somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোজার্ট ঃ সিম্ফোনি নং 40

২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৬ দুপুর ১২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার বাবা কখনই ইংরেজী গান বা মিউজিক শুনেন না এবং আমি নিজে শুনি এটাও কখনই পছন্দ করেন না। মূলতঃ বাবার ইচ্ছাতেই আমার বয়স যখন ছয়, তখন থেকেই আমার গানের হাতে খড়ি যা দীর্ঘ 12 বছর পর্যন্ত চলে। গত প্রায় 14 বছর যাবৎ আমি পাশ্চাত্য ক্লাসিকাল মিউজিক (চেম্বার এবং অপেরা) শুনে আসছি। তবে আমি যখন খুব ছোট, তখন থেকেই আমার বাবাকে একটি ইংরেজী মিউজিকের রেকর্ড (এল.পি.) প্রায়ই বাজাতে দেখতাম, যা তিনি লন্ডন থেকে কিনে এনেছিলেন। কৌতহলবশতঃ আমি রেকর্ডটি কি দেখতাম, যা আসলে মোজার্টঃ সিম্ফোনি নং 40। আজ 14 বছর ধরে পাশ্চাত্য ক্লাসিকাল মিউজিক শোনার পর এবং তা নিয়ে কিছু পড়ালেখা করার পর আমি আজকের এই লেখাটি লিখছি।

1788 সালের গ্রীষ্মে মোজার্ট তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনি কম্পোজ করেন যেটা ছিল এই কালজয়ী কম্পোজারের জীবনের একটি ক্রান্তিলগ্ন। প্রাগ শহরে তার অপেরা "ডন জিওভানী"-এর চরম সাফল্যের পর, ভিয়েনা শহরে তিনি তার কনসার্টে ব্যর্থ হন। এর কারন হিসেবে বলা হয় যে, তৎকালীন অস্ট্রিয়ান সম্রাটের তুরস্কের সাথে নতুন করে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া, ভিয়েনাবাসীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং এর ফলে ধীরে ধীরে, ভিয়েনাবাসী মোজার্টের কোন কনসার্টে অংশ না নেয়া শুরু করে। ফলস্বরুপঃ মোজার্টের আয় কমে যাওয়ায়, তিনি তার পরিবাবসহ ভিয়েনা শহর থেকে দুরবতর্ী একটি স্থানে চলে যান এবং তার এক বন্ধুকে একটি চিঠি দ্বারা তার এই চলে যাওয়াকে এভাবে ব্যাখা করেন যে, শহর থেকে দুরবর্তী নিরব একটি স্থানে গিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে কাজ করতে পারায় তিনি লাভবান হয়েছেন; কারন তিনি অনেক ভক্তের আগমন দ্বারা বিরক্ত নন। এখানে বসে তিনি তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনি লেখেন, যেগুলো মাত্র সাত থেকে দশ সপ্তাহের ব্যবধানে লেখা হয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, এই সময় মোজার্ট, তার ছয় মাস বয়সী শিশুকন্যার মৃতু্যতে শোকে বিহঃবল ছিলেন।

তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনির মধ্যে মাঝখানের সিম্ফোনিটি অথর্াৎ সিম্ফোনি নাম্বার :40 সবচেয়ে বেশী বিখ্যাত এবং প্রচলিত। তার এই সিম্ফোনিটির জনপ্রিয়তাকে শুধুমাত্র তার কম্পোজ করা বিখ্যাত "ইয়াইন ক্লাইন নাচিমুসিক" এবং "দ্যা ম্যারেজ অফ ফিগারো"-এর জনপ্রিয়তার সাথেই তুলনা করা চলে। মোজার্ট কখনোই কোন বিশেষ উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে তার কোন মিউজিককে কম্পোজ করেননি। শিশু বয়সে মোজার্ট কিছু সময় লন্ডনে অতিবাহিত করেন যেখান থেকে তিনি মিউজিক সম্পর্কে ধারনা ও জ্ঞান অর্জন করেন। বাখ এর সুর মোজার্টকে কৈশরে মিউজিক তৈরিতে মারাত্মক প্রভাবিত করে।

যদিও সিম্ফোনি নাম্বার 40 এর এত জনপ্রিয়তার সঠিক কারনের ব্যাখ্যা আজও কেউ দিতে পারেন নাই তবে মুল কারন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সিম্ফোনিটির কম্পোজ-এ মোজর্াটের " কি" এর চয়েজ একটি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সিম্ফোনিটি "জি মাইনর কি"-তে কম্পোজ করা হয়েছিল যা ছিল মোজর্াটের এক ব্যতিক্রমধমর্ী পছন্দ। মোর্জাটের সারাজীবনে করা 41টি সিম্ফোনির মধ্যে মাত্র দুইটি "মাইনর কি"-তে করা ঠিক যেমন আবার, 27টি পিয়ানো কনসেটের্ার মধ্যে দুইটি মাত্র কম্পোজ করা "মেজর কি"-তে!! "জি মাইনর কি"- তে সে সময়ের জার্মান ও অষ্ট্রিয়ান কম্পোজারগণ মিউজিক লিখতেন যাদের মধ্যে হেইডেন এবং লন্ডনের বাখ এর মত কম্পোজারগণ রয়েছেন যাদের কাজ মোজার্টকে কখনও কখনও মাইনর- কি তে কাজ করায় প্রভাবিত করেছিল।

সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 কে, নামে না চিনলেও, এটা শোনেন নি এমন মানুষের দেখা মেলা ভার। মোবাইল ফোন এর রিং টোন থেকে, সিনেমার মিউজিকে এর ব্যবহার এখনও হয়। ডিসকভারি চ্যানেলে আমি একবার একটি ডকুমেন্টারি দেখি। রাস্তায় নেমে চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপের অধিকাংশ লোক যে কোন সময় গুনগুন করে 3 টি টিউন গাইতে পারে। তার একটি মোজার্ট-এর সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 এবং অন্যদুটি বিটোফেন-এর সিম্ফোনি নং 5 ও 6!!

মোজার্টের সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40, এর টিউন এটাই প্রমান করে যে, মোজার্টের কম্পোজ একদিকে যেমন আমাদেরকে সহজেই আনন্দিত করে তুলতে পারে, তেমনি একইসাথে তা নিয়ে আসতে পারে চোখে পানি। সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 এর মাধ্যমে মোজার্ট মূলতঃ তার জীবনের তৎকালীন দুঃখময় সময়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সিম্ফোনিটির প্রথম মুভমেন্ট দ্বারা যদিও প্রকাশ পেয়েছে এক মেলোডিয়াস বেদনার প্রতিচ্ছবি তবুও শেষ মুভমেন্টেগুলোর মাধ্যমে সকলের জন্য এক বিশেষ আনন্দের ভাব ও দুঃখ জয়ের স্পৃহা শ্রোতাদের জন্য দিয়ে গেছেন মোজার্ট, যারা অবশ্যই মোজার্টের চাইতে অনেক কম কষ্ট পেয়েছেন!

আমার বাবা এখনও মাঝে মাঝে মোজার্টঃ সিম্ফোনি নং 40 এর রেকর্ডটি শোনেন, খুব সম্ভবত ওনার মন খারাপ থাকলে।

ভবিষ্যতে মোজার্ট-কে নিয়ে আরও কিছু লেখার ইচ্ছা রইল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামী লীগ ও আমরা কেনো ক্ষমা চাইবো‼️আমরা’তো বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১৫



লাল বদরদের আমরা কেন কোনোদিন বিশ্বাস করবো না, পছন্দ করতে পারবো না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঘৃণা করবো, তার একটা ভালো উদাহরণ এই স্ক্রীনশটটা।

সব মানুষ একই রাজনৈতিক আদর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরস্ক-কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও কাদের মোল্লাদের প্রেতাত্মার পুনরুত্থান

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৩১


বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "বাংলাদেশ থেকে জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে"। "নির্মূল" শব্দটি সম্পূর্ণভাবে দূর করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কলেরা বা ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপদ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


বিপদ নাকি একা আসে না—দলবল নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। প্রবাদটির বাস্তব এবং কদর্যরূপ যেন এখন মৃণালের জীবনেই ফুটে উঠেছে। মাত্র মাসখানেক আগে বাবাহারা হলো। পিতৃশোক কাটার আগেই আবার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগর দর্পন

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



১. মিরপুর ডিওএইচএস থেকে কুড়িল বিশ্বরোড যাওয়ার পথে ফ্লাইওভারের ওপর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। এক ভদ্রলোকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ঝকঝকে সেডান হাইব্রিড গাড়ির পেছনে এক বাইক রাইডার ধাক্কা দিয়ে স্ক্র্যাচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলামি চুক্তির কারণে বোয়িং কিনতে বাধ্য হলো সরকার?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১২:৫৭


বাসই চলে না , কিন্তু আকাশে ওড়ার বিলাসিতা থেমে নেই। কালের কণ্ঠের এই শিরোনামটা পড়ে মুহূর্তের জন্য থমকে যেতে হয়। কথাটায় একটা তিক্ততা আছে, একটা ক্ষোভ আছে, যেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×