
ফ্ল্যাশ ব্যাক
পার্থ দ্যা অনলি ওয়ান – ২৭ শে অক্টোবর
হঠাৎ কংক্রিটের মৃতনগরী ছেড়ে সবুজের স্নিগ্ধ অরণ্যে আসলে একধরনের অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।বুক ভরে প্রশান্তির নিশ্বাস নেওয়া যায়। কয়েকদিন থেকেই জল্পনা কল্পনা হচ্ছিল পিকনিক হবে। সবাই যেন যান্ত্রিক শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত হতে চাচ্ছিল।সবচেয়ে বেশী করে এই শহরের কোলাহল থেকে পালাতে চাচ্ছিল সামিরা। সেই আমাকে একদিন বলল চল এই শহর ছেড়ে দুরে কোথাও পালিয়ে যাই।
খুব বলতে ইচ্ছা করছিল, চল যাই! চল এমন কোথাও চলে যাই যেখানে আমাদেরকে খুঁজে পাবেনা কেউ। গাছের ডাল ভেঙ্গে বানাবো আমরা পাখির নীড়ের মত বাসা। প্রতিদিন হরিয়ালের ডাকে ভাঙবে আমাদের ঘুম। কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই, কোনো শাসন বারণ নেই। ৮ টা ৫ টা চাকুরীর ঘানি, প্রতিযোগীতা, লোভ লালসাহীন জগতের বাসিন্দা হবো আমরা। রোজ সকালে তোমার মায়াবী চোখের পরশ মেখে বেরিয়ে পড়ব খাদ্যের সন্ধানে। সন্ধ্যায় ফিরে আসব ক্লান্তি এবং তোমাকে দেখার প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে। তারপর তোমার স্পর্শ সুখে সব ক্লান্তি, সব অবসাদ লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে ভালোবাসার প্রবল ঝড়ে। আদিম নরনারীর মত একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আমরা বেঁচে থাকব বন্য ভালোবাসার তীব্র আকর্ষণে। কিন্তু সামিরাকে আমি এসব কিছুই বলিনি। সামিরাকে এমন অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছা করে যা কখনোই বলা হয়না। হয়তো কোনদিন বলাও হবেনা।
কাল রাতে সামিরা তার পিকনিকের পরিকল্পনা নিয়েও একের পর এক জল্পনা কল্পনা করে যাচ্ছিলো। ও বলছিলো, আমি শুধু শুনেছি। সে বলেছে, সবাই মিলে পিকনিক করতে যাচ্ছি ঠিক আছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তুমি একের পর এক সিগারেট খাবা আর বন্ধুদের নিয়ে তাস খেলবা এটা কিন্তু হবেনা। যদি এসব কর আমি কিন্তু সেখান থেকে চলে আসব। যে যা ইচ্ছা তা করুক তুমি শুধু আমার সাথেই থাকবা। আমি আর তুমি নিজেদের মত করে হারিয়ে যাব গহীন অরণ্যে। আমি গান গাব, তুমি মুগ্ধ হয়ে শুনবা! ঠিক আছে? আমার গান শুনে যদি হাস তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে! এ কথা শুনে তখনই আমার হাসি পাচ্ছিলো তবু বললাম, হাসব না। সে বলল তুমিতো এখনই হাসছ! তুমি সবসময় হাস! আমি কিন্তু তোমার এসব মিচকামী কিছুতেই সহ্য করব না। বলে নিজেই হেসে ফেলল।
এই শুনো, কাল তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিব। যদিও সেটা ভাবতেই আমার খুব লজ্জা লাগছে! হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। আমি কিছু বলিনা। সম্মোহিতের মত সামিরার কথা শুনতে থাকি। ওর কথায় এমন একধরনের মায়াবী সারল্যের ছোঁয়া আছে যা সবসময় আমাকে এক ঘোরের জগতে নিয়ে যায়। আমি তাই চুপ করে মন দিয়ে শুনি। এমন সব মুহূর্তে মনে হয় আমার চেয়ে সুখী মানুষ বোধহয় এই পৃথিবীতে একজনও নেই।
সবাই পিকনিকে এসেছে। শুধু সামিরা আসেনি। আজ সকাল থেকে তার মোবাইল অফ। ভেবেছিলাম ইচ্ছা করেই হয়তো বন্ধ রেখেছে। আমাকে চিন্তায় ফেলার জন্য হয়তোবা এমন করছে। শেষ মুহূর্তে ঠিকই এসে বলবে তুমি কি মনে করছ, আমি আসব না? মনে মনে খুব খুশী হচ্ছিলে না! ভাবছিলে যাক বেঁচে গেছি! এখন পিকনিকে যা ইচ্ছা তা করা যাবে! এখন আমাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলে না? কিন্তু না, সামিরা শেষ পর্যন্ত আসেনি।
সামিরার কথা মত আমি আসলেই একের পর এক সিগারেট খাচ্ছিলাম না। তাস খেলছিলাম না। কোন আড্ডা কিংবা দলবেঁধে ছবি তোলা কিছুতেই ছিলাম না। যে শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচার জন্য এসেছিলাম, সেই শহরেই বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল এখানে আমি কি করছি? কেন আছি? সামিরা আমার পাশে ছিলনা। কিন্তু আমার পুরোটা ভাবনা জুড়ে শুধু সামিরাই বিচরন করছিল। আমি অন্য কিছুই ভাবতে পারছিলামনা। প্রকৃতির স্নিগ্ধরুপ আমার কাছে অসহ্য লাগছিল। বন্ধুদের হাসিগান, ঠাট্টা সবকিছুই খুব বিষাদময় মনে হচ্ছিল।
সামিরাকে খুব মিস করছিস? নিলয় কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইল। নিলয় আমার খুব ভালো বন্ধু। সে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিল আমার মনে কি ঝড় চলছিল। বলল আচ্ছা সামিরা কি কোন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তোকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। সেদিন সামিরা আমাকে কল দিয়েছিল। সে তখন শাহবাগ ছিল। সামিরা কাঁদছিল।তার নাকি গাড়ি নষ্ট। তাই সিএনজি করে এসেছে। কিন্তু সে কোথায় কিভাবে যাবে সব নাকি ভুলে গেছে। আমি সিএনজি ড্রাইভারের সাথে কথা বলে সব বুঝিয়ে দিলাম। পড়ে যখন সামিরাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে বলল হঠাৎ করে নাকি সে সব ভুলে গিয়েছিল। তারপর আমাকে অনুরোধ করল তোকে যেন এসব কিছু না বলি। তোকে বললে তুই নাকি খামাকা টেনশন করবি।
নিলয়ের কথা শুনে আমি সোজা হাঁটা ধরলাম। আমাকে সামিরার কাছে যেতে হবে! সামিরার খুব খারাপ কোন একটা সমস্যা হয়েছে। বন্ধুরা চীৎকার করে ডাকছে। কিন্তু আমার কিছু শোনার সময় নেই।ভাবার সময় নেই। আমাকে সামিরার কাছে যেতে হবে। আমি দৌড় শুরু করলাম। সবটুকু শক্তি দিয়ে আমি দৌড়ে যাচ্ছিলাম। কোথায় যাচ্ছিলাম আমি?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



