somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভ্রান্তি-বিলাস (৭)

২৯ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ফ্ল্যাশ ব্যাক
পার্থ দ্যা অনলি ওয়ান – ২৯ শে অক্টোবর


সামিরা এত সহজে রাজি হয়ে যাবে ভাবিনি। ওকে যখন বললাম," আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে", ও খুব সহজেই বলল "চল"। বললাম "কোথায় নিয়ে যাব জানতে চাইলে না?" ও খুব আনন্দিত হয়ে বলল, "না, জিগাসা করলাম না। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাব। তোমার সাথে আমি জাহান্নামেও যেতে রাজি আছি।" একটু চুপ করে থেকে বললো, "তবে আমি জানি তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে। তুমি আমাকে আগে থেকে বলো না, ঠিক আছে? আমি মিলিয়ে দেখব আমার অনুমান ঠিক আছে কিনা। এটা একধরনের খেলার মত হবে। কারণ মানুষ যখন কাউকে খুব ভালোবাসে তখন তার সম্পর্কে কোন অনুমান মিলে গেলে একধরনের অন্যরকমের আনন্দ পাওয়া জায়। মনে হয় ভালোবাসার খেলায় জিতে গেছি। কিন্তু তোমাকে এসব বলে কোন লাভ নেই। কেন জান? আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই বলল কারন তোমার ভালোবাসার ক্ষমতাই নেই। আমার আছে। সেই ক্ষমতার কাছে তোমার নির্লিপ্ততা একদিন পরাজিত হবে। ওই যে বাংলা সিনেমার একটা গান আছে না? আমি পাথরে ফুল ফুটাবো, শুধু ভালোবাসা দিয়ে! হি হি হি " সামিরা কথাগুলো বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে। আমি মুগ্ধ হয়ে এই মায়াবী মানবীর দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার ভিতর ভালোলাগা, অপরাধবোধ, রাগ, আনন্দ, এবং ভালোবাসার এক মিশ্র বোধ কাজ করতে থাকে। আমার মধ্যে হঠাৎ এমন এক বোধের জন্ম হয় যাকে সংজ্ঞায়িত করার কোন ভাষা আমার জানা নেই।
সামিরা ঠিক করেছে আজ আমার সাথে রিকশায় করে ঘুরে বেড়াবে। সামিরাকে কেন যেন আজ খুব খুশী খুশী লাগছিল। সে আজ খুব করে সেজেছে। এর আগে সামিরা যখনই একটু বেশি সাজগোজ করে এসেছে আমি তাকে খুব পঁচিয়েছি। ওর সাজগোজ নিয়ে কিছু বললে সামিরা খুব রেগে যায়। আসলে আমি তার এই রেগে যাওয়াটাই উপভোগ করি। যেমন একদিন সে খুব সেজে ঘুরতে বের হল। নীল শাড়ীতে তাকে ঠিক নীল পরীর মতই লাগছিল। সে আমার কাছে জানতে চাইল, "আমাকে কেমন লাগছে?" আমি হাসিমুখে বলে দিলাম একেবারে শাকচুন্নির মত লাগছে। নীল শাঁকচুন্নি। সামিরা এতটাি রেগে গেলো, যে তিনদিন ফোন অফ রাখলো, হাহাহা।। আমি কখনোই তার রুপের তারিফ করতামনা, বরং সবাই যখন সামিরার প্রশংসায় মশগুল থাকত, তখন আমি তাকে উল্টাপাল্টা বলে খেপিয়ে দিতাম। আজও সামিরা নীল শাড়ি পড়ে এসেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা নীল পরী মনে হয় ভুল করে পথ ভুলে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। সামিরা এসেই আজ আমাকে অবাক করে বলল, "আজও শাঁকচুন্নি সেজে আসলাম। তোমার সাথে শাঁকচুন্নি ছাড়া আর কে থাকবে বল?" আমি বললাম, "তোমার মত পথ ভুল করে এই পৃথিবীতে চলে আসা পরীরা থাকবে।" সামিরা আমাকে চিমটি দিয়ে বলল, "তুমি ঠিক আছো? কার মুখে কি শুনছি এইসব। নতুন ভাবে আমাকে পচানোর জন্য ফাইজলামি করছ না? দাড়াও তোমার ফাইজলামি আমি বের করব। তোমাকে দেখলেত মনে হয়ে ডাস্টবিন থেকে উঠে এসেছ। আরে!! আমিত এতক্ষন খেয়ালই করিনি। আজ দেখি খুব পরিপাটি হয়ে এসেছ!" সামিরাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে সবকিছুতেই খুব আনন্দ পাচ্ছিল। কিন্তু কি যেন এক অজানা ভয়ে আমি ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলামনা। যদিও সামিরাকে তা বুঝতে দেইনি।
যখন ল্যাব এইডের সামনে রিকশা থেকে নামলাম তখনও সামিরা কিছু জানতে চাইলনা। তাকে দেখে আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম। সে খুব সহজেই আমার সাথে হাসপাতালে ঢুকল। আমরা ডাক্তারের কলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সামিরা হঠাৎ করে খুব চুপ হয়ে গেল। তাকে তখন কিছুটা নার্ভাস মনে হচ্ছিল। আমি সামিরার হাত নিজের হাতে নিয়ে বললাম, "আমার উপর বিশ্বাস রাখ।" সামিরা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই তো তোমার সাথে এসেছি।" সে অশ্রু আড়াল করার চেষ্টা করছিল। আমি সামিরা হাত ধরেই বসে ছিলাম। নিশ্চুপ। যদিও আমার মনের মাঝে তখন এক প্রলয়ংকারি ঝড় চলছিল। যা শুধু আমি নিজেই অনুভব করছিলাম।


রিফ্লেক্সন জার্নাল - ২৯.১০.২০১৫
রাত- ১০:০০
সামিরা চৌধুরী


পার্থ আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে আমি আগেই জানতাম। আর তাই ডক্টরের চেম্বারে ঢোকার আগে ওয়েটিং রুমটায় বসে যখন চোখে পড়লো দরজার নেমপ্লেটে লেখা নামটা "সাইকিয়াট্রিস্ট জহিরুল হক"। মোটেও অবাক হইনি আমি। বরং আমার স্ট্রং গেইজের সাথে যখনই বাস্তবের ঘটনাগুলো মিলে যায় আমি এক চরম পুলক অনুভব করি। আর হলোও সেটাই। আসলে পার্থের সাথে প্রতিটা ছোট ছোট কাজেও আমি জেতবার চেষ্টা করি। আর সেটা জিতে যাওয়া মানেই আমার কাছে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পাওয়া।

ডক্টর আমাকে অনেক কথা বললো, অনেক কিছু জিগাসাবাদও করলো। আমি উত্তর দিলাম। সবগুলো উত্তর তো আমি আগেই জানি। সাথে প্রশ্নগুলোও। ডক্টর বললেন আমার নাকি শর্ট টার্ম মেমোরী লস হয়েছে যা লং টার্ম মেমোরী লস এ খুব শিঘরী গড়াতে চলেছে।
রোগটার একটা খটমট বিদ্ঘুটে নামও বললেন তিনি। এ্যালঝেইমার না কি যেন। এ রোগে রোগী পেশীগত দুর্বলতায় ভোগে এবং ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। সাধারণত এ্যাসিটাইলকোলিন পদার্থের অভাবে মানুষের মনে অবসাদের জন্ম দেয়। মানুষের স্নায়ুবাহিত তথ্য সঞ্চালনে নিউরোট্রান্সমিটার-এর অন্তর্গত অন্যান্য উপাদানের মধ্যে এই পদার্থটিও একটি। মানুষের মস্তিষ্কে এ্যাসিটাইলকোলিন ঠিক কি কি কাজ করে, তা সুনির্দিষ্টভাবে এখনো জানা যায় নি। তবে ধারণ করা হয়, ঘুম, অবসাদ ইত্যাদির সাথে এই উপাদানটির সম্পর্ক আছে। এই এ্যাসিটাইলকোলিন-উৎপাদক স্নায়ুকোষের মৃত্যুর কারণে এ্যালঝেইমার রোগ হয় বলে ধারণা করা হয়। ডক্টর কি সব বলে চললেন গড় গড় করে, আমার মাথায় ঢুকছিলো না। আমার মাথা ঘুরতে থাকে।

ফেরার পথে পার্থ খুব মন খারাপ করে রইলো। আমি বললাম,"চলো পার্থ বসুন্ধরা সিটি যাই। ফুচকা খাবো।" পার্থ বললো, "সামিরা আমি তোমার সাথে নিরিবিলি কোথাও বসে কিছু কথা বলতে চাই।" আমি বললাম, "ঠিক আছে।" আমরা আমাদের অতি পুরাতন চেনা জায়গা রমনার সেই পুরোনো বুড়ো পাকুড় গাছটার নীচে বসলাম। আমার হঠাৎ নিজেকে বাংলা নাটকের নায়িকাদের মত লাগছিলো। বাদামওয়ালা, চুইংগামওয়ালাদের জ্বালায় এখানে আর আসা হয়না আজকাল। কিন্তু মন ভার করে রাখা পার্থর চেহারা দেখে তারা বুঝি কাছে ঘেসলোনা আজকে।

আমি পার্থর কাঁধে মাথা রাখলাম। পার্থ আমার হাত ধরে কিছুক্ষন বসে রইলো। ওর এত মন খারাপ হয়েছে। আমার অসুখটার খবরে আমি মোটেও বিচলিত হইনি। অথচ পার্থ কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। পার্থের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হচ্ছে আমার। সে বেশ পরিপাটি হয়ে আসার চেষ্টা করেছে আজকে তবে দুচোখের ক্লান্তি বলে দিচ্ছে গতরাতের নিদ্রাহীনতার প্রমানটুকু। আমি ওকে জিগাসা করলাম, "কাল রাতে ঘুমাওনি তুমি?" পার্থ সে কথার জবাব না দিয়ে আমার চোখে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত কথা বললো, "সামিরা সব কিছুর জন্য আমি দায়ী।" আমি অবাক হলাম, বললাম, "কিসের জন্য!" পার্থ আবারও বললো, "আমার জন্য তোমার এ অবস্থা হলো। তোমার এ অসুখের কারণ কি আমি জানি। আমি, আমি একমাত্র দায়ী তোমার এ অসুখটার জন্য।"

পার্থ হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। পার্থকে আমার খুব অচেনা লাগছিলো। যে পার্থ শতবার ভেঙ্গেও একটাবারের জন্যও মচকায়নি সে কি করে এমন আচরণ করছে? আমি প্রশ্নবিদ্ধ, নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলাম পার্থের দিকে। আমি এবার সত্যিই বাংলা নাটকের মত কাজ করে বসলাম। ওর মাথাটা কোলে টেনে নিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলাম আমার শাড়ির আঁচল দিয়ে। চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলাম যখন পার্থ আমার আঁচলের শেষ প্রান্তটুকু দুহাতে জড়িয়ে শিশুর মত চুপ করে শুয়ে ছিলো।

আমার চোখ তখন নিশব্দ কান্না কাঁদছিলো। আমি মনকে প্রবোধ দিচ্ছিলাম । না তোমাকে কান্না মানায় না সামিরা। এতটুকুতে দূর্বল হয়ে পড়া চলবেনা তোমার, কোনো ভাবেই। তোমার সামনে পড়ে রয়েছে অজানা বন্ধুর পথ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ৮:০৭
২৫টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে স্টক ব্রোকারদের নিয়ে বৈঠকে বসছে ডিএসই আজ ১৪-০৯-২০২৬

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মন্দার কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

একটি দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার শেয়ারবাজার অনেকটা হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের মতো। অর্থনীতির কোথায় প্রাণশক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×