গত ১০ তারিখ হরতালে আমার বাসার সামনে অনুরাগে মাত্র ৫০০ টাকা খেয়ে জননেত্রীর ছাত্রলীগের সোনার ছেলে ১০০ টাকা দিয়ে গালাগাল করে চলে যেতে নিলে দোকানের কপাট বন্ধ করে হোটেলের বয়-বেয়ারারা আচ্ছা ধোলাই দিয়েছে। এ নিয়ে মহল্লায় বড় অশান্তি চলছে।
সেদিন জয়নুল আবদিন ফারুকের ন্যাম ভবনে আশ্রয় নেয়ার সময় পুলিশদের ধাওয়ার দৃশ্য দেখে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনা কেন যেন মনে পড়ল। এটা ছিল পুলিশের আর ওটা সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল সদস্যের কাজ। ঘটনাটা প্রায় এক। সেদিন সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল, তাদেরই কয়েকজন জাতভাই অস্ত্র নিয়ে এসে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করল। কোনো প্রতিরোধ করল না। মনে হয় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ডিউটিরত কারোরই হয়তো ওই ব্যর্থতার জন্য পরে কোনো সাজা হয়নি। ঠিক ন্যাম ভবনেও তো নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বেশকিছু পুলিশ রয়েছে। তাদের কাজ ন্যাম ভবন এবং তার বাসিন্দাদের জানমালের হেফাজত করা। তা যদি হয় তাহলে প্রশ্ন তো আসতেই পারে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে ন্যাম ভবনের সীমানায় যখন জয়নুল আবদিন প্রবেশ করলেন তখন তার পিছু ধেয়ে আসা গুণ্ডাই হোক, তস্করই হোক আর নামধারী পুলিশই হোক, তারা ন্যাম ভবনের সীমানায় ঢুকল কী করে? যাদের ওই ভবন হেফাজতের দায়িত্ব তারা কি যথাযথ হেফাজত করেছেন? এজন্য কি কাউকে জবাব দিতে হবে? নাকি পোশাক ছাড়া কেউ এলেও তারা তাকে ফেরাতেন না? পোশাকধারী গুণ্ডা ফেরানোর তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!
হুবহু একই ঘটনা ২১ আগস্ট ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে জননেত্রী শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা বলা চলে। সেই সভার হেফাজতের দায়িত্ব কিছু পুলিশ ও অন্যান্য এজেন্সির ওপর অবশ্যই ছিল। তারা কেন সে দায়িত্ব পালন করেনি, এজন্য পুনঃতদন্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও বেশকিছু গ্রেফতার করা হবে। জজ মিয়ার গল্প সাজিয়ে ওখান থেকে পার পাওয়া যাবে না। ছেলেবেলায় শুনতাম, গ্রাম্য সিমাসাকাররা বলত, ‘এ্যত্ গাছ টান দিলে ব্যাত্ গাছ নড়ে, কানাকোক্কায় ডাক দিলে সমুদ্দুর নড়ে।’ কোনোদিন বুঝিনি এ্যত্ গাছ কি, ব্যাত্ গাছ, কানাকোক্কা, সমুদ্দুর এগুলো বুঝলেও এ্যত্ গাছের মাহাত্ম বুঝিনি। আর কি এমন জিনিস সেটা টানলে সমুদ্র পর্যন্ত নড়ে। এ কেমন বীর বা শক্তি যে সমুদ্র নাড়াতে পারে। ওরকম আরেকটা সিমাসা শুনেছিলাম, ‘এখান থেকে মারলাম ঢিল, ঢিল লাগলো কলা গাছে, হাঁটু ফেটে রক্ত পড়লো, চোখ গেল রে বাবা।’ গ্রামগঞ্জে এমন অসংখ্য কথা হয়। কিন্তু তার অনেক কিছুরই মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু এর নিশ্চয়ই মানে একটা কিছু আছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা খুঁজলে সব বেরিয়ে আসবে। এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য আজ যদি একের পর এক উপরস্থ কর্মকর্তাদের আসামি করে গ্রেফতার করা হয় বা যায়, তাহলে যারা শুধু জয়নুল আবদিন ফারুককে তো মারধর অপদস্থ করেনি, মানবতাকে করেছে, গণতন্ত্রকে করেছে। সর্বোপরি সংসদ, সংসদ নেতা ও স্পিকারকে লাঠিপেটা করেছে। জোশের কারণে এখন কেউ কেউ ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে চাচ্ছে না। তবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে প্রকৃত অপরাধী কোনো কর্মকর্তার যদি কঠিন থেকে কঠিনতর এমনকি জেল-ফাঁসও হয়, দেশবাসী খুবই খুশি হবে। কারণ রাষ্ট্র যে সবার জানমালের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য, রাষ্ট্রীয় কর্মচারী-কর্মকর্তারা যে কারও গোলাম না, সরকারের নির্দেশ পালন করলেও তাদের নির্দেশে খুন-খারাবি করা যায় না এটা অন্তত এ থেকে প্রমাণিত হবে। সেজন্যই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দ্রুত প্রকৃত বিচার হওয়া দরকার। ওই বিচার হলে সেদিন জয়নুল আবদিন ফারুককেও যে নির্যাতন করা হয়েছে তারও বিচার হবে। যারা লাঠালাঠি করেছে সেই লাঠিয়ালদেরও হবে। এরকম হলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কারও কথায় লাঠিয়াল সাজার সুযোগ পাবে না।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবাক না হয়ে পারছি না। কত বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যার সারাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জানমালের হেফাজতের দায়িত্ব তিনি যে কত অসঙ্গত কথা বলেন, তাতে মানুষের নিরাপত্তা কতটা যে ঝুঁকিতে পড়ে এটা মনে হয় কখনও চিন্তা করেন না। তিনি হঠাত্ করেই বললেন, সংসদ এলাকায় পিকেটিং নিষিদ্ধ জেনেও চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক কেন বিক্ষোভ করলেন। বিক্ষোভ নিষিদ্ধ এটা আমজনতার জন্য, সংসদ সদস্যের জন্য নয়। আর যদি নিষিদ্ধ এলাকায় বিক্ষোভ করার জন্য কোনো অপরাধ হয়ে থাকে, গ্রেফতার করে শাস্তি দিন। এমন পিটাপিটি করবেন কেন? পিটাপিটি করা কোন আইনে আছে? মানুষকে উলঙ্গ করে ইজ্জত নষ্ট করার ক্ষমতা আপনাকে কোন আইনে দিয়েছে? নিষিদ্ধ এলাকায় বিক্ষোভ করায় আপনার যদি ইচ্ছা হয় ফাঁসি দিন। জয়নুল আবদিন ফারুক বিক্ষোভ করায় তাকে নিদারুণভাবে পেটালেন, পরদিন সংসদ ভবনের ভেতরে বিরোধী দলের সদস্যরা কত না বিক্ষোভ করল তাদের পেটাতে পারলেন না? পুলিশের মন্ত্রী হয়ে পুলিশের উমেদারি করা বেশি ভালো না। মনসুর ভাইর ছেলে জনাব মোহাম্মদ নাসিম, মানুষ হিসেবে মোটেই খারাপ নন। এখনও দেখতে অসম্ভব সু্ন্দর, বাচনভঙ্গি নায়কদের মতো। তারপরও পুলিশরা তাকে অপমান অপদস্থ করতে, আঘাত করতে খুব একটা ছাড়েনি। জনাব লুত্ফুজ্জামান বাবর ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বর্তমানে জেলে। প্রতিনিয়তই তাকে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হয়। যত কথাই বলুন, পুলিশের উন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার জন্য সে যা করেছে বা করতে পেরেছে তার কানাকড়িও আপনি করতে পারেননি। করার কোনো সম্ভাবনাও নেই। যে পুলিশ বিএনপি সরকার থাকতে আওয়ামী লীগের নেতাদের পেটায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বিএনপির নেতাদের পেটায় সেই পুলিশ প্রশাসনের ভরসায় অত লাফালাফি করবেন না। যাদের কথা বললাম তারা তো সবাই পুরুষ মানুষ, আপনি তো মায়ের জাত মহিলা। আপনার অবশ্যই আরেকটু দরদী ও সংযত থাকার কথা। এ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে আক্রমণ করার ছবি দেখছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আপনারই সতীর্থ একজন সংসদ সদস্যকে দেখতে গেলেন না অথচ মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে অযথাই এখানে-ওখানে ব্যান্ডেজ বেঁধে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে শুয়ে থাকা পুলিশকে দেখতে গেলেন: আপনাকে কাছে পেয়ে দিশেহারা হয়ে বেপরোয়াভাবে তিনি বললেন, ‘সরকার আমাদের লাঠি দিয়েছে, ওটা কি চুমা খাওয়ার জন্য?’ এই দম্ভোক্তি যে পুলিশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে আপনি তাকে তক্ষুণি বরখাস্ত করেননি অথবা বরখাস্ত করার ক্ষমতাও আপনার নেই। সেই পুলিশের জন্য মায়াকান্না কাঁদেন? আপনার পুলিশের মানবিক অধিকারের কথা কেউ বলে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন? পুলিশ আপনার না, তারা সরকারের। যে যখন সরকারে আসে পুলিশ তার। পুলিশের রাষ্ট্রের হওয়া উচিত ছিল, মানুষের হওয়া উচিত ছিল। তা না হয়ে মিরপুরের জনাব এসএ খালেকের মতো হয়েছে। যখন যে সরকারে আসে তার সঙ্গেই তিনি থাকেন। শুধু শুধু দলবদল করায় কেউ কেউ নাকি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি এত দলবদল করেন কেন? তিনি ভাবলেশহীনভাবে বলেছিলেন, ‘কোথায়? আমি কোথায় দলবদল করি? বারে বারে সরকার বদল হলে আমি কি করব? পাকিস্তানের সময় সরকারি দল মুসলিম লীগে ছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে শেখ সাহেবের দল আওয়ামী লীগ করেছি। শেখ সাহেব মারা গেলে জিয়াউর রহমান সরকার এলে জিয়াউর রহমান সরকারের দল করেছি। আমি তো সবসময় সরকারি দল করি। সরকার বদলে যায় এতে আমি কি করব?’ পুলিশও কিন্তু তেমন। শুধু পুলিশ বলি কেন, সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সবসময় সরকারি দলের। এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুবই ঘনিষ্ঠ সরকারি কর্মচারী প্রায় সব ক’জন সরকার বদল হলে পরে যারা আসবেন তাদের সঙ্গে কী করে কাজ করতে হবে তার জন্য ষোলআনা প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছেন। একটা করে বদনাম বা দুর্নীতির বা অনিয়মের ফাইল তারা আলাদা করে তৈরি করেই রাখেন। ঘন ঘন সরকার বদলালে এসব কর্মকর্তার পরিশ্রমটা একটু বেশি হয়। দেরি করে সরকার বদলালে পরিশ্রম কম হয়, এই যা পার্থক্য। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা পুলিশের সমর্থনে যদি কেউ সরকারে থাকত তাহলে আইয়ুব খান বেঁচে থাকলে এখনও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থাকতেন। বাংলাদেশের কথা বললে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন কত নাজেহাল হন, তাকে কি নাজেহাল হতে হতো? তিনি অবলীলায় এখনও সরকারে থাকতেন। হঠাত্ সেদিন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এক খেদ ব্যক্ত শুনলাম। জেনারেল নুরুদ্দীন বিশ্বাসঘাতকতা করায় তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। আমার তো মনে হয় না মৃদুভাষী জেনারেল নুরুদ্দীন বিন্দুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি শুধু বলেছিলেন, তার হয়ে তিনি জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারবেন না। তিনি যথার্থই বলেছিলেন। প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি কর্মচারী-কর্মকর্তার এটাই মানসিকতা হওয়া উচিত। তারা কোনো ব্যক্তি বা সরকারের গোলাম নন, তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। কত অনুষ্ঠানে খোদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমার সামনে বলেছেন, নুরুদ্দীনকে আমি ছেলের মতো দেখতাম, অমুককে আমার ছেলের মতো দেখতাম। সেখানে অনেক লবণ চোর, মরিচ চোর, কাপড় চোরদেরও নাম আছে। আমার আবার উচিত না বললে ভাত হজম হয় না। আমি বলেছি, ‘সর্বকালেই প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীদের ছেলে-নাতি-পুতি হওয়ার জন্য অনেকেই লালায়িত থাকে। এখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, আমলা, ফইলাদের কতজন ছেলে আছে। পদ গেলে এসব ছেলে-সন্তান আর থাকে না। কারণ এরা কেউ মানুষের ছেলে না, মনুষ্যত্বের ছেলে-সন্তান না, এরা সব পদ-পদবির ছেলে-সন্তান, নাতি-পুতি। কিন্তু মজার হলো, যাদুমন্ত্রের মতো এমন সম্মোহনী শক্তি যে কেউ কখনও পদ-পদবিতে থেকে পদের সন্তানদের চেনে না।
মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর আবার কিছু কিছু প্রশ্ন প্রকট হয়ে উঠেছে। মীমাংসিত অনেক ঘটনাও নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারও সঙ্গে মতের অমিল হলেই সত্যকে আর সত্য বলে স্বীকার করা হয় না। সত্য থেকে ধীরে ধীরে কেন যেন গোটা জাতি দূরে সরে যাচ্ছে। ‘কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বগাঁথার মুখোশ বিদীর্ণ করে সত্য প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণকে আমি স্বাগত জানাই।’ কী মারাত্মক সত্যবিরোধিতা! অভিভূত বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। আমাকে একজন মানুষ হিসেবে স্বীকার করেন না, একজন রাজনীতিক মনে করেন না। মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার অস্তিত্ব নিয়ে কেন এত টানাটানি করছেন? আপনারা কি বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করেন? মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করেন? যে দেশের মন্ত্রী হয়েছেন, সেই বাংলাদেশকে স্বীকার করেন? যদি বঙ্গবন্ধুকে, মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোপরি বাংলাদেশকে বাধ্য হয়েও স্বীকার করেন, তাহলে অমন করে আমার বীরত্বগাঁথার মুখোশ উন্মোচনের কথা বলেন কী করে! আসলে আমি কি মুখোশধারী মুক্তিযোদ্ধা? আমি তো নিজেকে কখনও বীর বলেও মনে করি না। তা যদি করতাম তাহলে আপনাদের মতো কাপুরুষ ক্লীবদের কাছে পদে পদে পরাজিত হই কী করে! শত-সহস্র মুক্তিযোদ্ধা বুঝে আর না বুঝে যেভাবেই হোক, তাদের জ্ঞানবুদ্ধির সীমায় রাষ্ট্রের কাছে অনেক সময় অনেক কিছু চেয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি তো কখনও নিজের জন্য সেই চাওয়ার বীরত্বটুকু দেখাতে পারলাম না। আমার যুদ্ধের বীরত্বে আপনার আপত্তি? আপনি তো আর যুদ্ধের হিসাব রাখেননি। ওটা রেখেছে পাকিস্তানিরা। আর কত অস্ত্র জমা দিয়েছি তা ছবি দেখে এখনও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না। আমরা ওগুলো পাকিস্তান হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলাম। আপনার মতো বীররা অতগুলো অস্ত্র চোরাই মার্কেট থেকে কিনেও দিতে পারবেন না। কেউ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেনি। তারা ও আপনারা কতজন স্বনামে বেনামে রাষ্ট্রের কত সম্পদ পকেটস্থ করলেন। আপনাদের পক্ষীয় পত্রপত্রিকায় আমি শুধু বদনামই পেলাম, শুধু চরিত্রহননই হলো। আসলে বাস্তবে কিছুই পেলাম না। আপনাদের বহু নেতার বহু আগে আমি ঢাকায় এসেছিলাম। যারা একসময় আমার বোঁচকা-বুঁচকি টানত, জুতা-খড়ম এগিয়ে দিত তাদের কত গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, কখনও-সখনও মনে হয় ওরাই নেতা, আমি ফালতু। ’৯৯-এ সখিপুর-বাসাইলে ভোট-ডাকাতির উপনির্বাচনের সময় প্রপাগান্ডা শুনেছিলাম, শুধু ঢাকা শহরেই আমার ২১টি বাড়ি আছে। যার এত বাড়ি তার সেই ’৭২ সালে পাওয়া ২০/৩০ বাবর রোডের পাঁচ কাঠা জমির ওপর ভাঙা বাড়িতে থাকার দরকার কী! এমন খুপড়িতে এখনও বসবাস করি, যেখানে বইপুস্তক, পত্রপত্রিকা, ফাইলপত্র রাখার জায়গা হয় না। গত ৪০ বছরে না হলেও ২০-২৫ বার সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি কাদেরিয়া বাহিনীর জন্য একটি যাদুঘর করতে সামান্য একটু জায়গা দিন। পাঁচ কাঠা জায়গাও দেয়নি। কিন্তু কত জায়গায় কত যাদুঘর, কত কি স্মৃতিঘর হয়েছে। কিন্তু আমি যে ’৭২-এ বাবর রোডের বাড়িতে উঠেছিলাম, সে বাড়িও আমার জন্য বৈধ হলো না। কারণ সেই ’৭২ সালে বরাদ্দ দেয়া সব কাগজপত্র মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে ফেলেছে। আমার সঙ্গে আমার বাড়ির আশপাশের আরও ৮৪টি বাড়ির ১৯৮৩ সালের আগের কোনো কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ পূর্ত মন্ত্রণালয়ে নেই। অনেক নেতানেত্রী একরের পর একর জায়গার ওপর বাড়িঘর দখল করেছেন বা বরাদ্দ পেয়েছেন কিংবা নিয়েছেন। কিন্তু আমার ২০/৩০ বাবর রোডের বাড়ি আমি বরাদ্দ পাইনি। কেন পাইনি ইদানীং বুঝতে পারছি। কারণ আমি তো মানুষই নই। মানুষ হলে তো আমার বাড়ির দরকার। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধাই না। মুক্তিযোদ্ধা হলে তো বাড়ি পাব। রাজনৈতিক ব্যক্তি তো নই-ই। তাহলে কোন কোটায় আমার নামে জমি-জমা, গাড়ি-বাড়ি বরাদ্দ হবে? আমি তো অশরীরী! বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে আমার তো কোনো অস্তিত্বই নেই।
৩৪-৩৫ বছর আওয়ামী লীগ ঘরানার মানুষ ছিলাম। আওয়ামী লীগের জন্মের বেদনায় জড়িত না হতে পারি কিন্তু লালন-পালনে খুব একটা কম সময় ব্যয় করিনি। সেই আওয়ামী লীগের সময় বাড়িটির বৈধ বরাদ্দ চেয়ে জননেত্রী হাসিনার কাছে আবেদন করেছিলাম। কোনো কাজ হয়নি। বিএনপির মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে আবেদন করেছি। কোনো কাজ হয়নি। একসময় আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্র ও পূর্তমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ নাসিম বাড়িটি প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। বিএনপি সরকার চিঠি পাঠিয়েছিল, ২০/৩০ বাবর রোড, মোহাম্মদপুরের বাড়িটি আপনার অনুকূলে বরাদ্দ দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আপনার এবং আপনার ওপর নির্ভরশীল পোষ্যদের ঢাকায় কোনো জমি-জমা আছে কিনা এ সম্পর্কে হলফনামা দিন। যেহেতু আমার এবং আমার ওপর নির্ভরশীল স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের ঢাকায় এক চিলতে জমি নেই, তাই হলফনামাও দিয়েছিলাম। তারপরও বরাদ্দ হয়নি। অবৈধভাবেই বৈধ বাংলাদেশের জন্মের বেদনার সঙ্গে জড়িত একজন নগণ্য যোদ্ধা হিসেবে এখনও বেঁচে আছি। তারপরও কৌশলে অভিযোগ করা হয়, ঢাকা শহরে আমার ২১টি বাড়ি আছে। ঠিক আছে। আপনারা যখন জানেনই ঢাকা শহরে আমার এত বাড়ি আছে, দয়া করে মোহাম্মদপুরের এই বাড়িটি ছাড়া আর একটি বাড়ি আমাকে দিয়ে বাকি সব আপনারা নিয়ে নিন। আমার এই প্রতিশ্রুতিই সাফকবলা দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। জানেনই তো আমি কথা বদল করি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


