মানুষ শিশু বয়সে বলে, ‘আমি যখন বড় হবো।’ বড় হবার পর বলে, ‘আমি যখন আরও বড় হবো।’ বড় হয়ে সে বলে, ‘আমি যখন একটা ভাল চাকরি পাব/আমি যখন ওমুক পরীক্ষা পাশ করব/ আমি যখন বিয়ে করব।’ কিন্তু বিয়ে করার পর কী? মানুষের চিন্তা তখন এই কথায় এসে থামে, ‘আমি যখন অবসর নেব।’ কিন্তু অবসর নেবার পর পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় তার ব্যর্থ এবং অপরিপূর্ণ অতীতের বেদনাতুর দৃশ্য। আমরা ভুলে যাই জীবন উপভোগের সময় প্রতিটি দিন। প্রত্যেকটি মুহূর্তই উপভোগ করার জন্য।
মানুষ কর্ম দিয়েই রচনা করে তার কাঙ্ক্ষিত সফলতা, উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। আজ-আজ করে গতকাল হয়ে যাচ্ছে আমাদের দিনগুলো, গত বছর হয়ে যাচ্ছে আমাদের বছরগুলো। যে কাজে থাকি না কেন, প্রতিটি ‘আজ’ যেন সফলতায় ভরে ওঠে, বৃদ্ধি পায় বন্ধুত্ব আর আত্মবিশ্বাস - এজন্য আমাদেরকে সমস্ত শক্তি দিয়ে মনোনিবেশ করতে হয় ‘আজ’এর ওপর।
•প্রথমে বোতাম টিপে বন্ধ করে দিতে হবে অতীতের পিছুটানপূর্ণ দুশ্চিন্তার ধারাকে, যা আমার বর্তমানকে রুদ্ধ করছে। আরেকটি বোতাম টিপে বন্ধ করে দিতে হবে নবাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে। ভবিষ্যতের ভারের সঙ্গে অতীতের বোঝা যুক্ত হয়ে আজকের বোঝা ভারি হয়ে ওঠে।
•ভবিষ্যৎ হলো আজ। আগামিকাল বলতে কিছু নেই। মানুষের মুক্তির দিন আজ। ‘আজ’কে নিয়ে তাই উৎসবে মেতে ওঠি।
•ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হবার সর্বোত্তম পথ হলো: সমস্ত বুদ্ধি, ক্ষমতা আর আগ্রহ দিয়ে ‘আজকের কাজ’ করে যাওয়া।
•বুদ্ধিমান মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই নতুন জীবন। সেই মানুষই সবার চেয়ে সুখী, যে আজকের দিনকে নিজের বলতে পারে। আগামির বিপদকে ভয় করি না কারণ আজ আমি বেঁচে আছি।
•দান্তে বলেছিলেন, "ভেবে দেখ, আজকের দিন আর আসবে না।” জন রাস্কিনের টেবিলে একখানা পাথরে লেখা থাকত, ‘আজকের দিনটি।”
•প্রাচীন ভারতীয় কবি কালিদাসের একটি কবিতার মর্মার্থ: আজকের দিনই সব কিছু, এতেই রয়েছে জীবনের পরিপূর্ণতা। কারণ গতকাল তো শুধু স্বপ্ন আর আগামিকাল তো কেবল কল্পনা। শুধু আজকের মধ্যেই রয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ। আজ ভাল করে বেঁচে থাকলেই গতকাল সুখস্বপ্ন হয়ে ওঠে, আর আগামিকাল হয় আশায় ভরপুর। তাই আজকের দিনকেই সানন্দে গ্রহণ কর। এই হল প্রভাত বন্দনা।
•প্রতিটি দিন হাসিমুখে চিন্তা করে কাজ করলে সত্যিই প্রফুল্লতা আসবে। তাই হাসি মুখে শুরু করি আমার আজ।
•ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। চাই, আজকের দিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। গতকাল হলো ইতিহাস। আগামিকাল হলো রহস্য। আজকের দিনটি একটি উপহার। এজন্যই ইংরেজিতে বর্তমানকে বলা হয় প্রেজেন্ট, যার আরেক অর্থ উপহার। (এলিস মোরস আরলার -১৯০২)
•সে মানুষ সফল, যে সকালে ঘুম থেকে ওঠে আর রাতে যায় ঘুমোতে এবং এর মাঝে সে যা চায়, তা করতে পারে। (বব ডাইলান)
•আসুন ওঠি এবং কৃতজ্ঞ হই: কারণ যদিও আজ অনেক কিছু শিখি নি, সামান্য কিছু তো শিখেছি; সামান্য কিছু না শিখলেও অন্তত অসুস্থ তো হই নি; অসুস্থ হলেও মরে তো যাই নি। তাই চলুন কৃতজ্ঞ হই। (বুদ্ধ)
•শরীর ও মনে সুস্থ থাকার রহস্য অতীতের জন্য শোক করার মধ্যে নেই, ভবিষ্যতের জন্য চিন্তিত হবার মধ্যেও নেই; কিন্তু বর্তমান মুহূর্তটি বুদ্ধি ও আগ্রহের সাথে অতিক্রম করার মধ্যে আছে সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র। (বুদ্ধ)
‘আজ’কে নিয়ে উৎসব করার ১০টি পদক্ষেপ
১) শুধু আজকের জন্য আমি সুখী হব। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, “মানুষ যতটুকু সুখী সে নিজেকে মনে করে, সে ততটুকুই সুখী।” সুখ বাইরের বিষয় নয়, সুখ অন্তরে উপলব্ধির বিষয়।
২) শুধু আজকের জন্য যা ঘটে তা গ্রহণ করব, আমার ইচ্ছেমতো সেটা করতে চাইব না। আমার পরিবার, কর্মক্ষেত্র আর ভাগ্য যেমন আসবে তাকে সেভাবেই মেনে নেব।
৩) শুধু আজকের জন্য আমার শরীরের যত্ন নেব। আমি ব্যায়াম করব, যত্ন করব শরীরকে, অবহেলা করব না। কারও দোষ খুঁজব না।
৪) শুধু আজকের জন্য মনকে আমি সবল রাখার চেষ্টা করব। দরকারি কিছু শিখব: এমন কিছু শিখব যাতে চেষ্টার প্রয়োজন হয়। সেসঙ্গে প্রয়োজন হয় চিন্তা আর মনঃসংযোগ।
৫) শুধু আজকের জন্য আমার আত্মাকে তিনটি পথে সক্রিয় করব: আমি একজনের উপকার করব; কিন্তু নিজের পরিচয় জানাবো না; যা করতে চাই না - এমন দুটো ভাল কাজ করব। কেবল অভ্যাসের জন্যই এসব কাজ করব।
৬) শুধু আজকের জন্য আমি সুন্দর ও সাবলীল থাকব। বাহ্যিকভাবে সুদর্শন থাকতে ও ভাল পোশাক পড়তে চেষ্টা করব। আমি ধীরে কথা বলব, শিষ্ট থাকব। অপরের প্রশংসা করব, সমালোচনা করব না।
৭) আজকের জন্য আজকের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করব। সারাজীবনের সমস্যা নিয়ে একসাথে মাথা ঘামাবো না।
৮) আজকের জন্য একটা কর্মসূচি রাখব। সবসময় মেনে চলতে না পারলেও প্রতি ঘণ্টায় কী করব তার হিসাব রাখব। তাতে দুটো জিনিস ধ্বংস হবে: অনির্দিষ্ট ব্য¯ততা এবং অনিশ্চয়তা।
৯) শুধু আজকের জন্য আধঘণ্টা একাকী বিশ্রাম নেব। এই আধঘণ্টায় আমি সৃষ্টিকর্তাকে ধ্যান করব, যাতে জীবনকে প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারি।
১০) শুধু আজকের জন্য আমি ভয় পাব না। যা ভাল এবং সুন্দর, তাকে নির্ভয়ে পূজা করব। যাদের আমি ভালবাসি, বিশ্বাস করতে চাইব যে, তারাও আমাকে ভালবাসে।
যত ভাবি, ততই চিন্তিত হই। যতই জানি, ততই খুঁজি। যতই খুঁজি, ততই অতৃপ্তি বাড়ে। যতই অতৃপ্তি, শুদ্ধতার দিকে পথ চলা হয় ততই গতিশীল। আত্মোন্নয়ন বিষয়ে যত পড়েছি, তার সবই যেন আজ-কেন্দ্রিক। আজ’কে নিয়ে যাবতিয় অধ্যয়ন ও আত্মঅনুসন্ধানের একটি সংকলন এটি। গুণীব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে অনুসন্ধান, ব্যক্তিগত কৌতূহল, ডেল কার্নেগির লেখা, আমাদের দেশের ডেল কার্নেগি ডা. লুৎফর রহমানের লেখা, ইন্টারনেট প্রভৃতি মাধ্যমে আমার অলস বিচরণের একটি ‘সিনোপসিস’ বলা যায় লেখাটিকে। অথবা বলা যায়, আমার ডায়েরির একটি পৃষ্ঠা। মূলত ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য এই সংগ্রহ। অন্য কারও উপকার হলে, সেটা হবে বাড়তি পাওয়া।
[এসব বিষয়ে চূড়ান্ত (conclusive) কিছু লেখা যায় না। আজ’কে নিয়ে শুদ্ধতর সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও আলোচনা চলতে পারে। ‘আজ’ নিয়ে সহব্লগারদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, চিন্তা, অভিমত-সংযুক্তি, সফলতা-ব্যর্থতা ইত্যাদি শেয়ার করতে পারেন। তবে আরও জানা হবে
----------------
জীবন দর্শন সম্পর্কিত পূর্বের পোস্টগুলো:
১) মৃত্যুকথা: খ্যাতিমানদের জীবনের শেষ কথাগুলো
২) অন্তরের শান্তি Inner Peace
৩) কৃত্তিম উপায়ে হাসুন!
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০১৪ ভোর ৬:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



