somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তোর হলো শুরু, আমার হলো সারা...

২৯ শে আগস্ট, ২০০৬ রাত ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে ঝিমুচ্ছি। হাতে কাজ কর্ম বলতে আড্ডাবাজি। সেটাও একসময় অসহ্য মনে হতে লাগলো। বুড়ির জ্বালায় ঘরে টেকা দায়। শেষ পর্যন্ত পালিয়েই গেলাম। এক্কেবারে কুমিল্লা। পাক্কা দুই মাস! এই 2 মাস ভাগাভাগি করে থাকলাম কলেজের হোষ্টেল ও বন্ধুর বাসায়। ওখানকার ষ্টার হোটেলের খাবারের স্বাধ এখনো আমার জি্ববে আটকে আছে। সারাদিন টৌ টৌ ঘুরতাম, মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে কলেজে কাশও করতাম; স্কুল ছুটি'র সময় সদর দরজার অতি নিকটে আড্ডা জমাতাম। কে কাকে বুকড করেছে সেটা নিয়ে চলতো তক্ক-বিতক্ক! এমনকি মারপিটও! বিকেল বেলায় ফুটবল খেলা, তারপর প্রাণখুলে সাঁতার। স্বর্গের সুখ। কলেজের বন্ধুদের একটা কম্পিউটার ফার্ম ছিল 'বরুরায়'। ওখানে ছাত্রদের কাশ নিতাম। দারুন বিজনেস, 6টা পিসিতে কমপক্ষে 50জন ছাত্র! রাতের বেলায় চলতো 'টুয়েন্টি নাইন' ফর্মুলার সঠিক প্রয়োগ। এ খেলাটা অল্পদিনেই রপ্ত করতে পারলাম; এবং বেশ ভালোভাবেই।

অন্যান্য গ্রামের চেয়ে কুমিল্লা'র গ্রামগুলো একটু অন্যরকম। সবুজ। রাস্তার চারদিকে সবুজ বনানী। হাঁটা দিলে চোখ-মুখে অদ্ভুত একটা বনো গন্ধ ঝাপটা মারে। গন্ধটা খুব মিষ্টি। শ্বাস টানলে শেষ করতে ইচ্ছে করেনা এমন। প্রথম বারের মত পান চাষ দেখলাম। এবাড়ি-ওবাড়ি সব বাড়িতে পান গাছ আছেই। এখানে হিন্দুদের অনুষ্ঠানে দারুন সব বৈচিত্রময় আয়োজন। মুসলমানরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারতো। নাচ না জানা এই আমিও দূর্গাপূজায় নৃত্য করলাম। দূর্গাকে প্রণাম করে প্রাসাদও খেলাম ;)

বেশ কাটছিল দিনগুলো। গ্রামের বাড়িতে আগেই জানিয়েছিলাম কোথায় আছি। কিন্তু ঢাকায় কোনো ফোন করা হয়নি। একসময় ফোন করলাম। জানলাম, দাদা মৃতু্য পথযাত্রী। আমি যেন আর না ফিরি; এতসব দাবী তাদের। এক শুক্রবারে মনটা আর কোনোমতেই টিকলো না। বন্ধুদের খুলে বললাম মনের অবস্থা। ওরা আরও দিনকয়েক থেকে যেতে বললো। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত ওরা থমসম ব্রীজ পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিল। কোলাকুলি করে বাসে উঠে গেলাম।

বাসায় আসলাম সন্ধ্যের একটু আগে। মাগরিব নামায পড়তে সবাই যে যার মত চলে যাচ্ছে। কেউই আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। জানলাম দাদা 3 দিন ধরে অজ্ঞান। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। আমি ব্যাগ রেখে দাদার পায়ের কাছে বসলাম। পায়ে হাত দিয়ে দেখলাম অসম্ভব ঠান্ডা। পায়ের তালুতে হাত ঘষে গরম করার চেষ্টা করছি। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। ঠোঁটদুটো দাঁত দিয়ে চেপে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কতক্ষন কাঁদলাম। জীবনের এক্ষনে এসে, কারো জন্য প্রথমবারের মত দোয়া করলাম। ঈশ্বরকে বললাম- হয় তাকে ভালো করে দেন, নাহয় তাকে নিয়ে যান। এমন কষ্ট যেন তিনি তাকে না দেন। আমি আজ থেকে 5 ওয়াক্ত নামাজ পড়বো...।

দেখলাম হঠাৎ দাদা চোখ খুলেছেন!!!
এটা মিরাকল!!! দাদা আমাকে প্রায়ই বলতেন- ভাগ্যে নয়, মিরাকলে বিশ্বাস করবি। আজ সেই মিরাকল নিজের সামনে দেখলাম। আমি ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছি... তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন সেকেন্ড কয়েক। তারপর স্বভাব সুলভ ঠোঁট বাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন... এরপর তিনবার হেচকি দিয়ে তিনি স্থির হয়ে গেলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কি হয়েছে! এটুকু বুঝলাম ঈশ্বর আমার প্রার্থণা শুনেছেন। গলা দিয়ে প্রথমে কোনো শব্দই বের হলোনা। জোরে জোরে চেছামেছি শুরু করে দিলাম। সবাই ছুটে এলো...।

...অবশেষে দাদা নিজেই পালিয়ে গেলেন। আমার শিক্ষাগুরু। আমাকে টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল দ করে তুলেছেন তিনিই। প্রায়ই বলতেন- "কখনো মানুষ ঠকাবি না। ঠকালে কখনো মনে শান্তি পাবি না।"

তার কথাগুলোর মমার্থ তখন কিছুই বুঝিনি। এখন বুঝি। মনের ভেতর থেকে হালছেড়ে না দেবার যে প্রবণতা খুঁজে পাই, তা তারই শিখিয়ে যাওয়া। খুব সরল জীবন যাপন করতেন তিনি। মানুষকে ভালোবাসার জন্যও যে একটা ভালো মনের প্রয়োজন তা তাকে দেখে শিখেছি। দাদা'র সাথে আমি কাটিয়েছি দীর্ঘ 12 বছর। এ 12 বছরে তিনি আমাকে তার নিজের মত করে গড়তে চেয়েছিলেন। চলে যাবার আগে আমার দিকে তাকিয়ে কি ভাবছিলেন? তিনি সফল না ব্যর্থ?
জানিনা।

তবে, আজ আমি এক্ষনে শপথ করে বলতে পারি, তিনি সফল হয়েছেন। যে পথের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, সে পথে আজও পথিক আমি! একটুও বিচু্যতি ঘটে নাই। নিজের অবস্থানের পরিবর্তন কতটুকু করতে পেরেছি তা জানিনা। তবে, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি- কখনো মানুষ ঠকাইনি।


*** দাদা'র স্মরনে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১২ তারিখ সারাদিন শাপলা কলি-তে আর গন ভোট হ্যাঁ-তে

লিখেছেন সূচরিতা সেন, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:০০



মার্কা যখন শাপলা কলি
ভুল করলে দে, কান মলি।
দাঁড়িপাল্লা মার্কা যখন
বুঝে নাও সাঠিক ওজন।
মার্কা যখন ধানের শীষ
ঘাটেঘাটে চান্দা দিস।

আমি সংস্কারের পক্ষে তাই ১২ তারিখ বাংলাদেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠাকুর ঘরের কে? কলা আমি খাই নি ! :D

লিখেছেন অপু তানভীর, ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:১০



''শেকল ভাঙার পদযাত্রার'' যাত্রা শুরু ২০২০ সাল থেকে। নারী বৈষম্য ধর্ষণের মত অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে তারা এই পদযাত্রা করে থাকে। নানান দাবী নিয়ে তারা এই পদযাত্র করে থাকে। এর আগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পেছনে আদা জল খেয়ে নেমেছে আমেরিকা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৭


আজকাল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন একটা অদৃশ্য জাল ধীরে ধীরে টানটান হয়ে উঠছে ইরানের চারপাশে। প্রথমে মনে হয় এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা—কোনোটা স্যাংশন, কোনোটা কূটনৈতিক আলোচনা, কোনোটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের যে বড় ক্ষতি হবে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৩২


জামাত ক্ষমতায় এলে আমাদের সমাজে যে বড় ক্ষতি ও ক্ষত তৈরি হবে, তার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম দিনেই সংবিধান ছিঁড়ে ফেলবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮০

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৯



গতকাল রাত ১২ টায় খুব মেজাজ খারাপ হয়েছে।
বাসায় এসে বসেছি মাত্র। আর গলির ভিতর ঢুকেছে মিছিল। ধানের শীষের মিছিল। রাত ১২ টায় কেন মিছিল করতে হবে? ফাজলামোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×