একটা হার্ড কপিকে সফট কপি সফল ভাবে বানানো সহজ কাজ নয়-অনেক সময় সাপেক্ষ কাজও বটে। এই শহুরে সমাজের নানান ঝুট ঝামেলায় এমনিতেই বেশামাল মত হয়ে আছে —নিলয়;গত কয় দিন তার মাথা ঠিক ছিল না, আমেরিকা বাসী বন্ধুর অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে গিয়ে বড়ই অসুবিধায় পড়ে গেছে।.. যাক তবুও এখন কাজটা শেষ করতে পেরে আনন্দই লাগছে এখন। উঁচু উঁচু বিল্ডিং এর মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করতে লাগলো নিলয়। বন্ধু অলি গাড়ি নিয়ে আসছে। নিলয়-- মাঝারী গড়নের শরীর তার, ছাব্বিশ বছর বয়স। হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের কাছে এসে দাঁড়াল। এখন একটু আগে তার বড়লোক বন্ধু ফোন করেছে শাহবাগ মোড়ের কাছে থাকতে। ....গাড়িটা থামতেই উঠে বসলো নিলয়।
--কি খবর রাতে ঘুম টুম হয় নাই নাকি ?
--আসলে কিভাবে যে তিন দিনে শেষ করব,.... বিশাল কাজ। পরশুদিন থেকে কেবল এ চিন্তাই আমার মাথা নষ্ট করে দিয়েছে। এটুকু বলে নিলয় বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তার মনভাব বুঝতে চাইল, ভাবলো কিছু একটা শয়তানি করা যায় কিনা।-- নাহ! চেহারাটা দেখে কিচ্ছু বুঝা যাচ্ছে না।
গত তিন দিনের কথা ভাবতেই মনটা আনচান করে উঠলো , নাহ এত সহজে হবে না। অলি তাকে টাকা দিবে সেটা বড় কথা নয়, অলি অনেক টাকাপয়সার মালিক এখন, সেটা সে মাসকাবারিতে এমনিতেই তো খরচ তো করে, কিন্তু বন্ধুর কাছে এটাই তো সব চাওয়া হতে পারে না। আর সে তো ইচ্ছা করে আর টাকা পয়সা চাইতে কাজ করছে না।এই অলি -- দেশে আসলেই অলি নানান বাহানায় তাকে ব্যতিব্যাস্ত করে রাখে, বিভিন্ন অজুহাতে অদ্ভুত সব কাজের আব্দার নিয়ে আসে,প্রত্যেক বারই এমন করে সে।
--হুম, উত্তরা চল, কি বল- বাসায় গিয়ে সব বুঝে নেব তখন। মজার কিছু ছবি আছে খেতে খেতে দেখা যাবে। তোমার কোন সমস্যা নাই তো?
নিলয়ের মনে একটাই ইচ্ছা প্রবল, এখন কিভাবে অলিকে একটু পাঁকে ফেলা যায়।এখন তার রুপার কথাই মনে হল কেন জানিনা রুপার সাথে অলিকে পরিচয় করিয়ে দিলে পরে এবার ব্যাপারটা তালগোল পাকাতে সময় নেবে না।
মনে মনে নানান প্যাঁচ কসতে কসতে নিজেকেই যেন বলল সেঃ- 'আমিতো সবসময়েই জানি যে আমি বুদ্ধিমান একজন কিন্তু তারপরও এমন কিছু সময় জীবনের ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে এসে জায় যখন মনে হয় যেন আমিই বোধ হয় সর্ব বোকা বা বেকুব জাতীয়।' --নিলয় নিশ্চুপ মনে ভাবছে কি করে অলিকে ওখানে নেয়া যায়। মেয়েটা এসময় একলাই থাকে।সে কিছু না বলে চুপ করে প্লেয়ার এ গান লোড করতে থাকে।মনের মধ্যে একের পর এক প্ল্যান উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছেঃ- কি করা যায়- কি করা যায়। সে একটার পর গান প্লে করে আর চেঞ্জ করতে করতে ভাবছে রুপা যদি ...উঁহু বাদ দাও... এমন হয় না।
শহরের যানবাহনের ভিড়ের মদ্ধেও নিলয়ের খুব খারাপ লাগতে লাগলো ; কেন জানি আবারো শয়তানি করার ইচ্ছা জেগে উঠলো মনে। কিন্তু চেহারায় সরল সিধা ভাবটা বজায়ে রেখেই খুব বড় অঘটন ঘটানর জন্য মনকে রেডি করতে লাগলো সে। সেটাই ভাল বুদ্ধি ; দেখা যাক রুপা কিভাবে নেয় অলির মত নারী বিদ্বেষী অথচ সুদর্শন এক প্রবাসী কে।ওদের দুই জনের সঙ্ঘাত সংঘর্ষ উপভোগ্যই হবে। প্রতিদিনের এই ঢাকা শহর আসলেই নিত্য দিনের জন্য নুতন রুপে আসে, সবার জন্যই প্রতিদিনের এই শহরটা নতুনত্তের খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। অথচ আমরা অনেকেই তা জেনেও জানি না।কেন জানিনা আবার কেউ কেউ আছে এমন যে যারা ঢাকা আর নিউ ইয়র্কের মধ্যেকার যে পার্থক্য; সেটাও বুঝে না।নাকি বুঝতে চায় না। ইচ্ছাকৃত।অনেকে সুধু বুঝে দিন রাতের শহুরে আবর্তন—আর তাদের দেশ কিংবা বিদেশের নেশা ধরানো সব কথামালা, মন্তব্য সমালোচনা।চলতেই থাকে। নাহ অলিকে এবার একটা শিক্ষা না দিলেই নয়। সে দেশী কোন মেয়ের নাম পর্যন্ত শুনতে ইচ্ছুক না, আর একারনেই নিলয়ের মনের অলিকে নিয়ে তাবৎ সন্দেহ।
--বুঝলে , এই তিনটা দিন আমার খুব কষ্ট হইছে। টাইপ করতে করতেই আমার জান বাইর হইয়া গেছে। একদম অনিচ্ছাকৃত একটা ভাব
মুখে এনে বলল নিলয়।
--আমি পরের সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক যাব ; তোমারে তো আর বিশ্বাস নাই। বান্ধবীর লগে সময় দেওয়ার জন্য তো জীবনে সময় তোমাদের সারা বছরই থাকবে।আমি কাজটা করানোর জন্য অন্য লোকও পেতাম। তবুও-- তোমারও তো কিছু আয় হল। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তাটা মেপে নিল যেন সে।
--আমরা বাংলাদেশ বলতেই কেবল যে টাকার চিন্তায় সব কিছু বাদ দিয়ে দেব এটা কিন্তু ভুল বললা । অর্থ কড়ি মানুষকে যতটা না পরিবরতন করে তারচেয়েও মানুশ বেশী পরিবরতন হয়ে যায় টাকাপয়সার কারনে -নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে সিদ্ধহস্ত হয় পরে।
ফুটপাতে মানুষের জটলার দিকে তাকিয়ে যেন একটু মুচকি হাসল অলি। আবারো গাড়ি চালানোয় মন দিল সে।
রুপাকে কিছুই না জানিয়ে তার কাছে অলিকে নেয়া কি ঠিক হবে,
--অলি, তোমাকে আমি রুপার কথা বলেছিলাম না, মনে আছে।
--ওই যে খুব ভাল কবিতা লিখে যে ওই মেয়েটা – সেই কি রুপা। আচ্ছা আছা।কেন।
রুপাও যে উত্তরায় থাকে সেটা এই মুহুরতে বলাটা ঠিক হবে না। রুপা যে সুধু একজন লেখিকা সেটাই সব নয়, সে অহঙ্কারি একটা মেয়ে। পুরুষদের সম্বন্ধে তার অদ্ভুত কিছু সন্সকার রয়েছে, সবাই সেটা বুঝতে পারে না।কিন্তু নিলয় তাকে দীর্ঘদিন চেনে।
অলি বলল,
--কবিতা টবিতা আমি ভাল বুঝি না।সুধু জীবনানন্দের কবিতার বই পরেছি সেই কবে জানি-- মনে নাই। এখন আর সময় কই কবিতা পড়ার। বাসী ভাত নিয়ে তো আর কবিতাই হবে না। টাটকা আবেগও লাগবে। অলি যেন উপযুক্ত উত্তরটা হটাত খুজে পেয়ে সিটে নড়েচড়ে বসল এবার।
--কবিতা পড়তে হয় না, জীবনের প্রয়জনেই কবিতা স্রিস্তি হয়ে থাকে।নিলয় আরও কিছু যেন যোগ করতে চাইল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে অলি বলে উঠল;
--এত সব ছন্দ মন্দ করেই তো বাঙ্গালির জীবনে উন্নয়ন হচ্ছে না।
নিলয় এমনিতেই রেগে আছে, রাগটা এবার সত্যি অনুভব করছে সে শরীরে। ভাবছে নাহ আর সহ্য করবে না। রেগে গিয়ে কিছুটা উচ্চ কণ্ঠে বলল সে,
--কবিতা যে শুধু ছন্দ তা তো না এর প্রান ও আছে, সেটা হচ্ছে এর প্লাটফর্ম। আর এই প্লাটফর্মে অংশগ্রহন করা না হলে সে বোদ্ধা কেউ নয়।
--তো তোমার তো কোন বই পড়বার মত সময় আছে বলে মনে হচ্ছে না। রুপার সাথে কবিতা নিয়া আলোচনা করতে অসুবিধা হয় না।
তার এই হাসি যেন জালা ধরায়ে দিল নিলয়ের মনের মধ্যে। সে অসহায়ের মত শুধু প্রসংগতা ধরে রাখারই জন্য বলে চলল,
-- কবিতা বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন হয়। তা না হলে কবিতা না হয়ে সেটা হবে ‘ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী’ জাতীয় সাইন্স ফিকশন কিংবা এমন গোছের কিছু হবে। সেটা তো আর কবিতাই না। শুধু ছন্দের বাহার। 'দোল দোল দুলুনি...'।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনের কারোরই কোন কথা নাই,
--আমরা সবাই তো কম বেশী কিছু না কিছু পরিবর্তন হই ,এই যে শাহবাগ; কবি নজরুল ইসলাম আভেনিউ; এখান থেকে উত্তরা জসীম উদ্দিন পর্যন্ত সবখানেই আর সর্বত্র কিন্তু অভিযোজন চলছে। হা... হা... হাসতে হাসতে বলল অলি।
--পৃথিবীটা হচ্ছে এরকমঃ- ‘খাই নুন গাই গুন’। তো তোমার রুপা কোথায় থাকে। সে বলে গেল।
কিছুক্ষনের জন্য আবারও নিরবতা নেমে এল। অলি গম্ভির হয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো । নিলয় পকেটে হাত দিয়ে সফট কপিটা বের করতে গিয়েও পরে স্থির হয়ে গেল, পাসেঞ্জার সিটে হেলান দিয়ে বসলো।
এয়ারপোর্ট রোডে গাড়ির দ্রুত গতির সাথে তাল মিলিয়ে এতক্ষন স্লো মশানের চলমান আশেপাশের সব অক্ষর গুলি যেন ধীরে ধীরে ম্লান হতে হতে সৃতির গোড়ায় গিয়ে আবারও সেইসব পুরাতন আখর হয়ে যেতে থাকলো ।শাহবাগ!!–সেই তো শাহবাগ , ওই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়া, ফার্মগেট!!- হরেক সাইনবোর্ডের মিশেল ভি আই পি রোডের ব্যস্ততা, সেটাও এখন সৃতির প্রান্তে মিশেছে। গাড়ি কোন সময়ে যে উত্তরা ঢুকল বুঝতেই পারলনা নিলয়। অলির মুখ খুব গম্ভীর, পাশ থেকে দেখে নিলয় বুঝলনা কি ভাবছে এখন অলি। এখন কিছুক্ষনের জন্যে হলেও অহংবোধ, বিদ্বেষ, রাগ-তিক্ততা যেন এই আছে এই নাই অবস্থায় মিলিয়ে যেতে থাকলো। তার মনের মধ্যে,বিশাল ব্যাপ্তির মাঝে কোন কোন ক্ষুদ্রতাকে টেনে এনে রাখা যায়? সময়ের সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোড়াতালিকে নাকি জোরাতালি দেওয়া সমস্ত সময়ের সবগুলো আকাঙ্খাকে একবারে দেখে নেয়ার জন্য।মনকে বোঝান যায়! নাকি কোন বড় থেকে কোন একটা ক্ষুদ্র উপাখ্যানে এসে গিয়ে অবশেষে ভাষা, সংস্কৃত, ঐতিহ্য এসবেরই সংস্থানে। মনের কি এই দৌড়।
কখন যেন জসিমুদ্দিন রোড চলে এসেছে--- খেয়ালই করে নাই নিলয়। পাশের সাইড রোডটি-- পরিচিত সেই রাস্তাটি-- পার হওয়ার সময় বামদিকে ফিরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো সে , ধীরে ধীরে সাইড রোডটা পার হয়ে গেল গাড়ি। সে সুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে অলির দিকে ফিরে তাকাল, কিছুই বলল না। গাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে চলতে থাকলো।তাদের কারো মুখেই কোন কথা নাই।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০১৮ দুপুর ২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



