কুয়েটে তখন দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে পড়ছি। একটি কোর্সে আমাদেরকে টিভি বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। আমি অল্প সল্প পড়ছি আর যাই পড়ছি ভাইয়ের সাথে ফোনে গল্প করছি। গল্পের উদ্দেশ্য একটাই। নিজের জ্ঞান গরিমা জাহির করা। আমার জ্ঞান কত সুদূর প্রসারী এটা বোঝাতে একদিন ভাইকে বললাম, “আমরা তো এই সেমিস্টারে টিভি নিয়ে পড়ছি। হাতে কলমে সবকিছু শিখছি”।
ভাই খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলো। বলল, তাই!
একের পর এক প্রশ্ন করছে সে এখন। এমনিতেই সে সবসময় আমাকে অনেক প্রশ্ন করে। অধিকাংশই খুব অদ্ভুত প্রশ্ন। এর বেশিরভাগের উত্তরই আমি জানি না। তবু মান রক্ষার্থে আমাকে ‘সবই জানি’ এমন ভাব নিয়ে উত্তর দিতে হয়।
প্রথম প্রশ্নঃ “আচ্ছা ধরো তোমাকে একটা টিভি বানাতে বলা হল, তুমি কি পারবে”? ভাই আমার ১১.৫ বছরের ছোট। কি আর বোঝে । আর সত্যি সত্যি তো বানিয়ে দেখাতে বলছে না। আমি খুব দৃঢ় ভঙ্গীতে বললাম, “হ্যা চেষ্টা করে দেখতে হবে। চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই পারা যাবে”।
দ্বিতীয় প্রশ্নঃ “টিভিটা যদি নষ্ট হয়। তবে সারাই করতে পারবে”? আমি কণ্ঠস্বরে আর একটু দৃঢ়তা এনে বললাম, “হ্যা পারার তো কথা”।
সেমিস্টার শেষ।
এক মাস রোজা ও ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। বাড়ি এসে দেখি টিভি নষ্ট।
আব্বুকে গিয়ে বললাম, আব্বু টিভিটা তো ঠিক করা দরকার। আব্বুর উত্তর টিভি ঈদের আগে ঠিক হবে না কারন টিভি ঠিক করার মত সময় তার হাতে নেই।
আম্মুকে ধরলাম, আব্বুকে বল। আম্মু আব্বুকে বলল।
বুঝলাম আম্মুর সময়ও কাটছে না। তাছাড়া জি বাংলার সিরিয়াল গুলোর আপডেট জানা আম্মুর খুব দরকার। আর আম্মু খবর দেখতেও খুব ভালবাসেন । আম্মু ভীষণ মনোযোগ দিয়ে খবর দেখেন আর প্রতিবার প্রশ্ন করেন ঐটা কি শাড়িরে তন্দ্রা। হাফ সিল্ক না কাতান ? রং টা কি? লাল লাল লাগছে যেন।
আম্মুর খবর দেখা হচ্ছেনা। শাড়ি নিয়ে মন্তব্য করাও হচ্ছেনা। কিন্তু আম্মুর অনুরোধও আব্বু ফেলে দিল। আব্বু বলে দিয়েছে হবে না। তার মানে সত্যিই হবে না।
আম্মুর মন খারাপ। আমার মন খারাপ। ছোট ভাই বোন দুটির মন খারাপ।
ছোট ভাইটি এসে ধরল আমাকে। তুমি তো ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছ। তুমি পারবে না ঠিক করতে? তুমিই না বলেছিলে তোমাদের গত সেমিস্টারে এসব পড়িয়েছে।
ভাইয়ের কথাটা কোথায় জানি লাগল। একটু ঢোক গিলে বললাম, “হ্যা তা পারব”। আর আমার সত্যিই মনে হল না পারার কি আছে? নিশ্চয়ই কোথাও কোন একটা তার কেটে গেছে। তাই চলছেনা। জোড়া লাগিয়ে দিলেই হবে। আর এসব জোড়া লাগানোর কাজ তো সার্কিট ল্যাবে আমরা হরহামেশাই করি ।
আম্মুর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হল। ভাবলাম অনুমতি মিলবে না। কিন্তু সিরিয়াল দেখার জন্য কিনা জানি না আম্মু একবারেই অনুমতি দিল।
আমরা টিভি ঠিক করা শুরু করলাম। আমি প্রধান প্রকৌশলী । সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ওলি (বয়স ৮) ঐশীকে (বয়স ৫) পাশে রাখলাম। প্রথমেই ট্রলি থেকে টিভি নামিয়ে আমরা খাটের উপর শুইয়ে দিলাম। এবার আসল কাজ টিভি সারাই।
টিভি সারাইয়ের প্রথম ধাপ টিভি খোলা। শোয়ানো টিভিটা খোলা হল। আমরা প্রথম ধাপে উত্তীর্ণ হলাম। এবার দ্বিতীয় ধাপ কেটে যাওয়া তারটা খোঁজা। কিন্তু খুলে দেখি ভিতরে অনেক ঝুল। ধাপে একটু পরিবর্তন আনতে হল। দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে ঝুল পরিস্কার করা হল। আধা ঘণ্টা লেগে গেল। এইবার তৃতীয় ধাপ, কেটে যাওয়া তারটা খোঁজা। কিন্তু কোন তারই কাটা দেখলাম না। সব তারই জোড়া লাগানো।
এদিকে সহকারী প্রকৌশলী, ভাই অধৈর্য্য হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল , কি? কিছু বুঝলে?
- “হ্যা বুঝেছি । সমস্যা আরও ভিতরে রে” ।
ভিতরের সমস্যা ধরতে আমরা এবার টিভির প্রতিটা পার্টস খোলা শুরু করলাম। কিন্তু কোথাও কোন কেটে যাওয়া তার দেখতে পেলাম না।
কেটে যাওয়া তার খুঁজতে খুঁজতে ক্রমাগত পার্টস খুলে কখন যে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলেছি খেয়াল করিনি । যখন খেয়াল হল দেখি রক্ত চক্ষু নিয়ে আব্বু রুমের মধ্যে দাড়িয়ে আছেন, সেখানে অসম্ভব ক্রুদ্ধ এক দৃষ্টি ।
সেই দৃষ্টিতে আমার সহকারী দুই প্রকৌশলী ভয়ে সটকে পড়ল। আব্বু বললেন, এটা কার কাজ? যদিও তিনি স্পস্টতই জানেন কার কাজ হতে পারে। তারপর প্রচণ্ড রেগে বললেন, “ তুমি মানুষ না। তুমি আসলে অন্য কিছু। এটা কি এক টাকার জিনিষ ? ছেলেখেলার জিনিষ এটা? রিক্সা দাড়িয়ে আছে। টিভি নিতে এসেছি। এক মিনিটের মধ্যে জোড়া লাগাবে তুমি”।
ছেলেখেলার জিনিষ যে নয় সে আমি ভাল করেই জানি। তবে এত বকার কি আছে ? জোড়া লাগিয়ে দিলেই তো হচ্ছে।
বললাম, এক্ষুনি দিচ্ছি।
কিন্তু জোড়া লাগাতে যেয়ে দেখি কিছুতেই জোড়া লাগছে না। স্ক্রু,পার্টস সব বেশি বেশি মনে হচ্ছে। কোথায় কি কিছুই ঠিক মত বসাতে পারছি না ।
এদিকে রিক্সা আলা ক্রমাগত ঘণ্টি বাজাচ্ছে। কিন্তু টিভি তো জোড়া লাগছে না।
উপায় অবশেষে আব্বু ই বের করলেন। ধানের বস্তা বাধার দড়ি দিয়ে টিভি বেঁধে রিক্সায় তোলা হল। সে এক দেখার মত দৃশ্য। সব জিনিসপত্র খুলে খুলে আসছে। কোনোমতে দড়ি দিয়ে সেটা আটকে রাখা হয়েছে।
কি মনে করে আব্বু রিক্সায় উঠেও আবার ফিরে আসলেন। আমাকে সাথে নিয়ে গেলেন। দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বললেন, আমার মেয়ে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। নতুন নতুন শিখছেতো। তবে ব্যাপারগুলো কিন্তু ও সবই জানে। সবই ওদের ক্লাসে পড়ানো হয়।
দোকানদার কি বুঝল জানি না। আব্বু আড়ালে ডেকে বলল, শোন তোকে সাথে আনলাম। যাতে দোকানদার আমাকে যা তা বুঝিয়ে ঠকাতে না পারে। কিছু না জানলেও তুই ভাব ধরে থাকবি যেন তুই সব জানিস।
দোকানদার বলল আপনাদের সি আর টি টিউব নষ্ট হয়ে গেছে। ৫০০ টাকা লাগবে।
আমি বললাম সি আর টি? এত আমাদের ক্লাসে পড়িয়েছে।
টিভি ঠিক করে আমি আর আব্বু বাসায় ফিরলাম। আব্বু বাসায় ফিরে আম্মুকে বললেন আমি তো ভেবেছিলাম হাজার ১/২ টাকা লাগবে। তোমার ইঞ্জিনিয়ার মেয়ে ছিল বলে দোকানদার ঠকাতে পারেনি।
আব্বু এই কথা কি ভেবে বলেছিল জানি না। কিন্তু ছোট ভাইয়ের কাছে আমার মান সম্মান কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছিল তাতে ।
আজকে ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আজ তার প্যারেন্টস ডে। এই দিনে তার সাথে কথা বলার সুযোগ থাকে । কিন্তু দেশ জুড়ে এখন পেট্রোল বোমা আতঙ্ক। তাই আব্বু যায়নি ওকে দেখতে।
ভাইকে নিয়ে এই ঘটনাটি এখন মনে পড়ল।
শুভ বসন্ত সবাইকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



