঞাতেই বিভিন্ন জিনিস এখান থেকে-সেখান থেকে চুরি করে নিয়ে যায় ব্যক্তিগত ব্যাবহারের জন্য। মেয়েদের মধ্যে ক্লেপ্টোম্যানিয়া বেশি দেখা যায়।
শিহাব আগেও লক্ষ্য করেছে অহনাকে, আলগোছে-অন্যমনস্কভাবে অন্যের ছোটখাটো জিনিস নিজের ব্যাগে ঢোকাতে দেখেছে। একবার শিহাবের দামী লাইটার না বলে গিয়েছিল সে। আরেকবার নিয়েছিল শিহাবের হাত-ঘড়ি। শিহাব ভেবেছিল হয়তো মজা করার জন্য মাঝে মাঝে এসব নেয় সে। কিন্তু আস্তে আস্তে তার সন্দেহ হলো যে নিছক মজা করা এসবের উদ্দেশ্য নয়, এটি অহনার মানসিক ব্যাধি। মূর্তি চুরির ঘটনায় বিষয়টা পরিষ্কার হলো। শিহাব ঠিক করল এই বিষয়ে অহনার সাথে বিস্তারিত আলোচনা করবে সে।
তবে এই মুহূর্তে শিহাব সেই এনথ্রপলজির প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলার কথা ভাবছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ঢুকে সে প্রফেসরের ফোন নাম্বারটা খুঁজে বের করল। মনে মনে কথা গুছিয়ে নিল প্রথমে, তারপর কল করল তার নম্বরে।
রিং হলেও ধরছে না কেউ। প্রায় বিশ সেকেন্ড পর শিহাব যখন কল কেটে দেয়ার কথা ভাবছে, তখন একটা ভারী গম্ভীর কণ্ঠ বলে উঠল-
“হ্যালো, হু ইজ দিস?”
“স্যার আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার নাম শিহাব। আমি পত্রিকায় সাওয়া দেবীর মূর্তি চুরি নিয়ে লেখাটা পড়েছি।”
“আচ্ছা, বেশ! বেশ!! বলুন কি করতে পারি এখন?”
“আমি আসলে সাওয়া দেবী সম্পর্কে জানতে চাই। ইন্টারনেটে ঘেঁটেও তার সম্পর্কে কোন তথ্য পেলাম না।”
“পাওয়ার কথাও নয়। সাওয়া দেবী একটা বিলুপ্ত অধ্যায়। মূর্তি চুরির সঙ্গে সঙ্গে তার অবশিষ্ট স্মৃতিটুকুও মুছে গেল।”
“স্যার, কোন ভাবেই কি কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব নয় তার সম্পর্কে?”
“আমি একটা জার্নালের জন্য সাওয়া দেবীকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। যদিও সেটা প্রকাশিত হয়নি। জার্নাল সম্পাদকের কাছে গুরুত্বহীন লেগেছে লেখাটা! বাঞ্চ অফ স্ট্যুপিডস! যাই হোক, আমার কাছে সেই প্রবন্ধের একটা সফট কপি আছে। আপনি চাইলে ইমেইল করতে পারি আপনাকে।”
“সো নাইস অফ ইউ স্যার। আমি আপনার নম্বরে আমার ইমেইল আইডি টেক্সট করে দিচ্ছি।”
“ইউ আ ওয়েলকাম...বাট...আপনি এই মূর্তিটি নিয়ে এতটা আগ্রহী কেন বলুন তো?”
সত্যি কথাটা বলল না শিহাব। “তেমন কোন কারণ নেই স্যার। আমি এসব পুরনো মূর্তি, বিলুপ্ত জাতি ইত্যাদি বিষয় জানতে সবসময় একটু আগ্রহ বোধ করি।”
সেদিন রাতেই শিহাব ইমেইল পেল প্রফেসরের কাছ থেকে। সাওয়া দেবীর উপর প্রফেসরের লেখা প্রবন্ধটা পড়ে দু’টো বিষয় শিহাবকে অবাক করল।
প্রথমত, দেবীর যে মূর্তিটি শিহাব পত্রিকায় এবং অহনার কাছে দেখেছে, সেটাতে তার শরীরের অর্ধেকটা বানানো হয়েছে শুধু। অর্থাৎ পেট, বুক আর মাথা। শরীরের নিচের অংশ নেই। প্রফেসরের প্রবন্ধে দেবীর পুরো শরীরের একটা স্কেচ আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে দেবীর পা নেই, পায়ের জায়গায় জলপরীর মতো একটা লেজ। তবে সেটা মাছের লেজ নয়, সাপের লেজের মতো দেখতে। কালচে-লাল রঙের লেজ। জোঁকের মতন।
দ্বিতীয় বিষয়টা শিহাবকে প্রচন্ড বিস্মিত করল, সেটা হলো, “সাওয়া” শব্দের অর্থ। বার্মিজ ভাষায় সাওয়া শব্দের অর্থ হলো- জোঁক!
*** *** ***
পরদিন সকালে রবিন যখন ফোন করে শিহাবকে জানাল যে- হ্যা, শিহাবের দেয়া সেই রক্তে হিরুডিন নামক বস্তু পাওয়া গেছে; তখন শিহাব সত্যিকার ভাবে চিন্তিত হলো। অতিপ্রাকৃত কিছুতে বিশ্বাস করেনি সে কখনও। কিন্তু অহনার উপর সাওয়া দেবীর ছায়া যে পড়েছে, সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় রইল না আর। শিহাব ঝড়ের বেগে অহনার বাসার উদ্দেশে রওয়ানা দিল।
অহনার বাসায় ঢুকে রীতিমতো ধাক্কা খেল সে। বাসার বাইরে প্রতিবেশীদের ভীর জমে গেছে। ভেতরে সবাই কান্নাকাটি করছে। অহনার বাবা, ভাই, মা...সবাই কাঁদছে। অহনার ছোটভাই রাতুলকে সামনে পেয়ে তার কাঁধ চেপে ধরল শিহাব।
“কি হয়েছে রাতুল? অহনা কোথায়?”
রাতুল ভাঙা গলায় উত্তর দিল-“আপু সারারাত নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে শিহাব ভাই! কেউ দরজায় নক করলে ভয়ংকর গলায় বলেছে যে দরজা খোলার চেষ্টা করতে সে আত্মহত্যা করবে। ভেতরে বসে সারারাত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছে আপু। যেন প্রচন্ড যন্ত্রণায় ভুগছে!”
শিহাব দৌড়ে গিয়ে অহনার ঘরের দরজার সামনে কান পাতল। ভেতর থেকে চিৎকারের আওয়াজ আসছে না বটে, কিন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কেমন যেন অপার্থিব সে শব্দ। শিহাব দরজার কড়া নেড়ে বলল-“অহনা, কি হয়েছে তোমার? দরজা খোলো!”
ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষালী নারী গলায় অহনা জবাব দিল, “শিহাব তুমি এসেছ? দরজা খুলে রেখেছি, ঢুকে পড়ো!”
ভেতরে ঢুকে যা দেখল শিহাব, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে।
একটা শাড়ী পড়ে আছে অহনা, মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে আছে। চোখ ভিজে আছে জলে। সবকিছুই স্বাভাবিক, একমাত্র অস্বাভাবিক বিষয় হলো, শাড়ীর নিচের দিকে পা দেখা যাচ্ছে না অহনার। পায়ের জায়গায় একটি পুরুষ্টু লেজ, যেটা বৃহদাকার সাপের মতো এদিক সেদিক নড়াচড়া করছে। লেজের রঙ কালচে লাল; ঠিক যেন একটি জোঁক।
*** *** ***
পাঁচ বছর পরের কথা। রাঙামাটির ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি মন্দির-মতো ঘর, বাঁশ দিয়ে তৈরি। ঘরের মাচানের মধ্যে অহনা শুয়ে আছে। সারা শরীর নগ্ন। কোমরের নিচ হতে পা পর্যন্ত লম্বা কালচে লাল লেজটা এলোমেলো নাড়ছে সে।
ঘরের সামনে ঘাসের উপর কয়েকজন আদিবাসী মানুষ হাঁটুগেড়ে বসে অদ্ভুত সুরে, বিচিত্র ভাষায় কিছু মন্ত্র জপছে। জপা শেষ হলে একটি কিশোরী মেয়ে এগিয়ে এলো অহনার দিকে। মাথা নিচু করেই সে কাছে গেল তার। চোখে চোখ মেলাল না ভুলেও। কিশোরীটি বুকের কাছে একটা ছাগল ছানা ধরে রেখেছে।
অহনার পায়ের কাছে, কিংবা পায়ের জায়গায় গজানো লেজের কাছে ছাগলটা রেখে এক পা-দু’পা করে করে পিছিয়ে গেল সে। অহনা তার লেজের মতো জিনিসটা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল ছাগল ছানাটাকে। চুষে চুষে খেতে লাগল ওটার রক্ত। ছাগলটা শান্ত হয়ে বসে রইল। ছোটাছুটি করল না। কোন ব্যথা পাচ্ছে না সে। যেমন জোঁক কামড়ালে ব্যথা পায় না কেউ!
দেখতে দেখতে চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো ছাগলটা শুকিয়ে গেল, তার সব রক্ত শুষে নিল অহনা। ছাগলটা বুঝতেও পারল না কখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে সে।
অহনার রক্তপান শেষ হতেই আদিবাসীরা মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করল-
“সাওয়ে নাথবুররম, সাওয়ে!”
“সাওয়ে নাথবুররম, সাওয়ে!”
তারপর অহনার দিকে দিকে পিঠ না দিয়ে আস্তে আস্তে পিছ-পা হয়ে বনের ভেতর হারিয়ে গেল সবাই। শুধু একজন চলে গেল না। তার গায়ে আদিবাসীদের মতোই পোশাক। মুখে লম্বা দাড়ি, চুলও লম্বা। সে আস্তে আস্তে অহনার পাশে গিয়ে বসে পড়ল। বসে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অহনা তার পুরুষালী মেয়ে গলায় তাকে বলল-
“শিহাব, এরা সাওয়ে নাথবুররম বলে এর মানে কি?”
শিহাব স্তিমিত গলায় উত্তর দিল-“এর মানে হলো- দেবী, তোমায় প্রণাম।”
অহনা দু’হাতে শরীরের ভর রেখে, লেজ নাড়িয়ে কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসে শিহাবের কাঁধে মাথা রাখল। বলল-“তুমি কেন চলে যাচ্ছ না শিহাব? কেন পড়ে আছো এই জঙ্গলে? আমি অপয়া, আমার জন্য তুমিও কেন কষ্ট করছ?”
“তুমি অপয়া নও অহনা, ভাগ্যের পরিহাস তুমি! তোমায় ছেড়ে যাবার কথা অনেক ভেবেছি, কিন্তু পারিনি আমি। অনেক বার জঙ্গল ছেড়ে শহরের দিকে পা বাড়িয়েছি, কিন্তু তোমার অমোঘ টানে যে আমি আটকা পড়েছি দেবী, আমি যেতে পারব না কখনও তোমায় ছেড়ে।”
অহনার চোখ দু’টো ছলছল করে উঠল। অশ্রুসজল চোখেই সে শিহাবের ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল। সারা দিল শিহাবও। চুমু গভীর হতেই শিহাব নিজের জিভে রক্তের স্বাদ টের পেল, কিন্তু গা করল না।
তাদের অতিপ্রাকৃত প্রেমের সামনে সামান্য রক্তদান কিছুই নয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



