আমি জানিনা সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে একটা সমাজের সীমানা বা পরিধি পরিমাপের কোন সংজ্ঞা আছে কিনা কিংবা একটা সমাজের গন্ডি পরিমাপের মাপ কাঠি কি। আমরা জানি মানুষ সামাজিক জীব। আমি বিশ্বাস করি সামাজিক মূল্যবোধ ও সামাজিকতার কারনে একটা সমাজকে কখনো গন্ডিবদ্ধ করা যায় না। মূলতঃ সমাজ হচ্ছে মূল্যবোধের সীমাহীন সীমার পরিধি। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, আমাদের সমাজ কতগুলো অযৌক্তিক উপ-সমাজে ও শ্রেণীস্তুরে বিভক্ত। উদাহরণ স্বরূপ যদি বলতে যাই তাহলে আমাদের প্রধান দুটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘মুসলিম ও হিন্দু’ সমাজ ব্যবস্থার কথা আসে। যদি ব্যবচ্ছেদে যাই তাহলে আমরা দেখতে পাই হিন্দু সমাজ চারটি উপ-সমাজ বা চারটি ভিন্ন ভিন্ন গন্ডি বা সীমার সমষ্টি - ব্রাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। সবাই একই দেব-দেবীর অনসারী বা পুজারী কিংবা একই ধর্মের অনুসারী। কিন্তু লক্ষ্য করুণ- একটা গোষ্ঠী থেকে আরেক গোষ্ঠীর কত্ত ভেদাভেদ! এক গোষ্ঠীর লোক (ব্রাক্ষ্মণ) দেবতা তুল্য, অন্য গোষ্ঠী অস্পৃশ্য। একজন ব্রাক্ষ্মনের গতিসীমা বা আত্মীয়তার সীমা শুধু ব্রাক্ষ্মনের মধ্যেই। বাকী সব গোষ্ঠীর লোক তাদের অনাত্মীয় কিংবা আত্মীয় হবার যোগ্যতাই রাখেনা। ব্রাক্ষ্মনেরা সবসময় পূজনীয় (!)। তাই তাদের পায়ের ধুলো ক্ষত্রিয় ও শুদ্রদের কপালে নিতে হয় দেবতার সুদৃষ্টি ও মঙ্গলের আশায়। বিনিময়ে দেবতার আশীর্বাদে ব্রাক্ষ্মনেরা তাদের উপহার দয় অস্পৃশ্যের উপাধি। ভাবতেই অবাক লাগে কেমন করে এত বড় একটা অপবিত্র অংশ নিয়ে একটা সমাজ, একটা ধর্ম টিকে থাকে। আর যারাইবা জন্মগত পবিত্র (অথচ কর্মগত অপবিত্র) তারাইবা কেন অপবিত্রদের পবিত্র করে তুলছেন না। তাহলে কি একজন ঈশ্বর বা দেবতার বেশীর ভাগ সৃষ্টিই কূ-সৃষ্টি! জেনে রাখা ভালো- মেঘ কখনো সূর্য্যের আলোকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। তবে ভয় কিসের আমাদের দেবতাদের? এমন আরও উদাহরণ রয়েছে যা আমাদের প্রত্যেকেরই জানা। অনুরূপভাবে, এবার যদি মুসলিম সমাজ ব্যবস্থার কথায় আসি তাহলে এখানে আমরা পাই- শিয়া, সুন্নী, ওহাবী ও হানিফির মতো প্রধান উপ-সমাজ বা সামাজিক শ্রেণীপ্রথা বা সামাজিক স্তরের দৃষ্টান্ত। আমি বুঝি না সবাই একই ধর্মাবলম্বী, এক ও অদিত্বীয় আল্লাহর বান্দা (ইবাদাতকারী) এবং নবী (সঃ) এর উম্মত। তথাপি কেন শিয়াতে সুন্নীতে বিরোধ? কেন এক গোষ্ঠীর অমঙ্গলে অন্য গোষ্ঠী কামনা প্রত্যাশী? কেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী সুন্নী একজন শিয়া গোষ্ঠীর ধর্ম প্রধানের ইবাদতে (প্রার্থণায়) অংশগ্রহণে নারাজ ও অস্বীকৃতি জানায়? তাহলে কি সভাবতই প্রশ্ন জাগেনা এই ভেবে যে, নিশ্চয় পরস্পরের ইবাদতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন, গোষ্ঠী থেকে গোষ্ঠীতে ধর্মীয় আচার-আচারণ ও সামাজিকতা সীমাবদ্ধ। কিন্তু এটা আমাদের জেনে রাখা উচিত- একটি সমাজ, সমাজ ব্যবস্থা কখনো নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ প্রকৃতির মানুষ নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। একটা সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ নিয়েই, প্রত্যেকটি মানুষের স্বক্রীয় ভূমিকা, প্রত্যেকটি মানুষের সমঅধীকার প্রণয়ন ও প্রদানের মধ্য দিয়েই সমাজ ব্যবস্থা বা সমাজ। সমাজ সকল মানুষের উপস্থিতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো। আমরা যদি একটি সমাজকে ব্রাক্ষণ, ক্ষুদ্র, বৈশ্য ও শুদ্র এবং সুন্নী, শিয়া, হানিফি, ওহাবি ও দেবতা, অস্পৃশ্য প্রভৃতি স্তরে ভাগ করি তাহলে কখনো এর পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পাবে না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত এইসব সমাজ এক সময় নিস্ক্রিয় হয়ে যাবে। তলিয়ে যাবে সময়ের অতল গহ্বরে। ফলে রাষ্ট্রীয় কাজে তার এবং রাষ্ট্রে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, একটা বৃত্তের ভিতরকার অণু-পরমানু তথা কণা বা উপাদান সমূহের গতি সীমা কিন্তু বৃত্তের ভিতরেই। বৃত্তের বাহিরের বিশাল জগতের সাথে তার কোন সন্ধি নেই। তাই বিচরণ এবং সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শক্তি সঞ্ছয় সম্ভবপর হয় উঠেনা। ফলে বৃত্তের মধ্যেই অণ-পরমাণু সমূহের মধ্যকার পারস্পরিক আর্কষণ-বিকর্ষণ, শক্তি আদান-প্রদানে তারা শক্তি হারা হয়ে, হয়ে পড়ে নিশ্চল, স্থবির এবং অবশেষে মৃত্য। তাই বৃত্তের মৃত্যু বিন্দুর হাতেই, বিন্দুর মৃত্যুর সাথে সাথেই।
আমি মনে করি একটি রাষ্ট্র মানেই একটি সমাজ। তাহলে ভাবুনতো একটি সমাজ যদি একের অধিক উপ-সমাজ, কিছু দেবতা কিছু অস্পৃশ্য, ভিন্ন ভিন্ন স্তরে সীমাবদ্ধ শ্রেণীবৃত্ত বিরাজমান থাকে তাহলে অনুরূপভাবে একটি রাষ্ট্রের তথা সমাজের মৃত্যু কি অবধারিত নয়? ছোট ছোট শ্রেণী বা উপ-সমাজগুলো নিশ্চয় একদিন হারিয়ে যাবে, হয়ে পড়বে নিথর যা একদিন একটা মৌলিক সমাজ এক অর্থে রাষ্ট্রকে করে তুলবে পঙ্গু, শক্তিহীন এবং ফলস্রুতিতে পুরো জাতি ও জাতি সত্বা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় বিধান তথা সংবিধান নির্ধারিত হয় সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মৌলিক অধিকার (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) কে সমুন্নত ও অক্ষুন্ন রাখার নিশ্চিয়তা কল্পে। তেমনি সমাজও মানুষকে সামাজিক অধিকার প্রদানে অঙ্গীকারাব্ধ। কিন্তু এ কি হচ্ছে? আমাদের সমাজে সমাজ তার সামাজিক অধিকারসমূহ, আমাদের রাষ্ট্রে রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক অধিকারসমূহ শুধু বিত্ত ও প্রতিপত্তিশালী এবং দেবতাদের দিকে নিবিষ্ট রেখেছেন কেন? আমির হোসেন কিংবা গীতারা কি তাহলে মানুষ নয়!?
আমির হোসেন হয়তো মানুষ নয়, তাই সে সামাজিক জীব নয়। সে রাষ্ট্রীয় নাগরিকের কোন ক্যাটিগরিতেও পড়েনা। মানুষের কাছাকাছি কোন জন্তু হবে হয়তো। তাই যদি না হতো তবে সমাজ কেন তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। কেন সে অন্য সব মানুষের মত মানবিকতা পায় না, পায় না ভালোবাসা। কেন সে সমাজ থেকে, মানুষ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে? কেন সে একজন মানুষের পরিচয় পাচ্ছে না? আমরা তাকে কেন মানুষ ভাবতে পারিনা, ভাবি অন্যরকম।
ছোট্ট বেলার খেলার সাথীটিও নাকি একটা সময় আর খেলতে আসতো না, কাছে ঠেকতো না। পাছে সংক্রমিত হয় এই ভয়ে। সবসময় ছিল তার সাবধানি লঘু পদক্ষেপ। পাড়ার ছেলেরা গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে আম গাছের সেই উঁচু ঢালটি থেকে পুকুরে ঝাপিয়ে পড়ে একদলে সাঁতার কাটতে আর আসতো না তার কাছে। একসাথে দল বেধেঁ চাঁদের আলোয় লুকোচুরি খেলা অতঃপর ঠ্যাংগা রফিক্কার গাছে ডাব চুরি করা আর হতো না। সোমবার হাটের দিন চাচাতো ভাই জইল্লাসহ কেনার নামে ফেরিওয়ালা কিংবা দোকানির কাছ থেকে বাদাম অথবা বুট, কলা বিক্রেতার কাছ থেকে কেনার ভান ধরে কলা খেয়ে কলার মান যাচাই করা ইত্যাদি আর করা হয়ে উঠেনি আমির হোসেনের। এখন বাজারে গেলেই আমিরকে ঘিরে জটলা পাকিয়ে যায়। আগে যেখানে সবাই জটলা বেঁধে বানরের খেলা দেখতো এখন আমিরকে দেখতে তার চাইতেও বড় সমাগম হয় সেখানে। (আমার এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে আমির হোসেনকে দেখলেই বন্ধু সিকান্দার ও মফিজ খুব মজা করত। হিজড়া তালি মেরে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে হিজড়া সুরে উক্তি করত। একদিন আমিরকে এনে বসানো হলো আমাদের সাপ্তাহিক শুক্রবারের আড্ডায়। সিকান্দারের হাতাহাতিতে একদিন সিকান্দারের আগ্রহেই বিরক্ত আমির হোসেন সবার সামনেই উন্মোচন করে তার নিন্মাঙ্গ। সবার অট্টহাসি আর করতালির পিছনে সেদিন আমি ঠিকই দেখতে পেয়েছিলাম হাসির আড়ালে আমির হোসেনের লুকানো অব্যক্ত লজ্জা আর ক্রোধের করুণ আর্তি। )
আমির হোসেনের ভাষায়:
‘‘আমরা হয়তো মানুষ নই, তাই মানুষগুলো অন্যরকম! মানুষেরা আমাদের হিজড়া বলে। আমরা হিজড়া নামে তাই সমাজে ঘৃণ্য। পাড়ার মুরব্বীরা এমনকি আত্মীয়-স্বজন সবাই বলে হিজড়ারা নাকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ। ওরা নাকি অস্পৃশ্য। তাদের দেখলেই নাকি অমঙ্গল (!) হয়। তাই পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। কোত্থাও এতটুকু মমতা নেই। এতটুকু নেই ঠাঁই ।”
এভাবেই আমির হোসেনরা সমাজ নিগৃহীত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত ও ঘৃণীত জন থেকে জনে, ঘর থেকে ঘরে, গ্রাম থেকে গ্রামে, শহরে ও নগরে। খুবই লজ্জার ব্যাপার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় সংবিধানে আমির হোসেনদের জন্য কোন বিধান নেই। অথচ বিধান রয়েছে পশু সংরক্ষণের। নেই অধিকার প্রণয়ন, নেই কোন নাগরিক মর্যাদা। মানবিতা ও মানবতার কোন বালাইতো নেই-ই। বিধাতার কাছে তাই প্রশ্ন থেকেই যায় ‘‘ওরা তাহলে কি?” পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোতে কি ওদের একবারও মানুষ বলে চিহ্নিত করা হয়নি? হরমোনের প্রভাবে শুধু একটা অঙ্গের পরিবর্তন কিংবা দৈহিক পরিবর্তনের জন্য একজন বোধশক্তি পরিপূর্ণ, মানবিক আবেদন নিহিত, মেধাসম্বলিত আমির ও গীতারা কেন মানুষ গণ্য হয় না? অথচ একজন সক্ষম যৌনাঙ্গের অধিকারী ধর্ষক অথবা বেশ্যা অস্পৃশ্য নয়; একজন মানুষ (!?) বটে। দেব-দেবীদের সাদা শুভ্র হাত ওদের (ধর্ষক ও বেশ্যা) বুকে-দেহে অস্তিত্ব খোঁজে। ওরাও দেবতাদের আনুকুল্য পায়। দেবতারা হয় তাদের প্রতি আস্থাশীল। ঈশ্বর না অধিশ্বর? সে যা-ই হোক তিনি এইসব দেবতাদের মঙ্গল করুক। আমির ও গীতারা সেইসব দেবতা ও ঈশ্বরদের চিরকাল থুক দিক, থুক!
(সমাপ্ত)
লেখকঃ মোহাম্মদ রাহীম উদ্দিন
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




