somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

১১ ই জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ সম্পূর্ণভাবে হানাদারমুক্ত হইয়াছিল। অবসান ঘটিয়াছিল বাঙালির হাজার বত্সরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার। কিন্তু বিশাল একটি অপূর্ণতা থাকিয়া গিয়াছিল। ইহা কি ভাবা যায় যে, অভূতপূর্ব এ ইতিহাসের যিনি স্রষ্টা, যাঁহার নামে হাসিমুখে প্রাণ উত্সর্গ করিয়াছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, মাথা পাতিয়া লইয়াছে অকল্পনীয় দুঃখ ও ক্লেশ— তাঁহাকে ছাড়া এই বিজয় কখনো পূর্ণতা পাইবে কিংবা পাওয়া সম্ভব? অনিবার্যভাবেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি হূত্স্পন্দনে তখন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইতেছিল সেই শূন্যতার সর্বব্যাপী হাহাকার। অবশেষে তিনি আসিলেন। দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সেইটি ছিল ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত। পাকিস্তানের কারাগার হইতে মুক্ত হইয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন-দিল্লি হইয়া তাঁহার আজন্মলালিত স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করিলেন পরম মমতায়। স্বজনহারানো সর্বস্বান্ত মানুষ হূদয় উজাড় করিয়া বরণ করিয়া লইয়াছিলেন তাহাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে। নেতা ও জনতার আনন্দাশ্রু মিলিয়া-মিশিয়া একাকার হইয়া গিয়াছিল। পূর্ণতা পাইয়াছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথ ছিল ভয়ঙ্করভাবে কণ্টকাকীর্ণ। দীর্ঘ ৯টি মাস বঙ্গবন্ধুকে শুধু যে দুই হাজার মাইল দূরবর্তী পাকিস্তানের নির্জন একটি কারাগারের ‘ডেথ সেলে’ বন্দি করিয়া রাখা হইয়াছিল তাহাই নহে, সর্বাত্মক প্রস্তুতিও চলিতেছিল তাঁহাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর। বিচারের নামে গোপন প্রহসন চলিতেছিল সামরিক জান্তার গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ আনা হইয়াছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্ররোচনা দেওয়ার। আর ইহার রায় কী হইবে— তাহাও বিশ্ববাসীর জানা হইয়া গিয়াছিল আগেই। বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন প্রতিনিধি কারগিল বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানাইলে খোদ জান্তাধিপতি জে. ইয়াহিয়া খানই সদম্ভে বলিয়াছিলেন: ‘এই লোকটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মহাঅপরাধ করিয়াছে, তাহার ফাঁসি হওয়া উচিত।’
পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শফি একাত্তরের আগস্ট মাসেই জার্মান পত্রিকা ‘ডার স্পিগেল’কে ইহা নিশ্চিত করিয়াছিলেন যে, ‘অবশ্যই তাঁহাকে (বঙ্গবন্ধুকে) মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হইবে।’ ইহা জানিতেন পাকিস্তানের রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবী মহলও। তাহাদের একটি অংশ ইয়াহিয়া খানের নিকট বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আবেদনও জানাইয়াছিলেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন ইশতিকলাল পার্টির প্রধান সাবেক এয়ার মার্শাল আসগর খান ও লেনিন পুরস্কারবিজয়ী প্রখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজসহ পাকিস্তানের ৪২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির পক্ষে বিশ্বজনমতের চাপও তীব্র হইতে তীব্রতর হইতেছিল। বিশ্বের বহু খ্যাতনামা রাষ্ট্রনায়ক ও মনীষী বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়াছিলেন। তবে একথা নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে যে, বঙ্গবন্ধুর প্রাণরক্ষায় যাঁহার ভূমিকা সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছিল— তিনি হইলেন ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরিয়া আসেন তখন সাড়ে ৭ কোটি জনসংখ্যাঅধ্যুষিত সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এই দেশটি যুদ্ধবিধ্বস্ত। সড়ক-বন্দর ও সেতুসহ সমগ্র অবকাঠামোই বিপর্যস্ত। বেশিরভাগ মানুষেরই জীবন-জীবিকা তছনছ হইয়া গিয়াছে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিকে ধ্বংসস্তূপ হইতে টানিয়া তোলার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে টানিয়া তুলিবার জন্য যে-সম্পদ ও প্রশাসনিক অবকাঠামো দরকার তাহার কিছুই নাই। বলা যায়, প্রায় শূন্য হাতেই যাত্রা শুরু করিতে হইয়াছিল স্বাধীনতাপরবর্তী সরকারকে। এদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছিল পাকিস্তানের মিত্র দেশগুলির চরম বৈরিতা। বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞ জন্মলগ্নেই বলিয়া দিয়াছিলেন যে, বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যত্ নাই। তাহার পরও সব বাধার অচলায়তন অতিক্রম করিয়া অতি অল্প সময়ে বাংলাদেশ যে ঘুরিয়া দাঁড়াইল তাহার নেপথ্যে যেই ম্যাজিক বা জাদুটি কাজ করিয়াছে তাহার নাম নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু। এই নামটিই সেইদিন জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করিয়াছে। ইহা কোনো আবেগের কথা নহে। অকাট্য প্রমাণ রহিয়াছে ইহার অনুকূলে।
রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধজয়ের পরপরই মিত্রবাহিনীর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের নজির বিশ্বে বিরলই বলা চলে। তাহার পরও মাত্র তিনমাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী যে বাংলাদেশ ছাড়িয়া গেল— সেই অসম্ভবও সম্ভব হইয়াছিল বঙ্গবন্ধুর সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু যে ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন দেখাইয়া গিয়াছেন জাতিকে— তাহা সফলতা পাইতে শুরু করিয়াছে তাঁহার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। যাহারা একদা বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য দেখাইয়াছিল, তাহারাই আজ অকপটে স্বীকার করিতেছেন যে, বাংলাদেশের সাফল্য উন্নয়নশীল দুনিয়ার দেশগুলির জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে। বলা বাহুল্য, পাকিস্তানের মৃত্যুকূপ থেকে বঙ্গবন্ধু সেইদিন দেশে ফিরিয়াছিলেন বলিয়াই সাফল্যের এই ভিত রচনা করা সম্ভব হইয়াছে।

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:৫৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই প্রথম খাল বাবার পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটির নিদর্শন পেলাম

লিখেছেন অপলক , ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪

২০১০ সালে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ। মেয়েলি ব্যাপার বলি, প্রতিহিংসার ব্যপার বলি অথবা পলিটিক্যাল ইমম্যাচুরিটির কথা বলি, বাংলাদেশ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নতুন করে আকীকা দিয়ে নাম রাখা হয়েছিল হযরত শাহজালাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষণময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১


বিশ্বাসগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে
ভাগ্যের কম দোষটার হাত
ঝাঁকনি কম নেই তো- তাহলে
বিশ্বাসগুলো মরে যাচ্ছে এই;
মাটির আনন্দটা শুধু ফুল গন্ধ
নাকের সুসংবাদ যে দৌড়াচ্ছে
রাতের ঘুমটা যেনো স্বপ্নবিরল কষ্ট
ভোরের শিশির গড়ে না আর শক্ত;
তবু নিশ্বাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×