বিদ্রোহী কবির ভাষায়ঃ
জগতের যতো বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।
কোনোকালে এক হয়নিক' জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।
বাংলাদেশ থেকে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের বিতাড়িত করার সংগ্রামে বাংলার মেয়েরাও আজ এগিয়ে এসেছেন। আমাদের মা-বোনরা স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও সমৃদ্ধির জন্যে অশেষ ত্যাগ ও তিতিক্ষা প্রদর্শন করে চলেছেন।
বাংলার অবলা রমণী আজ নিজের ভাইকে, নিজের সন্তানকে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করতে পাঠিয়ে দিয়েই কর্তব্য শেষ করছেন না, দুশমন নিধনের কাজেও করছেন আত্মনিয়োগ। এ এক স্বতঃস্ফুর্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শত্রুকবলিত অঞ্চলগুলোতে আজ চলছে এক ত্রাসের রাজত্ব। মুক্তিবাহিনীর বীর সৈন্যদের গেরিলা আক্রমণে অহরহ পর্যদুস্ত হয়ে হানাদাররা নিজেদের বর্বরতার পরিচয় দিচ্ছে নিরস্ত্র নিরপরাধ জনপদে হামলা চালিয়ে। বাংলার বেসামরিক মানুষকে হত্যা, জনসাধারনের মালামাল লুটতরাজ এবং নারী নির্যাতন- এসবই হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের দৈনন্দিন কর্মসূচি।
পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতার বিরুদ্ধে সুদৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র। আমাদের মুক্তিবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে নাজেহাল করছে। যেখানেই শত্র“বাহিনী ঘাঁটি গেড়ে বসছে, এক দন্ডও স্বস্তিতে থাকতে পারছে না- প্রতি মুহূর্তেই তারা সন্ত্রস্ত।
পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার স্যৈন্যদের মানবতাবিরোধী কার্যকলাপই আজ তাদের অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের কারণ হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা আজ বড়ো বেসামাল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের নামে তারা করে চলেছে বিবেক-বিবর্জিত ও পশুসুলভ আচরণ। অধিকৃত অঞ্চলের নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণকে নির্বিচারে হত্যা, বসতঘরে অগ্নিসংযোগ এবং নিষ্পাপ নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে তারা বাংলার মানুষ তথা বিশ্ববাসীর কাছে অশেষ ঘৃণা ও কলঙ্কভাজন হয়েছে। বাংলার নারী-পুরুষ সবাই আজ পাকিস্তানি দস্যুদের উদ্দেশ্যে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিশোধ- যে কোনো মূল্যে হানাদার বর্বরদের ওপর প্রতিশোধ নিতে সবাই বদ্ধ পরিকর। জালেমের ওপর প্রতিশোধ নেবার এই প্রবণতা স্বতঃস্ফূর্ত। যখন যেভাবে পারা যায়, দুশমনকে তার দুষ্কর্মের জন্য সাজা দিতেই হবে। মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি বীর সৈনিক জীবনপণ করে তারই ব্যবস্থা করছে। শত্রুকে ঘায়েল করার মহান কর্তব্যের ডাকে সাড়া দিয়েছে প্রতিটি বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র শপথ, দেশ ও জাতির জন্যে আমরা মরবো- তবে মরবার আগে দুশমনদের একজনকে হলেও মারবো।
এই কঠিন কঠোর শপথ নিয়ে একজন দুর্বৃত্ত পাকবাহিনীর মেজরকে সম্প্রতি হত্যা করেছেন বাংলার এক বীরাঙ্গনা নারী। সে এক আশ্চর্যরকম ত্যাগ ও দুঃসাহসের কাহিনী। বেইমান চরিত্রহীন পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় অকথ্যভাবে নারী নির্যাতন চালিয়েছে গোড়া থেকেই। কতো নিষ্পাপ রমণী তাদের পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছে, তার হিসাব নেই। তাদের বর্বরতার হাত থেকে নারীত্বের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে বিভিন্ন ছাত্রীনিবাস, নার্সেস কোয়ার্টার ও বাড়িঘরের অসহায় মেয়েরা হয়তো আত্মহত্যাও করেছেন। কিন্তু ১৭ মে ঢাকা টেলিফোন বিভাগের কর্মচারী বাংলার এক বীরাঙ্গনা নারী নিজের নারীত্বের অপমানের শোধ নিয়েছেন জনৈক পাকিস্তানি মেজরকে পিস্তলের গুলিতে হত্যা করে। মেজরটি সেই মহিলাকে জোর করে ধরে নিয়ে ঢাকার দ্বিতীয় রাজধানীর একটি গৃহে আটক করে রাখে। অসহায় মহিলা সেই মুহূর্তে নিজের অবস্থা বিবেচনা করে দুর্বৃত্ত মেজরটির সঙ্গে ভাব করে ফেলেন। তারপর সুযোগ বুঝে তিনদিন পর মেজেরের পিস্তলটি হস্তগত করেন এবং তা-ই দিয়ে মেজরকে গুলি করেন। এভাবেই তিনি তাঁর নারীত্বের অবমাননার চরম প্রতিশোধ নেন।
পরমুহূর্তেই পাহারাদার পাকসৈন্যের গুলিতে মহিলাটিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। কিন্তু সে মৃত্যু ছিলো সুখের। কেননা জীবনের বিনিময়ে তিন একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি দুশমনকে নিজের হাতে হত্যা করতে পেরেছেন।
একজন বাঙালি ললনার এই ধৈর্য ও ত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার পথযাত্রায় অবশ্যম্ভাবী সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করছে।
_______________________
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে ৮-৬-১৯৭১ এ প্রচারিত।
রচনাঃ বেলাল মোহাম্মদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



