গত 28 জানুয়ারি শনিবার ছিল মহাকাশযান চ্যালেঞ্জার বিধ্বসত্দের 20তম বার্ষিকী। এ মর্মানত্দিক দুর্ঘটনায় সাত নভোচারী নিহত হয়। গোটা আমেরিকান জাতি এদিন নিহতদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
নিহত নভোচারীদের আত্মীয়স্বজন, নাসার সহকমর্ীসহ অনেক দর্শনাথর্ী ঐদিন কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্রে এক স্মরণসভায় মিলিত হয়। সভায় তারা সেই মর্মানত্দিক ছিনটি ও নভোচারীদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে। তবে ঐদিনটিকে সামনে রেখে একটি কথা ঘুরেফিরে বারবার উচ্চারিত হয়। তা হলো নাসার অভিযান ও কার্যক্রম আজো ঝুঁকিমুক্ত নয়। নিরাপদ নন মহাকাশের নভোচারীরা।
দিনটি ছিল আমেরিকান জাতির জন্য অন্যতম এক শোক দিবস। ঠিক জন এফ কেনেডি হত্যার দিনটি ও 11 সেপ্টেম্বর বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের ওপর আক্রমণের দিনটি গোটা জাতিকে যেমন সত্দম্ভিত করে দেয়।
1986 সাল 28 জানুয়ারি। সকাল 11টা 38 মিনিট। এমনই এক রৌদ্র উজ্জ্বল সকালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জার পৃথিবীর বুকে যাত্রা করে। যদিও তার যাত্রা করার নির্ধারিত সময় ছিল আরো ছয় দিন আগে।
উৎক্ষেপণের পর থেকে মহাকাশযানটির সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চলছিল। কিন' মাত্র 73 সেকেন্ড পরে পৃথিবী থেকে 14 হাজার মিটার উপরে হঠাৎ বিকট শব্দে এটি বিস্ফোরিত হয়। এতে ছিল হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেন গ্যাস। ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে একটা আগুনের কুণ্ডলিতে পরিণত হয়। যানটির গতি বৃদ্ধির জন্য দুপাশে দুটো বোস্টার রকেট ছিল। এ দুটি বিস্ফোরিত হয়ে দুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে আকাশে ইংরেজি ভি অক্ষরের মতো একটি আগুনের কুণ্ডলি তৈরি হয়।
সেই সময়ের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে নভোচারী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি উইলিয়াম পটার উল্লেখ করেন_ '20 বছর আগে জানালা দিয়ে যে দৃশ্যটি দেখেছিলাম তা আজো সুস্পষ্টভাবে চোখের সামনে ভাসছে।' রিচার্ড নরম্যান নামে অবসরপ্রাপ্ত এক চাকরিজীবী বলেন, 'গতকাল কি খেয়েছি এ প্রশ্ন যদি আমাকে করা হয় তবে হয়তো তা সঠিকভাবে মনে করতে পারবো না। কিন' সেই দিনের অবিস্মরণীয় ও মর্মানত্দিক দৃশ্যটির কথা কখনো ভুলবো না। আর একথা শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, যে কারো মনেই তা গভীর রেখাপাত করবে।
নভোযান চ্যালেঞ্জারের নভোচারীদের স্বজনরা ছাড়াও 2003 সালে নভোযান কলাম্বিয়া দুর্ঘটনায় নিহত 7 নভোচারী ও 1967 সালে অ্যাপোলো 1-এর নিহত 3 নভোচারীর আত্মীয়স্বজনরা এ সভায় যোগ দেয়। নিহতদের প্রেরণে তারা পাথরের স্মৃতিসত্দম্ভের সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
চ্যালেঞ্জারের নিহত পাইলট ফ্রান্সিস ডিক স্কবির স্ত্রী জুন স্কবি রজারস বলেন_ 'আজকের দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে যেমন গভীর বেদনার অন্যদিকে পরম সুখেরও বটে।' স্বামীর কথা উল্লেখ করে স্কবি বলেন, 'তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে কিছু অর্জন করতে হলে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হয়, আর তিনি তাই বেছে নিয়েছিলেন। মহান ত্যাগের জন্য ঝুঁকি নিতে আপত্তি কোথায়।'
স্কবি তার মেয়ে কেথির লেখা একটি চিঠি পড়ে শোনান। যাতে কেথি উল্লেখ করেন সেই দিনের দুর্ঘটনাটি ছিল একটা জাতীয় বিয়োগানত্দক ঘটনা। টিভিতে সারাদিন তার বাবার মৃতু্যর সংবাদ প্রচার করেছিল। যা দেখে গোটা জাতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করেছিল।
তবে সবচেয়ে খ্যাতনামা অপেশাদার নভোচারী ম্যাকুলিখির আত্মীয়স্বজন এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। দুর্ঘটনার পর থেকেই তারা নিজেদের লোকচক্ষুর অনত্দরালে রেখে আসছে। ম্যাকুলিখি ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান নিহত নভোচারীদের সম্পর্কে বলেন, এ অকাল মৃতু্য তাদের অবিস্মরণীয় করে রাখবে।
তবে এ দুর্ঘটনার 20 বছর অতিক্রানত্দ হলেও নাসার মহাকাশ অভিযান আজো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর তদনত্দের জন্য এক প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি রিপোর্টে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রকেট বোস্টারের ত্র"টিকে দায়ী করে। এরপর নাসা 2 বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করে রকেট সংস্কারের এক বড়ো ধরনের সংস্কার করে। কিন' এরপর 2003 সালে মহাকাশযান কলাম্বিয়া বিধ্বসত্দ হলে আমেরিকার মহাকাশ সংস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কলাম্বিয়া যানের দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যানটির উপরিভাগের একটি টুকরোকে দায়ী করা হয়। সেটি উড্ডয়নের কিছু পর খসে পড়লে যানটির একটি পাখা ক্ষতিগ্রসত্দ হয়।
নাসার আর্মেস রিচাস সেন্টারের পরিচালক ও কলাম্বিয়া দুর্ঘটনার তদনত্দ কমিটির সদস্য স্কট হাবার্ড এ বিষয়ে বলেন, এ দুটো দুর্ঘটনা থেকে আমাদের একটা বড়ো ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রকার ত্র"টি-বিচু্যতিকেই খাটো করে দেখা উচিত নয়।
উল্লেখ্য, চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনায় যারা নিহত হন তারা হলেন- ম্যাকুলিখি (37), স্কবি (46), কো-পাইলট মাইকেল স্মিথ (40), পদার্থবিদ রোনাল্ড ম্যাননাইর (38), একমাত্র নিগ্রো নভোচারী গ্রেগরি জারভিস (42), মিশন বিশেষজ্ঞ জাপানি বংশোদ্ভূত এ লিসন অনিজুকা ও জুডিথ রেসনিক (37)।
সূত্র :নাসা অনলাইন, অন্য পত্রিকা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

