1788 সালের গ্রীষ্মে মোজার্ট তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনি কম্পোজ করেন যেটা ছিল এই কালজয়ী কম্পোজারের জীবনের একটি ক্রান্তিলগ্ন। প্রাগ শহরে তার অপেরা "ডন জিওভানী"-এর চরম সাফল্যের পর, ভিয়েনা শহরে তিনি তার কনসার্টে ব্যর্থ হন। এর কারন হিসেবে বলা হয় যে, তৎকালীন অস্ট্রিয়ান সম্রাটের তুরস্কের সাথে নতুন করে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া, ভিয়েনাবাসীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং এর ফলে ধীরে ধীরে, ভিয়েনাবাসী মোজার্টের কোন কনসার্টে অংশ না নেয়া শুরু করে। ফলস্বরুপঃ মোজার্টের আয় কমে যাওয়ায়, তিনি তার পরিবাবসহ ভিয়েনা শহর থেকে দুরবতর্ী একটি স্থানে চলে যান এবং তার এক বন্ধুকে একটি চিঠি দ্বারা তার এই চলে যাওয়াকে এভাবে ব্যাখা করেন যে, শহর থেকে দুরবর্তী নিরব একটি স্থানে গিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে কাজ করতে পারায় তিনি লাভবান হয়েছেন; কারন তিনি অনেক ভক্তের আগমন দ্বারা বিরক্ত নন। এখানে বসে তিনি তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনি লেখেন, যেগুলো মাত্র সাত থেকে দশ সপ্তাহের ব্যবধানে লেখা হয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, এই সময় মোজার্ট, তার ছয় মাস বয়সী শিশুকন্যার মৃতু্যতে শোকে বিহঃবল ছিলেন।
তার জীবনের শেষ তিনটি সিম্ফোনির মধ্যে মাঝখানের সিম্ফোনিটি অথর্াৎ সিম্ফোনি নাম্বার :40 সবচেয়ে বেশী বিখ্যাত এবং প্রচলিত। তার এই সিম্ফোনিটির জনপ্রিয়তাকে শুধুমাত্র তার কম্পোজ করা বিখ্যাত "ইয়াইন ক্লাইন নাচিমুসিক" এবং "দ্যা ম্যারেজ অফ ফিগারো"-এর জনপ্রিয়তার সাথেই তুলনা করা চলে। মোজার্ট কখনোই কোন বিশেষ উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে তার কোন মিউজিককে কম্পোজ করেননি। শিশু বয়সে মোজার্ট কিছু সময় লন্ডনে অতিবাহিত করেন যেখান থেকে তিনি মিউজিক সম্পর্কে ধারনা ও জ্ঞান অর্জন করেন। বাখ এর সুর মোজার্টকে কৈশরে মিউজিক তৈরিতে মারাত্মক প্রভাবিত করে।
যদিও সিম্ফোনি নাম্বার 40 এর এত জনপ্রিয়তার সঠিক কারনের ব্যাখ্যা আজও কেউ দিতে পারেন নাই তবে মুল কারন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সিম্ফোনিটির কম্পোজ-এ মোজর্াটের " কি" এর চয়েজ একটি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সিম্ফোনিটি "জি মাইনর কি"-তে কম্পোজ করা হয়েছিল যা ছিল মোজর্াটের এক ব্যতিক্রমধমর্ী পছন্দ। মোর্জাটের সারাজীবনে করা 41টি সিম্ফোনির মধ্যে মাত্র দুইটি "মাইনর কি"-তে করা ঠিক যেমন আবার, 27টি পিয়ানো কনসেটের্ার মধ্যে দুইটি মাত্র কম্পোজ করা "মেজর কি"-তে!! "জি মাইনর কি"- তে সে সময়ের জার্মান ও অষ্ট্রিয়ান কম্পোজারগণ মিউজিক লিখতেন যাদের মধ্যে হেইডেন এবং লন্ডনের বাখ এর মত কম্পোজারগণ রয়েছেন যাদের কাজ মোজার্টকে কখনও কখনও মাইনর- কি তে কাজ করায় প্রভাবিত করেছিল।
সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 কে, নামে না চিনলেও, এটা শোনেন নি এমন মানুষের দেখা মেলা ভার। মোবাইল ফোন এর রিং টোন থেকে, সিনেমার মিউজিকে এর ব্যবহার এখনও হয়। ডিসকভারি চ্যানেলে আমি একবার একটি ডকুমেন্টারি দেখি। রাস্তায় নেমে চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপের অধিকাংশ লোক যে কোন সময় গুনগুন করে 3 টি টিউন গাইতে পারে। তার একটি মোজার্ট-এর সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 এবং অন্যদুটি বিটোফেন-এর সিম্ফোনি নং 5 ও 6!!
মোজার্টের সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40, এর টিউন এটাই প্রমান করে যে, মোজার্টের কম্পোজ একদিকে যেমন আমাদেরকে সহজেই আনন্দিত করে তুলতে পারে, তেমনি একইসাথে তা নিয়ে আসতে পারে চোখে পানি। সিম্ফোনি নাম্বারঃ 40 এর মাধ্যমে মোজার্ট মূলতঃ তার জীবনের তৎকালীন দুঃখময় সময়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সিম্ফোনিটির প্রথম মুভমেন্ট দ্বারা যদিও প্রকাশ পেয়েছে এক মেলোডিয়াস বেদনার প্রতিচ্ছবি তবুও শেষ মুভমেন্টেগুলোর মাধ্যমে সকলের জন্য এক বিশেষ আনন্দের ভাব ও দুঃখ জয়ের স্পৃহা শ্রোতাদের জন্য দিয়ে গেছেন মোজার্ট, যারা অবশ্যই মোজার্টের চাইতে অনেক কম কষ্ট পেয়েছেন!
আমার বাবা এখনও মাঝে মাঝে মোজার্টঃ সিম্ফোনি নং 40 এর রেকর্ডটি শোনেন, খুব সম্ভবত ওনার মন খারাপ থাকলে।
ভবিষ্যতে মোজার্ট-কে নিয়ে আরও কিছু লেখার ইচ্ছা রইল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




