৫২ (ভাষা আন্দোলন) , ৬২ (শিক্ষা আন্দোলন), ৬৬ (ছয় দফা আন্দোলন), ৬৮ (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা), ৬৯ (আইয়ুব বিরোধী গন-অভ্যুত্থান), ৯০ (স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলোন), ১৫ এর বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট প্রত্যাহারের আন্দোলোন, ১৮ এর কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে ২৪ এর আন্দোলনের বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে যা জনগণ (যদি তারা শতভাগ বিবেকহীন না হয়ে থাকে) মনে রাখবে বা আমরা অবশ্যই মনে রাখবো।
১.
২৪ ছাড়া যত আন্দোলন এ যাবৎকাল (স্বাধীন হওয়ার পূর্বে ও পরে) হয়েছে তা ৭১ এর চেতনাকে সঙ্গে নিয়েই। কারণ সবার আগে বাংলাদেশ, এ নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিলো না।
সে সব আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের পরিচয় (আমাদের নাগরিক পরিচয়)-এই মৌলিক বিষয় গুলোর সাথে সাংঘর্ষিক ছিলো না। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সংঘটিত আন্দোলন গুলোর শেষ পর্যায়ে কখনোই কেউ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তির্যক/বিতর্কিত মন্তব্য করেনি বা প্রশ্ন তোলেনি। আর তখনকার আন্দোলনকারী ছাত্র জনতা কর্তৃক ৭১ এর স্মৃতিকে ধারণ করার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা বিবিধ স্মারক, ভাস্কর্য, স্থাপনা প্রভৃতি ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়া তো দূরের কথা।
৩.
৭১ এর চেতনা নিয়ে বানিজ্য হয়েছে, এর অপব্যবহার হয়েছে, অতিব্যবহার হয়েছে। তাতে অনেকেই বিরক্ত ছিলো এর অনৈতিক সুবিধাভোগকারীদের ওপর। এরপরও ৭১ এর মুল চেতনার আবেদন বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি। ৭১ কে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করার তো প্রশ্নই আসেনা ।
৭১ নিয়ে যত অপপ্রচারই চলুক না কেনো, ন্যূনতম বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চয় তাদের বেছে নেবে না বা তাদের অনুগামী হবে না, যারা ধর্ম/ইসলাম নিয়ে বাণিজ্য করে, নিজ রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ধর্মের অপব্যক্ষা করে, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে ধর্মকে weaponize করে, এক কথায় স্বয়ং আল্লাহর হেফাজতে থাকা ইসলাম নিয়ে খেল তামাশা করে।
কতিপয় মানুষের ৭১ নিয়ে বাণিজ্য করার কারণে যদি ৭১ ই বাতিল হয়ে যায়, ৭১ এর স্মৃতি সংবলিত স্মারক সমূহ ধ্বংস করার যোগ্য হয়ে থাকে তবে আমরা কি ধরে নেবো যে ইসলাম নিয়ে বাণিজ্য করার কারণে খোদ ইসলামই বাতিল হয়ে গেছে (নাউজুবিল্লাহ)? তাই মসজিদ-মাদ্রাসা গুঁড়িয়ে দেয়া বাঞ্ছনীয় (নাউজুবিল্লাহ)?
৪.
২৪ ছাড়া অন্যান্য সব আন্দোলনের শুরু আর শেষের এজেন্ডা/উদ্দেশ্য সমূহ ছিলো একই এবং পানির মতো পরিস্কার। আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে মাঠ পর্যায়ের সর্বস্তরের জনগণ ছিলো শতভাগ ওয়াকিবহাল।
বিবিধ উদ্দেশ্য আন্দোলনের সময়ে ছিলো এক রকম আর আন্দোলনের পরে হয়ে গেলো আরেক রকম, এমনটা ওইসব আন্দোলনের সময় হয়নি যা ২৪ এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। শুরুতে এটা ছিলো বৈষম্য বিরোধী, শেষের দিকে হলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী আর আন্দোলনের পর দেশের আন্দোলনকারী রথী মহারথীদের খাজানা থেকে রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ নামক নানাবিধ জটিল বিষয়সমূহ বেরিয়ে আসতে শুরু করলো। হকচকিয়ে যাবার মতো অবস্থা। চমকের পর চমক। স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে এরকম অনেক প্রশ্ন জেগে উঠলো যে ছাত্ররা আসলেই কি তাদের আন্দোলনকালীন সময়ের নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে নিমগ্ন নাকি অন্য কোনও পক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা শুরু করেছে? আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলনের সময়কার মূল চরিত্র কি আন্দোলন পরবর্তী সময়েও অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলো?
৫.
এমন কোন আন্দোলন এ দেশে হয়েছে যেখানে আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ছাত্র জনতা সচিবালয় মন্ত্রণালয় দাপিয়ে বেড়িয়েছে? (২৪ এর এক জাঁদরেল ছাত্র নেতা তো আক্ষেপ করে বলেছিলো যে সে নাকি যখন তখন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মিটিং এ ঢুকে পড়ার সুখানুভূতি miss করছে)।
আচ্ছা, আমরা কি ভবিষ্যতে এমন কোন আন্দোলন দেখার অপেক্ষায় আছি যে, যে আন্দোলনের পর ছাত্ররা ঢাকা সেনানিবাসের সেনা সদরের আনাচ কানাচ চড়ে বেড়াবে, স্বশস্ত্র বাহিনীর তাবৎ জেনারেলরা তটস্থ হয়ে থাকবে?
৬.
সচিবালয় দাপিয়ে বেড়ানোর অতি স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী fallout হিসেবে জনসম্মুখে ছাত্র উপদেষ্টাদের পিএস/এপিএস কর্তৃক দুর্নীতি, সচিবালয়ে নিয়োগ বানিজ্য, নিজ জেলায় সরকারি তহবিলের বাড়তি বরাদ্দ (এক প্রকার বৈষম্য বটে) বিষয়ক ঘটনা/দুর্ঘটনা সমূহ সামনে চলে এসেছে। এসব কিন্তু ২৪ পূর্ব আন্দোলন সমূহে ঘটেনি। ঘটবেই বা কেনো? সে সব আন্দোলনের উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার পর আন্দোলনকারীরা যে যার কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেছে, ছাত্ররা ফিরে গেছে তাদের শিক্ষাঙ্গনে, স্তিমিত কারখানায় আর কৃষকরা ফসলের মাঠে। আন্দোলন শেষে নগদে নিজেরাই নিজেদের হালুয়া রুটির বন্দোবস্ত করে নেবে এমনটা তাদের মস্তিষ্কে আসেনি। তারা ছিলো এতটাই cute…।
সততার মানদণ্ডে ২৪ এর আগে সংঘটিত হওয়া আন্দোলনগুলোর আন্দোলনকারীদের ভূমিকা ছিলো প্রশ্নাতীত। সে তুলনায় ২৪ এর আন্দোলনকারীদের অবস্থান কোথায়? সকল আন্দোলনে তারুণ্যের ভূমিকা অবশ্যই একটা জোরালো উপাদান। কিন্তু নিঃসংকোচে, কোন প্রকার রাখ-ঢাক ছাড়াই সততা নৈতিকতার সাথে আপোষ করা এই বর্তমানকালের তরুণ নেতৃত্ব আমাদের কোন গন্তব্যে নিয়ে যাবে?
৭১ নিয়ে বানিজ্য করা খুব খ্রাপ....কিন্তু তার পরিবর্তে ইসলাম/ধর্ম নিয়ে বানিজ্যে নেমে পড়া কি সমিচিন?
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


