আমার বেঁচে থাকার রসদ কুৎসা নয় । নিতান্তই এক সাধারণ ভেতো বাঙালি আমি । এক বাটি ভাত পেলেই আমার পেট দিব্যি ভরে যায় । ভাল তরকারী হলে সেই খাওয়ার পরিমান অবশ্যি বাড়ে । অনেকের আবার ভাত –তরকারী কোনটিতেই পেট ভরে না । পেটের কিছুটা অংশ ফাঁকা থেকে যায় । অন্যের নামে নিন্দা করে তারা সেটি ভরিয়ে ফেলে ।
তবে এই নিন্দুকদের বিরুদ্ধে আমার যে খুব একটা অভিযোগ , তা নয় । কারন অনেকসময় মনে হয়েছে হয়ত আমারই কোথাও ভুল হয়েছে অথবা নিন্দাকারীর আজ শরীর মন ভাল নেই । হাতে বেশ অবসর । নিন্দা করে সে বাকি সময়টা কাটাতে চায় ।
হলিক্রস কলেজে পড়ার সময় আমি যখন বেশ খারাপ করছিলাম, আমার মা আমাকে দিব্যি দিলেন , বল তুই আর কোনোদিন কবিতা টবিতা লিখবিনা । খুব সাধারণ চাওয়া । মায়ের ইচ্ছে আমি বুয়েটে পড়ে বিরাট প্রকৌশলী হয় । আমার সেকেন্ড কাজিনরা অনেকে সেই দুর্লভ জায়গাটিতে পড়েছে আর তাদের মায়েরা বিরাট বিরাট গল্প দিয়েছে । মায়ের খুব ইচ্ছা আমি ও গল্প করার মত এরকম কিছু করি ।
আমার যে প্রকৌশলী হবার কোন ইচ্ছে ছিল না তা নয় , তবে আমার সপ্ন ছিল লেখক হব । বই টই পড়তেও বেশ ভাল লাগত । ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমাদের এক সেমিস্টার ইকোনমিক্স পড়তে হয়েছিল । ক্লাস টেস্টে আমার হায়েস্ট মার্ক ছিল সেটিতে । কিন্তু গণ্ডগোল বাধল পরীক্ষার আগে । কোত্থেকে আমার হাতে এসে পড়ল , সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লোটা কম্বল ।খণ্ড এক পড়লাম । অসাধারণ বই। একটি রোগা , দুর্বল অনাকর্ষনীয় ছেলে কিভাবে একসময় গল্পের নায়ক হয়ে গেল । নায়ককে আরও জানতে আমি খণ্ড দুই পড়া শুরু করলাম । যখন পড়া শেষ , সকাল নটা বাজে । রুদ্ধশ্বাসে আমি ৩০ মিনিটে পুরো ইকোনমিক্স বই শেষ করে পরীক্ষা দিতে গেলাম । ফলাফল যেটি আসল, সেটি আর বলার মত নয়।
লেখক হবার মত অতখানি প্রতিভা সত্যিই আমার নেই । তাই সেটি হতে পারিনি । তবে লিখতে ভালবাসি যে ; মায়ের দেওয়া দিব্যি আমি রাখতে পারলাম না । তাছাড়া স্বভাবেও ঘরকুনো , বন্ধুবান্ধব খুব একটা নেই । তাই কিছু একটা ছাই পাশ লিখলেও আমার বেশ লাগে , একাকীত্ব দূর হয় । মাঝে মাঝে এরকমও মনে হয় , লিখিনা জীবনের কথা গুলো , কাউকে তো কিছু বলা হল না । লিখে লিখে বলি ।
এ কারনে প্রবাসে নামে একটা সিরিজ লিখছিলাম ফেসবুকে । সিরিজটির প্রথম পর্ব প্রকাশের পর আমার মা ভিশন কান্নাকাটি করলেন । কারন তাকে গিয়ে বলা হল , আমি নাকি তার বিরুদ্ধে লেখালেখি করি । আমাকে বড় করতে তার যত কষ্ট হয়েছে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করি । ব্যাপারটি এখানে থেমে থাকলেই ভাল হত । কিন্তু এই কথাটি প্রতিনিয়ত আমার মায়ের কাছে এমনভাবে পেশ করা হল । আমার আর মায়ের সম্পর্কটা কিছুতেই আর স্বাভাবিক হল না ।
তথপ্রদানকারী আমি শেষ যে লাইনটা লিখেছিলাম , “তার চোখে যে জল আমি দেখেছি , তাতে আমার পঁচিশ বছরের অভিমান মুছে গেল “ এইটুকু আর বলল না ।
এসব তথপ্রদানকারীদের আর একটু পরিচয় দেয়া যেতে পারে । আমি যখন প্রথম আমেরিকাতে আসলাম , তারা আমার মাকে গিয়ে বলল , আমার কাজগপত্রে নাকি বিরাট ঝামেলা আছে । আমাকে প্রতিমাসে বাসা থেকে টাকা পাঠাতে হবে ।
এত খরচ খরচা করে আমার মা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন , এম্নিতেই আমার এখানে একা পাঠাতে তিনি কখনই রাজী ছিলেন না । ভীষণ দুশ্চিন্তা হল তার । তারপর আমি যখন বাসা থেকে কোন টাকা নেই না কিন্তু একটি প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি । তখন তারা আবার মাকে যেয়ে বলল , আমি আমেরিকাতে ফুর্তি করছি , বেশ আছি ,পার্টি করে বেড়াচ্ছি ।
প্রতিটা পরীক্ষার আগে মাকে আমি সবসময় ফোন করি । উদ্দেশ্য লেখাপড়ায় এতটা ভাল নই । মা দোয়া করে দিলে নিশ্চিত পার হয়ে যাব । গত কয়েকটি পরীক্ষা আমার বেশ খারাপ গেছে । আমি প্রতিদিন মাকে ফোন করি দোয়া নেবার জন্য ।কিন্তু দোয়ার কথা আর বলতে পারি না । আমার মা কথা শুরু করে কান্না দিয়ে আর শেষ করে কান্না দিয়ে ।
তাঁর একটিই কারন তাঁর এত আদরে বড় করা সন্তানটি এত অকৃতজ্ঞ । আমার মা কাঁদে । আমি কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ফোন রেখে দেই । আমার মা হয়ত সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।ফোনের ওপারে ব্যক্তিটির কথা সে ভুলে যায় ।
কান্নাকাটিতে আমি বরাবর অসাধারন । ক্লান্তিহীন একটানা কাঁদতে পারি আমি । মায়ের কাছ থেকেই হয়ত গুনটি পাওয়া । তবে আমার মা অনেকটাই বাচ্চা মেয়েদের মত । সামনা সামনি কেদে ফেলে , আমার সংগোপনে কান্নার খবর সে জানে না ।
কারোরই জানার কথা না ।এখন আমার স্বামী বেচারা অবশ্য দেখে । আমার কান্না কাটিতে বলা যায় রীতিমত বিরক্ত সে । একদিন আমার মায়ের সাথে আমার এরকম একটি অভিমানের ব্যাপার ঘটলো । আমি সন্ধ্যে থেকে সকাল পর্যন্ত কেঁদে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম । আমার ফোন কখন বন্ধ জানিও না, আমার স্বামী বেচারাও আমার কান্নাকাটিতে আপসেট হয়ে কখন ফোন বন্ধ রেখেছে মনে নেই ।
আমাদের তখন গাড়ি কেনা হয়নি । একটি ভাইয়ার গাড়িতে রোজ ক্লাসে যাই। সেদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, ভাইয়াটি আমাদের সাথে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করে , আমার দেরি দেখে ক্লাসে চলে গেছে । ক্লাসটি ছিল আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ । আর এখানে বাংলাদেশের মত ক্লাস মিস দেওয়া যায় না । দিলে সেটি গ্রেডে খুব প্রভাব ফেলে । আমার ক্লাস হয় মেইন ক্যাম্পাস থেকে বেশ দূরে । সেখানে ঐসময় যাবার আর কোন ব্যবস্থাও নেই ।
যাই হোক এরকম বিষয় আমার সাথে ইদানিং খুব বেশি ঘটছে । এর জন্য আমার মাকে আমি দায়ী করছি না । আমার মা আমার লেখাপড়া নিয়ে কতটা সচেতন সে প্রসঙ্গে একটু বলি । আমার একমাত্র ভাই যেটি ক্যাডেট কলেজে পড়ছে , সে একবার ১১ কেভি’র ইলেকট্রিক শক খেল । তার একটি পায়ের অনেকটাই ঝলসে গেল । তার হয়ত বেঁচে থাকার কথায় ছিল না । অনেকটা অলৌকিকভাবে সে বেঁচে গেল । কিন্তু এত বড় খবর আমার মা আমাকে জানালেন না । এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করে যদি আমার পরীক্ষা খারাপ হয় এই ভেবে ।
ঘটনাটি জানলাম এক মাস পর বাড়িতে এসে । যখন আমার ভাইয়ের পা থেকে মাংস পচে খসে পড়ছিল ।
এই আমার মা । মা আজকে আমাকে বললেন , তুই আমাকে নিয়ে এত খারাপ খারাপ কথা লিখিস । কই অমুকে তো লেখে না , তমুকে তো লেখে না । আমি কি তাদের চেয়েও খারাপ মা ?
আমি চুপ করে শুনি ।আমার মা যখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এসব বলে আমার মাকে বলতে পারি না , তোমাকে নিয়ে তো অনেক ভাল কিছুও লিখেছি মা । আমি যে আব্বুর মত হতে চেয়েছিলাম ,আব্বুর যুদ্ধে যাবার গল্প সেগুলোও তো লিখেছি ।
আমি আমার মাকে এ কথাগুলো কখনও বলতে পারিনি । তাঁর কাছে সেগুলো অজানা রয়ে যায় ।
এসব নানা কারনে , আমি ফেসবুকে লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছি । ব্লগে লিখি , ছদ্ম নামে লিখি ।
যাতে নিন্দুকরা আর কিছু খুঁজে না পায়। মা যেন আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে না বলে আমি কি তোর খুব খারাপ মা ?
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১৪ দুপুর ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




