somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোৎজার্টের মৃতু্য এবং অমরত্ব

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ ভোর ৪:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অকালে মস্ত প্রতিভার মৃতু্য কিছু কম হয়নি জগতে: শেলি, বায়রন, ব্যাঁবো, কাফকা, সিলভিয়া প্লাথ.. কিন্তু যে অকালপ্রয়াণের কথা উঠলে সারা পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে নীরব হয়ে পড়ে, যেন যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য ভাসল চোখে, সেটা ভলফগাং আমাডেয়স মোৎজার্টের। 2000 সালে টাইম ম্যাগাজিন পরিচালিত বিশ্বব্যাপি মত যাচাইয়ে পাওয়া গেছে যে বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বিচারে মোৎজার্ট গত সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ সংগীত প্রতিভা। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর এগারো মাসের জীবনে সাতশো-র মতে অবিস্মরণীয় রচনা, যার মধ্যে আছে কুড়িটার মতো অপেরাটিক কীর্তি, ঊনত্রিশটি পিয়ানো কনচের্তো, ভায়োলিন কনচের্তো, হর্ন কনচের্তো, সাতাশটি ষ্ট্রিং কোয়ার্টেট, ছটি ষ্ট্রিং কুইন্টেট, এছাড়াও অনেক চেম্বার মিউজিক এবং একচলি্লশটি সিস্ফোনি। মোৎজার্ট তার সময়ে ও জগতে অন্য সবার চাইতে সব কিছু আরো ভালো, আরো নিখুঁত, আরো উন্নত করেছেন।

মোৎজার্টের অকালমৃতু্যতে খুচের ঘটনা হিসেবে দেখার যে একটা ট্রাডিশন জারি হয়েছে সেই 1800 সালে, যখন রুশ কবি আলেকজান্দার পুশকিন লিখলেন চমৎকার কাব্যনাট্য 'মোৎজার্ট এন্ড সালিয়েরি'। মোৎজার্টকে বিষ দিয়ে হত্যার আগে সালিয়েরিকে দিয়ে পুশকিন যা বলিয়ে নেন, তা সেই অতল হতাশার নিটোল বাণী রূপ।

সালিয়েরি মোৎজার্টকে গভীর ঈর্ষা করতেন এবং তার উন্নতির পথে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেছেন, এটুকুর বাইরে তার মোৎজার্টের হত্যাকারী হওয়ার কিছুমাত্র প্রমাণ নেই। পারিপাশ্বর্িক সাক্ষ্য থেকে অনুমান করাই যায় যে, আন্তে ানিও সালিয়েরি চেষ্টার ক্রটি রাখেননি ভিয়েনার রাজদরবারে মোৎজার্টের সমাদর বিঘি্নত করার; মোৎজার্ট নিজেও তার চিঠিপত্রে প্রায়ই সালিয়েরির চক্রান্তে র ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ সবই শিল্পীর ঊর্বর, উত্তেজিত মস্তিষ্কের উদ্ভাবনা কি না তা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই।
তা হলে সালিয়েরির বিষে মোৎজার্টের মৃতু্য নিয়ে চর্চা কেন? প্রধান কারণটা সম্ভবত এই যে, ভিয়েনায় পঞ্চাশ বছর ধরে ঘাঁটি গেঁড়ে থাকা ইতালির ভেরোনা শহরের সংগীতবিশারদ সালিয়েরি (1750-1825) বেটোফেন ও শু্যবের্টের শিক্ষকতার করার সুযোগ পেলেও সারাটা জীবন সামান্য দূরত্ব থেকে দেখতে বাধ্য হয়েছেন মোৎজার্টের শিল্প ও কীর্তির উত্তরোত্তর উত্থান এবং উত্থান।

দ্বিতীয়ত, মৃতু্যর কিছুকাল আগে বেফাঁস কথার মধ্যে এও বলতেন যে, তিনিই বিষ খাইয়ে সাবড়ে দিয়েছিলেন মোৎজার্টকে। তৃতীয় কারণ : মোৎজার্টের অকালমৃতু্যতে, শেষ জীবনের আর্থিক কষ্টের জন্য পৃথিবীর মানুষের লজ্জার অন্ত নেই। সালিয়ারির মধ্যে সবাই আমরা কিছুটা নিজেদের দেখি, সালিয়ারির রোষ আর পাগলামির মধ্যে নিজেদের প্রায়শ্চিত খুঁজি।

পুশকিন, রিমস্কি কোর্সাকভ ও পিটার শ্যাফার-এ মোৎজার্ট- হত্যাকে সেরা মোৎজার্ট বন্দনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জঁ্যা আনুই-এর 'বেকেট' নাটকে রাজা দ্বিতীয় হেনটি যেমন হতাশায় ও আত্দসর্মপণে বেকেট খুনের নির্দেশ দেন

মোৎজার্টের চিঠিতেই আছে ওর জীবনের শেষ এবং মহত্তম অপেরা 'দ্য ম্যাজিক ফ্লুট' দেখতে দেখতে সালিয়েরি কীভাবে থেকে থেকেই 'ব্রাভো!' বলে উঠছিলেন। পিটার শ্যাফারের নাটকে মোৎজার্টের পাশে বসে সালিয়েরির সেই অবশ মুগ্ধতা এভাবে চিত্রিত হয়েছে।

1787-র জানুয়ারিতে প্রাগ-এর ন্যাশনাল থিয়েটারে ফের মঞ্চস্থ হল 'ফিগারো' এবং গ্রাগবাসীর মূচ্র্ছা যাওয়ার দশা। জাতীয় নাট্যসভার অধিকর্তা পাস্কাল বোন্দিনি শিল্পীকে তড়িঘড়ি বরাত দিলেন নতুন একটা অপেরার। মোৎজার্ট সাড়া দিলেন এমন এক অপেরা দিয়ে, যেটিকে সমালোচকরা মনে করেন শিল্পীর সেরা কাজ- 'দ্যন জোভানি'। 1787তে ফ্রেন্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড পিতা লিওপোল্ড মোৎজার্ট মারা যাচ্ছেন, সংসারে অর্থাভাবে হাজার ঝামেলার মধ্যে শিল্পী নিজেকে বাঁচিয়ে চলছেন আরো চূড়ান্ত মনোযোগে। আয় যতো কমছে, মগজ উপড়ে বার করছেন একটার পর একটা চিরস্মরণীয় নির্মাণ। শেষ দিককার কুইন্টেট, শেষ তিন মহৎ সিস্ফোনি, ক্ল্যারিনেট কনচের্তো, বি-ফ্লাটের পিয়ানো কনচের্তো, মৃতু্যশয্যায় শুয়ে অপরূপ বন্দনাগান। 'রিকুইয়ম'।
পুশকিন এবং শ্যাফারের নাটকে এই 'রিকুইয়ম' এক বিশেষ মহত্ব অর্জন করেছে। ইতিহাস বলছে কাউন্ট ফন ভালসেগ নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি ও অক্ষম কম্পোজারের বাসনা ছিল রিকুইয়মটি নিজের রচনা বলে বাজারে ছাড়বেন।

মোৎজার্টের জীবনের শেষ কটি দিনের বর্ণনা পড়া অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক। নাট্যকাররা সেই যন্ত্রণা থেকে আমাদের অব্যহতি দিয়েছেন, কিন্তু কী করে এড়াব জীবনীকারদের? 4 ডিসেম্বর, 1971-এর একটা বর্ণনা পাই যখন স্ত্রী কনস্তানজ বিহ্বল হয়ে দেখছেন দেবতুল্য স্বামী জ্বরের ঘোরে বকবক করছেন, বমি করছেন, নয়তো নির্মীয়মান রিকুইয়মের সুর ভাঁজছেন। শিষ্য ফ্রানৎস সুসমায়ারকে নিপুণ নির্দেশ দিলেন অসমাপ্ত কাজটি কীভাবে শেষ করতে হবে। পরদিন ভোরে যখন মৃতু্য হল, দিনটা দাঁড়াল প্রবল ঝড়বৃষ্টির। খুব ঘনিষ্ঠ কজন ছাড়া বেশি লোককে জড়ো করা যায়নি সেন্ট মাইকেলজ ক্যাথিড্রাল। দেহ নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি যখন রওনা দিল ভিয়েনার ছকিলোমিটার বাইরে সেন্ট মার্কস গির্জার কবরখানায়।

তবে যুধিষ্ঠিরের সারমেয়র মতো একটি কুকুর গেল ওই গাড়ির পিছু পিছু সেই সমাধিস্থল অবধি। সমাধিও বটে! আরো তিন মৃতদেহের সঙ্গে ভলফগাং আমাডেয়স মোৎজার্টের দেহ বস্তায় করে নিক্ষিপ্ত হল এক ফলকহীন কবরে! যাকে বলে ভিখিরির কবর। এই ভিখিরির মৃতু্য দিয়েই অমর হয়ে গেলেন মোৎজার্ট।

রেফারেনস: আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ইন্টারনেট।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা ভয়ংকর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!

শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×