somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাঁদাবাজির মুখে সমাজের সহানুভূতি: হিজরাদের অধিকার নাকি নৈরাজ্যের ঢাল?

২৭ শে অক্টোবর, ২০২৫ সকাল ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চাঁদাবাজির মুখে অফিসের সম্মান ও সমাজের নিরাপত্তা

দুপুর দুইটা বাজে, লাঞ্চের পর আমি অফিসে আমার চেম্বারে বসে জরুরি একটি ফাইল দেখছিলাম। চারপাশে তখন অফিসের স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা, কেউ কম্পিউটারে কাজ করছে, কেউ ফাইল গুছাচ্ছে। হঠাৎ রিসেপশন দিক থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ স্বরে চিৎকার শুনতে পেলাম। প্রথমে ভাবলাম হয়তো কোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু শব্দে ক্রমশ অস্থিরতা বাড়তে লাগল— তাই নিজেই চেম্বার থেকে বের হয়ে গেলাম।

বেরিয়ে দেখি, আমাদের অফিসের রিসেপশন ডেস্কের সামনে তিনজন হিজরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা উচ্চ স্বরে কথা বলছে, মাঝেমধ্যে অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও শব্দ উচ্চারণ করছে। তাদের দাবী— অফিস থেকে পনেরো হাজার টাকা দিতে হবে। আমাদের রিসেপশনিস্ট হতবাক অবস্থায় বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, অফিস থেকে গত সপ্তাহেই তাদের একটি অনুষ্ঠানের জন্য সাত হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সে যুক্তি শুনছে না, বরং আরও ক্ষোভে চেঁচামেচি করছে।

শেষ পর্যন্ত অফিসের কয়েকজন কর্মী মিলে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে পাঁচ হাজার টাকায় তাদের “ম্যানেজ” করতে হয়। ঘটনা শেষ হলেও সবার মুখে একটাই প্রশ্ন— “এভাবে আর কতোদিন?”

সত্যি বলতে, আমাদের অফিসপাড়া এখন এই ধরনের হিজরাদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। তারা প্রায়ই অফিস, দোকান, এমনকি বাসাবাড়িতেও ঢুকে জোর করে টাকা দাবি করে। তাদের আচরণ এমন যে, কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। কেউ কেউ ভয় পায়, কেউ আবার বিব্রত হয়, কারণ “হিজরাদের সঙ্গে ঝামেলা করা ঠিক নয়” — এমন এক সামাজিক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার সমাধান কোথায়?

আমাদের সমাজে হিজরা সম্প্রদায় বহু বছর ধরে বঞ্চিত ও অবহেলিত। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, এমনকি পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। ফলে তারা জীবিকার জন্য অনেক সময় রাস্তায় গান-বাজনা বা আশীর্বাদ চেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে এসেছে। এটা সমাজের এক ধরনের সহানুভূতির জায়গা থেকে গৃহীত ছিল। কিন্তু এখন সেই জায়গাটা অনেকটাই বদলে গেছে।

আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এই সম্প্রদায়ের একটি অংশ তাদের পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে চাঁদাবাজিতে নেমেছে। কেউ কেউ প্রকৃত হিজরা নন, বরং কৃত্রিমভাবে এই বেশ ধারণ করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। তাদের আচরণে অশালীনতা, ভয়ভীতি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষ এখন প্রকৃত হিজরাদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রশাসনও প্রায়ই এই বিষয়টিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক। কারণ, হিজরাদের নিয়ে আইন প্রয়োগে একটি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কাজ করে— কেউ যেন “মানবাধিকারের বিরুদ্ধে” অবস্থান না নেয়। কিন্তু এই অজুহাতে যদি সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ বিপন্ন হয়, তাহলে সেটাও তো এক ধরনের অধিকার লঙ্ঘন!

প্রশ্ন হচ্ছে, হিজরাদের অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে কি আমরা অন্যদের নিরাপত্তা ভুলে যাব?

এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র সহানুভূতি দিয়ে হবে না। দরকার বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ। হিজরাদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের জন্য সরকার ও এনজিওদের আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যাদের কাজ করার আগ্রহ আছে, তাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু যারা অপরাধমূলক কার্যকলাপে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে— যেমনটা অন্য যে কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে হয়।

আমাদের অফিসে যে ঘটনাটি ঘটল, সেটি হয়তো ছোট একটি উদাহরণ। কিন্তু এটি সমাজের গভীর একটি অসুস্থ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আজ অফিস, কাল হয়তো স্কুল বা হাসপাতাল— কোথায় নিরাপত্তা? একসময় এই ভয় যদি সাধারণ জীবনের অংশ হয়ে যায়, তাহলে সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যাবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে— মানবিকতা মানে দুর্বলতা নয়। হিজরারা যেমন নাগরিক, তেমনি অফিসের কর্মীরাও নাগরিক। এক পক্ষের অধিকার রক্ষায় অন্য পক্ষের মর্যাদা যেন নষ্ট না হয়— এটাই ন্যায়ের মূল কথা।

সমাধান তাই একটাই — সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও আইনের শাসনের সমন্বয়। হিজরাদের পুনর্বাসন যেমন দরকার, তেমনি চাঁদাবাজির নামে চলমান নৈরাজ্য বন্ধ করাও সমান জরুরি। নইলে এক সময় সমাজের সহানুভূতি হারিয়ে যাবে, আর সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৫ সকাল ১০:৫০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪০



নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলেছি।
ঊর্ধ্বলোক আর নিম্নের অতল অন্ধকার কোন জায়গায়,
সে নিয়ে আর চিন্তা কি!

প্রিয়ার আহবানে আমরা কতো কিছুই না করি!
এবারে প্রিয়ার আহবানে দিক-শূন্যই নাহয় হলাম!... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতেই হবে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৭

স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতেই হবে....

দুইদিন আগে সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চের একজন সদস্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের তীব্র আপত্তি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এমন অবস্থায় ডেপুটি স্পিকার অত্যন্ত দৃঢ়তা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×