ছাত্রজীবনের এক কঠিন বাঁকে এসে একটি খণ্ডকালীণ চাকরির যখন খুবই দরকার ছিলো, তখন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্বর্গদূতের মতো এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। ইন্টারভিউর আগের দিনও তিনি আমাকে চিনতেন না। আমাকে দেখেই কী ভেবে বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের বিব্রত মুখের সামনে বলে দিলেন, এই ছেলেটিকে নিন। সকলকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আমার সামনেই তিনি রায় দিয়ে দিলেন। পরবর্তি দু’টি বছর ছিলো আমার জীবনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তখনও আমার স্নানকোত্তর শেষ হয় নি। মজার ব্যাপারটি হলো এই চাকরিটি প্রথমে খণ্ডকালীণ ছিলো না। এই ভদ্রলোকের সহায়তায় তিনমাসের আমার চুক্তিটিকে পূর্ণকালীণ থেকে খণ্ডকালীণে পরিবর্তন করতে সমর্থ হই।
চাকরি জীবনের প্রাথমিক দিনগুলোতে এই জৈষ্ঠ সহকর্মীকে পেয়েছিলাম, যিনি কখনও তার জৈষ্ঠতার কথা মনে করাতেন না। সকলের সাথে মিশতেন এবং প্রায় সকল কথাই বলতেও দিতেন। ফলে অন্যরা যেমন বেশি আশকারা পেতো, তেমনি তিনিও তাদের সহযোগিতা পেতেন সবচেয়ে বেশি। এজন্য অন্যান্য জৈষ্ঠরা তাকে খুব হিংসা করতেন, কিন্তু বিপদের সময়ে তারই নম্বরে ইন্টারকমের কলটি যেতো। এর মূলে ছিলো, অনেক মানুষের সঙ্গে তার মিশার ক্ষমতা এবং দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য অলৌকিক কিছু কারিশমা।
বলছি আলি আহমদ সাহেবের কথা। এক দিলখোলা মানুষ। এর আগে এরকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অবসর জীবনে এসে বর্তমান কাজটি করছেন। তার নেতৃত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব করার গুণাবলী দিয়ে সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানটিকে তিনিই ধরে রেখেছেন বলা যায়। তিনি সহকর্মীদেরকে এতই উৎফুল্ল রাখতেন যে, তিনি কোন কারণে ছুটিতে থাকলে সেদিন অফিস থাকতো অন্ধকার। দেরিতে আসলেও অফিসের সকলে তার অনুপস্থিতি সবাই টের পেতো। বেশি টের পেতো সবুজ। অফিসের পিওন। সে একটু পরপর বলতে থাকতো, ‘আহমদ স্যারের আজ অইলো কী?’
আহমদ সাহেব ছিলেন অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। দেখা গেলো, অফিসের কর্মীরা কোন বিশেষ ডেডলাইনের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু রাতদিন কাজ করেও যখন ডেডলাইনের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে না, তখন উদ্ধারকারী হিসেবে তিনিই পথ বাতলে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘আসুন...এক কাপ চা খান। আরে ভাই... শুনুন ডেডলাইন হলো দু প্রকার: একটিকে বলে ডেডলাইন; আরেকটিকে বলে ‘আসল’ ডেডলাইন। ডেডলাইনেরও একটি ডেডলাইন আছে। অতএব, চা খেয়ে পূর্ণোদ্দমে আবার লেগে যান। যতক্ষণ কাজে থাকবেন, ততক্ষণ ডেডলাইন আপনার জন্য লাইফলাইন।’
সবসময় বলতেন, ‘কাজ করবেন আনন্দ নিয়ে, তাই বলে জীবন দিয়ে দেবেন না। জীবন একটাই।’ আড্ডা দিতেন সুযোগ পেলেই। পান খাবার কারণে মুখে বিষণ্নতা দেখা যেতো না, থাকলেও। পান খেয়ে ঠোঁট তো লাল করতেনই, হাতও লাল করে রাখতেন। অফিসের পিয়নের সাথে ছিলো তার আলাদা ভাব। ইশারা করলেই পান হাজির।
আড্ডার সুযোগে জুনিয়ররা মাঝে মাঝে দু’একটা অভিযোগের কথা শুনিয়ে দিতেন। অভিযোগগুলো অধিকাংশই বড় বসকে নিয়ে। অথবা অন্য কোন জৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে। তিনি শুধু হাসতেন, কিছুই বলতেন না। শেষে শুধু বলতেন, ‘শুনুন, বসকে নিয়ে এতো ঘ্যানর করবেন না। তাকে নিয়ে এতো ধ্যানের কী আছে? কাজ নিয়ে ধ্যান করুন। বস একদিন আপনাকে নিয়ে ধ্যান করবেন।’ অথবা বলতেন, ‘বসের কথা শুনবেন, কিন্তু শুনবেন না।’ সময় থাকলে তার রহস্যময় কথাগুলো ভাঙিয়ে বলতেন। বসের আদেশের বাইরেও নিজের কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে। খালি শুনলেই চলবে না, মাঝে মাঝে না শুনেও অফিসের উপকার করা যায়।
তার অনেক উক্তির মধ্যে মনে রাখার মতো উক্তিটি হলো, ‘অত বেশি চিন্তা করবেন না। চিন্তা করলে কার্যক্ষমতা কমে যায়।’
একবার হলো কী, তার প্রাণপ্রিয় অফিসের পিওন সবুজ মিয়ার মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। সাধারণত সবুজ থাকতো হাসির আগে আর খাবারের পরে। অর্থাৎ হাসির কোন বিষয় হলে, সবুজের উচ্চস্বরে হাসি থেকেই তা বুঝা যেতো; কিন্তু অফিসের খাবারের আয়োজনে পদাধিকারের বলেই সবুজ থাকতো সবার পেছনে! তো, সবুজ হঠাৎ হাসি বন্ধ করে দিয়েছে। আমরাও চিন্তিত। কী ব্যাপার, সবুজ? কোন উত্তর নেই। আলি আহমদ সাহেব দু’দিন ধরেই বিষয়টি খেয়াল করলেও, তিনি সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করছেন না । কিন্তু তৃতীয় দিনে আমাদেরকে চমকে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন:
-তোর কী হয়েছে রে? অফিসের পরিবেশ গোমট করে রেখেছিস কেন?
-স্যার, আমার অনেক বড় সমস্যা।
-কী সমস্যা, বলবি তো? কী এমন হয়েছে যে তোর হাসি বন্ধ?
-স্যার, ঋণের কিস্তি দিতে ভুলে গেছি।
-তাতে কী হয়েছে? জরিমানাসহ পরের মাসে দিয়ে দিবি?
-স্যার, এর আগেও ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আমার অনেক সমস্যা।
-আরে এতে তোর সমস্যা হবে কেন?
-(সবুজ হা করে দাঁড়িয়ে আছে।)
-তুই টাকা দিতে না পারলে তোর সমস্যা হতে যাবে কেন? ওটি তো ব্যাংকের সমস্যা।
আমরা যারা তাদের এই কথোপকথনের শ্রোতা ছিলাম, স্মিত হেসে কাজে মনযোগ দেই। কত সহজেই না তিনি পরিস্থিতিকে হালকা করতে পারেন। আমাদের হাসি থামলে পর তিনি এই বলে শেষ করলেন, ‘ওদের টাকা। ওরাই তোকে পথ বাতলে দেবে। এখন এক দৌড়ে গিয়ে একটি পান নিয়ে আয় তো!’
বাস্তব অভিজ্ঞতার জীবন্ত ভাণ্ডার ছিলেন, আলি আহমদ সাহেব। মাঝে মাঝে অফিসে যখন মন খারাপ হয় অথবা কোথাও কোন স্বস্তি খুঁজে পাই না, তখন তাকে খুবই মিস করি। আমি জানি না তিনি কোথায় আছেন, অথবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না। শহর ছেড়েছিলাম আমরা ১২/১৩ বছর আগে। তারও ২/৩ বছর আগে ওই চাকরিটি ছেড়েছিলাম। মোবাইলের তত প্রচলন না থাকায় এক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তার সাথে চেতনার যোগাযোগটি কখনও আলাদা হতে পারে নি।

---------
জন্মদিনে কখনও এতো আনন্দ পাই নি। আজ ব্লগে এবং ফেইসবুকে যত শুভেচ্ছা পেয়েছি, তার অধিকাংশই আমার ব্লগ বন্ধুদের থেকে। অনেক আনন্দিত ও সম্মানীত বোধ করছি। সকলকে কৃতজ্ঞতা! আর ভালোবাসা....
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১৪ রাত ৯:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



