আমার একটা পরিচিত মহল আছে। আর সবার যেমন থাকে। সেই মহলে অনেকটা উন্মাদিনী হিসেবেই আমাকে সবাই চেনে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম ক্লাসের সবচেয়ে দুরন্তদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম । কিন্তু একটা সময় পর যখন হরমোনেরা ধেয়ে আসছিল, একেবারে বদলে গিয়েছিলাম আমি।
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় কখনও প্রথম হওয়া হয়নি আমার। বড় বোন হয়েছিল। আমার বাবা যিনি সাড়ে ১৫ বছর বয়সে যুদ্ধে গিয়েছিলেন আমার প্রথম না হওয়ার ব্যাপারটা একেবারেই মানতে পারেননি।
আমার বাবা-মায়ের সংসারটা ছিল খুব অদ্ভুত। সেখানে সবাই এরকম মুখাবয়ব নিয়ে থাকত, যেন বাকিদের প্রতি তার কোন অনুভূতি নেই। বরং বলা যায় সে যেন বেশ বিরক্তই। আমার ধারনা ছিল পরিবারের সবচেয়ে বিরক্তিকর অপাংক্তেয় সদস্যটা আমিই। তার একটা কারণ ছিল। একটা বিরক্তিকর কাজ আমি প্রায়ই করতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির লোকদের ডায়রি পড়ে ফেলতাম।
আমার বাবা, তার যুদ্ধের সময়কার ডায়রিতে লিখেছিলেন যুদ্ধের ট্রেনিং এর সময় তিনি নিয়মিত ট্রেনিং করতেন এবং ট্রেনিং শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যায়, ক্যাম্পের দেয়াল টপকে ওপারের শাড়ি পরা বিহারী মেয়েদের নিয়ম করে দেখতেন। সেইসব বিহারী মেয়েদের দেখলে তার ট্রেনিঙের ক্লান্তি, যুদ্ধের ঝক্কি অনেকটা যেন কেটে যেত। এরকম একটা ডায়রি পড়ে খুব অবাক হয়েছিলাম আমি। যেন এক অচেনা বাবাকে চিনেছিলাম সেদিন।
বাবাকে সবসসময় প্রচণ্ড রগচটা, একরোখা আর ভয়ংকর মানুষ হিসেবেই আমরা চিনতাম। পরিবারের সকলেই তাকে খুব ভয় পেতাম। বাবা আসার শব্দ পেলেই আমরা যে যেখানেই থাকতাম হাতে বই নিয়ে বসে পড়তাম। বই হাতে ছাড়া বাবা- আমাদেরকে কখনই দেখতেন না। তবু কেন স্কুলের পরীক্ষা গুলোয় প্রথম হতাম না। কিছুতেই বাবার বোধগম্য হত না।
আমার বাবা, যিনি তখনকার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে দুটি লেটার পেয়েও ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেননি, বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম তার বড় সন্তানটিকে ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার করতে পারেননি যেন একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে বসলেন। এইবার তিনি করেই ছাড়বেন।
আমিও হয়েছিলাম কিছুটা। তবে তাদের মনের মত করে নয়। অনেকটা ঠিক একারনেই পরিবারের সাথে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ছিল আমার। একসময় আমি আবিস্কার করলাম এই দুরে যেতে যেতে দুরত্ত্ব অতিক্রম করতে না পারা এক ভয়ংকর নিঃসঙ্গ মানুষ হয়ে গেছি আমি।
আমার সত্যিকার অর্থে কোনদিন সই টাইপ কোন বন্ধু ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকে অসুস্থ হবার পর থেকে আমার একমাত্র বন্ধু ছিলাম আমিই । আমার বাবা-মা কেউ আমার অসুস্থ হবার কথা প্রথম দিকে জানতেন না। কারন আমি জানতাম তারা ধরে নিবেন লেখাপড়া থেকে রেহাই পাবার এ এক চমৎকার যুতসই ছুতো।
যখন একদম সুস্থ হয়ে গেলাম, আমার মা যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় আমাকে বকাঝকা করে কাটিয়েছেন এক বছর প্রতি বৃহস্পতিবার – শুক্রবার রোজা রাখলেন। আর আমাকে বললেন তুমি যে অসুস্থ হয়েছিলে কখনও কাউকে বলবে না। কারণটা না বললেও আমি এর কারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। আমার মা ভয় পেয়েছিলেন এতে আমার বিয়ে নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। আমি আমার মায়ের কথা রাখিনি। প্রচণ্ড ভালবাসবে বলে একজন মানুষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার দরজায় যেদিন কড়া নাড়ল, আমি সেদিনই তাকে সবটা বলে দিয়েছিলাম।
যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম আমি, দোতলায় একটা রুম পেয়েছিলাম । রুমটার নাম ছিল বাতায়ন। দক্ষিণ মুখী রুমটার বড় একটা বাতায়নের পাশে থাকার ব্যাবস্থা হয়েছিল আমার। আমার রুমমেটরা অধিকাংশ সময় ছিল স্থানীয়। মাঝেই মাঝেই রুম খালি থাকতো। তবে একেবারেই খালি নয়। আমি দু একটা আরশোলা আর দেয়ালের এক – দুই ধেড়ে টিকটিকি।
মাঝে মাঝে হলের হুলো বিড়ালটা দরজার ফাঁকি দিয়ে আমাকে দেখে যেত আমি কেমন আছি। হুলোটা আমাকে ভালবাসত কিনা জানি না তবে একদিন তাকে দেখে প্রচণ্ড ভয়ই পেয়েছিলাম। সেবারের সামারের ছুটিতে সবাই বাড়িতে গেলেও আর সব ছুটির মত হলে থেকে গিয়েছিলাম আমি । যদিও ছুটিতে বাড়িতে গেলে আমার খুব ভাল লাগত।
আমার ভাই- বোনের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য ১১-১৪ বছর। তবু তাদের সাথে সব খেলাই খেলতাম আমি । আমরা পুতুলের পেট কাটতাম। সেখানে মুরগীর ডিম ঢুকিয়ে আবার সেলাই করে দিতাম। আমার ভাই-বোন এতে খুব খুশি হত। ওরা ভাবত এখনি নিশ্চয়ই পুতুলটার ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোবে । কিন্তু বাচ্চা বেরোবার আগেই আমার মা এসে, আমার দু ভাই-বোনকে দু চড় বসিয়ে, সেই ডিম বের করে ভেজে, সকালের নাস্তায় আমাদেরকে খেতে দিতেন।
আমাকে মা চড় মারতেন না। আমার জন্য সারাদিন থাকত বিরামহীন কটু বাক্য বর্ষণ। আমার এরকম অদ্ভুত শিশুতোষ আচরণে বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে বলতেন তুই আর বাড়ি আসবি না। আমি মায়ের এই কথাটা রেখেছিলাম। ঈদের ছুটি ছাড়া সাধারণত বাড়ি যেতাম না।
এরকম এক ছুটিতে রুমের দরজা খুলেছি আর ঠিক তখনই হুলোটা নিষ্ঠুর ভাবে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়তে চাইল। আমি সেদিন সারাদিন ভয়ে রুম থেকে বেরোতে পারিনি। বাতায়নটার পাশে নিঃসঙ্গ ক্ষুধার্ত সময় কেটেছিল আমার। আমি জানি ছুটি হয়ে যাওয়া হলটাতে সেদিন খুব খিদে পেয়েছিল হুলোটার।
আমারও যেন এক মন খারাপ করা খিদে পেত সবসময়। এরকম খিদে পেলে আমি বেরিয়ে পড়তাম। বৃষ্টির দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি খিদে পেত আমার। আমি ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে নির্জন জায়গাগুলোয় হাঁটতাম। খুব রোদ্দুরের দিনেও আমি বেরোতাম। পুকুর পাড়, মেডিক্যাল সেন্টার আর স্টাফ কোয়ার্টারের নির্জন জায়গাগুলোয় হাঁটতাম।
অনেকেই আমার হাঁটাহাঁটির কথা জানত। আমাকে উন্মাদিনী বলত। আমাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করত। আমার এই নিঃসঙ্গতা নিয়ে উপহাস করত। আমি ওদের উপহাসে ক্লান্ত হলে মাঝে মাঝে আমি যে নিঃসঙ্গ নয় এরকম একটা অভিনয় করতাম। কিন্তু সে অভিনয়ের সবটাই যেন ওরা ধরে ফেলত। প্রকৌশলের পাঠশালায় পড়ার কারনে আমার সহপাঠীদের প্রায় সকলেই ছিল পুরুষ। আমার পুরুষ সহপাঠীদের হাসাহাসির আর একটি বিষয় ছিল আমার লেখা কবিতাগুলো।
আমার কবিতায় আমি কোনদিন রম্য কিছু লিখিনি। ভয়ঙ্কর বিষণ্ণ ছিল সে সব কবিতা। একটা বন্ধু পাবার ভীষণ আকুতির কথা থাকত সেখানে। তবুও ওরা কেন জানি হাসত। একবার ওদের একজন আমাকে নিয়ে তার সাথে ডেটিং এর গুজব ছড়িয়ে দিল। যদিও তার সাথে ২ মিনিট এক সাথে দাড়িয়েও কথা বলিনি কোনোদিন।
ক্লাসে সবসময় আমি আর ‘ক’ একসাথে বসতাম। ‘ক’ ই আমাকে বুদ্ধি দিয়েছিল এরকম অন্যায়ের নিশ্চয় প্রতিবাদ হওয়া দরকার। ক্লাসের সবার সামনে আমি সেদিন প্রতিবাদ করেছিলাম। সবাই যেন খুব অবাক হয়ে সেদিন আমাকে দেখছিল। আমার প্রতিবাদের ভাষা ‘ক’ আগেই ঠিক করে দিয়েছিল। আমি পুরোটা বলেই ‘ক’ এর কাছে এসে ভয়ঙ্করভাবে কাঁপছিলাম । আমার কাপাকাপি আরও বেড়েছিল যখন ক্লাস শেষে চারটি ছেলে আমাকে ভয়ংকর ভাবে শাসিয়েছিল অপমানের শোধ নেবার জন্য।
কি ভয়ংকর অসহায় ছিলাম আমি সেদিন। আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। আমি জানতাম এ শাসানি ওদের ফুটন্ত রক্তের টগবগানি ছাড়া আর কিছুই নয় । বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে সবাই খুব শীতল হয়ে গিয়েছিল। সবাই সবার প্রতি ভয়ংকর এক ভালবাসা নিয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। আর ঐ ছেলেটি প্রচণ্ড ভালবেসে আমারই এক সহপাঠীকে বিয়ে করেছিল।
আমার তখন চলছিল এক ভয়ংকর শীতল নিষঙ্গ জীবন। সেই জীবনে অসখ্যংবার ভীষণ অসহায় হয়ে ছিলাম আমি। আমার সেই অসহায় সময় গুলোতে অনেক ফেব্রুয়ারি এসেছিলো। সেইসব ফেব্রুয়ারিতে এক অদ্ভুত তৃষ্ণা পেত আমার। আমার তৃষ্ণা আরও বেড়ে যেত যখন পরিপুষ্ট তরুণীরা বাসন্তী শাড়ি পরে রাস্তায় হাঁটত। সবল প্রেমিকেরা ইট সুরকির রাজপথ মখমল গোলাপে ঢেকে দিত। আমি কোনদিন কাউকে আমার তৃষ্ণার কথা বলিনি। আর ওরাও আমাকে ‘যার তৃষ্ণা পায়না’ এরকম লোক বলেই জানত। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এক ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছিলাম আমি। আমার নিঃসঙ্গতারা ক্রমে ক্রমে আরও বাড়ছিল।
নিঃসঙ্গ হতে হতে একসময় এই নিঃসঙ্গতাকেই ভালবাসে ফেললাম আমি। আরও নিঃসঙ্গ হতে সবাইকে ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যাব বলে ছোটবেলায় যেরকম ভেবেছিলাম, তাই করলাম আমি।
আমি হারালাম। অচেনা নিঃসঙ্গ রাস্তায় একা হাঁটতে লাগলাম। আমার নিঃসঙ্গ রাস্তার বাকে এক যুবক পথিকের সাথে দেখা হয়ে গেল।
যুবক জানালো, যুবকও আমার সাথে হাঁটতে চায়। আমি চাইলেই তার সঙ্গী হতে পারি। ঠিক কবিতায় যেরকম লিখেছিলাম সেরকম সঙ্গী। আমি যুবককে বলেছিলাম আমাকে যে লোকে উন্মাদিনী বলে। উন্মাদদের সঙ্গ তো নিরাপদ নয়। যুবক আমাকে আশ্বস্ত করেছিল। সে আমাকে বলেছিল পৃথিবীর সকলেই উন্মাদ। যারা আমাকে উন্মাদ বলেছিল ওরাও নাকি আমার মতই উন্মাদ ছিল। ওদের কেউ কেউ অসহায় ছিল। কেউ কেউ ভয়াবহ নিঃসঙ্গ ছিল, সবার মাঝেও ভীষণ একা ছিল। তবে সকলেই উন্মাদ ছিল।
যুবক জানিয়েছিল সে নিজেও একজন উন্মাদ পথিক। বলেই সে উন্মত্তভাবে আমার হাত ধরেছিল সেদিন।
তারপর থেকে সেই উন্মাদ পথিকের সাথে হাঁটছি আমি।
তার সাথে আমার এবার কাটছে প্রথম ফেব্রুয়ারি। তৃষ্ণার ফেব্রুয়ারি।
*** লেখাটা দুদিন আগে লেখা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১০:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





