মোৎজার্টের অকালমৃতু্যতে খুচের ঘটনা হিসেবে দেখার যে একটা ট্রাডিশন জারি হয়েছে সেই 1800 সালে, যখন রুশ কবি আলেকজান্দার পুশকিন লিখলেন চমৎকার কাব্যনাট্য 'মোৎজার্ট এন্ড সালিয়েরি'। মোৎজার্টকে বিষ দিয়ে হত্যার আগে সালিয়েরিকে দিয়ে পুশকিন যা বলিয়ে নেন, তা সেই অতল হতাশার নিটোল বাণী রূপ।
সালিয়েরি মোৎজার্টকে গভীর ঈর্ষা করতেন এবং তার উন্নতির পথে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেছেন, এটুকুর বাইরে তার মোৎজার্টের হত্যাকারী হওয়ার কিছুমাত্র প্রমাণ নেই। পারিপাশ্বর্িক সাক্ষ্য থেকে অনুমান করাই যায় যে, আন্তে ানিও সালিয়েরি চেষ্টার ক্রটি রাখেননি ভিয়েনার রাজদরবারে মোৎজার্টের সমাদর বিঘি্নত করার; মোৎজার্ট নিজেও তার চিঠিপত্রে প্রায়ই সালিয়েরির চক্রান্তে র ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ সবই শিল্পীর ঊর্বর, উত্তেজিত মস্তিষ্কের উদ্ভাবনা কি না তা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই।
তা হলে সালিয়েরির বিষে মোৎজার্টের মৃতু্য নিয়ে চর্চা কেন? প্রধান কারণটা সম্ভবত এই যে, ভিয়েনায় পঞ্চাশ বছর ধরে ঘাঁটি গেঁড়ে থাকা ইতালির ভেরোনা শহরের সংগীতবিশারদ সালিয়েরি (1750-1825) বেটোফেন ও শু্যবের্টের শিক্ষকতার করার সুযোগ পেলেও সারাটা জীবন সামান্য দূরত্ব থেকে দেখতে বাধ্য হয়েছেন মোৎজার্টের শিল্প ও কীর্তির উত্তরোত্তর উত্থান এবং উত্থান।
দ্বিতীয়ত, মৃতু্যর কিছুকাল আগে বেফাঁস কথার মধ্যে এও বলতেন যে, তিনিই বিষ খাইয়ে সাবড়ে দিয়েছিলেন মোৎজার্টকে। তৃতীয় কারণ : মোৎজার্টের অকালমৃতু্যতে, শেষ জীবনের আর্থিক কষ্টের জন্য পৃথিবীর মানুষের লজ্জার অন্ত নেই। সালিয়ারির মধ্যে সবাই আমরা কিছুটা নিজেদের দেখি, সালিয়ারির রোষ আর পাগলামির মধ্যে নিজেদের প্রায়শ্চিত খুঁজি।
পুশকিন, রিমস্কি কোর্সাকভ ও পিটার শ্যাফার-এ মোৎজার্ট- হত্যাকে সেরা মোৎজার্ট বন্দনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জঁ্যা আনুই-এর 'বেকেট' নাটকে রাজা দ্বিতীয় হেনটি যেমন হতাশায় ও আত্দসর্মপণে বেকেট খুনের নির্দেশ দেন
মোৎজার্টের চিঠিতেই আছে ওর জীবনের শেষ এবং মহত্তম অপেরা 'দ্য ম্যাজিক ফ্লুট' দেখতে দেখতে সালিয়েরি কীভাবে থেকে থেকেই 'ব্রাভো!' বলে উঠছিলেন। পিটার শ্যাফারের নাটকে মোৎজার্টের পাশে বসে সালিয়েরির সেই অবশ মুগ্ধতা এভাবে চিত্রিত হয়েছে।
1787-র জানুয়ারিতে প্রাগ-এর ন্যাশনাল থিয়েটারে ফের মঞ্চস্থ হল 'ফিগারো' এবং গ্রাগবাসীর মূচ্র্ছা যাওয়ার দশা। জাতীয় নাট্যসভার অধিকর্তা পাস্কাল বোন্দিনি শিল্পীকে তড়িঘড়ি বরাত দিলেন নতুন একটা অপেরার। মোৎজার্ট সাড়া দিলেন এমন এক অপেরা দিয়ে, যেটিকে সমালোচকরা মনে করেন শিল্পীর সেরা কাজ- 'দ্যন জোভানি'। 1787তে ফ্রেন্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড পিতা লিওপোল্ড মোৎজার্ট মারা যাচ্ছেন, সংসারে অর্থাভাবে হাজার ঝামেলার মধ্যে শিল্পী নিজেকে বাঁচিয়ে চলছেন আরো চূড়ান্ত মনোযোগে। আয় যতো কমছে, মগজ উপড়ে বার করছেন একটার পর একটা চিরস্মরণীয় নির্মাণ। শেষ দিককার কুইন্টেট, শেষ তিন মহৎ সিস্ফোনি, ক্ল্যারিনেট কনচের্তো, বি-ফ্লাটের পিয়ানো কনচের্তো, মৃতু্যশয্যায় শুয়ে অপরূপ বন্দনাগান। 'রিকুইয়ম'।
পুশকিন এবং শ্যাফারের নাটকে এই 'রিকুইয়ম' এক বিশেষ মহত্ব অর্জন করেছে। ইতিহাস বলছে কাউন্ট ফন ভালসেগ নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি ও অক্ষম কম্পোজারের বাসনা ছিল রিকুইয়মটি নিজের রচনা বলে বাজারে ছাড়বেন।
মোৎজার্টের জীবনের শেষ কটি দিনের বর্ণনা পড়া অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক। নাট্যকাররা সেই যন্ত্রণা থেকে আমাদের অব্যহতি দিয়েছেন, কিন্তু কী করে এড়াব জীবনীকারদের? 4 ডিসেম্বর, 1971-এর একটা বর্ণনা পাই যখন স্ত্রী কনস্তানজ বিহ্বল হয়ে দেখছেন দেবতুল্য স্বামী জ্বরের ঘোরে বকবক করছেন, বমি করছেন, নয়তো নির্মীয়মান রিকুইয়মের সুর ভাঁজছেন। শিষ্য ফ্রানৎস সুসমায়ারকে নিপুণ নির্দেশ দিলেন অসমাপ্ত কাজটি কীভাবে শেষ করতে হবে। পরদিন ভোরে যখন মৃতু্য হল, দিনটা দাঁড়াল প্রবল ঝড়বৃষ্টির। খুব ঘনিষ্ঠ কজন ছাড়া বেশি লোককে জড়ো করা যায়নি সেন্ট মাইকেলজ ক্যাথিড্রাল। দেহ নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি যখন রওনা দিল ভিয়েনার ছকিলোমিটার বাইরে সেন্ট মার্কস গির্জার কবরখানায়।
তবে যুধিষ্ঠিরের সারমেয়র মতো একটি কুকুর গেল ওই গাড়ির পিছু পিছু সেই সমাধিস্থল অবধি। সমাধিও বটে! আরো তিন মৃতদেহের সঙ্গে ভলফগাং আমাডেয়স মোৎজার্টের দেহ বস্তায় করে নিক্ষিপ্ত হল এক ফলকহীন কবরে! যাকে বলে ভিখিরির কবর। এই ভিখিরির মৃতু্য দিয়েই অমর হয়ে গেলেন মোৎজার্ট।
রেফারেনস: আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ইন্টারনেট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

