somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার খারাপ মা

২৯ শে অক্টোবর, ২০১৪ দুপুর ১:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বেঁচে থাকার রসদ কুৎসা নয় । নিতান্তই এক সাধারণ ভেতো বাঙালি আমি । এক বাটি ভাত পেলেই আমার পেট দিব্যি ভরে যায় । ভাল তরকারী হলে সেই খাওয়ার পরিমান অবশ্যি বাড়ে । অনেকের আবার ভাত –তরকারী কোনটিতেই পেট ভরে না । পেটের কিছুটা অংশ ফাঁকা থেকে যায় । অন্যের নামে নিন্দা করে তারা সেটি ভরিয়ে ফেলে ।

তবে এই নিন্দুকদের বিরুদ্ধে আমার যে খুব একটা অভিযোগ , তা নয় । কারন অনেকসময় মনে হয়েছে হয়ত আমারই কোথাও ভুল হয়েছে অথবা নিন্দাকারীর আজ শরীর মন ভাল নেই । হাতে বেশ অবসর । নিন্দা করে সে বাকি সময়টা কাটাতে চায় ।

হলিক্রস কলেজে পড়ার সময় আমি যখন বেশ খারাপ করছিলাম, আমার মা আমাকে দিব্যি দিলেন , বল তুই আর কোনোদিন কবিতা টবিতা লিখবিনা । খুব সাধারণ চাওয়া । মায়ের ইচ্ছে আমি বুয়েটে পড়ে বিরাট প্রকৌশলী হয় । আমার সেকেন্ড কাজিনরা অনেকে সেই দুর্লভ জায়গাটিতে পড়েছে আর তাদের মায়েরা বিরাট বিরাট গল্প দিয়েছে । মায়ের খুব ইচ্ছা আমি ও গল্প করার মত এরকম কিছু করি ।

আমার যে প্রকৌশলী হবার কোন ইচ্ছে ছিল না তা নয় , তবে আমার সপ্ন ছিল লেখক হব । বই টই পড়তেও বেশ ভাল লাগত । ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমাদের এক সেমিস্টার ইকোনমিক্স পড়তে হয়েছিল । ক্লাস টেস্টে আমার হায়েস্ট মার্ক ছিল সেটিতে । কিন্তু গণ্ডগোল বাধল পরীক্ষার আগে । কোত্থেকে আমার হাতে এসে পড়ল , সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লোটা কম্বল ।খণ্ড এক পড়লাম । অসাধারণ বই। একটি রোগা , দুর্বল অনাকর্ষনীয় ছেলে কিভাবে একসময় গল্পের নায়ক হয়ে গেল । নায়ককে আরও জানতে আমি খণ্ড দুই পড়া শুরু করলাম । যখন পড়া শেষ , সকাল নটা বাজে । রুদ্ধশ্বাসে আমি ৩০ মিনিটে পুরো ইকোনমিক্স বই শেষ করে পরীক্ষা দিতে গেলাম । ফলাফল যেটি আসল, সেটি আর বলার মত নয়।

লেখক হবার মত অতখানি প্রতিভা সত্যিই আমার নেই । তাই সেটি হতে পারিনি । তবে লিখতে ভালবাসি যে ; মায়ের দেওয়া দিব্যি আমি রাখতে পারলাম না । তাছাড়া স্বভাবেও ঘরকুনো , বন্ধুবান্ধব খুব একটা নেই । তাই কিছু একটা ছাই পাশ লিখলেও আমার বেশ লাগে , একাকীত্ব দূর হয় । মাঝে মাঝে এরকমও মনে হয় , লিখিনা জীবনের কথা গুলো , কাউকে তো কিছু বলা হল না । লিখে লিখে বলি ।

এ কারনে প্রবাসে নামে একটা সিরিজ লিখছিলাম ফেসবুকে । সিরিজটির প্রথম পর্ব প্রকাশের পর আমার মা ভিশন কান্নাকাটি করলেন । কারন তাকে গিয়ে বলা হল , আমি নাকি তার বিরুদ্ধে লেখালেখি করি । আমাকে বড় করতে তার যত কষ্ট হয়েছে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করি । ব্যাপারটি এখানে থেমে থাকলেই ভাল হত । কিন্তু এই কথাটি প্রতিনিয়ত আমার মায়ের কাছে এমনভাবে পেশ করা হল । আমার আর মায়ের সম্পর্কটা কিছুতেই আর স্বাভাবিক হল না ।

তথপ্রদানকারী আমি শেষ যে লাইনটা লিখেছিলাম , “তার চোখে যে জল আমি দেখেছি , তাতে আমার পঁচিশ বছরের অভিমান মুছে গেল “ এইটুকু আর বলল না ।

এসব তথপ্রদানকারীদের আর একটু পরিচয় দেয়া যেতে পারে । আমি যখন প্রথম আমেরিকাতে আসলাম , তারা আমার মাকে গিয়ে বলল , আমার কাজগপত্রে নাকি বিরাট ঝামেলা আছে । আমাকে প্রতিমাসে বাসা থেকে টাকা পাঠাতে হবে ।

এত খরচ খরচা করে আমার মা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন , এম্নিতেই আমার এখানে একা পাঠাতে তিনি কখনই রাজী ছিলেন না । ভীষণ দুশ্চিন্তা হল তার । তারপর আমি যখন বাসা থেকে কোন টাকা নেই না কিন্তু একটি প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি । তখন তারা আবার মাকে যেয়ে বলল , আমি আমেরিকাতে ফুর্তি করছি , বেশ আছি ,পার্টি করে বেড়াচ্ছি ।

প্রতিটা পরীক্ষার আগে মাকে আমি সবসময় ফোন করি । উদ্দেশ্য লেখাপড়ায় এতটা ভাল নই । মা দোয়া করে দিলে নিশ্চিত পার হয়ে যাব । গত কয়েকটি পরীক্ষা আমার বেশ খারাপ গেছে । আমি প্রতিদিন মাকে ফোন করি দোয়া নেবার জন্য ।কিন্তু দোয়ার কথা আর বলতে পারি না । আমার মা কথা শুরু করে কান্না দিয়ে আর শেষ করে কান্না দিয়ে ।

তাঁর একটিই কারন তাঁর এত আদরে বড় করা সন্তানটি এত অকৃতজ্ঞ । আমার মা কাঁদে । আমি কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ফোন রেখে দেই । আমার মা হয়ত সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।ফোনের ওপারে ব্যক্তিটির কথা সে ভুলে যায় ।

কান্নাকাটিতে আমি বরাবর অসাধারন । ক্লান্তিহীন একটানা কাঁদতে পারি আমি । মায়ের কাছ থেকেই হয়ত গুনটি পাওয়া । তবে আমার মা অনেকটাই বাচ্চা মেয়েদের মত । সামনা সামনি কেদে ফেলে , আমার সংগোপনে কান্নার খবর সে জানে না ।

কারোরই জানার কথা না ।এখন আমার স্বামী বেচারা অবশ্য দেখে । আমার কান্না কাটিতে বলা যায় রীতিমত বিরক্ত সে । একদিন আমার মায়ের সাথে আমার এরকম একটি অভিমানের ব্যাপার ঘটলো । আমি সন্ধ্যে থেকে সকাল পর্যন্ত কেঁদে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম । আমার ফোন কখন বন্ধ জানিও না, আমার স্বামী বেচারাও আমার কান্নাকাটিতে আপসেট হয়ে কখন ফোন বন্ধ রেখেছে মনে নেই ।

আমাদের তখন গাড়ি কেনা হয়নি । একটি ভাইয়ার গাড়িতে রোজ ক্লাসে যাই। সেদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, ভাইয়াটি আমাদের সাথে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করে , আমার দেরি দেখে ক্লাসে চলে গেছে । ক্লাসটি ছিল আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ । আর এখানে বাংলাদেশের মত ক্লাস মিস দেওয়া যায় না । দিলে সেটি গ্রেডে খুব প্রভাব ফেলে । আমার ক্লাস হয় মেইন ক্যাম্পাস থেকে বেশ দূরে । সেখানে ঐসময় যাবার আর কোন ব্যবস্থাও নেই ।

যাই হোক এরকম বিষয় আমার সাথে ইদানিং খুব বেশি ঘটছে । এর জন্য আমার মাকে আমি দায়ী করছি না । আমার মা আমার লেখাপড়া নিয়ে কতটা সচেতন সে প্রসঙ্গে একটু বলি । আমার একমাত্র ভাই যেটি ক্যাডেট কলেজে পড়ছে , সে একবার ১১ কেভি’র ইলেকট্রিক শক খেল । তার একটি পায়ের অনেকটাই ঝলসে গেল । তার হয়ত বেঁচে থাকার কথায় ছিল না । অনেকটা অলৌকিকভাবে সে বেঁচে গেল । কিন্তু এত বড় খবর আমার মা আমাকে জানালেন না । এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করে যদি আমার পরীক্ষা খারাপ হয় এই ভেবে ।

ঘটনাটি জানলাম এক মাস পর বাড়িতে এসে । যখন আমার ভাইয়ের পা থেকে মাংস পচে খসে পড়ছিল ।

এই আমার মা । মা আজকে আমাকে বললেন , তুই আমাকে নিয়ে এত খারাপ খারাপ কথা লিখিস । কই অমুকে তো লেখে না , তমুকে তো লেখে না । আমি কি তাদের চেয়েও খারাপ মা ?

আমি চুপ করে শুনি ।আমার মা যখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এসব বলে আমার মাকে বলতে পারি না , তোমাকে নিয়ে তো অনেক ভাল কিছুও লিখেছি মা । আমি যে আব্বুর মত হতে চেয়েছিলাম ,আব্বুর যুদ্ধে যাবার গল্প সেগুলোও তো লিখেছি ।

আমি আমার মাকে এ কথাগুলো কখনও বলতে পারিনি । তাঁর কাছে সেগুলো অজানা রয়ে যায় ।

এসব নানা কারনে , আমি ফেসবুকে লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছি । ব্লগে লিখি , ছদ্ম নামে লিখি ।

যাতে নিন্দুকরা আর কিছু খুঁজে না পায়। মা যেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে না বলে আমি কি তোর খুব খারাপ মা ?

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১৪ দুপুর ২:২০
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের জগৎ বিখ্যাত উপন্যাস ‘A Prisoner of Birth’ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


ছবিতে আমি, মারুফ জামান এবং লেঃ কর্নেল রাজীব।
জেলে থাকতে জেফরি আর্চারের (Jeffrey Archer) লেখা ‘A Prisoner of Birth’ বইটির পড়ার জন্য বলেছিলেন ক্যাপ্টেন (চাকুরিচ্যুত) খন্দকার রাজীব... বইটি সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুন্দর সর্বনাশ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২১



সবকিছুই পাওয়া যায় এখন বিপণনের কল্যাণে,
বিপনি বিতানে বিতানে;
চাইলে কিনে নিতে পারো লালনীলহলুদ মনও!

মন চাইলে পোষ মানাতে পারো বনের অবাধ্য পশুও;
শুধু পোষ মানাতে যেও না মানুষ;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×