somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন বীরঙ্গনার কথা

০৩ রা জুলাই, ২০০৭ রাত ১১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিদ্রোহী কবির ভাষায়ঃ
জগতের যতো বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।
কোনোকালে এক হয়নিক' জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।

বাংলাদেশ থেকে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের বিতাড়িত করার সংগ্রামে বাংলার মেয়েরাও আজ এগিয়ে এসেছেন। আমাদের মা-বোনরা স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও সমৃদ্ধির জন্যে অশেষ ত্যাগ ও তিতিক্ষা প্রদর্শন করে চলেছেন।

বাংলার অবলা রমণী আজ নিজের ভাইকে, নিজের সন্তানকে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করতে পাঠিয়ে দিয়েই কর্তব্য শেষ করছেন না, দুশমন নিধনের কাজেও করছেন আত্মনিয়োগ। এ এক স্বতঃস্ফুর্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শত্রুকবলিত অঞ্চলগুলোতে আজ চলছে এক ত্রাসের রাজত্ব। মুক্তিবাহিনীর বীর সৈন্যদের গেরিলা আক্রমণে অহরহ পর্যদুস্ত হয়ে হানাদাররা নিজেদের বর্বরতার পরিচয় দিচ্ছে নিরস্ত্র নিরপরাধ জনপদে হামলা চালিয়ে। বাংলার বেসামরিক মানুষকে হত্যা, জনসাধারনের মালামাল লুটতরাজ এবং নারী নির্যাতন- এসবই হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের দৈনন্দিন কর্মসূচি।

পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতার বিরুদ্ধে সুদৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র। আমাদের মুক্তিবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে নাজেহাল করছে। যেখানেই শত্র“বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসছে, এক দন্ডও স্বস্তিতে থাকতে পারছে না- প্রতি মুহূর্তেই তারা সন্ত্রস্ত।

পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার স্যৈন্যদের মানবতাবিরোধী কার্যকলাপই আজ তাদের অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের কারণ হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা আজ বড়ো বেসামাল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের নামে তারা করে চলেছে বিবেক-বিবর্জিত ও পশুসুলভ আচরণ। অধিকৃত অঞ্চলের নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণকে নির্বিচারে হত্যা, বসতঘরে অগ্নিসংযোগ এবং নিষ্পাপ নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে তারা বাংলার মানুষ তথা বিশ্ববাসীর কাছে অশেষ ঘৃণা ও কলঙ্কভাজন হয়েছে। বাংলার নারী-পুরুষ সবাই আজ পাকিস্তানি দস্যুদের উদ্দেশ্যে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিশোধ- যে কোনো মূল্যে হানাদার বর্বরদের ওপর প্রতিশোধ নিতে সবাই বদ্ধ পরিকর। জালেমের ওপর প্রতিশোধ নেবার এই প্রবণতা স্বতঃস্ফূর্ত। যখন যেভাবে পারা যায়, দুশমনকে তার দুষ্কর্মের জন্য সাজা দিতেই হবে। মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি বীর সৈনিক জীবনপণ করে তারই ব্যবস্থা করছে। শত্রুকে ঘায়েল করার মহান কর্তব্যের ডাকে সাড়া দিয়েছে প্রতিটি বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র শপথ, দেশ ও জাতির জন্যে আমরা মরবো- তবে মরবার আগে দুশমনদের একজনকে হলেও মারবো।

এই কঠিন কঠোর শপথ নিয়ে একজন দুর্বৃত্ত পাকবাহিনীর মেজরকে সম্প্রতি হত্যা করেছেন বাংলার এক বীরাঙ্গনা নারী। সে এক আশ্চর্যরকম ত্যাগ ও দুঃসাহসের কাহিনী। বেইমান চরিত্রহীন পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় অকথ্যভাবে নারী নির্যাতন চালিয়েছে গোড়া থেকেই। কতো নিষ্পাপ রমণী তাদের পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছে, তার হিসাব নেই। তাদের বর্বরতার হাত থেকে নারীত্বের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে বিভিন্ন ছাত্রীনিবাস, নার্সেস কোয়ার্টার ও বাড়িঘরের অসহায় মেয়েরা হয়তো আত্মহত্যাও করেছেন। কিন্তু ১৭ মে ঢাকা টেলিফোন বিভাগের কর্মচারী বাংলার এক বীরাঙ্গনা নারী নিজের নারীত্বের অপমানের শোধ নিয়েছেন জনৈক পাকিস্তানি মেজরকে পিস্তলের গুলিতে হত্যা করে। মেজরটি সেই মহিলাকে জোর করে ধরে নিয়ে ঢাকার দ্বিতীয় রাজধানীর একটি গৃহে আটক করে রাখে। অসহায় মহিলা সেই মুহূর্তে নিজের অবস্থা বিবেচনা করে দুর্বৃত্ত মেজরটির সঙ্গে ভাব করে ফেলেন। তারপর সুযোগ বুঝে তিনদিন পর মেজেরের পিস্তলটি হস্তগত করেন এবং তা-ই দিয়ে মেজরকে গুলি করেন। এভাবেই তিনি তাঁর নারীত্বের অবমাননার চরম প্রতিশোধ নেন।

পরমুহূর্তেই পাহারাদার পাকসৈন্যের গুলিতে মহিলাটিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু সে মৃত্যু ছিলো সুখের। কেননা জীবনের বিনিময়ে তিন একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি দুশমনকে নিজের হাতে হত্যা করতে পেরেছেন।

একজন বাঙালি ললনার এই ধৈর্য ও ত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার পথযাত্রায় অবশ্যম্ভাবী সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করছে।
_______________________
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে ৮-৬-১৯৭১ এ প্রচারিত।
রচনাঃ বেলাল মোহাম্মদ
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×