অন্যান্য গ্রামের চেয়ে কুমিল্লা'র গ্রামগুলো একটু অন্যরকম। সবুজ। রাস্তার চারদিকে সবুজ বনানী। হাঁটা দিলে চোখ-মুখে অদ্ভুত একটা বনো গন্ধ ঝাপটা মারে। গন্ধটা খুব মিষ্টি। শ্বাস টানলে শেষ করতে ইচ্ছে করেনা এমন। প্রথম বারের মত পান চাষ দেখলাম। এবাড়ি-ওবাড়ি সব বাড়িতে পান গাছ আছেই। এখানে হিন্দুদের অনুষ্ঠানে দারুন সব বৈচিত্রময় আয়োজন। মুসলমানরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারতো। নাচ না জানা এই আমিও দূর্গাপূজায় নৃত্য করলাম। দূর্গাকে প্রণাম করে প্রাসাদও খেলাম
বেশ কাটছিল দিনগুলো। গ্রামের বাড়িতে আগেই জানিয়েছিলাম কোথায় আছি। কিন্তু ঢাকায় কোনো ফোন করা হয়নি। একসময় ফোন করলাম। জানলাম, দাদা মৃতু্য পথযাত্রী। আমি যেন আর না ফিরি; এতসব দাবী তাদের। এক শুক্রবারে মনটা আর কোনোমতেই টিকলো না। বন্ধুদের খুলে বললাম মনের অবস্থা। ওরা আরও দিনকয়েক থেকে যেতে বললো। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত ওরা থমসম ব্রীজ পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিল। কোলাকুলি করে বাসে উঠে গেলাম।
বাসায় আসলাম সন্ধ্যের একটু আগে। মাগরিব নামায পড়তে সবাই যে যার মত চলে যাচ্ছে। কেউই আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। জানলাম দাদা 3 দিন ধরে অজ্ঞান। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। আমি ব্যাগ রেখে দাদার পায়ের কাছে বসলাম। পায়ে হাত দিয়ে দেখলাম অসম্ভব ঠান্ডা। পায়ের তালুতে হাত ঘষে গরম করার চেষ্টা করছি। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। ঠোঁটদুটো দাঁত দিয়ে চেপে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কতক্ষন কাঁদলাম। জীবনের এক্ষনে এসে, কারো জন্য প্রথমবারের মত দোয়া করলাম। ঈশ্বরকে বললাম- হয় তাকে ভালো করে দেন, নাহয় তাকে নিয়ে যান। এমন কষ্ট যেন তিনি তাকে না দেন। আমি আজ থেকে 5 ওয়াক্ত নামাজ পড়বো...।
দেখলাম হঠাৎ দাদা চোখ খুলেছেন!!!
এটা মিরাকল!!! দাদা আমাকে প্রায়ই বলতেন- ভাগ্যে নয়, মিরাকলে বিশ্বাস করবি। আজ সেই মিরাকল নিজের সামনে দেখলাম। আমি ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছি... তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন সেকেন্ড কয়েক। তারপর স্বভাব সুলভ ঠোঁট বাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন... এরপর তিনবার হেচকি দিয়ে তিনি স্থির হয়ে গেলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কি হয়েছে! এটুকু বুঝলাম ঈশ্বর আমার প্রার্থণা শুনেছেন। গলা দিয়ে প্রথমে কোনো শব্দই বের হলোনা। জোরে জোরে চেছামেছি শুরু করে দিলাম। সবাই ছুটে এলো...।
...অবশেষে দাদা নিজেই পালিয়ে গেলেন। আমার শিক্ষাগুরু। আমাকে টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল দ করে তুলেছেন তিনিই। প্রায়ই বলতেন- "কখনো মানুষ ঠকাবি না। ঠকালে কখনো মনে শান্তি পাবি না।"
তার কথাগুলোর মমার্থ তখন কিছুই বুঝিনি। এখন বুঝি। মনের ভেতর থেকে হালছেড়ে না দেবার যে প্রবণতা খুঁজে পাই, তা তারই শিখিয়ে যাওয়া। খুব সরল জীবন যাপন করতেন তিনি। মানুষকে ভালোবাসার জন্যও যে একটা ভালো মনের প্রয়োজন তা তাকে দেখে শিখেছি। দাদা'র সাথে আমি কাটিয়েছি দীর্ঘ 12 বছর। এ 12 বছরে তিনি আমাকে তার নিজের মত করে গড়তে চেয়েছিলেন। চলে যাবার আগে আমার দিকে তাকিয়ে কি ভাবছিলেন? তিনি সফল না ব্যর্থ?
জানিনা।
তবে, আজ আমি এক্ষনে শপথ করে বলতে পারি, তিনি সফল হয়েছেন। যে পথের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, সে পথে আজও পথিক আমি! একটুও বিচু্যতি ঘটে নাই। নিজের অবস্থানের পরিবর্তন কতটুকু করতে পেরেছি তা জানিনা। তবে, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি- কখনো মানুষ ঠকাইনি।
*** দাদা'র স্মরনে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





