somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম: আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত ইশতেহার।

২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




​ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের খতিয়ান নয়, ইতিহাস মূলত লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকা কিছু অবিনাশী কণ্ঠস্বরের গল্প। আজ ২৬ জুন। ১৯৯৪ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের এক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বাতিঘর

—শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

কিন্তু তিনি কি কেবলই একজন শোকাতুর মা ছিলেন? না। তিনি ছিলেন এই রাষ্ট্রের চেতনার পাহারাদার, যিনি ক্ষমতার অলিন্দে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের মহোৎসবকে একাই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
​আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ইতিহাসের বিকৃতি আর ফ্যাসিবাদের নতুন রূপ দেখি, তখন জাহানারা ইমামের আপসহীন সংগ্রামী চরিত্রটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

একটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
​১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া এই নারী সমাজ ও ধর্মের প্রথাগত শৃঙ্খল ভেঙে নিজেকে যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন, তা আজীবন তাঁর চেতনার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে।

১৯৪২ সালে মাধ্যমিক, ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৪৭ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে এসেও তাঁর শিক্ষার ক্ষুধা থামেনি। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড এবং ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

​১৯৬১ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ১৯৬৪ সালে সেখান থেকে 'সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন' ডিগ্রি লাভ করেন। ​ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট—সর্বত্রই তিনি শিক্ষক হিসেবে মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। এই শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমিই তাঁকে পরবর্তীতে একটি জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক শক্তি জুগিয়েছিল।

​'একাত্তরের দিনগুলি':

শোক থেকে প্রতিরোধের মহাকাব্য
​জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের একজন অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা। একাত্তরের আগস্টে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর রুমী আর ফিরে আসেননি। শহীদ রুমীর বন্ধুদের মাধ্যমেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধার 'শহীদ জননী'।
​কিন্তু জাহানারা ইমাম কেবল ঘরের কোণে বসে কাঁদেননি। তাঁর রচিত 'একাত্তরের দিনগুলি' কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়; এটি একাত্তরের গণহত্যা ও প্রতিরোধের অবিনাশী দলিল। তাঁর কলম কেবল সাহিত্যচর্চা করেনি, বরং এটি ছিল এক একটি বুলেটের মতো তীক্ষ্ণ। এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধ: বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘গজকচ্ছপ’, ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস’সহ বহু গ্রন্থে তিনি মধ্যবিত্তের মনন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখেছেন।

​রাষ্ট্রীয় গাফিলতি এবং ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
:
ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। ​একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কেন একজন ষাটোর্ধ্ব ক্যানসারাক্রান্ত মাকে রাজপথে এসে আন্দোলন করতে হলো? এখানেই লুকিয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দালাল আইন বাতিল করা হয় এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের চূড়ান্ত চেষ্টা করা হয়, তখন রাষ্ট্র তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল।
​একটি ঐতিহাসিক সত্য: রাষ্ট্র যখন আপস করে, নাগরিক তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ‘গণআদালত’ বসিয়ে গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার করা হয়েছিল। ​ক্ষমতার নির্মমতা ও নাগরিকের জেদ
​তৎকালীন রাষ্ট্রক্ষমতা এই ঐতিহাসিক নাগরিক আন্দোলনকে স্বাগত জানায়নি, বরং তৎকালীন সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতার মামলা’ দায়ের করেছিল। ক্যানসারের ক্ষয়িষ্ণু যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি এই ঔদ্ধত্যের কাছে মাথা নত করেননি। রাষ্ট্র যে অপরাধীদের আড়াল করতে চেয়েছিল, জাহানারা ইমামের গণআদালত তাদের অপরাধ জনগণের কাঠগড়ায় নগ্ন করে দিয়েছিল।

​স্বীকৃতি এবং শেষ বিদায়: চেতনার রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার
​জাহানারা ইমামের এই অবদান কোনো পদক বা পুরস্কারের মুখাপেক্ষী ছিল না, তবুও রাষ্ট্র ও সমাজ তাঁকে ‘স্বাধীনতা পদক’, ‘রোকেয়া পদক’ ও ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’সহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত করতে বাধ্য হয়েছে।
​১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই যখন তাঁর মরদেহ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আনা হয়, তখন জাতীয় ঈদগাহে জনতার ঢল প্রমাণ করেছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার বানোয়াট মামলা জনগণের ভালোবাসার কাছে কতটা নগণ্য। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করার সময় মুক্তিযুদ্ধের আটজন সেক্টর কমান্ডার তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেছিলেন। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের গালে এক ঐতিহাসিক চপেটাঘাত—যাঁরা দেশদ্রোহী বলেছিল, তাঁদেরই সামরিক স্যালুট দিয়ে স্বীকার করতে হয়েছিল যে এই নারীই এই দেশের চেতনার জননী।

লড়াইয়ের মশাল হোক চিরন্তন। ​জাহানারা ইমামের মৃত্যুর দুই দশক পর, ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ সুগম হয়েছিল, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামই স্থাপন করে গিয়েছিলেন।
​আজকের অনলাইন অ্যাক্টিভিজম এবং নাগরিক সমাজের বড় সংকট হলো আপসকামিতা। জাহানারা ইমাম আমাদের শিখিয়েছেন, শরীর ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও মনকে কখনো ফ্যাসিবাদের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে দেওয়া যাবে না। শোষকের মামলা-হামলাকে পরোয়া না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে কীভাবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করতে হয়, জাহানারা ইমাম তার নাম। এই সমাজ, এই রাষ্ট্র যতদিন বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বে, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম প্রতিটি লড়াইয়ের মিছিলে প্রথম সারিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

​লড়াই জারি আছে, লড়াই জারি থাকবে। শহীদ জননী, তোমায় লাল সালাম।[/sb


সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন মসজিদের কাজ শুরু করলাম

লিখেছেন প্রামানিক, ২৫ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

আলহামদুলিল্লাহ্, নতুন মসজিদের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। আজ সকাল দশটায় গ্রামের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ উদ‍্যোগী মানুষ নিজ উদ‍্যোগেই মাটি কেটে দিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০



প্রিয় কন্যা আমার-
ফাজ্জা তোমার স্কুল বন্ধ। তুমি তোমার নানা বাড়ি গেছো। এবার অনেকদিন থাকবে নানা বাড়ি। নার্সারি থেকে কেজি ওয়ানে উঠলে। বেতন বেড়েছে। খরচ বেড়েছে। আমি নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসাহাসি থেকে সাফল্যের ইতিহাস: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৫২



এক সময় অনেক সমালোচনার মুখে ছিল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (সাবেক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১)। তখন অনেকেই বলেছিল, এত টাকা খরচ করে এসব করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু আজ ধীরে ধীরে সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোসাইপুর ১৯৭১

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:৫০



জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×