
মব কালচারের অবসান এবং জবাবদিহিতার সময়।
----------------------------------------------- ---------------------------
বিগত মাসগুলোতে বাংলাদেশ যা দেখেছে, তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা বলা যায় না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নাম দিয়ে একদল সুযোগ সন্ধানী যেভাবে 'মব জাস্টিস' বা গণপিটুনির সংস্কৃতি চালু করেছিল, তার দায় তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বিগত সময়ের কিছু তিক্ত বাস্তবতা:
বিগত মাসগুলোতে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ অরাজকতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা আধুনিক কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থায় কল্পনা করাও কঠিন। 'সংস্কার' বা 'পরিবর্তনের' আড়ালে যে মব কালচার বা গণ-আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তার খতিয়ান অত্যন্ত বীভৎস:
প্রতিষ্ঠান দখল ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ:
জনরোষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক জাতীয় সংবাদপত্রের অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে চড়াও হয়ে সম্প্রচার বন্ধ করা এবং জবরদস্তিমূলক দখলের যে সংস্কৃতি আমরা দেখেছি, তা মুক্ত গণমাধ্যমের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল। এই মব সন্ত্রাসীদের ভয়ে পেশাদার সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশে বাধ্য হয়ে পিছু হটেছিল।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও মাজার সংস্কৃতিতে আঘাত:
তৌহিদি জনতা'র নাম ভাঙিয়ে দেশের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মাজার এবং পীরের আস্তানাগুলো যেভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। ইবাদতগাহে আগুন দেওয়া এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করা হয়েছে।
আইনহীনতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড:
রাস্তায় রাস্তায় 'গণপিটুনি' দিয়ে মানুষ হত্যা করা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিরোধী মতের মানুষকে পিটিয়ে মারা, এমনকি মৃতদেহ নিয়ে উল্লাস করার মতো বিকৃত মানসিকতা আমরা দেখেছি। সবচাইতে জঘন্য ছিল কবর থেকে মৃতদেহ তুলে এনে অবমাননা করা এবং পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নারকীয় ঘটনাগুলো, যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ব্যক্তিগত সম্পদ ও বাসভবনে লুটতরাজ:
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বিরোধী মতের মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় মদদে ডাকাতি করার মহোৎসব চলেছে। সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না; বরং এই মব কালচারের হোতারাই এসব অপরাধকে 'বিপ্লব' হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা করেছে।
প্রতিহিংসার রাজনীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা:
একাত্তরের পরাজিত শক্তির দোসর এবং তাদের মদদপুষ্টরা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছিল। যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজেদের পছন্দের লোক বসানো এবং সরকারি বাসভবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করে রাখার এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় মেতেছিল তথাকথিত উপদেষ্টারা।
এখন সময় এসেছে এই তথাকথিত 'উপদেষ্টা' এবং মব কালচারের মদদদাতাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর। নির্বাচিত সরকার আসার পর এখন নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং বাসভবন ছেড়ে দেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
"যারা অন্যের ওপর মব লেলিয়ে দিয়ে ক্ষমতা ভোগ করতে চায়, ইতিহাস সাক্ষী—একদিন সেই মব তাদের দরজাতেই কড়া নাড়ে।"
আমরা চাই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা, যেখানে কোনো 'মব' দিয়ে নয়, বরং আইনের শাসনে দেশ চলবে। যারা বিগত দিনে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করেছে এবং অরাজকতা উসকে দিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিচার হতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া আর এক মুহূর্তও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল করে রাখা মেনে নেওয়া হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



