
প্লেটোর 'অ্যাপোলজি' কোনো সাধারণ ক্ষমা প্রার্থনার দলিল নয় (গ্রিক শব্দ Apologia মানে আত্মপক্ষ সমর্থন বা যুক্তির ব্যাখ্যা)। ৫০০ জন জুরির সামনে দাঁড়িয়ে ৭০ বছর বয়সী সক্রেটিস যে নির্ভীক বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অনুপ্রেরণাদায়ক দলিল।
চাটুকারিতা বনাম সত্যের শক্তির লড়াই
বক্তব্যের শুরুতেই সক্রেটিস জুরিদের অনুরোধ করেন তারা যেন তার কথা বলার ধরণ বা অলঙ্কারিক ভাষা না দেখে, বরং তার কথার ভেতরের সত্যকে বিচার করে। তিনি বলেন:
======================================================================
"আমার কুৎসাকারীরা অত্যন্ত গুছিয়ে এবং সুন্দর ভাষায় কথা বলেছে, যা প্রায় বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু তাদের একটি কথাও সত্য নয়। আর আমি আপনাদের সামনে কোনো সাজানো নাটক করব না, কেবল সহজ-সরল সত্যটি তুলে ধরব। সত্যেরই জয় হোক।"
======================================================================
অ্যাথেন্সের 'ঘোড়ামাছি' বা ডাঁশ
সক্রেটিস নিজেকে ঈশ্বরের দেওয়া একটি উপহার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি একটি বিখ্যাত রূপক ব্যবহার করে বলেন, অ্যাথেন্স রাষ্ট্রটি হলো একটি বিশাল, উন্নত জাতের কিন্তু অলস ঘোড়ার মতো, যা তার বিশালত্বের কারণেই ধীরগতির হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন:
======================================================================
"ঈশ্বর আমাকে এই শহরের বুকে একটি 'ঘোড়ামাছি' হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমি সারাদিন ধরে আপনাদের পেছনে লেগে থাকি, আপনাদের প্রতিটি জায়গায় কামড় দিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করি, যেন আপনারা অলসতা কাটিয়ে জেগে ওঠেন। আপনারা যদি আমাকে আজ হত্যা করেন, তবে আপনাদের জাগিয়ে তোলার মতো এমন আরেকটি মাছি সহজে খুঁজে পাবেন না।"
======================================================================
মৃত্যুর চেয়ে অধর্মকে বেশি ভয় পাওয়া
বিচারক ও জুরিরা যখন তাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে তিনি যদি প্রশ্ন করা এবং দর্শন চর্চা ছেড়ে দেওয়ার শর্ত মানেন, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, তখন সক্রেটিস বুক চিতিয়ে বলেন:
======================================================================
"হে অ্যাথেন্সের নাগরিকবৃন্দ, আমি আপনাদের সম্মান করি এবং ভালোবাসি। কিন্তু আমি আপনাদের চেয়ে ঈশ্বরের আদেশকে বেশি মান্য করব। যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ আছে এবং সামর্থ্য আছে, আমি দর্শন চর্চা এবং সত্যের অনুসন্ধান থেকে বিরত হব না। আমি যাকে দেখব তাকেই থামিয়ে প্রশ্ন করব - 'আপনি অ্যাথেন্সের মতো এক মহান শহরের নাগরিক হয়েও কেবল টাকা-পয়সা, খ্যাতি আর সম্মানের পেছনে ছুটছেন? অথচ নিজের বুদ্ধি, সত্য আর আত্মার উন্নতির দিকে বিন্দুমাত্র নজর দিচ্ছেন না? আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত!"
======================================================================
অপরীক্ষিত জীবন বাঁচার যোগ্য নয়
মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার ঠিক আগে সক্রেটিস তার জীবনের মূল দর্শনটি এক লাইনে প্রকাশ করেন, যা আজ আড়াই হাজার বছর পরেও মানুষের মনে কাঁপন ধরায়:
======================================================================
"আমি যদি বলি যে প্রতিদিন সদগুণ বা পুণ্য নিয়ে আলোচনা করাই মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ, এবং অপরীক্ষিত জীবন মানুষের জন্য বেঁচে থাকার যোগ্য জীবন নয় (The unexamined life is not worth living) - তবে আপনারা হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এটাই পরম সত্য।"
======================================================================
জুরিদের উদ্দেশ্যে শেষ অমোঘ বাণী
যখন বিচারে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত হয়ে যায়, তখন সক্রেটিস বিন্দুমাত্র ভেঙে পড়েননি। তিনি যারা তার মৃত্যুর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন:
======================================================================
"আপনারা ভাবছেন আমাকে হত্যা করে আপনারা আপনাদের পাপ ও অন্যায়ের সমালোচনা থেকে রেহাই পেয়ে গেলেন। কিন্তু আমি আপনাদের সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি, আমার মৃত্যুর পর আমার চেয়েও শতগুণ তরুণ সমালোচক তৈরি হবে, যারা আপনাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে। কাউকে হত্যা করে সত্যকে স্তব্ধ করা যায় না।"
======================================================================
সবশেষে পরম শান্তিতে তিনি বিদায় নেন এই বলে:
======================================================================
"এখন আমাদের বিদায়ের সময় সমাগত। আমি চললাম মৃত্যুর দিকে, আর আপনারা বেঁচে থাকার দিকে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কার পথটি বেশি কল্যাণের, তা ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ জানে না।"
======================================================================
সক্রেটিসের এই ঐতিহাসিক বক্তব্য বিশ্ব চিন্তাধারাকে বদলে দিয়েছিল।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



